যুক্তরাজ্যে নতুন প্রধানমন্ত্রী বেছে নিতে ভোটে টোরিরা

Facebook Twitter Google Digg Reddit LinkedIn StumbleUpon Email

একতা বিদেশ ডেস্ক : ব্রিটেনে তেরেসা মে’র যুগ অতীত হয়ে গেছে। এখন ক্ষমতাসীন কনজারভেটিভ পার্টি ও প্রধানমন্ত্রীর হাল ধরার জন্য চলছে দলের মধ্যে লড়াই। এতে অবতীর্ণ ১০ জন শক্তিধর নেতা। তাদের ভিতর থেকে দলের নতুন নেতা ও পরবর্তী প্রধানমন্ত্রী নির্বাচন করা হবে। যদিও যুক্তরাজ্যের ক্ষমতাসীন কনজারভেটিভ পার্টির নেতৃত্ব বাছাইয়ের প্রথম দফা ভোটে সাবেক পররাষ্ট্র মন্ত্রী বরিস জনসন তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বীর তুলনায় প্রায় তিনগুণ বেশি ভোট পেয়ে প্রথম স্থান অর্জন ধরে রেখেছেন। জুলাইয়ের শেষদিকে বিজয়ী ব্যক্তির নাম ঘোষণা করা হবে। ক্ষমতাসীন দলের শীর্ষ নেতা হওয়ার পাশাপাশি ওই বিজয়ী প্রার্থী বর্তমান প্রধানমন্ত্রী টেরিজা মে-র স্থলাভিষিক্ত হবেন। ৮ বছর লন্ডনের মেয়রের দায়িত্বে থাকা জনসন প্রথম দফার ভোটে ‘উল্লসিত’ হলেও এখনও অনেক পথ বাকি বলে সমর্থকদের সতর্ক করেছেন। ভোটে কোনো প্রার্থী বাতিল হলে বাকি প্রার্থীদের ওপর দ্বিতীয় দফায় একই রকম ভোট হবে আগামী সপ্তাহে। সেই ভোটে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে হলে একজন প্রার্থীকে পেতে হবে কমপক্ষে ৩৩ ভোট। এর কম ভোট পেলেই তিনি বাতিল হবেন। তবে যদি সব প্রার্থীই ৩৩ ভোটের বেশি পান তাহলে সবচেয়ে কম ভোট যিনি পাবেন তিনিই এ প্রক্রিয়া থেকে ছিটকে পড়বেন। এ প্রক্রিয়া চলতে থাকবে যতক্ষণ পর্যন্ত প্রার্থী দু’জন না হন। তারপর ওই দুই প্রার্থীর ওপর ভোট হবে। তাতে যিনি সবচেয়ে বেশি ভোট পাবেন তিনিই হবেন কনজারভেটিভ দলের পরবর্তী নেতা এবং তিনিই হবেন সাবেক প্রধানমন্ত্রী তেরেসা মে’র উত্তরসূরি। তার জন্য বরাদ্দ হয়ে যাবে ১০ ডাউনিং স্ট্রিট। বিজয়ী এমন সৌভাগ্যবানের নাম ঘোষণা করা হতে পারে ২২ জুলাই। নেতৃত্বের এই লড়াইয়ে এখন পর্যন্ত যারা টিকে আছেন তার ১০ জন হলেন পরিবেশমন্ত্রী ও ২০১৬ সালে ব্রেক্সিটের পক্ষে জোরালো অবস্থানকারী মাইকেল গভ। তিনি বলেছেন, তিনি ব্রেক্সিট প্রক্রিয়াকে আরো বিলম্বিত করাবেন। প্রতিযোগিতায় আছেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী ম্যাট হ্যানকক, সাবেক চিপ হুইফ মার্ক হারপার, পররাষ্ট্রমন্ত্রী জেরেমি হান্ট, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সাজিদ জাভিদ, সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী বরিস জনসন, হাউজ অব কমন্সের সাবেক নেতা আন্দ্রেয়া লিডসম, কর্ম