ইরান ইস্যুতে নতুন উত্তেজনা

Facebook Twitter Google Digg Reddit LinkedIn StumbleUpon Email

একতা বিদেশ ডেস্ক : মধ্যপ্রাচ্যে ইরান ইস্যুতে উত্তেজনায় যুক্ত হলো নতুন মাত্রা। ১৩ জুন উপসাগরীয় অঞ্চলে তেলবাহী দুটি ট্যাংকারে বড় ধরনের টর্পেডো হামলা চালানো হয়েছে। এতে একটি ট্যাংকার পুরোপুরি ডুবে গেছে এবং অন্যটিও অনেক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। নতুন এ হামলার মধ্য দিয়ে ইরান-যুক্তরাষ্ট্র উত্তেজনা আরো বৃদ্ধি পাবে বলেই মনে করা হচ্ছে। এর আগে সৌদি আরবের তেলবাহী জাহাজে অজ্ঞাত হামলার জন্যও ইরানকে দায়ী করা হয়েছিল। তখন মক্কায় জরুরি সম্মেলন ডেকে ইরান সন্ত্রাসবাদী কার্যক্রমে জড়িত দাবি করে দেশটিকে প্রতিহত করার আহ্বান জানান সৌদি আরবের বাদশাহ সালমান বিন আবদুল আজিজ। ওই হামলাও ইরানের ভূখণ্ড থেকে কাছাকাছি অবস্থিত ছিল। সৌদি সংবাদমাধ্যম আল হাদাথ সর্ব প্রথম হামলার ছবি প্রকাশ করে। এর আগে উপসাগরীয় অঞ্চলের ঠিক এই স্থানেই ইরানের বিরুদ্ধে মাইন ব্যবহারের অভিযোগ এনেছিল যুক্তরাষ্ট্র। দেশটির দাবি ইরান আরো ৪টি তেলবাহী জাহাজে হামলা চালিয়েছে গত মাসে। তবে এবারের হামলা চালানো জাহাজ দুটোতে জাপানি কার্গো পরিবহন করা হচ্ছিল। এ হামলা ঠিক তখনই ঘটলো যখন জাপানের প্রধানমন্ত্রী শিনজো আবে ইরানের রাজধানী তেহরানে সুপ্রিম লিডার আয়াতুল্লাহ খামেনির সঙ্গে বৈঠক করছেন। হামলার শিকার একটি জাহাজ সৌদি আরব থেকে সিঙ্গাপুর যাচ্ছিল। অপর আরেকটি জাহাজ কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, তাদের জাহাজে টর্পেডো হামলা হয়েছে। এই হামলার পরপরই বিশ্বজুড়ে তেলের দাম বেড়ে গেছে। এখন পর্যন্ত বিশ্ববাজারে তেলের দাম বেড়েছে শতকরা ৪ শতাংশ। এখন ব্যারেল প্রতি তেল ৬২ ডলারে বিক্রি হচ্ছে। এটি আরো বাড়তে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। মার্কিন নৌবাহিনী জানিয়েছে, হামলার সঙ্গে সঙ্গেই তারা ক্ষতিগ্রস্ত জাহাজগুলোতে উদ্ধার অভিযান পরিচালনা করে অবস্থানরত সবাইকে উদ্ধার করেছে। জাহাজ কোম্পানি জানিয়েছে, তাদের সকল ক্রু নিরাপদ রয়েছেন। তবে ইরান জানিয়েছে, তাদের উদ্ধারকারী জাহাজ গিয়েই ক্রুদের উদ্ধার করেছে। মার্কিন নৌবাহিনী শুধু তাদেরকে পানি থেকে উদ্ধার করেছে। টর্পেডো হামলাটি হয়েছে বহুল আলোচিত হরমুজ প্রণালীতে। দীর্ঘ সময় ধরেই ইরান হরমুজ প্রণালী বন্ধ করে দেয়ার হুমকি দিয়ে আসছে। এ অঞ্চল দিয়েই পৃথিবীর ২০ শতাংশ তেল পরিবহন করা হয়ে থাকে। ইরান এ হামলাকে ষড়যন্ত্রমূলক হামলা হিসেবে অভিহিত করেছে। ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী জাভাদ জারিফ ইঙ্গিত দিয়েছেন যে, কোনো একটি দেশ এ হামলা চালিয়ে ইরানের ওপর দায় চাপাতে চাচ্ছে যাতে করে জাপানি প্রধানমন্ত্রীর সফর ভণ্ডুল হয়ে যায়। এদিকে, ওয়াশিংটনের নিষেধাজ্ঞা সমর্থন করলে তার পরিণতি সম্পর্কে সরাসরি হুমকি দিয়েছেন ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী। জার্মান পররাষ্ট্রমন্ত্রী অবশ্য উত্তেজনা এড়াতে যাবতীয় কূটনৈতিক পদক্ষেপ নেবার অঙ্গীকার করেছেন। আমেরিকা ও ইরানের