ধান ক্ষেত জ্বলছে কৃষকের ক্ষোভের আগুনে

Facebook Twitter Google Digg Reddit LinkedIn StumbleUpon Email
মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম : কৃষকের এখন মরণের দশা! চরম হতাশা, দুঃখ, রাগ, ক্ষোভে সে আজ ছটফট করছে। দেশের বেশ কয়েকটি জায়গায় সে তার নিজের ক্ষেতের পাকা ধান নিজেই জ্বালিয়ে দিয়েছে। ছবিসহ সেসব খবর সামাজিক মাধ্যমে ‘ভাইরাল’ হয়েছে। প্রচার করা হচ্ছে যে, গ্রামাঞ্চলে এখন ধান কাটার জন্য ক্ষেতমজুর খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। খুঁজে পাওয়া গেলেও তাদের একেকজনকে দৈনিক একমণ ধানের দামের সমপরিমাণ টাকা মজুরি হিসেবে দিতে হচ্ছে। এতো দামে মজুর নিয়োগ করতে হওয়ার কারণেই নাকি কৃষক আজ বিপর্যয়ে পতিত হয়েছে। এটিই নাকি সর্বনাশের আসল কারণ। কিন্তু ক্ষেতমজুরের বর্তমান মজুরির উল্লিখিত হার কি আসলেই অতিরিক্ত ও অস্বাভাবিক? একমণ ধান বাজারে এখন ৫০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। এটিই যদি হয় একজন ক্ষেতমজুরের দৈনিক মজুরি তাহলে সেই হিসেবে তার মাসিক মজুরি দাঁড়ায় ১৫ হাজার টাকা। এই পরিমাণ হলো ‘জাতীয় নিম্নতম মজুরি’ হিসাবে উত্থাপিত দাবির (১৬ হাজার টাকা) চেয়ে কম। ধান কাটার কাজ হলো কঠিন পরিশ্রমের কাজ। সূর্য ওঠার আগে কাজ শুরু করে সন্ধ্যা পার করেও একজন ক্ষেতমজুরের দিনের কাজ শেষ হয় না। ১২/১৪ ঘণ্টা একটানা হাড়ভাঙ্গা পরিশ্রম করতে হয়। এসব বিবেচনায় মৌসুমের কয়েকটি দিন ক্ষেতমজুরের দৈনিক মজুরি ‘একমণ ধানের মূল্যের সমপরিমাণ’ হওয়াটিকে মোটেও ‘অস্বাভাবিক’ অথবা ‘অতিরিক্ত’ বলা যায় না। বছরের বেশিরভাগ সময় ক্ষেতমজুরকে নামমাত্র মজুরিতে, এমনটি অনেকটা পেটে-ভাতে কাজ করার জন্য পাওয়া যায়। কিন্তু ধান কাটার মৌসুমে তাদেরকে সেরকম ‘পানির দামে’ পাওয়া যায় না। ক্ষেতমজুরকে ‘পানির দামে’ কাজ করাতে না পারাকেই কি তাহলে কৃষকের দুর্দশার কারণ বলে বিবেচনা করতে হবে? এই বিবেচনা কি মানবিক, যুক্তিসংগত ও গ্রহণযোগ্য হতে পারে? একথা অনুধাবন করা প্রয়োজন যে, একজন ক্ষেতমজুর বছরে গড়ে ১২০ দিন মৌসুমি কাজ পায়। বাকি ২৪৫ দিন তাকে হয় বেকার অথবা আধা-বেকার থাকতে হয়। অধিকাংশ দিনই তাকে পেটে-ভাতে কাজ করে টিকে থাকতে হয়। ১২০ দিনের মজুরি দিয়ে ৩৬৫ দিন তাকে তার