আমরা হকার, মানুষ কিনা?

Facebook Twitter Google Digg Reddit LinkedIn StumbleUpon Email

মঞ্জুর মঈন : ‘আমরা হকার ‘মানুষ’ কিনা, প্রধানমন্ত্রী জানতে চাই?’ এটা ঢাকায় হকারদের আন্দোলনে একটা বহুল উচ্চারিত স্লোগান। এই স্লোগানের মধ্যদিয়ে যে করুণ আকুতি ব্যক্ত হয় তা চলতি জীবনের ব্যস্ততার ফাঁকে আমাদের পক্ষে উপলব্ধি করা একটু কঠিন। এই পেশাটা কারো কারো কাছে ঠিক পছন্দ নাও হতে পারে, কিন্তু কোটি শিক্ষিত বেকারের এই দেশে রাস্তায় দাঁড়িয়ে পণ্য বিক্রি করাটা একটা পুরাতন পেশা। এই পেশার মাধ্যমেই অন্তত পাঁচ লক্ষ মানুষ পরিবার পরিজন নিয়ে বেঁচে আছে। বাবা এক সময় হকারি করতো তার সন্তান এখন একই যায়গায় ঐ কাজটাই করছে এমন হাজার হাজার দৃষ্টান্ত আছে। যারা এই কাজে জড়িত তাদের জন্যও যে এটা খুব নিশ্চয়তাপূর্ণ, আরামদায়ক এবং সম্মানজনক কাজ এমন না। তাহলে এত মানুষ হকারি করে কেন? তারা চাকরি-টাকরি করতে পারে না? গ্রামে কৃষিকাজ করতে পারে না? কিংবা হকারদের কেনো রাষ্ট্রের টাকায় পুনর্বাসন করতে হবে? সরকারি পরিসংখ্যান অনুসারে যেদেশে চারভাগের একভাগ মানুষ মাসে ৩ হাজার টাকা আয় করতে পারে না, কিন্তু ‘উন্নয়ন’ জিকির আর ‘মধ্যম আয়ের দেশ’ বলে বগল বাজানো হয় সেদেশে মানুষের মনে এই প্রশ্নগুলো জাগতেই পারে। আপনি যদি এই বালক সুলভ প্রশ্নের মানসিক স্তরটা কোনভাবে অতিক্রম করতে সক্ষম হন তবেই হকাররা মানুষ কিনা এই প্রশ্নের মর্মান্তিক মর্ম উপলব্ধি করতে পারবেন। একটা পেশা, যার মাধ্যমে রুটি রুজি করে কয়েক লক্ষ মানুষ পরিবার পরিজনসহ বেঁচে থাকে। সেই পেশাকে শুধুমাত্র নির্বাহী হুকুম জারি করে বিলুপ্ত করা যায় না। শক্তি প্রয়োগ করে উচ্ছেদ করা যায় না, এটা অন্যায়। অথচ গত প্রায় চার মাসের বেশি সময় ধরে ঢাকার হকারদের কোনো বিকল্প ব্যবস্থা ছাড়াই উচ্ছেদ করা হয়েছে। গত ৪ ফেব্রুয়ারি পুলিশ সপ্তাহের কথা বলে সকল হকারকে তুলে দেয়ার পর আর বসতে দেয়া হয়নি। পুলিশ সপ্তাহ শেষ হলে হকাররা যেখানেই দাঁড়িয়েছে সেখানেই গ্রেফতার হয়েছে। তারপর মামলা দিয়ে তাদের কোর্টে পাঠানো হয়েছে। কেউ জামিন পেয়েছে, কাউকে জেল খাটতে হয়েছে। এই অবস্থায় হকাররা যে আন্দোলন শুরু করেছে তা এখন পর্যন্ত চলমান আছে। সর্বশেষ ঢাকার নীলক্ষেত-নিউমার্কেট এলাকায় ত্রিশজন হকারকে গ্রেফতার করে মামলা দিয়ে চালান করে দেয়া হয়েছে। ঢাকা শহরের এই হকাররা চার মাস ধরে আক্ষরিক অর্থে নিরন্ন, তাদের মুখের দিকে তাকানো যায় না। তাদের জীবনে যে নিঃশব্দ করুণ ট্রাজেডি বয়ে যাচ্ছে সেটা তারাই অনুভব করতে পারবেন যারা এমন জীবনে এমন সময় পার করেছেন। যৎসামান্য পুঁজি যখন আটকে থাকে এবং উপার্জন বন্ধ হয়ে যায় তখন সমস্ত আর্থিক দায়িত্ব মাথায় নিয়ে একেকজন মানুষ দিশেহারা অবস্থায় পড়ে। এই অথৈ সাগরে হাবুডুবু খাওয়ার অনুভূতি তিনিই ভালো বুঝবেন যিনি আট