জলবায়ু পরিবর্তনে বাড়ছে সম্পদ বৈষম্য

Facebook Twitter Google Digg Reddit LinkedIn StumbleUpon Email

একতা পরিবেশ ডেস্ক : তাপমাত্রা বাড়ছে। আবহাওয়া চরমভাবাপন্ন হচ্ছে দিন দিন। বিশ্বের নানা প্রান্তের মানুষ নানাভাবেই এখন এর ভয়াবহ রূপ দেখছে। আর এসবই ঘটছে বৈশ্বিক উষ্ণায়ন বৃদ্ধির কারণে হওয়া জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে। বৈশ্বিক উষ্ণায়ণ বাড়ছে। গত কয়েক বছর ধরেই তাপমাত্রা বৃদ্ধির রেকর্ড দেখছে বিশ্ব। দেখছে আবহওয়ার চরম আচরণ। কিন্তু এই আচরণের শিকার বিশ্বের সব মানুষ সমানভাবে হয় না। আরও ভালো করে বললে, এই বৈশ্বিক উষ্ণায়ন কিংবা জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবও শ্রেণিভেদে একেক রকম হচ্ছে। মূলত নিম্ন শ্রেণির মানুষের পক্ষে প্রতিরোধ ও নিরাপত্তামূলক ব্যবস্থা কম নেওয়া সম্ভব হয় বলেই নিম্নবিত্তরা জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। এই ক্ষতি আবার তাকে আরও প্রান্তের দিকে ঠেলে দিচ্ছে। ফলে ক্রমেই বাড়ছে সম্পদ বৈষম্য। গত অর্ধ শতক ধরেই জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে দেশে-দেশে মানুষে-মানুষে সম্পদ বৈষম্য বেড়েছে। সাম্প্রতিক এক গবেষণায় দেখা গেছে, গত ৫০ বছর ধরে জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে দরিদ্র দেশগুলোর অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি কমেছে, আর ধনী দেশগুলো আরও ধনী হয়েছে। বৈশ্বিক উষ্ণায়নের মতো বাস্তবতার মুখোমুখি না হলে বিশ্বের দরিদ্র দেশগুলোর সঙ্গে ধনী দেশগুলোর সম্পদের যে পার্থক্য বর্তমান তা অন্তত ২৫ শতাংশ কম হতো বলে মনে করেন গবেষকেরা। গবেষকদের বরাত দিয়ে বিবিসির প্রতিবেদনে বলা হয়, বর্তমানে মৌরিতানিয়া ও নাইজারের মতো দেশগুলোর মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) যে হার, তা বৈশ্বিক উষ্ণায়নের মতো বিষয়ের মুখোমুখি না হলে ৪০ শতাংশ বেশি থাকত। একইভাবে ভারতের ক্ষেত্রেও বিষয়টি সত্য। এ ধরনের বিষয় না থাকলে ২০১০ সালে যে জিডিপি হতো তার চেয়ে ৩১ শতাংশ কম হতো। আর ব্রাজিলের ক্ষেত্রে এ পরিমাণ ২৫ শতাংশ। অর্থাৎ বৈশ্বিক উষ্ণায়ন একদিকে যেমন মৌরিতানিয়া ও নাইজারের মতো দেশের অর্থনীতির ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে, তেমনি ভারত ও ব্রাজিলের মতো শক্তিশালী অর্থনীতির দেশের প্রবৃদ্ধির চাকাকে গতিশীলও করছে। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) তথ্যমতে, শেষোক্ত এ দুই দেশ বর্তমানে বিশ্বের যথাক্রমে পঞ্চম ও নবম বৃহৎ অর্থনৈতিক শক্তি। প্রোসিডিংস অব দ্য ন্যাশনাল অ্যাকাডেমি অব সায়েন্সেস জার্নালে প্রকাশিত ওই গবেষণা নিবন্ধে বলা হয়, যেসব দেশের অর্থনীতি বড়, সেসব দেশই কার্বন নিঃসরণ করে বেশি। এই কার্বন নিঃসরণই বৈশ্বিক উষ্ণায়নের জন্য দায়ী। আর এ দায় নিজে না নিয়ে ধনী দেশগুলো তা অলক্ষ্যে চাপিয়ে দেয় দরিদ্র দেশগুলোর কাঁধে। গ্রিনহাউস গ্যাসের নিঃসরণ বাড়িয়ে চলার পাশাপাশি তারা আন্তর্জাতিক ফোরামে বিষয়টি নিয়ে আলোচনায় নামে। এই যখন চলতে থাকে, তখন দরিদ্র দেশগুলো প্রতিরক্ষামূলক ব্যবস্থা নিতে নিতে, দুর্যোগ মোকাবিলা করতে করতে একরকম হাঁপিয়ে ওঠে। গবেষক দলের অন্যতম সদস্য ও নিবন্ধের সহলেখক স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের আর্থ সিস্টেম সায়েন্সের অধ্যাপক মার্শাল বার্কে ১৯৬১ সাল থেকে ২০১০ সাল পর্যন্ত মোট ১৬৫টি দেশের অর্থনৈতিক তথ্য ও তাপমাত্রা বৃদ্ধির তথ্য বিশ্লেষণ করেন। তিনি ও তাঁর দল এ দুইয়ের মধ্যে আন্তঃসম্পর্ক রয়েছে কিনা, থাকলে তা কেমন, তা বের করার চেষ্টা করেন। এ ক্ষেত্রে তাঁরা ২০টি মডেল ব্যবহার করেন, যার মাধ্যমে প্রতিটি দেশের আবহাওয়া মানবসৃষ্ট কারণে কতটা উষ্ণ হয়েছে, তা বের করা হয়। এরপর এই তথ্যকে তুলনা করা হয় একগুচ্ছ তথ্যের সঙ্গে, যেখানে বৈশ্বিক উষ্ণায়ন ছাড়া দেশগুলোর অর্থনৈতিক উন্নয়ন কেমন হতো, তার সম্পর্কে একটি অনুমান করা হয়। এতে দেখা যায় তুলনামূলক শীতপ্রধান দেশগুলোতে এই সময়কালে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি হলেও পিছিয়ে পড়েছে গ্রীষ্মমণ্ডলীয় দেশগুলো। আর বিশ্বের ধনী দেশগুলোর বড় অংশই পশ্চিমের শীতপ্রধান দেশ। মার্শাল বার্কে বলেন, ‘ইতিহাস বলছে, না গরম, না শীত- এমন আবহাওয়াতেই ফসলের উৎপাদন বেশি হয়। এমন আবহাওয়াই মানুষকে সুস্বাস্থ্য ও বেশি উৎপাদনশীল হওয়ার নিশ্চয়তা দেয়। ফলে শীতপ্রধান দেশগুলো বৈশ্বিক উষ্ণায়নের কারণে সৃষ্টি জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে কিছুটা উষ্ণতার সুবিধা ভোগ করছে। ঠিক উল্টো অবস্থার মুখোমুখি হচ্ছে গ্রীষ্মমণ্ডলীয় দেশগুলো।’ এ বিষয়ে প্রধান গবেষক নোহায় ডিফ্যানবোহ বলেন, অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড তাপমাত্রার তারতম্যের কারণে অনেকভাবেই প্রভাবিত হতে পারে। উদাহরণস্বরূপ কৃষির কথা বলা যায়। দীর্ঘ শীতের কারণে শীতপ্রধান দেশগুলোয় উৎপাদন মৌসুম অনেক ছোট। অন্যদিকে, উচ্চ তাপমাত্রায় ফসলহানি হওয়ার বিষয়টি সম্পর্কে আমরা অনেক আগে থেকেই জানি। আবার উচ্চ তাপমাত্রায় মানুষের শ্রম-সক্ষমতাও হ্রাস পায়। কমে আসে বৌদ্ধিক সক্ষমতা, সহনশীলতাসহ আরও অনেক কিছু, যা সরাসরি উৎপাদনশীলতার সঙ্গে যুক্ত। ফলে শীতপ্রধান দেশে বৈশ্বিক উষ্ণায়নের ইতি-নেতি দুই অর্থেই প্রভাব থাকলেও গ্রীষ্মমণ্ডলীয় দেশে শুধু এর নেতিবাচক প্রভাবটিই পড়ে। অর্থাৎ শীতপ্রধান দেশ বৈশ্বিক উষ্ণায়ন থেকে লাভবান হওয়ার সুযোগ থাকলেও গ্রীষ্মমণ্ডলীয় দেশের তা একেবারেই থাকে না। এই নেতিবাচক প্রভাবের ফলে তাদের অর্থনীতি সময়ের সঙ্গে কেবল নিম্নমুখীই হয়। শিল্পযুগের সূচনা