পুরো সংসারটি চালাতে হয়। তাই স্বল্পকালীন কাজের-মৌসুমে তাকে, অতিরিক্ত ও অমানবিক পরিশ্রম করে হলেও, কিছুটা বেশি মজুরি আয় করতে পারার জন্য পাগল হয়ে উঠতে হয়। ন্যূনতম জীবনী শক্তি নিয়ে কোনোরকমে টিকে থাকার জন্য তাকে তা করতে হয়। ক্ষেতমজুরের এই ‘জীবন-বাস্তবতা’ বুর্জোয়া চেতনাধারী মধ্যবিত্ত সমাজের ‘পণ্ডিতদের’ পক্ষে বুঝে ওঠা সম্ভব হয় না। সাম্রাজ্যবাদী বহুজাতিক বৃহৎ পুঁজির শোষণে গোটা জাতি আজ শোষিত। সেই চাপ এসে পড়ে দেশীয় বুর্জোয়াদের ওপর। সেই চাপকে তারা তাদের চেয়ে নিচে থাকা কৃষকের কাঁধে স্থানান্তর (ঝযরভঃ) করতে স্বক্ষম হয়। আর, সেই চাপকে কৃষক তার কাঁধ থেকে কিছুটা পরিমাণে হলেও স্থানান্তর করতে স্বক্ষম হয় তার থেকে আরো নিচে থাকা ক্ষেতমজুরের ওপর। কিন্তু ক্ষেতমজুরদের ক্ষেত্রে তাদের ওপর নেমে আসা সেই চাপকে স্থানান্তর করার জন্য তার চেয়ে আরো নিচে আর কেউ নেই। বলা যায় যে, ‘ভর্তার নিচে যেমন তরকারি নেই, নেংটির নিচে যেমন কাপড় নেই– তেমনি ক্ষেতমজুরের নিচে মানুষ নেই’। শোষণের বোঝার বেশিরভাগটিই শেষ পর্যন্ত তাই ক্ষেতমজুর-শ্রমিকদের ওপরে এসে বর্তায়। ক্ষেতমজুরের পেটে আরো একটু বেশি জোরে লাথি মারার সুযোগ আর নেই। তারা এমনিতেই চিড়া-চ্যাপটা হয়ে আছে। তাই বাস্তব কথা হলো, কৃষকের দুর্দশার কারণ অন্যত্র। সেটি কী, তা খুঁজে বের করতে হবে। নিচে থেকে আসা ক্ষেতমজুরদের চাপ নয়, বরঞ্চ উপরে থেকে আসা দেশি-বিদেশি লুটেরাদের চাপই হলো কৃষকের দুর্গতির আসল কারণ। কৃষকের দুর্গতির আসল কারণ তাই হলো দেশে বর্তমানে বিদ্যমান ‘পুঁজিবাদী ব্যবস্থা’। ক্ষেতমজুরের অতিরিক্ত(!) মজুরি তার আসল কারণ নয়। পুঁজিবাদী বাজার ব্যবস্থার বৈশিষ্ট্যই হলো এমন যে, কৃষককে সবসময় ‘বেশি দামে কিনতে হয়’ এবং ‘কম দামে বেচতে হয়’। এ কারণেই তাকে ক্রমাগত নিঃস্ব থেকে নিঃস্বতর হয়ে পড়তে হয়। কৃষকের সমস্যা-সংকটের সমাধান তাই নিহিত রয়েছে ‘পুঁজিবাদী ব্যবস্থার’ অবসান ঘটাতে পারার ওপর। এই মৌলিক কর্তব্য থেকে দৃষ্টি অন্যদিকে ঘুরিয়ে দেয়ার উদ্দেশ্যেই পুঁজিবাদপন্থিরা ‘ক্ষেতমজুররা বেশি মজুরি নেয়’ বলে অযৌক্তিক প্রচারণায় লিপ্ত হয়েছে। কৃষক ও ক্ষেতমজুর যেন তাদের উভয়ের উপর পরিচালিত শোষণ-বঞ্চনার বিরুদ্ধে এক হয়ে সংগ্রাম করার বদলে, উল্টো