দশ বছরের চাকুরি জীবনে হঠাৎ বেকার হয়ে পড়েন। হকারদের এক চরম আর্থিক অনটন ও বেকারত্বের দিশাহারা অবস্থার মধ্যেই ঈদ আসন্ন। গোটা সমাজের জন্য আনন্দের বার্তা নিয়ে যখন ঈদ দোরগোড়ায় তখন সেই প্রশ্নটিই নতুন করে হকারদের মনে উঁকি দেয়। আমরা কি মানুষ? এই ঈদ কি আমাদেরও? ঈদের দিনে আমাদের সন্তানের মলিন মুখে হাসি ফুটবে? বাসস ভবনের নিচের ফুটপাথে চার বছরের বেশি সময় ধরে শার্ট বিক্রি করে ফারুক। আন্দোলনের খুব সক্রিয় কর্মী। বয়স কোনোভাবেই পঁয়ত্রিশের বেশি হবে না। ঢাকার শান্তিবাগ এলাকায় মেসে থাকে, প্রতি রাতে পল্টন থেকে হেটে বাসায় ফেরে। আমার সাথে মাঝে মাঝে শান্তিনগর মোড়ে দেখা হয়। একদিন কথা বলতে বলতে তার থাকার যায়গায় পৌঁছাই। লম্বা মতো দেয়াল ঘেরা জায়গায় দুই সারিতে মুখোমুখি মেঝে পাকা টিনের ঘর। ঢুকতেই হাতের ডানে কল পাড় পাশেই খোলা রান্নার জায়গা। বাম সারিতে মোট আটটা এবং ডান সারিতে সাতটা ঘর। ডান দিকের সবশেষ ঘরটায় আরো ছয় জনের সাথে ফারুক থাকে। তিনটা চকি পাতা ঘরটা সর্বোচ্চ দেড়শ বর্গ ফুটের হবে। এই ঘরটার ভাড়া সাড়ে ৬ হাজার টাকা শুনে কোনোভাবেই বিশ্বাস করা যায় না। কিন্তু বাস্তবতা হলো ঢাকা শহরে জায়গার পরিমাণ ও সুযোগ সুবিধা বিবেচনায় গরিব মানুষের বাসাভাড়া মধ্যবিত্ত ভাড়াটিয়াদের তুলনায় অন্তত দ্বিগুন। এই কর্মহীন দিনগুলো কেমন যাচ্ছে ফারুকের কাছ থেকে তা কিছুটা জানা হয় আমার। ঢাকায় থাকা খাওয়া বাবদ প্রতি মাসে তার চার হাজার টাকার বেশি খরচ হয়। বাড়িতে কোনো মাসে ছয় হাজার কোন মাসে একটু বেশি টাকা পাঠাতে পারে। সেখানে প্রাইমারি স্কুলে পড়া এক মেয়ে এবং কোলের এক ছেলে বাচ্চাসহ পৈত্রিক ভিটায় তার বউ আর বাবা মা থাকে। এমনি সময়ে সে বয়স্ক বাবা মার জন্য তেমন কিছু করতে পারে না। গত চার মাস ধরে কোনো উপার্জন না থাকায় যে আর্থিক সংকটে সে পড়েছে সেটা বলতে গিয়ে ফারুকের চোখে পানি আসে। এসময়ে অন্য কাজের চেষ্টা সে করেছে কিনা তার কছে আমি জানতে চাই। আর কি কাজের সুযোগ এই শহরে তার জন্য আছে যখন সে উল্টো আমাকে এই প্রশ্ন করে আমি ভেবে উত্তর খুঁজে পাইনা। ফারুক বলে, সে দুটো কাজের চেষ্টা করেছে এই সময়ে। তারই মেসের একজন ইলেক্ট্রিশিয়ান তাকে এক সপ্তাহের যোগালির কাজ দিয়েছিল। আর প্রথম পাঁচ রোজায় এক ইফতারির দোকানে কাজ করে দিনে ২০০ টাকা করে পারিশ্রমিক পেয়েছে। তাকে সান্ত¦না দিতে গিয়েই কিনা জানি না আমি দীর্ঘশ্বাস ছাড়ি, মৃদুস্বরে টেনেটেনে বলি, সামনে ঈদ! ফারুক আমার দিকে এক করুণ দৃষ্টিতে তাকিয়ে নিঃশব্দে হাসে। এই হাসির অর্থ আমি বুঝি না। এ ঠিক কটাক্ষের হাসি নাকি ঈদ ব্যাপারটার কোন মানে ফারুক ধরতে না পেরে এমন করে হাসে সেটা আমার জানা হয় না। হকারদের এবারের আন্দোলন দীর্ঘ সময় ধরে চলেছে কিন্তু আন্দোলন দুর্বল হয়নি। আন্দোলন দমন করতে কয়েকটি মামলা হয়েছে, প্রতিদিন