উৎপাদন করে যারা তারাই থাকে নিরন্ন

Facebook Twitter Google Digg Reddit LinkedIn StumbleUpon Email
আবদুল্লাহ ক্বাফী রতন : চলতি অর্থ বছরে আউশ, আমন, বোরো মিলিয়ে ৩ কোটি ৬৪ লাখ মেট্রিক টন ধান উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারিত হয়েছে। এর মধ্যে আউশ, আমন মিলিয়ে ১ কোটি ৭২ লাখ ২০ হাজার মেট্রিক টন ধান উৎপাদন হয়েছে। বোরো ধান কাটা হচ্ছে। প্রায় ১ কোটি ৯২ লাখ মেট্রিক টন বা ৫২ কোটি মণ ধান উঠবে কৃষকের ঘরে। এ বাম্পার উৎপাদন নিয়ে প্রতি বছরের ন্যায় মহাবিপাকে পড়েছে কৃষকরা। প্রত্রিকান্তরে প্রকাশ স্থানভেদে ধান বিক্রিতে কৃষকদের ২০০ থেকে ৪০০ টাকা লোকসান দিতে হচ্ছে। এ পরিস্থিতিতে কৃষিমন্ত্রী ড. আব্দুর রাজ্জাক গত কয়েক দিন ধরে একটার পর একটা বেসামাল মন্তব্য করে যাচ্ছেন। তার মতে, কৃষকদের এবার কিছুটা ক্ষতি হবেই। তিনি বলেছেন, ধানের দাম বাড়ানোর সুযোগ আপাতত সরকারের হাতে নাই। তিনি নিশ্চিত করেছেন রাজনৈতিক প্রভাবের কারণে কৃষকদের কাছ থেকে সরাসরি ধান কেনা যাচ্ছে না। কিন্তু আসল যে কথা তিনি বলেছেন তা হচ্ছে দেশের উন্নয়ন হয়েছে বলেই কৃষক ধানের দাম পাচ্ছে না। এটাই মোদ্দা কথা এবং এটাই হচ্ছে বর্তমান সরকারের ধনীমুখিন উন্নয়ন নীতির সারকথা। এ কথা সত্য, সাম্প্রতিক সময়ে দেশ অনেক ক্ষেত্রে অগ্রসর হয়েছে। এই অগ্রগতির প্রধান কারিগর ও নায়ক হলো দেশের কৃষক-ক্ষেতমজুর, গার্মেন্টস শ্রমিকসহ শ্রমজীবী জনগণ, প্রবাসে কর্মরত মেহনতি মানুষ ও ক্ষুদে-মাঝারি উদ্যোক্তাগণ। কৃষক-ক্ষেতমজুররা বাংলাদেশকে খাদ্য আমদানির দেশ থেকে খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ দেশে পরিণত করেছে। এতে কষ্টার্জিত বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয় হচ্ছে। অপরদিকে বাংলাদেশের গার্মেন্ট শ্রমিকরা বছরে ৩ হাজার কোটি ডলার এবং প্রায় ১ কোটি প্রবাসী শ্রমিক দেশের জন্য প্রতিবছর ১ হাজার ৫০০ কোটি ডলার আয় করেন। উৎপাদন বৃদ্ধি করে কৃষকের বৈদেশিক মুদ্রা বাঁচানো, গার্মেন্টসহ অন্যান্য শ্রমিক ও প্রবাসী শ্রমিকদের হাড়ভাঙ্গা খাটুনিতে বৈদেশিক মুদ্্রার রিজার্ভ দিন দিন বৃদ্ধি পেয়ে আজ ৩ হাজার কোটি ডলার ছাড়িয়ে গেছে। উন্নয়নের তথাকথিত সকল সূচকে দেশের অগ্রগতি ঘটেছে। কিন্তু যে প্রশ্ন বারবার সামনে চলে আসে দেশের এই অগ্রগতির নায়ক যারা তাদের জীবন মানের কতটুকু