সাম্প্রদায়িক বিভাজন-বিদ্বেষের রাজনীতি উপমহাদেশকে উত্তপ্ত করবে

Facebook Twitter Google Digg Reddit LinkedIn StumbleUpon Email
মোহাম্মদ শাহ আলম : ভারতের সাধারণ নির্বাচন হয়ে গেল। ২৩ মে বিজেপি আবার নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠ আসন পেয়ে ক্ষমতায় আসীন হয়েছে। শাসক দল বিজেপি বিশেষ করে নরেন্দ্র মোদি ভারতের নিরাপত্তা ও হিন্দুত্ববাদ প্রধান ইস্যু হিসাবে এবারের নির্বাচনী রাজনীতিতে নিয়ে আসে। কাশ্মীরে ভারতীয় আধা-সামরিক জোয়ানদের উপর সন্ত্রাসী হামলায় ৪৪ জন জোয়ানের অকাল মৃত্যু, ভারত-পাকিস্তানের মধ্যে যুদ্ধ উত্তেজনা, নরেন্দ্র মোদির ভারতের নিরাপত্তা-হিন্দুত্ববাদ ও সাম্প্রদায়িক রাজনীতির পালে নতুন করে বাতাস তুলে। কৃষি সমস্যা, বেকারত্ব, শ্রম অধিকারসহ অর্থনৈতিক-সামাজিক অন্যসব জ্বলন্ত বিষয়, দাবি ও ইস্যু ধামাচাপা ও প্রান্তিক অবস্থানে চলে যায়। কংগ্রেসসহ উদার গণতান্ত্রিক ও বামপন্থি শক্তি হীনবল হয়ে পড়ে। মানুষের জীবন নিয়ে হীন রাজনীতির এই কূটকৌশল রাজনীতিতে সাময়িক সাফল্য নিয়ে আসলেও আখেরে ভারতীয় জাতির জন্য, দেশের জন্য তা মঙ্গলজনক হবে কিনা? বিভাজনের এই সাম্প্রদায়িক রাজনীতির শেষ কোথায়? বিভাজনের সাম্প্রদায়িক রাজনীতি কি ভারতের নিরাপত্তার জন্য সহায়ক? গত নির্বাচনে যা বিজেপি নিয়ে এসেছে। এই রাজনীতি ভারতের অভ্যন্তরে যে বিচ্ছিন্নতা বোধের জন্ম দিচ্ছে তা থেকে জঙ্গী ও মৌলবাদী শক্তির উর্বর ক্ষেত্র কি তৈরি হচ্ছে না? বিশেষ করে হিন্দু-মুসলিম জঙ্গী-মৌলবাদী গোষ্ঠীর উত্থান ভারতে বুর্জোয়া গণতান্ত্রিক কাঠামো ও প্রতিষ্ঠানকে বিপদগ্রস্ত ও তছনছ করবে না? এদের অপতৎপরতার ফলশ্রুতিতে রাষ্ট্রের নিপীড়নের হাতিয়ারগুলি শাসকদল কি শক্তিশালী করে তুলবে না? এর ফলে গণতন্ত্রের Space কি সঙ্কুচিত হয়ে পড়বে না? আশেপাশে রাষ্ট্রগুলির উপর এর ক্রীয়া-প্রতিক্রিয়া কি হবে? এ সকল প্রশ্ন ও জিজ্ঞাসা মানুষের মনকে আলোড়িত করছে। মসুলিম লীগ রাষ্ট্রীয় স্বয়ং সেবক সংঘ (আর.এস.