কার স্বার্থের বাজেট?

ফসলের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিতে প্রয়োজন কৃষকবান্ধব বাজেট

Facebook Twitter Google Digg Reddit LinkedIn StumbleUpon Email
একতা প্রতিবেদক : ধানের দাম নিয়ে সারা দেশে চলছে হাহাকার। এবার মণপ্রতি ধান উৎপাদনে খরচ হয়েছে ৭৫০ থেকে ৯০০ টাকা। অথচ বাজারে এখন প্রতি মণ ধানের দাম ৪০০ থেকে ৫৫০ টাকা। সংসার খরচ, ঋণ পরিশোধসহ নগদ টাকার জরুরি প্রয়োজনে লোকসান দিয়েই ধান বিক্রি করতে বাধ্য হচ্ছেন কৃষকরা। অথচ সরকারিভাবে ধান কেনার জন্য দাম ঠিক করা হয়েছে প্রতি কেজি ২৬ টাকা, অর্থাৎ প্রতি মণ ১০৪০ টাকা। তাহলে কৃষক কেনো সরকারি দামে ধান বিক্রি করছে না? এর কারণ বেশ কয়েকটা। সরকার ধানের দাম প্রতি কেজি ২৬ টাকা ঠিক করে দিলেও যে পরিমাণ ধান কিনছে, তা মোট উৎপাদনের তুলনায় কিছুই না। চলতি বোরো মৌসুমে সরকার সারা দেশ থেকে দেড় লাখ মেট্রিক টন ধান কিনবে। আর এ বছর বোরো ধানের মোট উৎপাদন প্রায় ২ কোটি মেট্রিক টন। ফলে সরকার যে পরিমাণ ধান কিনছে তাতে বাজারে ধানের দামে কোনো প্রভাবই পড়ার কথা না। অন্যদিকে সরকার এ মৌসুমে চাল কেনার লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে ১০ লাখ মেট্রিক টন। প্রতি কেজি চালের দাম ৩৮ টাকা। সরকারকে এই চাল সরবরাহ করে মিল মালিক ও ব্যবসায়ীরা। তারা কৃষকের কাছ থেকে ধান কিনে মিলে চাল তৈরি করে সরকারি গুদামে বিক্রি করে। ধান ও চালের দাম নির্ধারণে বড় ধরনের পার্থক্য রেখে এমনিতেই মিল মালিকদের বড় মুনাফার সুযোগ করে দেন সরকারের নীতি-নির্ধারকরা। তার উপর বাজার থেকে সরকার নির্ধারিত দামের অর্ধেকেরও কমে ধান কিনে চাল বানিয়ে সরকারকে সরবরাহ করে মুনাফার অঙ্ক কয়েক গুণ বাড়িয়ে নিবে মিল মালিকরা। আবার ধান ক্রয়ের জন্য খাদ্য বিভাগের যে সব শর্ত রয়েছে তার অধিকাংশই কৃষকের পক্ষে পূরণ করা সম্ভব নয়। ক্রয়কেন্দ্রের আমলাতান্ত্রিকতা এবং দীর্ঘসূত্রিতার কারণে সহজ-সরল কৃষকরা সহজে এদিকে পা বাড়ান না। নানা সমস্যার কারণে ধান মাড়াইয়ের পরপরই কৃষকের ধান বিক্রি প্রয়োজন হলেও সরকারি ক্রয় কেন্দ্রে তখন আদৌ ধান কেনা হয় না। সাধারণ কৃষক মহাজনের ঋণ শোধ করার জন্য ধান উঠার সাথে সাথে বিক্রি করতে বাধ্য হন। ফলে দালাল ফরিয়াদের কাছে ধান বিক্রি ছাড়া তাদের কোনো উপায় থাকে না। এ ধান বিক্রিতেও ঠকতে হয় কৃষকদের। জমি থেকে ধান উঠার পর চালকল মালিক কিংবা ফরিয়ারা এক মণ ধান নিয়ে কৃষকদেরকে ৩৭ কেজির দাম দেয়। তাদের অজুহাত, ধান শুকিয়ে