চাল রপ্তানির সিদ্ধান্ত হবে আত্মঘাতী

Facebook Twitter Google Digg Reddit LinkedIn StumbleUpon Email

একতা প্রতিবেদক : সারাদেশের বোরো ধানের বাম্পার ফলনের মধ্যে চাল রপ্তানির ব্যাপারে সরকারের পক্ষ থেকে চিন্তা-ভাবনার যে তথ্য পাওয়া গেছে তা দেশের জন্য ‘আত্মঘাতী’ হবে বলে মন্তব্য করেছেন বাম গণতান্ত্রিক জোট। তাঁরা বলছেন, এই ধরনের সিদ্ধান্ত দেশের খাদ্য নিরাপত্তাকে বিঘিœত করবে। ধানের লাভজনক দাম নিশ্চিত করে কৃষক বাঁচানো ও অবিলম্বে পাটকল শ্রমিকদের বকেয়া বেতন পরিশেধসহ নয় দফা বাস্তবায়নের দাবিতে এক সমাবেশে বাম গণতান্ত্রিক জোটের নেতারা এসব কথা বলেন। দেশব্যাপী কর্মসূচির অংশ হিসেবে গত ১৯ মে জাতীয় প্রেসক্লাবের সামনে এই সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়। সমাবেশ শেষে বিক্ষোভ মিছিল অনুষ্ঠিত হয়। বাম জোটের সমন্বয়ক ও বাসদ নেতা বজলুর রশীদ ফিরোজের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত সমাবেশে বক্তব্য দেন বাম গণতান্ত্রিক জোটের কেন্দ্রীয় নেতা বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির সাধারণ সম্পাদক সাইফুল হক, সিপিবির সহকারী সাধারণ সম্পাদক সাজ্জাদ জহির চন্দন, ইউনাইটেড কমিউনিস্ট লীগের সাধারণ সম্পাদক মোশাররফ হোসেন নান্নু, বাসদ (মার্কসবাদী) নেতা আ. ক. ম. জহিরুল ইসলাম, বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক আন্দোলনের আহ্বায়ক হামিদুল হক, গণসংহতি আন্দোলনের নেতা জুলহাজ নাইন বাবু, গণতান্ত্রিক বিপ্লবী পার্টির নেতা লিয়াকত আলী। সমাবেশ পরিচালনা করেন বাম গণতান্ত্রিক জোট ঢাকা মহানগরের সমন্বয়ক ও বাসদ নেতা খালেকুজ্জামান লিপন। সমাবেশে বক্তারা বলেন, দেশের মোট শ্রমশক্তির ৪১ ভাগ কৃষি খাতে নিয়োজিত, জিডিপিতে কৃষির অবদান ১৪.৫ ভাগ। অথচ সেই কৃষক ফসলের ন্যায্যমূল্য থেকে বঞ্চিত। কৃষকরা দেশের ১৭ কোটি মানুষের আহার যোগান। তাঁরা দেশকে খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ করেছে। এত বড় কাজের জন্য তাদের পুরস্কার পাওয়ার কথা অথচ সেই কৃষক মনের দুঃখে ক্ষোভে ধান ক্ষেতে ও ধানের বস্তায় আগুন লাগিয়ে দিচ্ছে। সরকার মণপ্রতি ধানের দাম এক হাজার ৪০ টাকা নির্ধারণ করলেও বাজারে ধানের দাম ৫০০-৫৫০ টাকা মণ। কৃষি অধিদপ্তর বলছে এক কেজি ধান উৎপাদনে কৃষকের খরচ হয় ১৭ টাকা, বাজারে বর্তমানে এক কেজির ধানের দাম ১৩ টাকা। প্রতি কেজিতে চার টাকা লোকসান দিচ্ছে কৃষক। এক বিঘা জমিতে কৃষকরা সাড়ে ছয় হাজার টাকা পর্যন্ত লোকসান দিচ্ছে। সরকার ঋণখেলাপীদের, ব্যাংক মালিকদের, শিল্প মালিকদের ছাড় দিচ্ছে কিন্তু কৃষকদের লাভজনক দাম নিশ্চিত করতে সরকার কোনো কার্যকর পদক্ষেপ নিচ্ছে না। উল্টো খাদ্যমন্ত্রী বলেছেন, কৃষকরা ষড়যন্ত্র করে ধানে আগুন লাগিয়েছে। তিনি বলেন, তারা ২০০ টাকা দিয়ে বার্গার খেতে পারে কিন্তু চালের দাম দুই টাকা বেশি দিতে