এস)-এর সাম্প্রদায়িক বিভাজনের রাজনীতি ১৯৪৭ সালে সাম্প্রদায়িকতার ভিত্তিতে ভারতকে বিভক্ত করে। ভারত বিভক্তি নিয়ে কংগ্রেসের অভ্যন্তরে তৎকালে তুমুল দ্বন্দ্ব ও বিতর্ক তৈরি হয়। ভারত বিভক্তির পর পাকিস্তান ইসলামিক রাষ্ট্র হিসেবে জন্ম নেয়। ভারতে কংগ্রেসের নেতৃত্বে অসাম্প্রদায়িক গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র ব্যবস্থা কায়েম হলেও তার আর্থ-সামাজিক ভিত্তিভূমি ছিল দুর্বল। প্রথম মহাযুদ্ধের পর ১৯১৯ সালে অপমানজনক ভার্সাই সন্ধিচুক্তি যেমন নাৎস্বীবাদ-ফ্যাসিবাদের জন্ম দেয় তেমনি কৃত্রিমভাবে ভারত বিভক্তি আজকে ভারত উপ-মহাদেশে নতুন রূপ-আঙ্গিকে জঙ্গীবাদ-মৌলবাদ ও সাম্প্রদায়িক রাজনীতির উত্থান ঘটিয়েছে। বর্তমান অবস্থা উপলব্ধি করতে হলে ১৯৪০-এর দশকের ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটের দিকে দৃষ্টি দেয়া প্রয়োজন বলে মনে হয়। এখানে আমরা যদি মৌলানা আবুল কালাম আজাদের ‘ভারত স্বাধীন হলো’ বইয়ের ‘লর্ড মাউন্ট ব্যাটেন মিশন’ এর অধ্যায়ে মৌলনা আজাদের মন্তব্য ও বক্তব্যের দিকে তাকাই তাহলে উপ-মহাদেশের বর্তমান সাম্প্রদায়িক রাজনীতির গর্ভধারণকে আমাদের বুঝতে সহজ হয়। মৌলানা আজাদ লিখেছিলেন “কোনো চূড়ান্ত ব্যবস্থা না নেওয়ার জন্যে আমি আমার দুই সহযোগীকে বুঝিয়েছিলাম। আমি দেখলাম প্যাটেল ভারত বিভাগের জন্যে এতই নেচে উঠেছেন যে, অন্যপক্ষের কোনো কথাই তিনি বিশেষ কানে তুলতে চান না। ২ ঘণ্টার ওপর আমি তাঁকে সমানে যুক্তি দেখালাম। বললাম, দেশভাগ মেনে নিলে চিরদিন তা ভারতের গলায় কাঁটা হয়ে থাকবে। দেশভাগে সাম্প্রদায়িক সমস্যার সুরাহা তো হবেই না, বরং তাতে দেশের পক্ষে সৃষ্টি হবে চিরকেলে সমস্যা। দেশভাগ মানা মানে শ্লোগানটাকেই মেনে নেওয়া। হিন্দু আর মুসলমান ভিত্তিতে দেশকে টুকরো করতে প্রাণ থাকতে কংগ্রেস রাজী হয় কী করে? সাম্প্রদায়িক ভয়-ভীতি দূর করার বদলে, সাম্প্রদায়িক বিদ্বেষের ভিতের ওপর দুটি রাষ্ট্র সৃষ্টি করে দেশভাগ সেই ভয়ভীতিকে চিরস্থায়ী করে তুলবে। বিদ্বেষের ভিত্তিতে একবার রাষ্ট্রপত্তন করলে সে জল কোথায় গড়াবে কেউ বলতে পারে না।” (ভারত স্বাধীন হলো বইয়ের মাউন্টব্যাটেন মিশন, পৃষ্ঠা-১৩৯, অষ্টম মুদ্রণ জানুয়ারি ২০১৫।) সাম্প্রদায়িক বিদ্বেষের ভিত্তিতে ভারত বিভক্তির জল কোথায় গড়িয়েছে তা ভারত উপ-মহাদেশের জনগণ মর্মে মর্মে উপলব্ধি করছে। পাকিস্তান হয়েছে সাম্প্রদায়িক জঙ্গীদের চারণভূমি, ভারত-বাংলাদেশের সামাজিক ও রাজনৈতিক ক্ষেত্রে সাম্প্রদায়িক রাজনীতির নবউত্থান হয়েছে। “সাম্প্রদায়িক ভয়ভীতি দূর করার বদলে, সাম্প্রদায়িক বিদ্বেষের ভিতের উপর দুটি রাষ্ট্র সৃষ্টি করে দেশভাগ সেই ভয়ভীতিকে