দাবদাহে যশোরে মাছের রেণু-পোনা উৎপাদনে বিপর্যয়

Facebook Twitter Google Digg Reddit LinkedIn StumbleUpon Email
যশোর সংবাদাতা : ঘূর্ণিঝড় ফণীর প্রভাব কেটে যাওয়ার পর থেকে দাবদাহ বয়ে যাচ্ছে যশোরের ওপর দিয়ে। এতে চাঁচড়া মৎস্যপল্লীসহ জেলার হ্যাচারিগুলোয় রেণু ও পোনা উৎপাদন প্রায় ৫০ শতাংশ কমে গেছে। হ্যাচারি মালিকদের আশঙ্কা, ভরা মৌসুমে রেণু ও পোনা উৎপাদনে বিপর্যয়ের কারণে তাদের লোকসানের মুখে পড়তে হবে। জেলা মৎস্য অফিস সূত্রে জানা গেছে, দেশে রেণু-পোনা উৎপাদনে যশোর গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। জেলার হ্যাচারিগুলো প্রধানত রুই, কাতলা, মৃগেল, সিলভার কার্প, গ্রাস কার্প, বিগহেড, থাই সরপুঁটি, মিরর কার্প, চিতল, আইড়, তেলাপিয়া, মনোসেক্স তেলাপিয়া, শিং, কৈ, থাই কৈ ও পাঙাশ মাছের পোনা উৎপাদন করে। হ্যাচারির পাশাপাশি যশোরে পাঁচ-ছয় হাজার নার্সারি রয়েছে। জেলার দুই লাখ লোক মাছ উৎপাদন, চাষ এবং এ-সংশ্লিষ্ট পেশার মাধ্যমে জীবিকা নির্বাহ করে। তবে যশোরের হ্যাচারিগুলোয় উৎপাদিত ৬০ শতাংশ রেণু ও পোনা বিক্রি হয় জেলার বাইরে। সূত্র জানায়, যশোরের হ্যাচারিগুলোয় প্রতি বছর ৬৪ দশমিক ৮৬ টন কার্পজাতীয় রেণু উৎপাদন হয়। জেলায় রেণুর চাহিদা ১৫ দশমিক ২৩ টন। উদ্বৃত্ত ৪৯ দশমিক ৬৩ টন রেণু দেশের বিভিন্ন স্থানে সরবরাহ করা হয়। যশোরের হ্যাচারিগুলোয় তেলাপিয়া পোনা উৎপাদন হয় ১০ কোটি ১৪ লাখ। জেলায় এ পোনার চাহিদা রয়েছে ৯ কোটি ৮৮ লাখ ৫০ হাজার। বাকি পোনা দেশের বিভিন্ন স্থানে সরবরাহ করা হয়। এছাড়া প্রতি বছর ৩ দশমিক ৬২ টন পাঙাশ, শূন্য দশমিক ৮৫ টন শিং, মাগুর, পাবদা ও গুলসা রেণু উৎপাদন হয়। এর প্রায় পুরোটাই দেশের বিভিন্ন স্থানে সরবরাহ করা হয়। সংশ্লিষ্টরা জানান, চৈত্র থেকে মধ্য আষাঢ় পর্যন্ত রেণু ও পোনা উৎপাদনের প্রধান মৌসুম। গত মৌসুমে যশোরের প্রধান রেণু উৎপাদন অঞ্চল চাঁচড়া মৎস্যপল্লীর ৩৮টি হ্যাচারিতে প্রায় ২ লাখ ৬০ হাজার কেজি রেণু উৎপাদন হয়েছিল। তবে এবার তীব্র গরমের কারণে এসব হ্যাচারিতে রেণু উৎপাদন ধস নেমেছে। যশোর জেলা মৎস্য হ্যাচারি মালিক সমিতির সভাপতি ফিরোজ খান জানান, চলতি বছর এপ্রিল থেকে তীব্র গরম পড়ছে। এ কারণে হ্যাচারিতে রেণু মারা পড়ছে। পাশাপাশি খাদ্য ও বিদ্যুতের মূল্যবৃদ্ধির কারণে সব হ্যাচারিতে রেণু-পোনা উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। মাছচাষিরা জানান, এবার গ্রীষ্মের তাপমাত্রা সহনীয় মাত্রার চেয়ে বেশি হওয়ায় যশোরাঞ্চলের হাপাগুলোয় প্রতিদিন রেণু, পোনা ও মাছ মারা যাচ্ছে। এজন্য হাপা মালিক ও ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা মাছ সংগ্রহ কমিয়ে দিয়েছেন। তাপমাত্রা বেশি থাকায় রেণু-পোনা পরিবহন করা যাচ্ছে না। এছাড়া বেশকিছু হ্যাচারি নিজ থেকেই উৎপাদন কমিয়ে দিয়েছে। এ কারণে জেলায় রেণু ও পোনা উৎপাদন প্রায় ৫০ শতাংশ কমে গেছে। স্থানীয় মাছচাষী অহিদুল্লাহ লুলু বলেন, তাপমাত্রা বেড়ে যাওয়ায় রেণু-পোনা উৎপাদনে ঝুঁকি নিতে চাচ্ছেন না হ্যাচারি মালিকরা। হাপায় প্রয়োজনীয় পানি সরবরাহ না থাকায় পানির তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণে থাকছে না। এ কারণে হাপা মালিকরাও রেণু বা পোনা কেনা কমিয়ে দিয়েছেন। ডিম থেকে রেণু উৎপাদনেও গরম প্রভাব ফেলছে। দ্রুত বৃষ্টি না হলে সবাইকে চরম ক্ষতির মুখে পড়তে হবে। জেলা হ্যাচারি মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক জাহিদুর রহমান গোলদার জানান, কয়েক দিন ধরে যশোরাঞ্চলে তাপমাত্রা অসহনীয় পর্যায়ে রয়েছে। কোথাও কোথাও ৩৬-৩৮ ডিগ্রি পর্যন্ত তাপমাত্রা রেকর্ড করা হচ্ছে। এ দাবদাহ জনজীবনের পাশাপাশি এ অঞ্চলের মৎস্য সেক্টরেও বিরূপ প্রভাব ফেলেছে। এ বিষয়ে যশোর জেলা মৎস্য কর্মকর্তা মো. আনিছুর রহমান বলেন, যশোরাঞ্চলের ওপর দিয়ে কয়েক দিন ধরে যে দাবদাহ বয়ে যাচ্ছে, তা মাছ চাষের জন্য খুবই প্রতিকূল আবহাওয়া। এমন তাপমাত্রায় রেণু উৎপাদন সম্ভব হয় না। তিনি বলেন, প্রতি বছর এ সময়টা মাছচাষিদের জন্য খুব খারাপ যায়। এ সময়ে আমরা রেণু উৎপাদনকারীদের সতর্কতার সঙ্গে কাজ করার পরামর্শ দিই। কয়েক দিনের মধ্যে বৃষ্টিপাত হলে বা তাপমাত্রা কমে গেলে আশা করি রেণু উৎপাদন স্বাভাবিক পর্যায়ে চলে আসবে।

Print প্রিন্ট উপোযোগী ভার্সন



Login to comment..
New user? Register..