পরস্পরের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে নিজেদের শক্তি ক্ষয় করে, এই উদ্দেশ্যেই তারা এটি করছে। দেশের একজন মন্ত্রী বলেছেন যে, এবার ফলন এতো বেশি হওয়ার কারণে ধানের মূল্য ‘পানির দামের’ পরিমাণের ঊর্ধ্বে বাড়ানো যাচ্ছে না। এটি ‘বাজারের’ ব্যাপার। বাজারের হাল-চাল নিয়ে সরকারের কিছুই করার নেই। তা আছে কি নেই তা নিয়ে আলোচনা করার আগে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রীর কাছে প্রশ্ন উৎপাদন বেশি হওয়ার কারণে বর্তমানে কৃষককে যদি ২৭ টাকা কেজি দরে নতুন চাল বেচতে হয়, তাহলে ভোক্তা-বাজারে চালের দাম ৪০ টাকা থেকে যায় কেন? পুঁজিবাদী বাজার ব্যবস্থার চরিত্র ও বৈশিষ্ট্যই হলো এমন যে তা কৃষককে সবসময়ই ‘ক্রেতা’ হিসেবেও ঠকায়, আবার ‘বিক্রেতা’ হিসেবেও ঠকায়। এ যেন ‘শাঁখের করাত’– আসতেও কাটে, যেতেও কাটে। এর নিচে পড়লে নিস্তার নেই। কৃষককে যেসব উৎপাদনসমাগ্রী ও দৈনন্দিন ব্যবহার্য জিনিসপত্র কিনতে হয় সেসবের দাম যে হারে বাড়ে, তার চেয়ে অনেক কম হারে বাড়ে তার উৎপাদিত ফসলের দাম। তদুপরি, ফসল বিক্রির আয় দিয়ে ফসল উৎপাদনের খরচ সে পুষিয়ে নিতে পারে না। ফলে ‘লোকসান’ তার নিত্যসঙ্গী হয়ে থাকে। অনেকে যুক্তি হাজির করেন যে, কৃষকের স্বার্থেই চালের দাম বাড়া উচিৎ। অতএব, ‘চাল-ডাল-তেলের দাম বৃদ্ধি করা চলবে না’ দাবিটি হলো কৃষক-স্বার্থবিরোধী। এটি একটি চরম প্রতারণামূলক যুক্তি(!)। লক্ষ্যণীয় যে, এসব ‘যুক্তিবাদীরা’ ‘চালের’ দাম বৃদ্ধি করার জন্য সুপারিশ করলেও, ‘ধানের’ দাম বাড়ানোর জন্য তাদের মুখে টুঁ শব্দটিও শোনা যায় না। এর কারণ, ‘চালের’ বিক্রেতা হলো ব্যাপারীরা আর ‘ধানের’ বিক্রেতা হলো কৃষক। কৃষককে বঞ্চিত করে ব্যাপারীদের স্বার্থ রক্ষার্থেই তারা এসব বিভ্রান্তিকর যুক্তি(!) হাজির করে। ফসলের লেনদেনের ক্ষেত্রে আসলে দু’টি পৃথক সমান্তরাল বাজার রয়েছে। একটি হলো ‘উৎপাদকের বাজার’, আর অপরটি হলো ‘ভোক্তার বাজার’। ‘ভোক্তার বাজারে’ দাম বাড়লেই যে ‘উৎপাদকের বাজারে’ একই হারে দাম বাড়বে, তা সত্য নয়। পৃথক এই দু’টি বাজারের মধ্যে সামঞ্জস্য স্থাপনের কোনো ক্ষমতা ‘মুক্ত বাজারের’ নেই। সাধারণ অভিজ্ঞতা হলো এই যে, যে দামে কৃষক চাল, সবজি ইত্যাদি পণ্য ‘উৎপাদকের বাজারে’ বিক্রি করে, ভোক্তা সাধারণকে সেই