ঈদ কি আসবে পাটকল শ্রমিকদের?

Facebook Twitter Google Digg Reddit LinkedIn StumbleUpon Email
একতা প্রতিবেদক : বাংলাদেশ পাটকল করপোরেশনের (বিজেএমসি) প্রতিশ্রুতির এক মাস হতে চললেও পাটকল শ্রমিকরা এখনো তাদের বকেয়া বেতন-ভাতা পাননি। এই রমজান মাসেও তাদের পরিবার-পরিজন নিয়ে অনাহারে-অর্ধাহারে দিনাতিপাত করতে হচ্ছে। গরমের মধ্যে কষ্ট করে রোজা রেখেও তাঁরা অধিকার আদায়ের জন্য লড়াই-সংগ্রাম চালিয়ে যাচ্ছেন। প্রতিদিন শ্রমিকদের উদ্যোগে রাজপথ-রেলপথ অবরোধ কর্মসূচি পালিত হচ্ছে। এর মধ্যেই পাটকল শ্রমিকদের বকেয়া বেতন ঈদের আগেই পরিশোধ করার জন্য মন্ত্রণালয়কে ব্যবস্থা নিতে বলেছে সংসদীয় কমিটি। এ বিষয়ে এরমধ্যে অর্থ মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে আলোচনা হয়েছে বলে জানিয়েছে মন্ত্রণালয়। গত ১৬ মে সংসদ ভবনে বস্ত্র ও পাট মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির বৈঠকে এ বিষয়ে আলোচনা হয়। বৈঠক শেষে কমিটির সদস্য ইসরাফিল আলম বলেন, আমরা বলেছি, ঈদের আগেই শ্রমিকদের ন্যায্য পরিশোধ করতে হবে। তবে শ্রমিকরা যাতে তাদের টাকা পায় সেজন্য ব্যাংক হিসাবে তাদের বকেয়া পরিশোধ করতে বলা হয়েছে। ঈদের আগে শ্রমিকদের বকেয়া পরিশোধ করা সম্ভব হবে কি না জানতে চাইলে তিনি বলেন, অবশ্যই করতে হবে। সরকারকেই টাকা দিতে হবে। বাংলাদেশ পাটকল করপোরেশনের (বিজেএমসি) অধীনে ঢাকা, চট্টগ্রাম ও খুলনা অঞ্চলে ২৭টি রাষ্ট্রায়ত্ত পাটকল রয়েছে। এতে প্রায় ৮০ হাজার শ্রমিক কাজ করেন। দীর্ঘদিন ধরে বেতন-ভাতা বকেয়া থাকায় নয় দফা দাবিতে লাগাতার ধর্মঘট করছেন তারা। গত ৬ মে থেকে দ্বিতীয় দফায় দেশব্যাপী একযোগে ধর্মঘটের ফলে মিলগুলোর উৎপাদন বন্ধ রয়েছে। সমস্যা সমাধানে প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনা অনুযায়ী বস্ত্র ও পাট মন্ত্রণালয় কাজ শুরু করেছে। খুলনার খালিশপুর জুটস মিলসের সিবিএ সভাপতি আবু দাউদ দ্বীন মোহাম্মদ বলেন, বারবার প্রতিশ্রুতি দেয়া হলেও তা পূরণ হচ্ছে না। এর আগে একবার ২৮ মার্চের ভেতর বকেয়া বেতন ও অন্যান্য পাওনা পরিশোধের কথা বলা হয়েছিল। কিন্তু হয়নি। পরে আবার আন্দোলন শুরু হলে ২৫ এপ্রিলের মধ্যে দাবি-দাওয়া পূরণের প্রতিশ্রুতি দেয়া হয়। এবারও তা পূরণ হয়নি। শ্রমিকরা স্ব-উদ্যোগে ধর্মঘট ডেকেছেন। আমরা শ্রমিক