মজুদের উপযোগী করতে ঘাটতি হয়ে যায়। সরকারি ক্রয়কেন্দ্রের সংখ্যা একেবারেই কম। দূরত্বের কারণে কৃষকরা সেখানে যেতে উৎসাহিত হন না। ইউনিয়ন পর্যায়ে ধান ক্রয়কেন্দ্র চালু করা হলে কৃষক উৎসাহিত হতে পারেন। তারপরও সরকারের যে পরিমাণ ধান কিনে তাতে বাজারে খুব বেশি প্রভাব পড়ার কথা না। এখানেই চলে আসে কৃষকের প্রতি সরকারের দায়িত্বশীল ভূমিকার প্রশ্নটি। পাশাপাশি জড়িত কৃষি উৎপাদন ও বাজার ব্যবস্থায় শৃঙ্খলা রক্ষায় সরকারের প্রচেষ্টা। কৃষককে উৎসাহিত করে খাদ্যশস্য উৎপাদনে ইতিবাচক ধারা ধরে রাখতে হলে তাকে উৎপাদিত ফসলের ন্যায্যমূল্যের নিশ্চয়তা দিতে হবে। মুনাফালোভী ব্যবসায়ীদের হাতে বাজার ছেড়ে দিয়ে কখনোই তা সম্ভব না। এক্ষেত্রে ন্যায্য মূল্য নিশ্চিত করতে সরকারিভাবে সিংহভাগ ফসল ক্রয়, গুদামজাত ও বিক্রির ব্যবস্থা ছাড়া মূল্য সমস্যার সমাধান করা সম্ভব নয়। কৃষি উপকরণের পাশাপাশি উৎপাদিত ফসলে ভর্তুকির ব্যবস্থা করা না হলে খুব বেশি দিন কৃষকের উৎসাহ ধরে রাখা যাবে না। এজন্য সরকারের সামগ্রিক পরিকল্পনা, বাজেট ও ব্যবস্থাপনা ঢেলে সাজানো জরুরি। তবে গতানুগতিকতার বাইরে যাওয়ার ন্যূনতম সম্ভাবনা না থাকায় ২০১৯-২০ অর্থবছরের বাজেটে এ ধরনের কোনো পদক্ষেপ থাকছে না। কৃষকের উৎপাদন ব্যয় বাড়লেও কৃষিখাতে সরকারি ব্যয় ক্রমশ সঙ্কুচিত হচ্ছে। স্বাধীনতার পর প্রথম কয়েক বছর কৃষি উৎপাদনে মোট ব্যয়ের ৩১ শতাংশ সরকার বহন করলেও এখন তা ৯ শতাংশের নিচে নেমে এসেছে। কৃষিতে ভর্তুকির হারও এ খাতের জিডিপির দুই শতাংশের কম। এ কারণেই উৎপাদন বাড়লেও উৎপাদন সহায়ক উপাদানের মূল্যবৃদ্ধি এবং উৎপাদিত ফসলের প্রকৃত মূল্য না পাওয়ায় বছর বছর লোকসান দিচ্ছে কৃষক। ১৯৭৯-৮০ অর্থবছরেও মোট উন্নয়ন বাজেটের প্রায় ২২.৫ শতাংশ বরাদ্দ কৃষি খাত পেয়েছিল। সাম্প্রতিক বছরগুলোকে কৃষি খাতে বাজেট বরাদ্দ বাড়লেও এর সিংহভাগই ব্যয় হচ্ছে অনুন্নয়ন খাতে। কৃষি বাজেট কমাতে গিয়ে সব চেয়ে বড় আঘাত এসেছে এ খাতের উন্নয়নে। দুই দশকের ব্যবধানে উন্নয়ন বাজেটে কৃষি খাতের প্রাপ্তি শূণ্যের কোঠায় নেমে আসে। ১৯৭৭ সালে উন্নয়ন বাজেটের ২৩ শতাংশ কৃষিতে বরাদ্দ দেওয়া হয়েছিল। এরপর থেকে এ খাতের বরাদ্দ কমতে কমতে ২-৩ শতাংশে নেমে এসেছিল। বর্তমানে কিছুটা বাড়লেও তা ৮ শতাংশ অতিক্রম করছে না। কৃষি বাজেটের মতোই এ খাতে দেওয়া ভর্তুকির পরিমাণও প্রয়োজনের তুলনায় অতি সামান্য। স্বাধীনতার পর সরকারিভাবে স্বল্পমূল্যে সার, বীজ ও কীটনাশক কৃষকের কাছে পৌঁছানোর ব্যবস্থা