গ্রেফতার-নির্যাতন হয়েছে। কমিউনিস্ট পার্টির কেন্দ্রীয় সম্পাদক শ্রমিকনেতা জলি তালুকদার, হকার ইউনিয়নের সভাপতি আব্দুল হাশেম কবির, সেকান্দার হায়াৎ, মুর্শিকুল ইসলাম শিমুল, হযরত আলীসহ আন্দোলনের নেতাদের আসামি করা হয়েছে। তাতেও আন্দোলন দমন করা যায়নি। একপর্যায়ে প্রধানমন্ত্রী সংসদে হকারদের পুনর্বাসন সম্পন্ন না হওয়া পর্যন্ত তাদের সীমিতভাবে রুটি রুজি করার ব্যবস্থা রাখার কথা বলতে বাধ্য হয়েছেন। গত এক সপ্তাহ ধরে হকাররা অফিস ছুটির পরে পণ্য নিয়ে ফুটপাথে দাঁড়াচ্ছে। যদিও এখন পর্যন্ত নিউমার্কেট এলাকায় পুলিশি ধরপাকড় চলছেই। হকারদের বিরুদ্ধে একটা জনমত সঙ্গত কারণেই আছে। যারা হাঁটেন তারা যুক্তিসঙ্গত ভাবেই অবাধ এবং মুক্ত ফুটপাথ চান। আবার তাদের একটা বড় অংশই হকারদের ক্রেতা। এবারের আন্দোলন উপস্থিতি ও অংশগ্রহণের দিক থেকে অনেক বড় এবং ব্যাপক ছিল। ধারাবাহিক এবং এতই শৃঙ্খলাপূর্ণ ছিল যে সরকার কোনোভাবেই এ আন্দোলনকে উপেক্ষা করতে পারে নাই। কিন্তু শুরু থেকেই সামান্য ব্যতিক্রম বাদে দেশের গণমাধ্যমগুলো হকারদের আন্দোলনের বিরুদ্ধে নীতিগত অবস্থান নেয়। এটা দুর্ভাগ্যজনক যে ফুটপাথ মুক্ত রাখার পক্ষে নীতিগত অবস্থান নিলেও সত্য প্রকাশে তারা স্বাধীন নীতিতে চলতে ব্যর্থ হয়েছে। হকারদের আর্জি ছিল, এই সরকার আমলে গত এগার বছরে হকার পুনর্বাসনের জন্য যেসকল বরাদ্দ, তার ব্যয় কোথায় হয়েছে তা একটু খতিয়ে দেখা হোক। পত্রিকায় এই খাতে ২০১৭ সালে হাজার কোটি টাকার একনেক বরাদ্দের খবর বের হয়েছিল, সেই টাকা দিয়ে কি করা হয়েছে তা নিয়ে প্রতিবেদন হোক। এ সময়ে শহর অঞ্চলে সড়ক যোগাযোগ উন্নয়ন এবং যানজট নিরসনের নামে যত অনুদান ও প্রকল্প হয়েছে তার প্রায় সবগুলোতেই হকার পুনর্বাসন খাত ছিল। সে সকল অর্থ কিভাবে লুটপাট হয়েছে, কার পকেট ভরেছে তা তুলে ধরলে সেটা কি ‘হকার মুক্ত ফুটপাথ’ নীতির খেলাপ হয়? হকারদের অন্তত ত্রিশ বছরের পুরাতন এই পেশাটার রূপ যদি বদলাতে হয়, যদি শহরের পাশাপাশি মানুষের জীবনের সামান্য উন্নয়নও করতে হয় তাহলে একটা ন্যূনতম রাষ্ট্রীয় উদ্যোগ তো প্রয়োজন। এই সরকার হকারদের জন্য অথবা অবাধ ও মুক্ত ফুটপাথের জন্য আজ পর্যন্ত কি উদ্যোগটা নিয়েছে? হ্যা একটা উদ্যোগ নিয়মিত নিয়েছে লাঠি মেরে, জেলে দিয়ে, বুলডোজার দিয়ে মালপত্র নষ্ট করে হকারদের তুলে দেয়া। যেন এই কয়েক লক্ষ্য হকার দেশের নাগরিক নয়। তাদের খাওয়া-পরা-বেঁচে থাকার বিষয়ে রাষ্ট্রের কোনো দায়-দায়িত্ব নাই। তারা যেন গলির মুখের কুকুরের মত রাস্তার উপদ্রপ। হকাররা এই শহরে এই দেশে যেন মানুষ নয়। ঘরে ঘরে আনন্দের বার্তা নিয়ে ঈদ আসন্ন। হকারদের পক্ষ থেকে দেশবাসীকে ঈদের শুভেচ্ছা। ঈদ মোবারক! লেখক : আন্তর্জাতিক সম্পাদক, জিটিইউসি

Print প্রিন্ট উপোযোগী ভার্সন



Login to comment..
New user? Register..