চিরস্থায়ী করবে”। মৌলানা আজাদের এই মন্তব্য আজ কি সত্য প্রমাণ হচ্ছে না? ভারতের গত নির্বাচন ২০১৯-এর পূর্ব মুহূর্তে কাশ্মিরের পুলওয়ামায় জঙ্গী হামলায় ৪৪ ভারতীয় জোয়ানের নির্মম মৃত্যু পাকিস্তান ও মুসলিম বিদ্বেষ ভারতের জনগণের মধ্যে তুঙ্গে উঠে। এই বিদ্বেষ ও ভয়ভীতিকে কাজে লাগিয়ে ভারতের নিরাপত্তা নির্বাচনী রাজনীতির প্রধান বিষয় হয়ে উঠে। আগেও উল্লেখিত হয়েছে অন্য জাতীয় সমস্যা অর্থনৈতিক-সামাজিক জনগুরুত্বপূর্ণ ইস্যু ধামাচাপা পড়ে যায়। সামনে উঠে আসে জাতীয় নিরাপত্তা ও হিন্দুত্ববাদের রাজনীতি। ভারত পাকিস্তানের মধ্যে যুদ্ধউন্মাদনা সৃষ্টি হয়। এই পটভূমিতে বিজেপি ২৩ মে লোকসভা নির্বাচনে জয়লাভ করে। ফলে ভারতের রাজনীতি ও সমাজে সাম্প্রদায়িক বিভাজনের রাজনীতি চূড়ান্ত পর্যায়ে উত্তীর্ণ হয়েছে। উপ-মহাদেশের স্বাধীনতার ৭২ বছর পরও এই উপ-মহাদেশে জনগণ সাম্প্রদায়িক বিদ্বেষ ও রাজনীতির কবল থেকে এখনও মুক্ত হতে পারছে না। এই সমস্যা চিরকেলে সমস্যা উঠেছে। “দেশভাগে সাম্প্রদায়িক সমস্যার সুরাহা তো হবেই না তাতে দেশের পক্ষে সৃষ্টি হবে চিরকেলে সমস্যা”। মৌলানা আজাদের এই বক্তব্য আজ কতইনা সত্য। উপ-মহাদেশের জনগণ তা হাড়ে হাড়ে উপলব্ধি করছে– বলী হচ্ছে সাম্প্রদায়িক রাজনীতির যুপকাষ্ঠে। কিন্তু প্রতিক্রিয়াশীল শক্তি ও পুঁজিবাদী অর্থনীতির বাজার মৌলবাদ জনগণের আর্থ-সামাজিক মুক্তিকে রুদ্ধ ও বাধাগ্রস্ত করার জন্য সাম্প্রদায়িক হাতিয়ারকে আজ নতুন আঙ্গিকে নতুন রূপে ও উদ্দেশ্যে ব্যবহার করছে। অরুন্ধুতি রয় ভারতের রাজনৈতিক অবস্থা ব্যাখ্যা করতে গিয়ে এক সাক্ষাৎকারে বলেন, “Arendhati Roy: I’ve been working about all this for some 20 years, Basically during the 80’s and early 90’s. The Congress governments opened two locks; one was the lock of the Babri Masjid, the mosque in Ajodhya. Which some people claim is actually the birth place of the Hindu God Ram. The Second was the introduction of a free market ecomomy. Opening this two locks unleashed two kind of totalitarianism in economic neoliberal market fundamentalism and Hidutia-religious, Hindu chavuinist nationalism.” আমি এইসব নিয়ে গত বিশ বছর ধরে কাজ করছি বিশেষ করে ৮০-র দশক এবং ৯০-র দশকের শুরু থেকে। কংগ্রেস