মধ্যে সংঘাত পুরোপুরি যুদ্ধের আকার নিতে পারে, এমন আশঙ্কা আর উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না। বিশেষ করে মার্কিন নিষেধাজ্ঞার ফলে ইরানের অর্থনীতি বিপর্যস্ত হয়ে পড়ায় সে দেশের নেতৃত্ব মরিয়া হয়ে উঠেছে। আগামী জুলাই মাসের মধ্যে ইউরোপ, চীন ও রাশিয়া ইরানের সঙ্গে বাণিজ্য স্বাভাবিক করতে না পারলে সে দেশ পরমাণু চুক্তি অন্তত আংশিকভাবে বর্জন করার হুমকি দিয়েছে। এমন প্রেক্ষাপটে জার্মান পররাষ্ট্রমন্ত্রী হাইকো মাস তাঁর ইরান সফরে কোনো বড় কূটনৈতিক সাফল্যের আশা করেন নি বটে, কিন্তু তেহরানে তাঁর সঙ্গে যৌথ সংবাদ সম্মেলনে সে দেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী জাভাদ জরিফ যে পশ্চিমা জগতের বিরুদ্ধে খোলাখুলি হুমকি দেবেন– এমনটাও তিনি ভাবতে পারেন নি। মার্কিন নিষেধাজ্ঞার মাধ্যমে ইরানের বিরুদ্ধে ‘অর্থনৈতিক যুদ্ধ’ চালানোর বিষয়ে সাবধান করে দেন জরিফ। তাঁর মতে, যারা এই যুদ্ধ পরিচালনা করছে বা তার প্রতি সমর্থন জানাচ্ছে, তারা নিরাপদ থাকার আশা করতে পারে না। গোটা অঞ্চলে উত্তেজনা কমাতে এই অর্থনৈতিক যুদ্ধ বন্ধ করতে হবে, বলেন ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী। এ ক্ষেত্রে জার্মানি তথা ইউরোপীয় ইউনিয়ন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন। জার্মান পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, সিরিয়া ও ইয়েমেনে যুদ্ধ চললেও সৌভাগ্যবশত ইরানে কোনো যুদ্ধ চলছে না। তাঁর মতে, পরিস্থিতি সে রকম রাখতে তাঁরা সব কিছু করতে চান। তবে গোটা অঞ্চলে উত্তেজনা দুশ্চিন্তার কারণ হয়ে উঠেছে। সামান্য ঘটনাও হিংসায় ইন্ধন যোগাতে পারে। তাই যে কোনো অবস্থায় এমন পরিস্থিতি এড়িয়ে যেতে সব কিছু করতে হবে বলে মনে করেন জার্মান পররাষ্ট্রমন্ত্রী। তিনি ইরানের নেতৃত্বের উদ্দেশ্যে পরমাণু চুক্তি মেনে চলার ডাক দেন। ওয়াশিংটন অবশ্য ইরানের হুমকির তোয়াক্কা করছে না। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক মুখপাত্র বলেন, পরমাণু ব্ল্যাকমেল কাজে লাগিয়ে অন্যান্য দেশকে ভয় দেখানো তেহরানের বিপ্লবি প্রশাসনের বৈশিষ্ট্য। ইরান সফরের পর হাইকো মাস সার্বিকভাবে দুশ্চিন্তায় পড়েছেন। সুইডেনে পরমাণু শক্তিধর নয়, এমন ১৮টি দেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের সম্মেলনের আগে তিনি গোটা বিশ্বে পরমাণু নিরস্ত্রীকরণ ও পরমাণু অস্ত্র প্রসার রোধের উদ্যোগ সম্পর্কে সংশয় প্রকাশ করেছেন। তাঁর মতে, এই নেতিবাচক প্রবণতার বিরুদ্ধে সম্মিলিতভাবে পদক্ষেপ নিতে হবে। তাঁর মতে, ইরানের সঙ্গে পরমাণু চুক্তির ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে। উত্তর কোরিয়ার সঙ্গে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সংলাপেও কোনো অগ্রগতি হচ্ছে না। ওয়াশিংটন ও মস্কোর মধ্যে স্টার্ট চুক্তির মেয়াদ বাড়ানোর সম্ভাবনা নিয়েও প্রশ্ন উঠছে। উল্লেখ্য, বিশ্বের বিভিন্ন সংকটের ক্ষেত্রে ট্রাম্প প্রশাসনের ভূমিকা নিয়ে সংশয় বাড়ছে।

Print প্রিন্ট উপোযোগী ভার্সন



Login to comment..
New user? Register..