চিফ সিয়াটলের চিঠি

Facebook Twitter Google Digg Reddit LinkedIn StumbleUpon Email

একতা পরিবেশ ডেস্ক : চিফ সিয়াটল ছিলেন যুক্তরাষ্ট্রের সুকুয়ামিশ ও দুয়ামিশ আদিবাসী গোষ্ঠীর নেতা, যার নামে বর্তমান যুক্তরাষ্ট্রের সিয়াটল নগরীর নাম রাখা হয়েছে। নেতৃত্বগুণ ও যুদ্ধে পারদর্শিতার কারণে তিনি হয়ে উঠেছিলেন মার্কিন আদিবাসী গোষ্ঠীর অবিসংবাদিত নেতা। তাঁর সময়েই যুক্তরাষ্ট্রের আদিবাসী গোষ্ঠীগুলোর ক্রমসংকোচন শুরু হয়। মূলধারা হয়ে ওঠে শ্বেতাঙ্গ নেতৃত্ব। শ্বেতাঙ্গরা তাদের ভূমিতে অতর্কিতে বিভিন্ন আক্রমণ চালাতে শুরু করে। এ অবস্থায় নিজের গোত্র ও ভূমি রক্ষায় স্থানীয় শ্বেতাঙ্গ চিকিৎসক ডক মেনার্ডের সঙ্গে ব্যক্তিগত বন্ধুত্ব গড়ে তোলেন চিফ সিয়াটল। এভাবেই তিনি তাঁর গোত্রকে রক্ষা করেন। প্রকৃতির প্রতি ছিলেন অন্য যেকোনো আদিবাসীর মতোই ভীষণ সংবেদনশীল। এই নেতার কাছেই প্রস্তাব যায় ওয়াশিংটন থেকে, তাদের ভূমি বিক্রির। প্রস্তাবে চিফ সিয়াটলকে তাঁর লোকেদের নিয়ে সরে যেতে বলা হয়। বলা হয় ওয়াশিংটনের কর্তৃপক্ষ চিফ সিয়াটলের ভূমি কিনতে আগ্রহী। সে সময় যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ছিলেন ফ্রাঙ্কলিন পিয়ার্স। বলা হয়, এই প্রস্তাবের উত্তরে চিফ সিয়াটল প্রেসিডেন্টকে একটি চিঠি পাঠিয়েছিলেন। কিন্তু তেমন কোনো চিঠির অস্তিত্ব সরকারি নথিতে পাওয়া যায় না। বরং জানা যায়, ১৮৫৪ সালের ডিসেম্বরে চিফ সিয়াটল একটি বক্তৃতা দিয়েছিলেন, যার একটি অনুলিখিত সংস্করণ প্রথম প্রকাশিত হয় ১৮৮৭ সালে সিয়াটল সানডে স্টার পত্রিকায়, চিফ সিয়াটলের মৃত্যুর ২১ বছর পর। কবি ও চিকিৎসক হেনরি এ স্মিথের একটি কলামে প্রথম এ বক্তৃতা সম্পর্কে জানা যায়। স্মিথের দাবি, তিনি নিজে এই বক্তৃতার নোট নিয়েছিলেন। পরে তাঁর বক্তব্য সমর্থন করেন কয়েকজন আদিবাসী নেতা। কিন্তু স্মিথের সেই সংস্করণটি হারিয়ে যায়। তবে চিফ সিয়াটলের বক্তৃতার অনেকগুলো সংস্করণের দেখা মেলে। এর মধ্যে সবচেয়ে জনপ্রিয়টির দেখা মেলে ‘হোম’ নামক একটি চলচ্চিত্রে, যেখানে একজন আদিবাসী জনগোষ্ঠীর ভূমির অধিকারের লড়াইটিই মূলত চিত্রিত হয়েছে। চিফ সিয়াটলের ওই চিঠি কিংবা বক্তৃতাটি এখনো ভীষণভাবে প্রাসঙ্গিক। কারণ, পৃথিবী ও প্রকৃতির প্রতি মানুষের দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে চিফ সিয়াটল সেই সময়ে যে প্রশ্নটি তুলেছিলেন, সেই প্রশ্নটিই এই বৈশ্বিক উষ্ণায়ন