ভারতে গুরুতর ধাক্কা খেলেন বামপন্থিরা

Facebook Twitter Google Digg Reddit LinkedIn StumbleUpon Email
একতা বিদেশ ডেস্ক : ভারতের লোকসভা নির্বাচনে গুরুতর ধাক্কা খেলেন বামপন্থিরা। সেদেশের স্বাধীনতার পর এমন শোচনীয় ফল অতীতে কখনও হয়নি। গোটা দেশে বামপন্থিরা জিতেছেন সাকুল্যে পাঁচটি আসনে। তামিলনাড়ুতে চারটি, আর কেরালায় একটি আসনে। নির্বাচনে বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে সরকারে ফিরেছেন নরেন্দ্র মোদী। ফলাফল প্রায় পাঁচ বছর আগের মতো বিজেপি’র পক্ষে একতরফা এবং নির্ণায়ক। এবারও ২৭২ আসনের গণ্ডি একাই পেরিয়ে বিজেপি পেয়েছে ৩০২ আসন। বিজেপি নেতৃত্বাধীন এনডিএ জোট পেয়েছে ৩৫০ আসন। আর কংগ্রেস পেয়েছে ৫০ আসন, ইউপিএ জোট ৯২টি আসন। ফলাফলের প্রবণতায় স্পষ্ট, নরেন্দ্র মোদীর নেতৃত্বে বিজেপি’র নির্বাচনী রণকৌশল পুরোপুরই সফল হয়েছে। পর্যবেক্ষকদের অভিমত, বিশেষ করে পাকিস্তানের বালাকোটে বিমানহানাকে ব্যবহার করে উগ্র জাতীয়তাবাদের প্রচার গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলেছে। মেরুকরণে হাতিয়ার হয়েছে কাশ্মীরও। সংখ্যালঘু বিরোধী বিভাজনের প্রকাশ্য এবং আগ্রাসী রাজনীতি প্রতিহত করতে পারেননি বিরোধীরা। পিছনে চলে গিয়েছে কাজের অভাব, কৃষি সঙ্কট, নোট বাতিল, পণ্য ও পরিষেবা কর, রাফালে দুর্নীতি সংক্রান্ত আলোচনা। এদিকে বামপন্থিদের মধ্যে এবার তামিলনাডুতে, মাদুরাই আর কোয়েম্বাটোর কেন্দ্রে জিতেছে সিপিআই (এম)। পাশাপাশি ওই রাজ্যের তিরুপুর ও নাগাপত্তনম কেন্দ্র দু’টিতে জিতেছে সিপিআই। এছাড়াও সিপিআই(এম) জিতেছে কেরালার আলাপুজ্জা কেন্দ্রে। পাঁচ বছর আগে বামপন্থিদের আসন সংখ্যা ছিল ১২। সেবার কেরালায় আটটি আসনে জিতেছিলেন বামপন্থিরা। বাকিগুলির মধ্যে পশ্চিমবঙ্গ ও ত্রিপুরা থেকে ছিল দু’টি করে আসন। বামপন্থিদের এ ভরাডুবি নিয়ে চলছে নানামুখী বিশ্লেষণ। এর মধ্যে নির্বাচনের এ ফলাফলের প্রেক্ষিতে ভারতের কমিউনিস্ট পার্টির কেন্দ্রীয় দপ্তর গত ২৩ মে এক বিবৃতিতে জানায়, ‘ভারতের কমিউনিস্ট পার্টির কেন্দ্রীয় দপ্তর বিজেপি ও এনডিএর পক্ষে জনগণের রায় স্বীকার করে বলেছে যে বিজেপি ও এনডিএ জোট কেরালা, তামিলনাড়ু, পন্ডেচেরি ও অন্ধ্র প্রদেশের রাজ্যে কোনও আসনে জয়ী হতে ব্যর্থ হয়েছে। পার্টি উল্লেখ করে যে, ভুলে যাওয়া উচিত নয় মোদী সরকার, বিজেপি-আরএসএস ভোটারদের মেরুকরণের ধর্মীয় মুল্যবোধ এবং সশস্ত্র শক্তি ব্যাবহারের মত সকল কূটকৌশল প্রয়োগ করে। তারা বেকারত্ব, গ্রামীণ দুর্দশা এবং বিক্ষোভ ও জিএসটির মতো বিধ্বংসী পদক্ষেপসহ বিভিন্ন বাস্তব জ্বলন্ত সমস্যা থেকে মানুষের দৃষ্টি সরিয়ে দিতে সফল হয়েছে। পার্টি চায় ভারতের জনগণ সর্বদা আরো সচেতন হোক, যেমন বিগত পাঁচ বছরে মোদি সরকার শ্রমিক, যুব, ছাত্র, নারী সহ সকল শ্রেণির মানুষের অধিকারসমূহ ক্ষুন্ন করছে। অর্থনীতিতে ইতিমধ্যেই অচলাবস্থা বিরাজ করছে এবং তেলের দাম বৃদ্ধির কারণে সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবন আরও দুর্দশাগ্রস্ত হবে। সংবিধানের মান রক্ষা করার জন্য বাম, ধর্মনিরপেক্ষ, গণতান্ত্রিক শক্তির ঐক্য এখন সময়ের প্রয়োজন। শ্রমিক শ্রেণিরই জন্য এই সংগ্রাম অবধারিত।’ অপর এক বিবৃতিতে সিপিআই (এম)-র পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য কমিটির সম্পাদক সূর্য্যকান্ত মিশ্র বলেছেন, ‘স্বাধীন ভারতের নির্বাচনী ইতিহাসে বামপন্থি, ধর্মনিরপেক্ষ ও গণতান্ত্রিক শক্তির নজিরবিহীন বিপর্যয়ের ঘটনা ঘটেছে সপ্তদশ লোকসভা নির্বাচনে। পশ্চিমবঙ্গের সংসদীয় নির্বাচনের ইতিহাসেও আসন এবং ভোটের শতাংশে এত বড় শোচনীয় পরাজয় আগে কখনও বামপন্থেিদর হয়নি। জনগণের এই রায়কে গ্রহণ করে দেশ বিশেষত: এ রাজ্যে নজিরবিহীন প্রতিকূলতা এবং এক অভুতপূর্ব শ্বাসরুদ্ধকর পরিবেশের মধ্যেও বাম, গণতান্ত্রিক ও ধর্মনিরপেক্ষ শক্তিকে যাঁরা সমর্থন করেছেন তাঁদের অভিনন্দন জানাচ্ছি। এই নির্বাচনী ফলাফলে আরএসএস পরিচালিত বিজেপি’র বিরাট সংখ্যাগরিষ্ঠতায় জয় দেশের গণতন্ত্র, ধর্মনিরপেক্ষতা, জনগণের জীবনজীবিকার সমস্যাসহ সমগ্র সাংবিধানিক কাঠামোর ওপর বিরাট চ্যালেঞ্জ হাজির করেছে। পশ্চিমবঙ্গে তৃণমূল কংগ্রেসের স্বৈরশাসন, প্রতিযোগিতামূলক সাম্প্রদায়িকতা, আরএসএস-বিজেপি’র মতো সাম্প্রদায়িক সংগঠনের প্রভৃত শক্তিসঞ্চয়ে সহায়ক ভূমিকা পালন করেছে। এই নির্বাচনী ফলাফলের নিবিড় রাজনৈতিক-সাংগঠনিক পর্যালোচনা করে সম্পূর্ণ নতুন জাতীয় ও রাজ্য পরিস্থিতিতে আমাদের কর্মসূচি নির্ধারণ করবো। যেকোনো পরিস্থিতির মোকাবিলা করে গণতন্ত্র, ধর্মনিরপেক্ষতা ও জীবনজীবিকার সংগ্রামে আমরা দৃঢ়প্রতিজ্ঞা।’ সিপিআই(এম) পলিট ব্যুরো এক বিবৃতিতে বলেছে, ‘বিজেপি ও তার শরিকদের অনুকূলে মানুষ নির্ণায়ক রায় দিয়েছেন। এই নির্বাচনে পার্টি গুরুতর ধাক্কা খেয়েছে। আমরা এর কারণগুলি নিয়ে আত্মসমীক্ষা করব এবং ভবিষ্যতের জন্য নেব যথার্থ শিক্ষা। এক সাংবাদিক বৈঠকে পার্টির সাধারণ সম্পাদক সীতারাম ইয়েচুরি জানান, আমাদের পলিটব্যুরোর বৈঠকে আমরা এই নির্বাচনের ফলাফল নিয়ে পর্যালোচনা করব। এরপর কেন্দ্রীয় কমিটির বৈঠকে আমরা রাজনৈতিক, সাংগঠিনক ও মতাদর্শগত অবস্থানগুলি সবিস্তারে পর্যালোচনা করব। সিপিআই(এম) প্রার্থীদের যাঁরা ভোট দিয়েছেন, তাদের সবাইকে ধন্যবাদ জানিয়েছে পলিট ব্যুরো। সেইসঙ্গেই, পার্টির বার্তা মানুষের কাছে নিয়ে যাওয়ার জন্য যাঁরা কাজ করেছেন, তাঁদের জানিয়েছে কুর্নিশ। পলিট ব্যুরো বলেছে, সামনে খুবই বড় চ্যালেঞ্জ। আমাদের ধর্মনিরপেক্ষ গণতান্ত্রিক সাধারণতন্ত্র, সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান, মানুষের অধিকার এবং জীবনজীবিকার ইস্যুগুলিকে রক্ষা করা এখন খুবই বড় চ্যালেঞ্জ। সম্প্রীতি রক্ষার সঙ্গেই ভবিষ্যতে ঐক্যবদ্ধভাবে এইসব চ্যালেঞ্জগুলি পূরণের জন্য মানুষের কাছে আহ্বান জানিয়েছে পলিট ব্যুরো।

Print প্রিন্ট উপোযোগী ভার্সন



Login to comment..
New user? Register..