ছিল। সেচ ব্যবস্থাও পরিচালিত হতো সরকারি তত্ত্বাবধায়নে। ১৯৮০’র দশকে বীজ, সেচ ও সারের ওপর সরকারি নিয়ন্ত্রণ বিলুপ্ত করে ব্যক্তি মালিকানায় ছেড়ে দেওয়া হয়। সরকারি ব্যবস্থাপনায় সার উৎপাদনের ব্যবস্থা থাকলেও বণ্টন ব্যবস্থা চলে যায় ব্যবসায়ীদের হাতে। নব্বই দশকের গোড়ার দিকে সারসহ বিভিন্ন উপকরণের ওপর ভর্তুকি তুলে দেওয়া হয়। এসব কারণেই প্রতিবছরই বাড়তে থাকে সার, কীটনাশক, বীজসহ বিভিন্ন উপকরণের দাম। একই সঙ্গে জ্বালানি তেল ও বিদ্যুতের দাম বৃদ্ধি পাওয়ায় বেড়ে যাচ্ছে সেচ খরচ। ১৯৯৬-১৯৯৭ অর্থবছরে দেশে ব্যাপক সার সংকট সৃষ্টি হওয়ায় পুনরায় ভর্তুকি ব্যবস্থা চালু হলেও সে ভর্তুকি প্রকৃত কৃষকের কাছে পৌঁছানোর কোনও ব্যবস্থা নেই। সার, বীজ ও কীটনাশক ব্যবসায়ী এবং সেচ যন্ত্রের মালিকরা ভর্তুকির টাকা পেলেও কৃষকের তেমন কোনও উপকার হচ্ছে না। কৃষিতে যেকোনও ধরনের ভর্তুকির টার্গেট হতে হবে সাধারণ কৃষক। কৃষকদের জন্য বিশেষ করে ছোট কৃষকের জন্য কম সুদে ঋণের ব্যবস্থা, তাদের কাছে ন্যায্যমূল্যে বীজ, সার, কীটনাশক পৌঁছে দেয়া, কৃষিপণ্যের বাজার ব্যবস্থা গড়ে তুলে ফসলের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করা, কৃষিপণ্য উৎপাদনের পর সংরক্ষণের জন্য প্রয়োজনীয় কোল্ড স্টোরেজ গড়ে তোলা, বড় সেচের ব্যবস্থা সরকারি নিয়ন্ত্রণে নিয়ে আসা, শস্য বীমা চালু ইত্যাদি ব্যবস্থা ছাড়া বছর বছর ভর্তুকির পরিমাণ বাড়লেও এতে কৃষকের কোনও লাভ হবে না। কৃষি ভর্তুকির টাকা কোনোক্রমেই যাতে ডিলার ও ব্যবসায়ীদের পকেটে না যায় তার ব্যবস্থা করা এবং যে কোনো আর্থিক দুর্নীতি কঠোর হাতে দমন করার সরকারি ব্যবস্থা গঠন করা উচিত। কৃষি উন্নয়নে সরকারের নানা পদক্ষেপের কথা বলা হলেও সরকারিভাবে খাদ্যশস্য ক্রয়ে বাজেট বাড়ছে না। বাড়ানো হচ্ছে না সরকারি গুদামের ধারণক্ষমতা। বর্তমানে সারা দেশে সরকারি গুদামের ধারণ ক্ষমতা ২১ লাখ মেট্রিক টন। এর বিপরীতে খাদ্যশস্য কেনা হয় ১২-১৩ লাখ মেট্রিক টন। কৃষি ও খাদ্য নিরাপত্তার স্বার্থে সরকারিভাবে নতুন গুদাম নির্মাণে বাজেট বরাদ্দ জরুরি। কৃষকদের উৎপাদিত পণ্যের ন্যায্য মূল্য না পাওয়ার অন্যতম প্রধান কারণ শস্য সংরক্ষণে প্রয়োজনীয় অবকাঠামোর অভাব। বিশেষ করে পচনশীল পণ্য সংরক্ষণের জন্য দেশে তেমন কোনো কার্যকর ব্যবস্থা নেই। ফলে সরকারিভাবে খাদ্য গুদামের সংখ্যা বৃদ্ধির পাশাপাশি হিমাগার নির্মাণ প্রয়োজন। তবে গত কয়েকটি বাজেটে খাদ্যশস্য সংরক্ষণে নতুন করে কোনো গুদাম বা