ও জলবায়ু পরিবর্তনের বাস্তবতায় ভীষণ রকম বাস্তব হয়ে উঠেছে। বাংলাদেশেও আমরা দেখি বিভিন্ন বনাঞ্চল দখল করতে, বিভিন্ন তথাকথিত উন্নয়ন কর্মকাণ্ড চালানোর নামে প্রকৃতির সংকোচন চলছে হরহামেশা। এই নিয়ে যেকোনো প্রশ্ন তুললেই গায়ে লাগিয়ে দেওয়া হচ্ছে, উন্নয়নবিরোধী তকমা। কিন্তু সত্য হচ্ছে প্রকৃতিকে পৃথক বিবেচনা করে করা যেকোনো উন্নয়ন আদতে আত্মহত্যার শামিল। সাপ্তাহিক একতার পাঠকদের জন্য চিফ সিয়াটলের বক্তৃতার এখন পর্যন্ত সবচেয়ে গ্রহণযোগ্য সংস্করণটির অনুবাদ এখানে তুলে ধরা হলো। যদিও অতিকাব্যিকতার কারণে এই সংস্করণটি নিয়েও অনেক বিতর্ক রয়েছে। চিঠি : ‘ওয়াশিংটনের প্রেসিডেন্ট বার্তা পাঠিয়েছেন যে, তিনি আমাদের ভূমি কিনে নিতে চান। এটা তার বদান্যতা বলা যায়। কারণ, আমরা জানি, আমাদের বন্ধুত্বের তেমন কোনো প্রয়োজন নেই তার। তবুও আমরা তার প্রস্তাব বিবেচনা করব। কারণ আমরা জানি, তার প্রস্তাব যদি আমরা না মানি, তবে তার লোকেরা অস্ত্র নিয়ে এসে আমাদের ভূমি নিয়ে যাবে। চিফ সিয়াটল যা বলে, তাকে সেই বিশ্বাসেই নেওয়া উচিত, যেমনটা বিশ্বাস থাকে ঋতুর আবর্তনের ওপর। আমার কথা তারকাদের মতো, যারা কখনো অস্ত যায় না। ওয়াশিংটনের প্রেসিডেন্ট বার্তা পাঠিয়েছেন যে, তিনি আমাদের ভূমি কিনে নিতে চান। কিন্তু কেউ কী করে আকাশ কেনাবেচা করতে পারে? কিংবা ভূমি? বিষয়টি আমাদের কাছে খুবই অদ্ভূতুড়ে। বাতাসের নির্মলতার কিংবা জলের দ্যুতির মালিকানা যদি আমাদের না থাকে, তাহলে আমরা তাদের কিনব কী প্রকারে? তাই ওয়াশিংটনের মহান নেতা যখন প্রস্তাব পাঠালেন যে, তিনি আমাদের ভূমি কিনতে চান, তা আমাদের বিমূঢ় করে দিল। ওয়াশিংটনের নেতা বলেছেন, তিনি আমাদের জন্য একটি অঞ্চল সংরক্ষিত রাখবেন, যেখানে আমরা আয়াসে বেঁচে থাকতে পারি। তিনি আমাদের পিতা হবেন, আর আমরা তাঁর সন্তান। এ কারণে আমরা তাঁর প্রস্তাব বিবেচনা করছি। কিন্তু এটি সহজ নয়। কারণ, পৃথিবীর প্রতিটি কোণা প্রতিটি ভাগ আমাদের মানুষের কাছে পবিত্র। পাইনের প্রতিটি চোখা ধার, প্রতিটি বালিয়াড়ি, বনাঞ্চলের ঘনীভূত প্রতিটি কুয়াশা, সব তৃণভূমি, কলতানমুখর প্রতিটি পতঙ্গ পবিত্র। আমাদের লোকেদের প্রতিটি স্মৃতি ও অভিজ্ঞতায় এই সবই ভীষণ পবিত্র। উদ্ভীদের শরীরে বয়ে চলা প্রাণরসকে আমরা দেখি আমাদের ধমনীতে বয়ে চলা রক্তের মতোই। আমরা এই পৃথিবীর অংশ এবং প্রথিবীও আমাদের অংশ। গন্ধময় ফুলেরা আমাদের বোন। ভালুক, হরিণ কিংবা ওই