অগ্রগতি সাধিত হয়েছে। ‘দেশের উন্নয়ন হয়েছে বলেই কৃষক ধানের দাম পাচ্ছে না’ - কৃষিমন্ত্রী ড. আব্দুর রাজ্জাকের এ মন্তব্য প্রশ্নটিকে আবারও সামনে নিয়ে এসেছে। ’৭১ এর সংগ্রামকে স্বাধীনতার সংগ্রামের পাশাপাশি মুক্তির সংগ্রাম বলে আখ্যায়িত করা হয়েছিল। পশ্চিম পাকিস্তানের প্রায় ঔপনিবেশিক শাসন থেকে রাজনৈতিক মুক্তির পাশাপাশি শোষণ, বঞ্ছনা, বৈষম্য থেকে মুক্তির স্বপ্ন দেখানো হয়েছিল স্বাধীন সোনার বাংলায়। দেশেরআর্থিক সূচকগুলো দর্শনীয় হলেও সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষ কিন্তু বেহাল অবস্থায় দিনাতিপাত করছে। গ্রামাঞ্চলে ১ কোটির বেশি মানুষ চরম দারিদ্র্যসীমার নীচে জীবন অতিবাহিত করছে। কারণ তাদের আয় দিয়ে পরের দিন কাজ করার ক্ষমতা অর্থাৎ টেকসই শ্রমশক্তি উৎপাদনের জন্য ২, ১১২ ক্যালরি পেতেযে পরিমাণ খাদ্য গ্রহণ করা প্রয়োজন তা ক্রয় করা সম্ভব হয় না। এটা হচ্ছে পেটে-ভাতে টিকে থাকা। এক সাগর রক্তের বিনিময়ে পাওয়া সংবিধানেই প্রতিটি মানুষের খাদ্য, বস্ত্র, বাসস্থান, শিক্ষা, চিকিৎসা এ পাঁচটি মৌলিক চাহিদার কথা বর্ণিত আছে। এর একটি যার পূরণ হয় না তাকেই দরিদ্র বলা উচিত। সে হিসাবে আমাদের দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষই দরিদ্র। রাষ্ট্রের দিক থেকে শিক্ষা এবং স্বাস্থ্য খাতে ব্যয় ক্রমান্বয়ে কমছে। জিডিপির মাত্র ২ শতাংশ ব্যয় করা হয়শিক্ষা খাতে যা দক্ষিণ এশিয়ায় সর্বনিম্ন। ২০১০ সালে স্বাস্থ্য খাতে ব্যয় ছিল জিডিপির ১.১ শতাংশ। সর্ব শেষ বাজেটে সেটা কমে ০.৮ শতাংশ হয়েছে। চিকিৎসা ব্যয় মেটাতে গিয়ে বছরে ৪ শতাংশ অর্থাৎ প্রায় ৬৫ লাখ মানুষ দারিদ্র্যসীমার নীচে চলে যাচ্ছে। বর্তমানে বাংলাদেশের মোট দেশজ উৎপাদন (জিডিপি) ২৫ লাখ কোটি টাকার উপরে। মাথাপিছু আয় ১ লাখ ৬১ হাজার টাকা। এ আয় কাদের ভোগে যাচ্ছে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর সর্বশেষ ‘হাউজহোল্ড ইনকাম অ্যান্ড এক্সপেন্ডিচার সার্ভে’ অনুযায়ী দেশের সবচেয়ে গরিব ৫ শতাংশ জনগোষ্ঠীর আয়ের পরিমাণ মোট আয়ের মাত্র ০.২৩ শতাংশ। ২০১০ সালে এই হার ছিল ০.৭৮ শতাংশ। অপরদিকে, দেশেরসবচেয়ে বেশি ধনী ৫ শতাংশ জনগোষ্ঠীর আয়ের পরিমাণ এ সময়ে মোট আয়ের ২৪.৬১ শতাংশ থেকে বেড়ে হয়েছে ২৭.