হিমাগার নির্মাণ বা এ সংক্রান্ত কোনো পদক্ষেপ নেয়া হয়নি। ২০১০-১১ অর্থবছরে প্রথমবারের মত কৃষকদের জন্য বাজেটে কৃষিবীমা চালুর ঘোষণা দেয়া হয়। এ উদ্যোগ সফলভাবে বাস্তবায়ন করা গেলে কৃষকদের ঝুঁকি কিছুটা কমবে বলে বিশেষজ্ঞরা মতামত দিয়েছিলেন। কিন্তু ওই বাজেটে কৃষিবীমা বাস্তবায়নের জন্য কোনো বরাদ্দ ছিল না। এছাড়া এই বীমার ধরণ বা পরিকল্পনা সম্পর্কেও স্পষ্ট করা হয়নি। অর্থবছর শেষে দেখা যায়, কৃষিবীমা শুধু ঘোষণার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থেকেছে। এখন পর্যন্ত এ বিষয়ে কোনো পদক্ষেপ দেখা যাচ্ছে না। প্রতিবছরই কৃষিকাজে ব্যবহৃত উপকরণের দাম বাড়ছে। একইভাবে বাড়ছে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম। কৃষকের জমিতে উৎপাদিত সব জিনিসের দামই বাজারে আকাশ ছোঁয়া। কিন্তু ক্রেতারা উচ্চমূল্যে এসব জিনিস কিনলেও ন্যায্যমূল্য পায় না কৃষক। মধ্যস্বত্বভোগীরাই কৃষকদের ঠকিয়ে কম দামে কিনে বেশি দমে বাজারে বিক্রি করে লাভবান হয়। উৎপাদন খরচ বাড়লেও উৎপাদিত ফসলের ন্যায্যমূল্য না পেয়ে হতাশ হচ্ছে কৃষক। ফসলের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করতে প্রয়োজন কৃষকবান্ধব বাজেট। ধানের মূল্য নিয়ে অব্যবস্থাপনা দূর করতে হলে কমপক্ষে ইউনিয়ন পর্যায় পর্যন্ত ধান-গম-আলু সরকারি ক্রয়কেন্দ্র চালুর জন্য বরাদ্দ দিতে হবে। পচনশীল পণ্য, শাক-সবজি, ফল, আলু, মাছ, মাংস, ডিম ইত্যাদি স্থানীয়ভাবে সংগ্রহ, প্রক্রিয়াজাতকরণ, সংরক্ষণ ও বাজারজাতকরণের নেটওয়ার্ক সরকারিভাবে গড়ে তুলতে হবে। সংরক্ষণের জন্য হিমাগার তৈরি জরুরি। ফসল বহির্ভূতখাত যেমন হাঁস-মুরগি, মৎস্য, গবাদি পশু, দুধ, ডিম, মাংস ইত্যাদি উন্নয়নের জন্য সংরক্ষণ, প্রক্রিয়াজাতকরণ ও বাজারজাতকরণের জন্য প্রয়োজনীয় নেটওয়ার্ক তৈরি করতে হবে– যা কৃষক সহজে ব্যবহার করতে পারবে। কৃষকের জন্য শস্য বীমা প্রথা চালু করতে হবে। কৃষিভিত্তিক শিল্প বিকাশের লক্ষ্যে পাটকল ও চিনিকল বন্ধ না করে আধুনিকায়ন ও বহুমুখী উৎপাদনের পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে। সরকারি উদ্যোগের পাশাপাশি ব্যক্তিখাতে আধুনিক বৃহৎ কৃষি ভিত্তিক শিল্প ও ব্যবসা স্থাপনের জন্য প্রয়োজনীয় আর্থিক ও কারিগরি সহায়তা সরকারকে দিতে হবে। এর জন্য সরকারকে সারা দেশে কৃষিপণ্যের প্রক্রিয়াজাতকরণ, প্যাকেজিং এবং সংরক্ষণের একটি বড় নেটওয়ার্ক তৈরি করতে হবে।

Print প্রিন্ট উপোযোগী ভার্সন



Login to comment..
New user? Register..