সরকার দুইট রুদ্ধদ্বার উন্মুক্ত করে দেয় (Two lock’s) একটি হলো অযোধ্যার বাবুরি মসজিদের দরজা খোলা, যেটাকে কিছু মানুষ হিন্দু ভগবান রামের প্রকৃত জন্মভূমি বলে মনে করে। আর অন্যটি হলো অর্থনীতিতে মুক্তবাজার চালু করা। এই দুই বন্ধ দরজা খোলার ফলে অর্থনীতি ও সমাজে দুই ধরনের কর্তৃত্ববাদের জন্ম দেয়। একটি হলো অর্থনীতিতে বাজার মৌলবাদ আর সমাজ ও মানস চেতনায় হিন্দু জাত্যাভিমান-হিন্দুত্ববাদ। কংগ্রেস এটা শুরু করলেও বিশ্বের ও ভারতের অবাধ মুক্ত বাজার পন্থীরা কংগ্রেস ও বিজেপির নরমপন্থীদের উপর আস্থা ও ভরসা রাখতে পারেনি। তারা তাদের স্বার্থে বেছে নিয়েছে আর.এস.এস নির্ভর উগ্র বিজেপিকে। তারা নির্ভরযোগ্য ব্যক্তি হিসেবে বেছে নিয়েছেন নরেন্দ্র মোদিকে। অবাধ মুক্তবাজারপন্থী আধুনিক পুঁজিবাদ ভাবাদর্শ হিসেবে ভর করেছে মধ্যযুগীয় ধর্মীয় ভাবাদর্শের উপর। নিপীড়িত শোষিত মানুষকে বঞ্চনাকারী এই গণবিরোধী প্রতিক্রিয়াশীল ও দেশ-জনগণের সম্পদ লুটপাটকারীরা মানুষকে সাম্প্রদায়িক বিষে অতীতাশ্রয়ী করে রামরাজ্যের ন্যায় কল্পনা রাজ্যের স্বপ্নে বুদ রাখছে এবং তুলেছে। এইভাবে নিপীড়ত জনগণকে শাসকশ্রেণি প্রতারিত করছে। মৌলানা আবুল কালাম আজাদ মনে করতেন ঐক্যবদ্ধ ভারত সাম্প্রদায়িক সমস্যার সমাধান করতে পারে- বিভক্ত ভারত সাম্প্রদায়িকতাকে স্থায়ী করবে- যা আগেও উল্লেখিত হয়েছে। সমস্যা সমাধানে তাঁর বক্তব্য ছিল আধুনিক এবং প্রগতিশীল। “ভাগ্য যখন ভারতের মুঠোয় আসবে, তখন সাম্প্রদায়িক অবিশ্বাস আর বিসংবাদের অধ্যায় ভুলে গিয়ে আসবে আধুনিক দৃষ্টিতে জীবনের হালফিল সমস্যার মুখোমুখি হওয়ার নতুন পালা। বিভেদ তখনও নিঃসন্দেহে থেকে যাবে, কিন্তু তা হবে অর্থনৈতিক-সাম্প্রদায়িক নয়, রাজনৈতিক বিরোধিতা তখনও থাকবে, কিন্তু তার ভিত্তি ধর্মীয় হবে না- হবে অর্থনৈতিক আর রাজনৈতিক প্রশ্ন নিয়ে। ভবিষ্যতের বিন্যাস হবে শ্রেণিগত সম্প্রদায় ভিত্তিতে নয়; নীতিও গড়ে উঠবে সেই ধারায়।” (ভারত স্বাধীন হল বইয়ের, ব্রিটিশ ক্যাবিনেট মিশন অধ্যায়, পৃষ্ঠা ১১০) ভারতের বিভক্তির ফলে উপ-মহাদেশে এই ধারায় রাজনীতি এগুলো না। মৌলানা আজাদ ছিল ব্রিটিশ ক্যাবিনেট মিশনের ফেডারেল রাষ্ট্র ব্যবস্থার প্রস্তাবের পক্ষে। এই প্রস্তাবের ভিত্তিতে কংগ্রেস ও মুসলিম লীগের মধ্যে রফা হয়ে ১৯৪৬ সালে অন্তবর্তী সরকার হলো, কিন্তু এটা টিকলো