৮৯ শতাংশ। এই পরিসংখ্যান মূলত নির্দেশ করে, সবচেয়ে গরিব জনগোষ্ঠীর আয় ক্রমাগত কমেছে। অপর দিকে সবচেয়ে বেশি ধনীদের আয় ক্রমাগত বাড়ছে। সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক প্রতিষ্ঠান ওয়েলথ-এক্স‘ওয়ার্ল্ড আল্ট্রা-ওয়েলথ রিপোর্ট ২০১৮’ নামেরএকটি প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে। এতে বলা হয়েছে অতি ধনী বৃদ্ধিতে বাংলাদেশ বিশ্বে এক নম্বর। যাদের তিন কোটি মার্কিন ডলার বা ২৫২ কোটি টাকার সম্পদ রয়েছে তারাই অতি ধনী। ২০১২ সাল থেকে গত কয়েক বছরে দেশে অতি ধনীর সংখ্যা বেড়েছে ১৭ শতাংশ হারে। অন্যদিকে বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিবেদন মতে, ১৯৭২ সাল থেকে ২০১৮ সালে দেশে কোটিপতি আমানতকারীর সংখ্যা৫ জন থেকে বেড়ে হয়েছে ৭৫, ৫৬৩ জন। সম্পদ বৈষম্য পরিস্থিতি আরো ভয়াবহ। সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি)’র গবেষণা অনুযায়ি, সম্পদ বৈষম্যের ক্ষেত্রেগিনিসূচক হচ্ছে ০.৭৪ এবংআয় বৈষম্যের ক্ষেত্রে গিনি সূচক হচ্ছে ০.৪৮। গিনি সূচকহচ্ছে আয়বৈষম্য ও সম্পদ-বৈষম্য পরিমাপের একটি অর্থনৈতিক সূচক, যেখানে ১ নির্দেশ করে পরিপূর্ণ বৈষম্য এবং ০ নির্দেশ করে পরিপূর্ণ সমতা। উপরে বর্ণিত উভয় সূচক সম্পদ ও আয়ের কেন্দ্রীভবন নির্দেশ করে। এ আয় ও সম্পদ বৈষম্য নিষ্ঠুর হয়ে ওঠে যখন লুটপাটের মাধ্যমে অর্জিত সম্পদ ধনীরা বিনিয়োগের পরিবর্তে বিদেশে পাচার করে দেয়। বৈদেশিক বাণিজ্যে আমদানির সময় ওভার ইনভয়েসিং এবং রপ্তানির সময় আন্ডার ইনভয়েসিং এর মাধ্যমে দেশের মানুষের কষ্টার্জিত বৈদেশিক মুদ্রা বিদেশে পাচার হয়ে যাচ্ছে। প্রবাসী শ্রমিকরা বিদেশ থেকে ডলার পাঠায় আর দেশের লুটেরা ধনিকরা তা বিদেশে পাচার করে। দেশের কর্পোরেট হাউসগুলোর মালিকরা এ দেশে মুনাফা করে আর বিদেশে তাদের ‘দ্বিতীয় আবাসে’ তা ভোগ করে। যতই অর্থনৈতিক অগ্রগতি সাধিত হচ্ছে ততই সমাজের উৎপাদক শ্রেণি তথা শ্রমিক-কৃষক-ক্ষেতমজুরদের সাথে মালিক শ্রেণির আয় ও সম্পদ বৈষম্য তীব্রতর হচ্ছে। গত ৪০ বছর ধরে গার্মেন্ট শিল্পের মাধ্যমে পুঁজি বিনিয়োগকারীরা হাজার হাজার কোটি টাকার সম্পদ গড়েছেন। কিন্তু এ শিল্পে কর্তব্যরত শ্রমিকরা দেশের মাথাপিছু আয়ের সম পরিমাণ আয় অর্জনে এখনো সক্ষম হয়নি। পাকিস্তান সরকার শুরু থেকেই পূর্ব পাকিস্তানের প্রতি বৈষম্যমূলক নীতি অনুসরণ করে। পাকিস্তান সরকার সারাদেশের সম্পদ ব্যবহার করে পশ্চিম পাকিস্তানের