পারে না। অন্যদিকে কৃষিমন্ত্রী বলছেন, ধানের দাম নিয়ে তাঁর কিছু করার নেই। বামনেতারা বলেন, শুধুমাত্র খুলনা অঞ্চলের নয়টি পাটকল শ্রমিকদের ১২ সপ্তাহের মজুরি ও কর্মকর্তা কর্মচারীদের ৩-৪ মাসের বকেয়া বেতন বাবদ পাওনা ৭৫ কোটি ১৪ লাখ টাকা। কিন্তু ওই নয়টি পাটকলে ৩২৫ কোটি টাকার উৎপাদিত পাট পণ্য মজুত আছে। নয়টি পাটকলের প্রতিদিনের উৎপাদন ক্ষমতা ২৭২ টন কিন্তু সেখানে প্রতিদিন উৎপাদন করা হচ্ছে ১০০.২৯ টন। এখানে প্রতিদিন যে ১৭২ টন কম উৎপাদন হচ্ছে, রাষ্ট্রের ক্ষতি হচ্ছে তার দায় দায়িত্ব কার? এ দায় শ্রমিকেরা কেন নেবে? মৌসুমে ১২০০/১৫০০ টাকা মণ দরের পাট সময়মতো না কিনে পরে ২৫০০/৩০০০ টাকা দিয়ে ব্যবসায়ী ও ফড়িয়াদের কাছ থেকে কেনার ফলে যে ক্ষতি হয় তার দায়িত্ব কেন শ্রমিকেরা নেবে? অর্থ মন্ত্রণালয় কেন সময়মতো অর্থ ছাড় করে না? এসবই শাসক লুটেরাদের চক্রান্ত। ইতোমধ্যে খবর প্রকাশিত হয়েছে, একটি চক্রান্তের অংশ হিসেবে সরকার পাটকলগুলো পিপিপির মাধ্যমে লুটেরা মালিকদের হাতে তুলে দেওয়ার জন্যই পরিকল্পিতভাবে পাটকল শ্রমিকদের বকেয়া বেতন না দেয়া ও মজুরি কমিশন বাস্তবায়ন করছে না। বক্তারা ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, যে কৃষিমন্ত্রী কৃষকের জন্য কিছু করতে পারবে না বলেন তার ওই মন্ত্রণালয়ে দায়িত্বে থাকার কোনো নৈতিক অধিকার নেই। খাদ্যমন্ত্রীর কৃষক ও জনগণকে নিয়ে উপহাস ও বিরূপ মন্তব্য করার দায়ে অবিলম্বে পদত্যাগ করা উচিত। বক্তারা অবিলম্বে প্রতিটি ইউনিয়নে ও হাটে সরকারি ক্রয়কেন্দ্র খুলে সরকার নির্ধারিত দামে সরাসরি কৃষকের কাছ থেকে ধান ক্রয় করা এবং প্রতিটি উপজেলায়/ ইউনিয়নে খাদ্য গুদাম নির্মাণ করার দাবি জানান। বক্তারা বলেন, কৃষিমন্ত্রী বলেছেন, সরকারের ধান ক্রয় নয়, চাল রপ্তানি করলেই সমস্যা কিছুটা সমাধান হতে পারে। মন্ত্রীর এ বক্তব্যের তীব্র প্রতিবাদ জানিয়ে বাম নেতারা বলেন, চাল রপ্তানি করলে এটা হবে আত্মঘাতী। এতে দেশে খাদ্য নিরাপত্তা বিঘ্নিত হবে। সরকারের ভুলনীতি পরিহার ও দুর্নীতি বন্ধ করে পাটকল-পাট চাষিদের রক্ষা ও ধর্মঘটি পাটকল শ্রমিকদের বকেয়া বেতনসহ নয় দফা দাবি মেনে নেয়ার জন্য সরকারের প্রতি জোর দাবি জানান বাম নেতারা। একই সাথে পাটশিল্পের বিরুদ্ধে সব ষড়যন্ত্র মোকাবেলায় পাটকল শ্রমিক, পাটচাষি ও দেশবাসীকে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার জন্য আহ্বান জানান তাঁরা। সমাবেশে বক্তারা ধানের লাভজনক দাম নিশ্চিত করা এবং পাটকল শ্রমিকদের ন্যায্য দাবি মেনে নেয়া না হলে কৃষি মন্ত্রণালয়, খাদ্য মন্ত্রণালয় ও খাদ্য গুদাম ঘেরাও, অবরোধসহ কঠোর কর্মসূচি ঘোষণার হুঁশিয়ারী প্রদান করেন। সমাবেশ শেষে একটি বিক্ষোভ মিছিল প্রেসক্লাব, তোপখানা রোড হয়ে পল্টন মোড়ে গিয়ে শেষ হয়।

Print প্রিন্ট উপোযোগী ভার্সন



Login to comment..
New user? Register..