না, কারণ জওহর লাল নেহেরুর ফেডারেল সরকার বিষয়ে অসতর্ক বক্তব্যের সুযোগ নিয়ে কায়দে আজম মোহাম্মাদ আলী জিন্নাহ কংগ্রেস ও মুসলিম লীগের সমঝোতা থেকে সরে পড়েন। সাম্প্রদায়িকতার ভিত্তিতে ভার বিভক্তির ফলে ১৯৪৭ সালের পর থেকে দীর্ঘদিন ধরে ভারতে ধর্মনিরপেক্ষ উদার গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা চর্চা হলেও বর্তমানে ৭২ বছর পরও এই গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা আজ হুমকি-বিপদগ্রস্ত। সাম্প্রদায়িক বিভাজনের রাজনীতি নতুন করে উচ্চমাত্রা পেয়েছে। প্রশ্ন উঠেছে বর্ণবাদী ইহুদি রাষ্ট্র ইসরাইলের ন্যায় ভারতও বর্ণবাদী, সাম্প্রদায়িক ও হিন্দু রাষ্ট্রে পরিণত হবে কিনা? এরকম আলামত বিজেপি নেতাদের বক্তব্যে শুনতে পাওয়া যায়। নতুন করে তারা ভারতের নাগরিক পঞ্জি করছে। যার প্রধান টার্গেট ভারতের মুসলমান সম্প্রদায়। আরও বিপজ্জনক বক্তব্য হলো পাকিস্তান-বাংলাদেশের হিন্দু, শিখদের তারা আশ্রয় দেওয়ার প্রত্যাশা দিচ্ছে। এই বক্তব্য ধর্মান্ধ প্রতিক্রিয়াশীল শক্তিকে উৎসাহিত করবে। এই পদক্ষেপ পাকিস্তানকে আরও ধর্মান্ধ করবে। এমনকি বাংলাদেশকেও ধর্মীয় রাষ্ট্রে পরিণত করার পথকে সুগম করবে। এ সুযোগে মানুষের আর্থ-সামাজিক ও জীবনের দাবি নিয়ে খেলতে পারবে শোষকশ্রেণি। এর ফলশ্রুতিতে করপোরেট পুঁজি ও মানবতাবিরোধী শক্তি লাভবান হবে। উপ-মহাদেশের শান্তি ও পারস্পরিক নিরাপত্তা সবসময় থাকবে হুমকির মধ্যে। এটাই কি ভারত উপ-মহাদেশের জনগণের বিধিলিপি। কিন্তু না সময় এক জায়গায় থাকে না- সময় বহমান। উগ্র জাতীয়তা, সাম্প্রদায়িকতা, বর্ণ, মুসলিম, অভিবাসী বিদ্বেষ, এই যে বিদ্বেষের রাজনীতির বন্যা পৃথিবীব্যাপী প্রবলবেগে প্রবাহিত হচ্ছে। মানুষ ও মানব সভ্যতাকে পরস্পর থেকে বিভক্ত বিচ্ছিন্ন করছে এর অন্তর্নিহিত কারণ কি? এর কারণ সম্পর্কে কিছুটা ইতিমধ্যে উল্লেখিত হয়েছে। তবুও একটু ব্যাখ্যা প্রয়োজন। মানব সভ্যতায় বুর্জোয়ারা সামন্তবাদ ও রাজতন্ত্রকে পরাজিত করে, বিশেষ করে ফরাসি বিপ্লবের মাধ্যমে তিনটা ঐতিহাসিক অবদান রেখেছে। (১) রাষ্ট্রকে গির্জা থেকে পৃথক করে ধর্ম নিরপেক্ষ রাষ্ট্রের জন্ম দেয়। (২) সমাজ চেতনায় বিজ্ঞান চেতনাকে প্রধান বিষয়ে পরিণত করে। সামন্তসমাজে সমাজ চেতনার মূল বিষয় ছিল ধর্ম। (৩) রাজনীতিতে চালু করে গণতন্ত্র, মানবিক মূল্যবোধও