লীগের পক্ষ থেকে সিবিএ ও নন-সিবিএ নেতারা সমর্থন দিয়েছি। আন্দোলনরত শ্রমিক নেতারা জানান, খুলনার রষ্ট্রায়ত্ত ক্রিসেন্ট, প্লাটিনাম, খালিশপুর, দৌলতপুর, স্টার, আলিম, ইস্টার্ন এবং যশোরের কার্পেটিং ও জেজেআই জুট মিলে বর্তমানে ১৩ হাজার ২৭১ শ্রমিক কাজ করছেন। মজুরি বকেয়া থাকায় শ্রমিকরা পরিবারের সদস্যদের নিয়ে অর্ধাহারে-অনাহারে দিন কাটাচ্ছেন। শ্রমিকদের ঘোষিত দাবির মধ্যে রয়েছে- সরকারঘোষিত জাতীয় মজুরি ও উৎপাদনশীলতা কমিশন-২০১৫ সুপারিশ বাস্তবায়ন, অবসরপ্রাপ্ত শ্রমিক-কর্মচারীদের পিএফ গ্র্যাচুইটি ও মৃত শ্রমিকের বিমার বকেয়া টাকা প্রদান, টার্মিনেশন ও বরখাস্ত শ্রমিকদের কাজে পুনর্বহাল, শ্রমিক-কর্মচারীদের নিয়োগ ও স্থায়ীকরণ, পাট মৌসুমে পাট ক্রয়ের অর্থ বরাদ্দ, উৎপাদন বৃদ্ধির লক্ষ্যে মিলগুলোকে পর্যায়ক্রমে বিএমআরই করা। বিজেএমসির অধীনে ঢাকা, চট্টগ্রাম ও খুলনা জোনে মোট ২৬টি পাটকল রয়েছে। তার মধ্যে চট্টগ্রাম জোনে রয়েছে আমিন জুট মিলস লিমিটেড ও ওল্ড ফিল্ডস লিমিটেড, গুল আহমেদ জুট মিলস লিমিটেড, হাফিজ জুট মিলস লিমিটেড, এমএম জুট মিলস লিমিটেড, আরআর জুট মিলস লিমিটেড, বাগদাদ-ঢাকা কার্পেট ফ্যাক্টরি লিমিটেড, কর্ণফুলী জুট মিলস লিমিটেড, ফোরাত কর্ণফুলী কার্পেট ফ্যাক্টরি, গালফ্রা হাবিব লিমিটেড ও মিলস ফার্নিসিং লিমিটেড। অন্যদিকে খুলনায় রয়েছে ক্রিসেন্ট, প্লাটিনাম, খালিশপুর, দৌলতপুর, স্টার, ইস্টার্ন, আলিম এবং যশোরের জেজেআই ও কার্পেটিং জুট মিল। এদিকে নরসিংদী ইউএমসি জুট মিলে (ইউনাইটেড-মেঘনা ও চাঁদপুর ইউনিটে) স্থায়ী ও অস্থায়ী মিলিয়ে কর্মরত রয়েছেন চার হাজার ৫৭৫ জন শ্রমিক। অন্যদিকে পলাশ উপজেলার ৫২০ তাঁতের বাংলাদেশ জুট মিলটিতে প্রায় তিনহাজার শ্রমিক-কর্মচারী কমর্রত রয়েছেন। গত ৪ মাস ধরে পাওনা মজুরি পাচ্ছেন না এ দুই মিলের শ্রমিকরা। নতুন করে যোগ হয়েছে আরও ১১ সপ্তাহের বকেয়া মজুরি। বকেয়া মজুরি না পেয়ে মানবেতর জীবনযাপন করছে শ্রমিকরা। অর্থের অভাবে অনেকেই সেহেরি না খেয়েই রোজা রাখছেন। বাংলাদেশ জুট মিলের ফিনিশিং বিভাগের শ্রমিক জামাল বলেন, ১১ সপ্তাহ ধরে আমাদের মজুরি না দেওয়ায় অতি কষ্টে জীবনযাপন করছি। পরিবার-পরিজন নিয়ে কোনোমতে সেহেরি খেয়ে-না-খেয়ে রোজা রাখতে হচ্ছে আমাদের। ইউএমসি জুট মিলের শ্রমিক আনোয়ার হোসেন বলেন, সরকার