ব্যক্তিখাতকে পৃষ্ঠপোষকতা প্রদান করে। পূর্ব পাকিস্তানের আয়ে পশ্চিম পাকিস্তানে শিল্পায়ন কার্যক্রম চালানো হয়। আর পূর্বপাকিস্তানকে করে রাখা হয় কৃষিনির্ভর। পাকিস্তানের সামগ্রিক উন্নয়ন পরিকল্পনার যুক্তি ছিল- অগ্রগতির চালিকা শক্তি হিসেবে পশ্চিম পাকিস্তানের উন্নয়ন বজায় রাখতে হবে, এবং সেই উন্নয়নের ফলাফল উপচে পড়ে বা চুঁইয়ে পড়ে পূর্ব পাকিস্তানের বৃদ্ধি তরান্বিত করবে। এটাকেই বাঙালি অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক নূরুল ইসলাম, রেহমান সোবহান, মোশাররফ হোসেন, আখলাকুর রহমান, আব্দুর রাজ্জাক, ড. হাবিবুর রহমান প্রমুখ ‘দুই অর্থনীতি’ হিসেবে অভিহিত করে পূর্ব পাকিস্তানের উপর পশ্চিম পাকিস্তানের অর্থনৈতিক শোষণ জনসম্মুখে নিয়ে আসেন। পরবর্তীতে আওয়ামী লীগের ৬ দফার মাধ্যমে তা রাজনৈতিক রূপ লাভ করে। দুই অর্থনীতির ফলে সৃষ্ট বৈষম্য থেকে মুক্তি পেতেই বাঙালিরা’৭১ সালে যুদ্ধ করেছিল। সেই অর্থনৈতিক মুক্তি কিন্তু অর্জিত হয়নি। বর্তমানে শাসক শ্রেণির উন্নয়ন পরিকল্পনায় যুক্তি হচ্ছে স্বশ্রেণির একদল ব্যক্তির জন্য আর্থিক খাত, পুঁজিবাজার, বড় বড় প্রকল্প উন্মুক্ত করে দেয়া। তারা লুটপাট করে পুঁজি সঞ্চায় করবে, এর কিছু পাচার করবে, কিছু বিনিয়োগ করবে। তার ফলে তাদের যে অগ্রগতি হবে তার চুঁইয়ে পড়ে দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের উন্নয়ন ঘটবে। দুই অর্থনীতি এখনও বিরাজমান। শোষকের অর্থনীতি বনাম শোষিতের অর্থনীতি। আগের শোষক ছিল বহিরাগত। বর্তমান শোষক অভ্যন্তরীণ। প্রতীকী অর্থে বল্লে একদিকে গুলশান-বনানী আর তার বিপরীতে নিপীড়িত কড়াইল বস্তি। দেশে চলমান সাম্রাজ্যবাদনির্ভর ‘লুটেরা-ধনবাদের’ যে উন্নয়ন পরিকল্পনা তারই ফলশ্রুতিতে ধনী-গরিবের বৈষম্য বৃদ্ধি পাচ্ছে। গরিব নিঃস্ব সর্বহারায় পরিণত হচ্ছে। তারা গ্রাম থেকে উচ্ছেদ হয়ে কড়াইল বস্তির মত ঝুপড়িতে আশ্রয় নিচ্ছে। আবার অনেকের সেই ঠাঁইও হচ্ছেনা। তাদের অনিকেত জীবন কাটছে ফুটপাতে। অপরদিকে শোষণ ও লুটপাটের মাধ্যমে ধনীরা অতি ধনী হচ্ছে। তাদের বিত্ত বাড়ছে। সাথে বাড়ছে বৈভব। সম্পদের প্রকৃত উৎপাদকদের স্বার্থের দ্বিতীয় মুক্তিযুদ্ধ অত্যাসন্ন। ঘরে ঘরে তাই ‘অর্থনৈতিক মুক্তিযোদ্ধাদে’র প্রস্তুতি আজ জরুরি।

Print প্রিন্ট উপোযোগী ভার্সন



Login to comment..
New user? Register..