বিরাট ঈগল– এই সব আমাদের ভাই। পর্বতের প্রতিটি খাঁজ, ঘাসের ডগায় জমা প্রতিটি শিশির বিন্দু, আর ওই ঘোড়ার গায়ের উত্তাপ ও এই আমাদের মতোমানুষ সব একই পরিবারভুক্ত। ওই উজ্জ্বল জলরাশি যে ঢেউয়ের তরঙ্গ তুলে বয়ে চলেছে, তা শুধু জলরাশিই নয়, বরং আমাদের পূর্বসূরিদের রক্তধারা। যদি আমরা আমাদের ভূমি বিক্রি করি, তবে তোমাকে অবশ্যই স্মরণে রাখতে হবে যে, এই ভূমি পবিত্র। নদীর স্বচ্ছ জলে পড়া প্রতিটি প্রতিবিম্ব আমাদের লোকেদের জীবনের গল্পই বলছে। আর ওই পানির কলতান আদতে আমাদের পূর্বসূরিদের কণ্ঠস্বর। এই নদীগুলো আমাদের ভাই। তারা আমাদের তৃষ্ণা নিবারণ করে। তারা আমাদের নৌকাগুলো বয়ে চলে, আর উদরপূর্তি করে আমাদের সন্তানদের। তাই তোমাকে অবশ্যই নদীর প্রতি সেই মমতা দেখাতে হবে, যা তুমি দেখাও মানুষের প্রতি। যদি আমরা আমাদের ভূমি বিক্রি করি, তবে মনে রেখ, বাতাস আমাদের কাছে মহামূল্যবান। কারণ এই বাতাস সেই আত্মাগুলোর সংযোগ তৈরি করে, যেগুলোকে সে বেঁচে থাকতে সহায়তা করে। এই বাতাস, যা আমাদের পিতামহকে দিয়েছিল প্রথম শ্বাসের সুযোগ, সেই গ্রহণ করেছে তাঁর শেষ দীর্ঘশ্বাসও। এই বাসাই আমাদের সন্তানদের দিয়েছে জীবনের পাঠ। তাই যদি আমরা আমাদের ভূমি বিক্রি করি, তবে তুমি অবশ্যই একে গচ্ছিত রাখবে এক পবিত্র ভূমি হিসেবে, যেখানে মানুষ যেতে পারবে বাতাসের স্বাদ নিতে, যা সুমিষ্ট হয়েছে বনফুলের সুবাসে। তুমি কি তোমার সন্তানদের তা–ই শেখাবে, যা আমরা শিখিয়েছি আমাদের সন্তানদের? শেখাবে কি এই পৃথিবী আমাদের মা? এই পৃথিবীর যা হয়, তার সন্তানদেরও তা–ই হয়; শেখাবে কি এই ধারণা? আমরা মনে করি: পৃথিবী মানুষের পদানত নয়, মানুষ এই পৃথিবীর অংশ। সবকিছুই পরস্পর সম্পর্কিত, ঠিক যেমনটা রক্ত আমাদের সবাইকে সংযুক্ত করে। জীবনের তরঙ্গ মানুষ বোনেনি; বরং সেই বিপুল জীবনতরঙ্গের একটি ক্ষুদ্র সত্তা মাত্র। এই তরঙ্গে সে যাই করুক না কেন, সে আসলে তা করে নিজের সঙ্গে। আমরা মনে করি: আমাদের ঈশ্বর তোমাদেরও ঈশ্বর। তাঁর কাছে এই পৃথিবী মূল্যবান। এর কোনো ক্ষতি তাই তাঁর দিকে পুঁজ ছুড়ে দেওয়ার মতো। তোমার লক্ষ্য আমাদের কাছে এক ধাঁধার মতো। সব ষাঁড়কে হত্যার পর কী হবে? থাকবে কী? কী হবে সব ঘোড়াকেই যদি পোষ মানানো হয়? কী হবে যখন গভীর বনাঞ্চলের প্রতিটি গুপ্ত কোণা ভরে ওঠে মানুষেরই গন্ধে, আর ফলবতী পর্বত ছেয়ে যায় কথায় কথায়? কোথায় বাঁচবে এ ঝোপজঙ্গল? শেষ! কোথায় যাবে ঈগল? নিরুদ্দেশ! দ্রুতগামী