প্রসারিত হয়। এই তিনটি আজ বিশ্ব সাম্রাজ্যবাদী কর্পোরেট পুঁজির স্বার্থের সাথে সাংঘর্ষিক হয়ে উঠেছে। এগুলোকে মেনে-রক্ষা করে তার শ্রেণিস্বার্থ রক্ষা করা আজ কঠিন হয়ে পড়েছে। তাই এগুলোকে তারা ধ্বংস, ছুড়ে ফেলা ও সংকোচিত করছে। যা আমরা ট্রাম্পের শাসনামলে উগ্র জাতীয়তার নামে আমেরিকায় এবং এখন ইউরোপের গণতান্ত্রিক মূল্যবোধসম্পন্ন দেশগুলোতে অভিবাসী, মুসলিম, বর্ণ বিদ্বেষের উত্থানের মধ্য দিয়ে উদার গণতান্ত্রিক ব্যবস্থাকে হুমকিগ্রস্ত হতে দেখছি। সর্বত্র রাষ্ট্র কর্তৃত্ববাদী হয়ে উঠেছে। গণতন্ত্র ও সুশাসন সংকোচিত হচ্ছে। এর সাথে সঙ্গতিপূর্ণভাবে ভারত উপ-মহাদেশে বিশেষ করে ভারতে সাম্প্রদায়িকতার কবলে পড়ে ভারতীয় গণতন্ত্র বিপন্ন হচ্ছে। সাম্প্রদায়িকতার আলখেল্লা পড়েছে ভারতীয় কর্পোরেট পুঁজি। আধুনিক পুঁজিবাদ ও তার সাথে মধ্যযুগীয় ধর্মীয় ভাবাদর্শ তার উপজীব্য ও শোষণের হাতিয়ার হয়ে উঠছে। বুর্জোয়াদের পশ্চাতগতি তাদের দুর্বলতাকে উন্মোচিত করছে। জাতিরাষ্ট্র-সাম্প্রদায়িকতা বিশ্বের বিজ্ঞান-কৃৎ কৌশলগত উন্নয়নকে ধারণ করতে পারছে না। সাইন্টিফিক-টেকনোলোজিকাল বিপ্লব (STR) বিশ্বকে সংহত, ছোট, সময় ও দূরত্বকে কমিয়ে দিয়েছে। ই-মেইল, টুইটার, ফেইসবুক, হোয়াটসঅ্যাপ, ওয়েবসাইট, ইউটিউব বিশ্ব উৎপাদিকা শক্তি হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। এগুলো বিশ্বকে ইনট্রিগ্রেটেড-ঐক্যবদ্ধ করছে। আর বিশ্ব গ্লোবাল পুঁজি (clash of civilization) তত্ত্বে সজ্জিত হয়ে জাতিতে-জাতিতে, ধর্মে-ধর্মে, বর্ণে-বর্ণে পৃথিবীকে বিভক্ত করছে। এই রাজনীতি এই ব্যবস্থা (STR)-এর সাথে সাংঘর্ষিক হয়ে উঠেছে। পুঁজিবাদী বর্তমান ব্যবস্থার সাথে বিজ্ঞান-প্রযুক্তিগত উন্নয়নের দ্বন্দ্ব, বৈরি দ্বন্দ্বে রূপ নিয়েছে। তাই দেশে দেশে গ্লোবাল পুঁজির নীতি ও কর্মকৌশলের সাময়িক সাফল্য দেখা গেলেও আখেরে তা ব্যর্থ হতে বাধ্য। কারণ মধ্যযুগীয় ধর্মীয় ভাবাদর্শের বিভাজনের সাম্প্রদায়িক রাজনীতি ভারতের জনগণের মঙ্গল বয়ে আনবে না। তা ব্যর্থ হতে বাধ্য। মানবতাবিরোধী এই সাম্প্রদায়িক বিভাজনের রাজনীতি উপ-মহাদেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতিকে উত্তপ্ত করবে। লেখক : সাধারণ সম্পাদক, কেন্দ্রীয় কমিটি, সিপিবি

Print প্রিন্ট উপোযোগী ভার্সন



Login to comment..
New user? Register..