ও পেনশন বিষয়ক সাবেক মন্ত্রী এস্থার ম্যাকভি, ব্রেক্সিট বিষয়ক সাবেক মন্ত্রী ডমিনিক রাব ও আন্তর্জাতিক উন্নয়ন বিষয়ক মন্ত্রী রোরি স্টিওয়ার্ট। এর মধ্যে নেতৃত্বের প্রচারণা ১৩ জুন শুরু করেছেন সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী বরিস জনসন। তাকে নির্বাচনে ফ্রন্ট রানার হিসেবে ধরা হচ্ছে। যেকোনো প্রার্থীর চেয়ে তিনি বেশি এমপির সমর্থন পাবেন বলে মনে করা হয়। তিনি এমপিদের কাছে কথা দিয়েছেন, আগামী অক্টোবরের শেষ নাগাদ ব্রিটেনকে ইউরোপিয়ান ইউনিয়ন থেকে বের করে আনবেন। তবে কি পরিকল্পনায় তিনি এটা করবেন সে বিষয়ে বিস্তারিত কিছু বলেন নি। কোনো চুক্তি ছাড়া ব্রিটেনকে বের করে আনার ইচ্ছা তার নেই বলে জানিয়ে দিয়েছেন। তিনি কখনো কোকেন সেবন করেছেন কিনা– এমন প্রশ্ন করা হলে তিনি তা এড়িয়ে যান। বরিস জনসনের প্রতিদ্বন্দ্বী স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সাজিদ জাভিদ। তিনিও ১৩ জুন প্রচারণা শুরু করেছেন। তিনি বরিস জনসনকে ‘গতকালের খবর’ হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন। বলেছেন, আমাদের প্রয়োজন আগামীদিনের, আজকের নেতা। একই পুরনো মুখ দিয়ে একই ঘর ভরতে চাই না আমরা। আমরা চাই একটি নতুন প্রজন্ম, যার থাকবে নতুন এজেন্ডা। প্রথম দফা ভোটে উৎরে পরবর্তী ধাপে কোয়ালিফাই করতে পারেন সাজিদ জাভিদ, মাইকেল গভ, ডোমিনিক রাব ও জেরেমি হান্টও। বাকি ম্যাট হ্যানকক, রোরি স্টিওয়ার্ট, আন্দ্রেয়া লিডসম, মার্ক হার্পার ও এস্থার ম্যাকভি ভাল ফল করার আশা করছেন। কনজার্ভেটিভ পার্টির রয়েছে ৩১৩ জন এমপি। এর মধ্যে মাত্র এক চতুর্থাংশের সামান্য বেশি ভোট দিতে পারবেন প্রার্থী নির্বাচনে। তারা প্রকাশ্যে কাকে সমর্থন দিচ্ছেন তা বলতে পারবেন। কিন্তু ভোট হবে গোপন ব্যালটে। ফলে ভোট দেয়ার সময় একজন এমপি তার মানসিকতা পরিবর্তন করে ফেলতে পারেন। এদিকে ব্রেক্সিট সম্পর্কে ব্রিটেনের প্রধানমন্ত্রী পদপ্রার্থীদের অবস্থানের প্রেক্ষিতে আয়ারল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রী ব্রিটেনের সংসদ সদস্যদের সতর্ক করে দিয়েছেন। ইইউ সাফ জানিয়ে দিয়েছে, নতুন নেতার সঙ্গে কোনো দরকষাকষির সুযোগ নেই। সবকিছু পরিকল্পনা অনুযায়ী চললে জুলাই মাসের শেষে ব্রিটেনে নতুন প্রধানমন্ত্রী শাসনভার গ্রহণ করবেন। তবে ব্রেক্সিট কার্যকর করার জন্য তাঁর হাতে মাত্র তিন মাস সময় থাকবে। কারণ ৩১শে অক্টোবর ব্রিটেন ইইউ ত্যাগ করতে চলেছে। নতুন শীর্ষ নেতা এই মেয়াদ আরও বাড়ানোর আবেদন করবেন কিনা, করলে ইইউ সম্মতি জানাবে