পানির চেয়েও কম দামে বেচতে হচ্ছে ধান

Facebook Twitter Google Digg Reddit LinkedIn StumbleUpon Email

লাভজনক দামে সরাসরি কৃষকের কাছ থেকে ধান কেনার দাবিতে রাজধানীতে বাংলাদেশ কৃষক সমিতির বিক্ষোভ [ ছবি: রতন দাস ]
একতা প্রতিবেদক : বাংলাদেশ কৃষক সমিতি ধানের লাভজনক দাম নিশ্চিত করতে সরকারের আন্তরিক পদক্ষেপ দাবি করেছে। গত ১৭ মে জাতীয় প্রেসক্লাবের সামনে এক বিক্ষোভ সমাবেশে এ দাবি জানানো হয়। সমাবেশ থেকে বক্তারা বলেছেন, আগে বলা হতো কৃষক পানির দামে ফসল বিক্রি করছে। এখন ১ কেজি ধানের দাম সাড়ে ১২ টাকা আর ১ লিটার পানির দাম ১৫ টাকা। কাজেই দেখা যাচ্ছে ফসলের দাম এখন পানির থেকেও কম। সমাবেশে সভাপতিত্ব করেন কৃষক সমিতির সভাপতি অ্যাড. এস এম এ সবুর। বক্তব্য রাখেন, কৃষক সমিতির সাধারণ সম্পাদক কাজী সাজ্জাদ জহির চন্দন, কেন্দ্রীয় কমিটির সহ-সভাপতি নুরুর রহমান সেলিম, সাংগঠনিক সম্পাদক জাহিদ হোসেন খান, কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য আলতাফ হোসেন, সুনামগঞ্জের কৃষকনেতা অধ্যাপক চিত্তরঞ্জন তালুকদার। সমাবেশে বক্তারা বলেন, কেবল ধান নয় এখন যাই উৎপাদন করে কৃষক তার দাম পায় না। ধানের সময় ধান, আলু, সবজি, গম, ভুট্টা, টমেটো প্রতিটি ফসল ঘরে ওঠার মৌসুমে এই দাম নিয়ে কৃষকের ক্ষোভ বিক্ষোভের কথা গণমাধ্যমে প্রকাশিত হয়। কিন্তু দেখা যায় তাৎক্ষণিক কিছু সরকারি আশ্বাস ছাড়া কার্যকর স্থায়ী কোনো পদক্ষেপ নেয়া হয় না। বক্তারা বলেন, কৃষিমন্ত্রী বলছেন ধানের দাম নিশ্চিত করতে বাধা হচ্ছে স্থানীয় রাজনৈতিক চক্র। আমরা জানি সেই চক্রের সদস্য কারা। সরকার এই চক্রকে চিনে কিন্তু তাদের উচ্ছেদ না করে নানাভাবে পৃষ্ঠপোষকতা করে। বক্তারা আরও বলেন, সরকার দাবি করে তারা প্রাইভেট খাতকে সবথেকে বেশি গুরুত্ব দেয়। কিন্তু বাংলাদেশের সর্ববৃহৎ প্রাইভেট খাত কৃষি নিয়ে প্রতিবছর যে চিত্র সারা বাংলায় দেখা যায় তার সাথে সরকারের ওই দাবির কোনো মিল খুঁজে পাওয়া যায় না। সরকার প্রাইভেট সেক্টর বলতে কেবল তৈরি পোশাক মালিক ও আমাদানিকারকদের সুবিধা দেওয়াকে সামনে তুলে আনে। বক্তারা বলেন, সরকার ধানের দাম ঠিক করে দিয়েছে, তাহলে কৃষকের দাম পাওয়ার ক্ষেত্রে কোনো সমস্যা থাকার কথা না। সরকার নির্ধারিত প্রতিমণ ধান ১,০৪০ টাকা কৃষকরা মেনে নিয়েছে। তাহলে তারা ৫০০-৬০০ টাকার মধ্যে ধান বিক্রি করতে বাধ্য হচ্ছে কেন? এই সমস্যাটি খুঁজে বের করে সমাধান করলেই ধানের দাম নিয়ে কৃষকের এই ভোগান্তির মুখোমুখি হতে হয় না। আসল সমস্যা হলো সরকারের লোকজন প্রতিটি সেক্টর থেকে নিজেদের পকেটে টাকা ভরতে চায়। যেটা কৃষিমন্ত্রীর বক্তব্য থেকেও বেরিয়ে এসেছে। যে ছাত্রনেতা সারাবছর পানি উন্নয়ন বোর্ডে ঠিকাদারি করে এই মৌসুম এলেই সে ধানের