ধান ক্ষেত যখন পুড়ছিল সরকার তখন ‘ভাবছিল’

Facebook Twitter Google Digg Reddit LinkedIn StumbleUpon Email
একতা প্রতিবেদক : টাঙ্গাইলের কালিহাতী উপজেলার পাইকড়া ইউনিয়নের বানকিনা এলাকার কৃষক আব্দুল মালেক ধানের কম দাম ও শ্রমিক সংকটের প্রতিবাদে ধানক্ষেতে আগুন লাগিয়ে দিয়েছিলেন। সেই ঘটনা গণমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের কল্যাণে সারা দেশে ছড়িয়ে পড়ে। এরপর আরো এক-দুটি জায়গায় একই ধরনের প্রতিবাদ হয়েছে। তবু অবস্থার বিশেষ কোনো পরিবর্তন হয়নি। এর মধ্যে সরকার ধানের মূল্য নির্ধারণ করে দিয়েছে। প্রতিমণ ধান কৃষকের কাছ থেকে এক হাজার ৪০ টাকা দরে কিনবে বলে ঘোষণা দিয়েছে সরকার। কিন্তু এই দামে কৃষক ধান বিক্রি তো দূরের কথা, এর অর্ধেক দামে ধান বিক্রি করতে বাধ্য হচ্ছে কৃষক। সরকার অনেকটাই অসহায়ের মতো সময় পার করছে। সরকারের অসহায়ত্বের চিত্র ফুটে উটেছে খোদ কৃষিমন্ত্রী ড. আবদুর রজ্জাকের বক্তব্যের মধ্য দিয়ে। গত ১৬ মে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে কৃষিমন্ত্রী বলেন, ‘কৃষকরা যথাযথ দাম পাচ্ছেন না, ন্যায্য দাম পাচ্ছেন না। এটার জন্য সরকারের সর্বোচ্চ পর্যায় থেকে আমরা আলাপ করেছি। খুবই দুশ্চিন্তায় রয়েছি। এটা নিয়ে আমরা গভীরভাবে চিন্তাভাবনা করছি। কী কী পদক্ষেপ নিলে এ পরিস্থিতি মোকাবিলা করতে পারি এবং চাষির মুখে হাসি ফোটাতে পারি।’ মন্ত্রী আরো বলেন, ‘ইমিডিয়েটলি, ইনস্ট্যান্টলি এই সমস্যার সমাধান করা খুবই কঠিন। উৎপাদন যেটা দেখছি আমরা কিছু চাল রপ্তানি করব।’ তিনি বলেন, ‘যদি কোনো প্রাকৃতিক দুর্যোগ হয় আমরা বিদেশ থেকে এনে পরিস্থিতি মোকাবিলা করতে পারব।’ সরকার কৃষকের কাছ থেকে সরাসরি কেন ধান কিনছে না এমন প্রশ্নের জবাবে মন্ত্রী জানান, দীর্ঘদিনেও সরাসরি ধান কেনার কোনো পদ্ধতি চালু করা সম্ভব হয়নি। আর এবার আগেভাগে ধান-চাল কেনার উদ্যোগ নিলেও মিলাররা আগের আমন মৌসুমে বেশি চাল কিনে রাখায় সংগ্রহ অভিযান এখনো গতি পায়নি। আর সব মিলিয়ে ১০ লাখ টন ফসল কেনা সম্ভব, যা উৎপাদনের তুলনায় খুবই কম। কৃষিমন্ত্রী বলেন, ‘এত চাষি। কার কাছ থেকে কিনবেন? একজনের কাছ থেকে কিনবেন আর পাঁচজন দিতে চাইবে।’ তিনি বলেন, কোনো পদ্ধতি আমরা বের করতে পারছি না যে সরাসরি আমরা কীভাবে চাষির কাছ থেকে কিনব। কিনে তো মিলাররা। তাদের সমস্যা হয়েছে আগের চাল রয়ে গেছে। সরকারি হিসেবে ফলন হয়েছে তিন কোটি ৫০ লাখ টন। এই অতিরিক্ত ফলন কৃষকের মুখে হাসি ফোটাতে পারছে না। উল্টো বোঝা হয়ে দাঁড়িয়েছে। ধান কাটার জন্য শ্রমিক পাওয়া যাচ্ছে না। সবচেয়ে বড় সমস্যা, ধানের ন্যায্য দাম পাচ্ছে না কৃষক। কৃষকরা জানান, এবার প্রতি বিঘা বোরো চাষে ১২ হাজার টাকা খরচ হয়েছে। এক বিঘা জমিতে বীজ ও বীজতলা তৈরি বাবদ এক হাজার ১০০ টাকা, হালচাষ এক হাজার ২০০ টাকা, সেচ খরচ বাবদ ১ হাজার ২০০ টাকা, সার বাবদ এক হাজার টাকা, কীটনাশক বাবদ এক হাজার টাকা, পরিচর্যা বাবদ দুই হাজার টাকা ও ধান কাটা বাবদ চার হাজার ৫০০ টাকা খরচ হয়েছে। কৃষকরা জানান, ভালো ফলন হলে এক বিঘা জমিতে সাধারণত ১৬ থেকে ১৮ মণ ধান হয়ে থাকে। সে হিসেবে ৫০০ টাকা মণ হলে ১৮ মণ ধানের বিক্রি দাম হয় নয় হাজার টাকা। তাই প্রতি বিঘায় প্রায় তিন হাজার টাকা লোকসান গুনতে হচ্ছে তাদের। তবে সবচেয়ে বেশি লোকসানে পড়েছে বর্গা চাষিরা। উৎপাদিত ফসলের ভাগ জমির মালিককে দেয়ায় সবচেয়ে বেশি ক্ষতির মুখে পড়েছেন তারা। শ্রমিক সংকটে দৈনিক ৭০০ থেকে ৮০০ টাকা দিয়ে ধান কাটানো হচ্ছে। ধান কাটা বাবদ বাড়তি খরচ দিতে হচ্ছে শ্রমিকদের। তাই এবার অনেক লোকসান হচ্ছে। দিনাজপুরের চিরিরবন্দর উপজেলার কুতুবডাঙ্গার কৃষক শাহ রফিকুল ইসলাম বলেন, শ্রমিক সংকটের কারণে এবার এক বিঘা ধান কাটতে ব্যয় করতে হচ্ছে আট হাজার টাকা। এছাড়া মাড়াইয়ের জন্য রয়েছে আরো বাড়তি টাকা। অথচ ধানের দাম নেই। সরকার পর্যাপ্ত ধান ক্রয় না করায় কৃষকদের গুনতে হবে বড় আর্থিক ক্ষতি। তিনি বলেন, কৃষকদের বাঁচাতে সরকারকে এখনই পদক্ষেপ নিতে হবে। বোরো ধান যেন কৃষকের গলার কাটায় পরিণত হয়েছে। এভাবে চলতে থাকলে আগামীতে ধান উৎপাদন থেকে সরে আসবে কৃষক। একই জেলার ফুলবাড়ী উপজেলার কৃষক সেলিম আহমেদ বলেন, বোরো ধানের যে অবস্থা তাতে করে ভবিষ্যতে ধান আবাদ করা কষ্টকর হয়ে পড়বে। কেননা উৎপাদন করেও যদি ন্যায্যমূল্য পাওয়া না যায় তাহলে কৃষক কি জন্য মাথার ঘাম পায়ে ফেলে ধান উৎপাদন করবে। ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলার সরাইল উপজেলার অরুয়াইল গ্রামের কৃষক রমজান মিয়া বলেন, দিনমজুরকে প্রতিদিন বেতন দিতে হয় ৬০০ টাকা। এছাড়া তাকে আবার খোরাকি দিতে হয় অতিরিক্ত ২০০ টাকা। সবকিছু মিলিয়ে খরচ হয় প্রায় এক হাজার টাকা। উৎপাদন খরচ না উঠায় তার এক মণ ধানে লোকসান হচ্ছে প্রায় ৩০০ টাকা।

Print প্রিন্ট উপোযোগী ভার্সন



Login to comment..
New user? Register..