কিনা, তাও স্পষ্ট নয়। টোরি দল তথা দেশের নেতৃত্বের দৌড়ে যাঁরা আসরে নেমেছেন, তাঁদের একটা বড় অংশ নির্ধারিত তারিখেই ব্রেক্সিট কার্যকর করার পক্ষে। তবে তাঁরা কীভাবে এত কম সময়ের মধ্যে এমন দুরূহ কাজ করবেন, সে বিষয়ে সন্তোষজনক উত্তর পাওয়া যাচ্ছে না। কয়েক জন প্রার্থী এ বিষয়ে ‘অবাস্তব’ প্রতিশ্রুতি দিয়ে চলেছেন বলেও অভিযোগ উঠছে। এমন প্রেক্ষাপটে ব্রিটেনের অভ্যন্তরীণ রাজনীতি সম্পর্কে সংশয় প্রকাশ করছেন ইইউ নেতারা। প্রতিবেশী দেশ আয়ারল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রী লিও ভারাদকার ব্রিটেনের সংসদ সদস্যদের উদ্দেশ্যে ‘মারাত্মক রাজনৈতিক ভুল পদক্ষেপ’ সম্পর্কে সতর্ক করে দিয়েছেন। তাঁর মতে, ব্রিটেনের বিদায়ী প্রধানমন্ত্রী টেরেসা মে ও ইউরোপীয় ইউনিয়ন যে বিচ্ছেদ চুক্তি সম্পর্কে ঐকমত্যে পৌঁছেছে, নতুন নেতা ক্ষমতায় এলে ইইউ তার তুলনায় আরও ভাল চুক্তি মেনে নেবে, এই ধারণা সম্পূর্ণ ভূল। উল্লেখ্য, ব্রিটেনের সংসদ তিন-তিনবার এই চুক্তির বিরুদ্ধে ভোট দিয়েছে। ইউরোপীয় কমিশনের বিদায়ী প্রেসিডেন্ট জঁ ক্লোদ ইয়ুংকারও মঙ্গলবার আবার সাফ জানিয়ে দিয়েছেন, যে ব্রিটেনের নতুন শীর্ষ নেতা কার্যভার গ্রহণ করলেও ব্রেক্সিট চুক্তিতে কোনো রদবদল সম্ভব নয়। তিনি বলেন, ‘‘টেরেসা মে ও জঁ ক্লোদ ইয়ুংকার নয়, ব্রিটেন ও ইইউ এই চুক্তি স্বাক্ষর করেছে। ইউরোপীয় কমিশনের এক মুখপাত্রও একই সুরে সে কথা জানিয়ে দিয়েছেন। টোরি দলের সবচেয়ে সম্ভাবনাময় প্রার্থী হিসেবে পরিচিত বরিস জনসন ৩১শে অক্টোবর ব্রেক্সিট কার্যকর করতে বদ্ধপরিকর। যে কোনো বিলম্বকে তিনি দলের পরাজয় হিসেবে তুলে ধরতে চলেছেন। তবে এই কড়া অবস্থানকে জনসন ইইউ-র সঙ্গে নতুন আলোচনার চাল হিসেবে ব্যবহার করতে চাইছেন। প্রয়োজনে চুক্তি ছাড়াই ব্রেক্সিট কার্যকর করতে তিনি পিছপা হবেন না বলে তিনি জানিয়েছেন। তবে ইইউ-র কাছে বকেয়া অর্থ আটকে রাখার হুমকি দিয়ে জনসন সবচেয়ে বড় বিতর্ক সৃষ্টি করেছেন। টোরি দলের নেতৃত্বের দৌড়ে অন্য কয়েকজন প্রার্থী বরিস জনসন-এর খোলাখুলি সমালোচনা করছেন। প্রার্থীদের মধ্যে প্রকাশ্য টেলিভিশন বিতর্কে জনসন-কে অংশ নিতে চ্যালেঞ্জ জানিয়েছেন ম্যাট হ্যানকক, মার্ক হার্পার-সহ অনেক প্রতিদ্বন্দ্বী। জনসন অবশ্য এমন বিতর্ক এড়িয়ে চলার চেষ্টা করছেন। বেফাঁস মন্তব্য বা লাগামহীন রসিকতার জন্য পরিচিত এই প্রার্থী নিজের জয়ের সম্ভাবনা ঝুঁকির মুখে ফেলতে চাইছেন না বলে সমালোচকরা মনে করছেন।

Print প্রিন্ট উপোযোগী ভার্সন



Login to comment..
New user? Register..