ব্যবসায়ী হয়ে যায়। যে যুবনেতা খাদ্য বিভাগে ঠিকাদারি করে এই মৌসুমে সে ধানের ব্যবসায়ী হয়ে কৃষকের পাওনা পেতে প্রতিবন্ধক হয়ে দাঁড়ায়। বক্তারা কৃষক ও ক্রয়কেন্দ্রের মধ্যের এই অশুভ শক্তির উপস্থিতি অপসারণের দাবি জানান। রংপুরের কৃষকনেতা আলতাফ হোসেন বলেন, কৃষির একমাত্র সমস্যা ধানের দাম নয়। কৃষি উপকরণের অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধি, ভেজাল উপকরণ গ্রামের কৃষিব্যবস্থাকে সংকটাপন্ন করে তুলেছে। আমরা প্রতিবছর এভাবে লোকসান দিতে থাকলে আমরা ধান চাষ ছেড়ে দিতে বাধ্য হব। হাওরের কৃষকনেতা চিত্তরঞ্জন তালুকদার বলেন, আমাদের পেটে ক্ষুধা। ঋণ করে যে ধান ফলিয়েছি সেই ধান কেটে এনে বাজারে বিক্রি করলে শ্রমিকের মজুরিও উঠে আসে না। এই ঝকমকে শহরে বসে সরকার অনুধাবন করতে পারছে না গ্রামের কৃষক কতটা সংকটে আছে। তাদের ভেতরে প্রতিনিয়ত যে ক্ষোভ দানা বাঁধছে তা বিস্ফোরিত হলে অনেক কিছুই তছনছ হয়ে যাবে। সমাবেশের আগে একটি বিক্ষোভ মিছিল রাজধানীর বিভিন্ন সড়ক প্রদক্ষিণ করে। ২৩ মে ঘেরাও, অবরোধ, বিক্ষোভ: বাজেটে কৃষিখাতে বরাদ্দ বৃদ্ধি, ধান ক্রয়ে লক্ষ্যমাত্রার পরিমাণ বৃদ্ধি, প্রতিটি ইউনিয়ন থেকে সরাসরি ধান কিনতে বিদ্যমান প্রতিবন্ধকতা দ্রুততার সাথে অপসারণ, প্রয়োজন অনুযায়ী খাদ্য গুদাম নির্মাণ, কৃষিঋণ আদায়ের জন্য কৃষকের নামে সার্টিফিকেট মামলা প্রত্যাহার ও গ্রেফতারি পরোয়ানা বন্ধের দাবিতে ২৩ মে জেলায় জেলায় ডিসি অফিস ঘেরাও, অবরোধ ও বিক্ষোভ সমাবেশের ডাক দিয়েছে বাংলাদেশ কৃষক সমিতি। গত ১৭ মে বেলা ১২টায় পুরানা পল্টনের মুক্তিভবনে বাংলাদেশ কৃষক সমিতির জাতীয় পরিষদের সভায় এ কর্মসূচি ঘোষণা করা হয়। কৃষক সমিতির সভাপতি অ্যাড. এস এম এ সবুরের সভাপতিত্বে সভায় কৃষক ও কৃষির সংকট নিয়ে লিখিত বক্তব্য উপস্থাপন করেন সংগঠনের সাধারণ সম্পাদক কাজী সাজ্জাদ জহির চন্দন। মাঠ পর্যায়ে ধানের দাম ও এই সংক্রান্ত পরিস্থিতি তুলে ধরেন সিরাজগঞ্জের ক্ষৃক নেতা ইসমাইল হোসেন, রংপুরের কৃষকনেতা আলতাফ হোসেন, সুনামগঞ্জের কৃষকনেতা অধ্যাপক চিত্তরঞ্জন তালুকদার, খুলনার এস এ রশিদ, বাগেরহাটের কাজী সেকেন্দার আলী, কিশোরগঞ্জের এনামুল হক ইদ্রিস, ময়মনসিংহের আবুল হাশেম, পটুয়াখালীর মোতালেব মোল্লা, চট্টগ্রামের মো. নবী, পুলক কুমার দাশ, বগুড়ার সন্তোষ পাল, মৌলভীবাজারের জহর লাল দত্ত, গাজীপুরের লীনা চক্রবর্তী, নোয়াখালীর নূর মোহাম্মদ, কুমিল্লা সুজাত আলী। বর্তমানে কৃষি ও কৃষক যেসব সংকট মোকাবেলা করছে তা নিরসনে একটি কার্যকর আন্দোলন গড়ে তোলার কৌশল ও কর্মসূচি নির্ধারণে এই সভায় দেশের প্রায় ৫০টি জেলা থেকে কৃষক আন্দোলনের নেতারা এই সভায় অংশগ্রহণ করে তাদের বক্তব্য তুলে ধরেন। বক্তারা বলেন, আমাদেরকে ধান, আলু, সবজির