ঈদের আগে বকেয়া মজুরি পরিশোধের ঘোষণা দিলেও তা বাস্তবায়ন হয়নি। আমরা এতদিন দোকান থেকে বাকিতে সদাই এনে সংসার চালিয়েছি। এখন সময় মতো বকেয়া পরিশোধ না করায় দোকানদাররা বাকিতে সদাই বিক্রি করছেনা। তাই পরিবার পরিজন নিয়ে অর্ধাহারে অনাহারে দিনাতিপাত করছি। পলাশের বাংলাদেশ জুট মিলের শ্রমিক ইউনিয়নের সভাপতি ইউসুফ আলী বলেন, দীর্ঘদিন ধরে মজুরি না পেয়ে অনাহারে-অর্ধাহারে দিনকাটাতে গিয়ে আমাদের পিঠ এখন দেয়ালে ঠেকে গেছে। তাই মিল বন্ধ করা ছাড়া আর কোনো উপায় ছিলনা। বিজেএমসি কর্তৃপক্ষেও অব্যবস্থাপনা ও উদাসীনতার কারণে মিলটি আজ ধ্বংসের দ্বার প্রান্তে এসে দাঁড়িয়েছে। আমরা বিজেএমসির চেয়ারম্যানের পদত্যাগসহ বিজেএমসি বিলুপ্ত করার দাবি জানাচ্ছি। নরসিংদী ইউএমসি জুট মিল শ্রমিক সংগঠনের সভাপতি শফিকুল ইসলাম বলেন, সময়মতো পাট ক্রয় না করায় জুটমিল গুলোকে লোকসান গুণতে হচ্ছে। আর এর মাসুল গুণতে হচ্ছে শ্রমিকদের। আমরা অবিলম্বে সরকারকে পাটকল শ্রমিকদের প্রস্তাবিত মঞ্জুরি কমিশন বাস্তবায়ন, শ্রমিক-কর্মচারীদের বকেয়া মজুরিসহ ৯ দফা দাবি মেনে নেওয়ার আহ্বান জানাই। শ্রমিকদের ন্যায্য দাবি মেনে নাও: আন্দোলনরত পাটকল শ্রমিকদের সকল বকেয়া পাওনা পরিশোধের দাবি জানিয়েছে ‘শ্রমজীবী ও শিল্প রক্ষা আন্দোলন’-এর আহ্বায়ক বর্ষীয়ান শ্রমিকনেতা মনজুরুল আহসান খান এবং সদস্য সচিব শ্রমিকনেতা হারুনার রশীদ ভূঁইয়া আজ ১৬ মে ২০১৯, বৃহস্পতিবার এক বিবৃতিতে অবিলম্বে ন। নেতৃবৃন্দ ২৩টি রাষ্ট্রায়াত্ত পাটকলের শ্রমিকদের ৯ দফার আন্দোলনে দমন-পীড়ন বন্ধ করে শ্রমিকদের ন্যায্য দাবি মেনে নেওয়ার আহ্বান জানান। নেতৃবৃন্দ বলেন, পাটকলগুলোর আজকের সংকটের জন্য সরকারি নীতিই দায়ী। দেশের পাট শিল্পকে পরিকল্পিতভাবে ধ্বংস করা হয়েছে। নেতৃবৃন্দ বলেন, যারা দেশের স্বার্থ বিকিয়ে দিয়ে পাটশিল্পকে আজকের রুগ্ন দশায় ফেলেছে তাদের বিচারের কাঠগড়ায় দাঁড় করানো হবে। নেতৃবৃন্দ ২০১৫ সালে মজুরি কমিশন ঘোষিত পাটকল শ্রমিকদের জন্য মজুরি কাঠামো আজ অব্দি বাস্তবায়ন না হওয়ায় সরকারের তীব্র সমালোচনা করেন। তারা বলেন, দেশের শ্রমিক এবং অভিবাসী শ্রমিকদের কষ্টার্জিত অর্থ দিয়ে সরকার সমাজের একটি সুবিধাভোগী শ্রেণিকে লালন পালন করছে।

Print প্রিন্ট উপোযোগী ভার্সন



Login to comment..
New user? Register..