থেকে বিষয়টিকে গুণনায় ধরলে এমনকি বর্তমান বিশ্বকাঠামোয় উন্নত, অনুন্নত দেশের যে শ্রেণিকরণ, তার সূত্রটি খুঁজে পাওয়া সম্ভব। গ্রিনপিস আফ্রিকার রাজনৈতিক উপদেষ্টা হ্যাপি ক্যামবুলের মতে, বহু বছর ধরেই জলবায়ু পরিবর্তন ও বৈশ্বিক ঊষ্ণায়নের এমন প্রভাব সম্পর্কে সবাই অবগত। জলবায়ু পরিবর্তন এমন একটি বিষয়, যা যেকোনো ঝুঁকিকে বহুগুণে বাড়িয়ে দেয়, বিদ্যমান সংকটকে আরও কঠিন করে তোলে। ফলে এই বৈশ্বিক সমস্যার কারণে দরিদ্র ও ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীই আরও বড় ঝুঁকিতে পড়বে এবং তারাই শেষ পর্যন্ত সব হারানোর দলে গিয়ে ভিড়বে, এতে আর বিস্ময়ের কী আছে। বিভিন্ন প্রাকৃতিক দুর্যোগে কোন দেশ কীভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে, তার ব্যাপ্তি কেমন, তার একটি হিসাব নিলেই বিষয়টি বোঝা সম্ভব। গত মাসে মোজাম্বিক ও জিম্বাবুয়েতে আঘাত হানে ঘূর্ণিঝড় ইদাই। এতে অঞ্চলটির নয় শতাধিক মানুষ নিহত হয়। সম্পদহানি হয় ব্যাপকমাত্রায়। অথচ এর চেয়ে তীব্র ঝড়েও যুক্তরাষ্ট্রের মতো শক্তিশালী দেশগুলোকে দেখা যায়, বেশ সফলভাবে সামাল দিতে। কারণ তার রয়েছে শক্তিশালী অবকাঠামো ও প্রতিরক্ষামূলক ব্যবস্থা। আফ্রিকার দুর্বল দেশগুলোর এ ধরনের কোনো ব্যবস্থা নেই। ফলে এসব দেশের মানুষকেই এমন দুর্যোগে মরতে হয় কাতারে কাতারে। যদিও বৈশ্বিক উষ্ণায়ন কিংবা জলবায়ু পরিবর্তন কোনোটিতেই এ দেশগুলোর তেমন উল্লেখযোগ্য ভূমিকা নেই। যতটা আছে, তাও পশ্চিমা দেশগুলোর বিভিন্ন কোম্পানির কারণে। গবেষণার তথ্যমতে, ১৯৬১ থেকে ২০১০ সাল পর্যন্ত যে ১৮টি দেশ মাথাপিছু ১০ টনেরও কম কার্বন ডাই অক্সাইড নিঃসরণ করেছে, বৈশ্বিক উষ্ণায়নের কারণে তাদের মাথাপিছু জিডিপি কমেছে ২৭ শতাংশের মতো। অন্যদিকে একই সময়ে মাথাপিছু ৩০০ টন কার্বন ডাই অক্সাইড নিঃসরণ করা ১৪টি দেশে মাথাপিছু জিডিপি প্রবৃদ্ধি হয়েছে গড়ে ১৩ শতাংশ করে। এর মাধ্যমে দরিদ্র দেশগুলো জ্বালানি ব্যবহার বিচারে ধনী দেশগুলো থেকে আরও পিছিয়ে পড়েছে। অর্থাৎ আরও পিছিয়ে পড়েছে তারা। আবার প্রতিটি দেশের ভেতরেও এ কথা সত্য। প্রতিটি দেশের উচ্চবিত্ত ও নিম্নবিত্তের মধ্যে বাড়ছে সম্পদের ব্যবধান এবং তা একই সূত্র মেনেই। মোদ্দা কথা হলো, শেষ পর্যন্ত জলবায়ু পরিবর্তন বা তার কারণ বৈশ্বিক উষ্ণায়ন কোনো দেম বা গোষ্ঠীরই কাজে আসবে না। বিশ্ব সীমানা বা নানা অভিধায় বিভাজিত হলেও পৃথিবী একটিই। তাই এর যেকোনো প্রান্তে যা কিছু ঘটুক না কেন, তার প্রভাব সারা পৃথিবীকেই বহন করতে হয়। এখানে ধনী-দরিদ্র দেশের ব্যবধান করে লাভ নেই। কারও ওপর সাততাড়াতাড়ি প্রভাবটি পড়ছে, কেউ নিঃস হচ্ছে তাড়াতাড়ি। কিন্তু এভাবে চলতে থাকলে নিঃস সবাইকেই হতে হবে– এটা এক রকম নিশ্চিত।

Print প্রিন্ট উপোযোগী ভার্সন



Login to comment..
New user? Register..