পাশাপাশি মৎস ও প্রাণিজ সম্পদের সমস্যাগুলো নিয়েও কথা বলতে হবে। দেশের বিভিন্ন জায়গায় আধিবাসীরা তাদের জমি থেকে উচ্ছেদ হচ্ছে। পল্লী বিদ্যুৎ ও ভূমি অফিসের দুর্নীতি অতীতের যে কোনো রেকর্ড ছাড়িয়েছে। সভায় বলা হয় সর্বগ্রাসী সংকটে নিমজ্জিত কৃষি রক্ষার জন্য টোটকা কোনো চিকিৎসায় কাজ হবে না। এখানে কৃষক ও ভোক্তার পরস্পর বিরোধী স্বার্থের মধ্যে সমন্বয় আনতে হবে। সেজন্য দরকার হলো কৃষির খরচ কমিয়ে আনা। সরকারি উদ্যোগে বীজ, সার, কীটনাশক সরবরাহ করে কৃষককে বহুজাতিক কোম্পানির বীজ বেনিয়াদের খপ্পর থেকে রক্ষা করতে হবে। বিএডিসি’র ৯ হাজার লোকবল থাকার কথা থাকলেও বর্তমানে ৪ হাজারের কম লোকবল নিয়ে বিএডিসি চলছে। সভায় বলা হয় সরকার তার গদি পাহাড়া দিতে বিভিন্ন বাহিনীর সদস্য বাড়াতে যতটা তৎপর বিএডিসি’র মতো প্রতিষ্ঠানের লোকবল বাড়াতে মোটেই আন্তরিক নয়। সরাসরি কৃষকের কাছ থেকে ধান কিনুন: দেশে কৃষকের উৎপাদিত ১ মণ ধানের মূল্য ১ কেজি গরুর মাংসের চাইতেও কম। কৃষক ফসল উৎপাদন করে লাভজনক মূল্য না পাওয়ায় সর্বশান্ত হয়ে পড়ছে। কৃষক তার উৎপাদিত ধান বিক্রয় করে তার উৎপাদন খরচ তুলে আনতে পারছে না, ফলে তার ঋণের বোঝা বাড়ছে এবং কৃষক আজ দিশেহারা হয়ে পড়েছে। মাঠের ধান কেটে গোলায় ভরার খরচও না ওঠায় বিক্ষুব্ধ কৃষক নিজের মাঠের ধানে আগুন দিচ্ছে। অথচ কৃষকের উৎপাদিত ধানের লাভজনক মূল্য কৃষক না পেলেও মধ্যসত্বভোগী ব্যবসায়ীরা উচ্চলাভের টাকায় আঙুল ফুলে কলা গাছ হচ্ছে। কৃষক-ক্ষেতমজুর সংগ্রাম পরিষদের সমন্বয়ক কাজী সাজ্জাদ জহির চন্দনসহ নেতৃবৃন্দ গত ১৪ মে এক বিবৃতিতে এসকল কথা বলেন। নেতৃবৃন্দ বিবৃতিতে আরও বলেন, সরকারের কার্যকরি উদ্যোগ ও সদিচ্ছার ঘাটতির কারণে আজ কৃষক আত্মঘাতি হয়ে উঠছে। কৃষকের ফসলের লাভজনক মূল্য নিশ্চিত করতে অবিলম্বে সরকারি রেটে সরাসরি কৃষকের কাছ থেকে ধান ক্রয় করতে হবে এবং ইউনিয়নে ইউনিয়নে ফসলের সরকারি ক্রয়কেন্দ্র নির্মাণ করতে হবে। সরকার ব্যবসায়িকদের লাভের স্বার্থরক্ষায় কৃষি উৎপাদন পণ্য ও কৃষি উৎপাদন যন্ত্রের মূল্য বৃদ্ধি করে এবং কৃষি পণ্যের বাজার ব্যবসায়ীদের নিয়ন্ত্রণে ছেড়ে দিয়ে রেখেছে। কিন্তু কৃষকের কাছ থেকে ধান ক্রয় করে কৃষকের লাভজনক মূল্য নিশ্চিত করছে না। কৃষক বাঁচলে ১৮ কোটি মানুষ বাঁচবে। কৃষকের উন্নয়ন ব্যতিরেকে বাংলাদেশের উন্নয়ন সম্ভব নয়। তাই অবিলম্বে কৃষকের ধানের লাভজনক মূল্য নিশ্চিত করতে হবে। নেতৃবৃন্দ বিবৃতিতে আরও বলেন, সরকার যদি কৃষকের ধানের লাভজনক মূল্য নিশ্চিত করতে ব্যর্থ হয় তবে কৃষকরা সংগঠিত হয়ে কৃষকের স্বার্থরক্ষায় ব্যর্থ সরকারের ব্যর্থ কৃষিনীতি পরিবর্তন করে দেবে।

Print প্রিন্ট উপোযোগী ভার্সন



Login to comment..
New user? Register..