ঘোড়াটিকে বিদায় বলে তাকেই আবার শিকারে নামলে বলবার কী থাকতে পারে! প্রাণের সমাপ্তি; আর বেঁচে থাকার লড়াইয়ের শুরু। আমরা জানি, সাদা মানুষেরা আমাদের মতো করে বুঝবে না। তাদের কাছে পৃথিবীর প্রতিটি ভূমিই একই রকম। তারা আগুন্তুকের মতো, যারা রাতের আঁধারে এসে নিজের চাওয়া সবকিছু নিয়ে নেয়। পৃথিবী তাদের ভাই নয়, বরং শত্রু, যাকে অধিকার করতে তারা ছুটে চলে। তারা পৃথিবী থেকে তাদের সন্তানদের বিযুক্ত করে এবং ভুলে যায় তাদের অধিকার। তারা এই পৃথিবী, মা, ভাইবোন, সন্তান এই সবকিছুকেই এমনভাবে দেখে, যা কেনাবেচা করা যায়। তার অসীম ক্ষুধা পৃথিবীকে গিলে খেয়ে এক মরুতে পরিণত করবে। আমি বুঝতে পারি না। আমরা ও তোমরা আলাদা। তোমাদের শহরগুলো আমাদের চোখে যন্ত্রণা সৃষ্টি করে। তোমরা বল, লাল মানুষেরা অসভ্য, তারা বোঝে না। সাদা মানুষদের শহরে কোনো নীরবতা নেই। বসন্তে পাতাদের কথা কিংবা পতঙ্গ-পাখনার গুঞ্জন শোনার মতো কোনো স্থান নেই সেখানে। কিন্তু সেই জীবনের কী অর্থ থাকতে পারে, যা কখনো ব্যাঙের ঝগড়া শোনেনি? একজন লাল মানুষ হিসেবে আমি এটি বুঝি না। যখন শেষ লাল মানুষটি এই ভীষণ দুর্যোগে হারিয়ে যাবে, আর তার স্মৃতি হয়ে পড়বে বিস্তীর্ণ বিরাণে ঘুরে বেড়ানো মেঘমালার মতো, তখন এই বেলাভূমি ও বনাঞ্চল কি আদৌ থাকবে? এখানে কি আমার লোকেদের কোনো আত্মা কোনো চিহ্ন অবশিষ্ট থাকবে? আমরা এই পৃথিবীকে ভালোবাসি, ঠিক যেমনটা ভালোবাসে এক সদ্যোজাত তার মায়ের হৃৎস্পন্দনকে। তাই আমরা এইভূমি যিদ বিক্রি করি, তবে তোমাকে অবশ্যই একে আমাদের মতো ভালোবাসতে হবে। যত্ন নিতে হবে, যেমনটা আমরা নিচ্ছি। এই ভূমি এখন যেমনটা আছে, তার মুখচ্ছবিটি হৃদয়ে গেঁথে নাও। গ্রহণের সময়ের এই স্মৃতিটি মনে রেখ। একে রক্ষা করো সব সন্তানের জন্য, ভালোবাস, যেমটা ভালোবাসেন আমাদের ঈশ্বর। আমরা যেহেতু এই ভূমির অংশ, তোমরাও নিশ্চয় তাই। এই ভূমি, এই পৃথিবী আমাদের কাছে মূল্যবান। এটি তোমাদের কাছেও মূল্যবান। আমরা মনে করি, একজনই ঈশ্বর রয়েছেন। লাল কিংবা সাদা কোনো মানুষই বিচ্ছিন্ন থাকতে পারে না। শেষব্দি আমরা সবাই ভাই-ই তো। আমি তোমাদের প্রস্তাবে একটি শর্তেই শুধু রাজি হতে পারি; আর এই ভূমির সব প্রাণীকে তোমরা অবশ্যই ভাই মনে করবে। আর তোমাদের সন্তানদের শেখাবে, তাদের পায়ের তলার যে ভূমি, তা তাদের পূর্বসূরিদের শরীরের অবশেষ থেকে তৈরি।’

Print প্রিন্ট উপোযোগী ভার্সন



Login to comment..
New user? Register..