পণ্যই ‘ভোক্তা বাজারে’ দ্বিগুণ দামে কিনতে হয়। তিন দশকেরও বেশি সময় আগে জাতিসংঘের ‘খাদ্য ও কৃষি সংস্থা’ FAO (Food and Agricultural Organization)-এর এক বিশেষ বিশ্ব সম্মেলনে গৃহীত একটি ঐতিহাসিক সিদ্ধান্তে বলা হয়েছিল যে, ‘চূড়ান্ত ভোক্তা কোনো কৃষি পণ্য যে দামে কিনবে, সেই পণ্যের প্রাথমিক উৎপাদক যেন কমপক্ষে তার ৭৫ শতাংশ মূল্য পায় তা নিশ্চিত করতে হবে।’ এ সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন তো দূরের কথা, সে সিদ্ধান্তের বিষয়টি সরকার আজ পরিপূর্ণভাবে ভুলে বসে আছে। এবার বোরো মৌসুমে বাম্পার ফলন হয়েছে। প্রায় সব বিশেষজ্ঞরা হিসেব করে দেখিয়েছেন যে প্রতি মণ ধানে কৃষকের ন্যূনতম ২০০ টাকা লোকসান হচ্ছে। দেখা যাচ্ছে যে এক বিঘা জমিতে বোরো ধান আবাদ করতে জমি লিজ নেয়া, বীজ কেনা, জমি চাষ, মই দেয়া, ধান রোপন, সার প্রয়োগ, পানি খরচ, কিটনাশক প্রয়োগ, ফসল কাটা ও উঠানো–ইত্যাদির জন্য কৃষকের মোট খরচ হয় ১৬,৬৬৫ টাকা। ১ বিঘা জমিতে গড়ে ২২ মণ ধান উৎপাদন হয়। অর্থাৎ, মণ প্রতি উৎপাদন খরচ পড়ে কমপক্ষে ৭৫৭ টাকা। সেই ১ মণ ধান এখন কৃষক বাজারে বিক্রি করে পাচ্ছে মাত্র ৫০০-৫৫০ টাকা। অর্থাৎ তার লোকসান হচ্ছে মণপ্রতি ২০০ টাকারও বেশি। আমাদের দেশে ৪৮ লক্ষ হেক্টর জমিতে বোরো ধানের আবাদ হয়ে থাকে। হেক্টর প্রতি উৎপাদন হয় প্রায় ৪ টন। সে হিসেবে অনুমান করা যায় যে, সারা দেশে এবার প্রায় ২ কোটি টন অর্থাৎ ৫ কোটি মণ বোরো ধান উৎপন্ন হয়েছে। প্রতি মণে ২০০ টাকা লোকসান হয়েছে বলে হিসেব করলে, বোরো চাষীদের মোট লোকসানের পরিমাণ দাঁড়ায় ১ হাজার কোটি টাকা। এটি কেবল এক বছরে, এবার এবং একটি মাত্র ফসলে, কৃষকের লোকসানের হিসাব। যারা নিতান্তই গরিব কৃষক, তারাই সংখ্যায় বেশি। তারা নানাভাবে দায়গ্রস্ত থাকায় অথবা জমে থাকা জরুরি কোনো ব্যয় নির্বাহের জন্য ক্যাশ টাকার প্রয়োজনে তাদের ফসলের একটি অংশ তারা ফসল ওঠার সাথে সাথে দ্রুত বাজারজাত করতে বাধ্য হচ্ছে। গরিবের এই ধানে বাজার ভরে ওঠার সাথে সাথে ধানের দাম পড়ে গেছে। সে দামেই গরিবকে তার ‘রক্তে বোনা ধান’ বেচে দিতে হচ্ছে। কিন্তু ধনী কৃষক ও বড় জোতদারদের সংসারে সে ধরনের অভাব না থাকায় তারা তাদের বিপুল উদ্বৃত্ত ধান উঠতি বাজারের কমতি দামে বিক্রি না করে পরবর্তীতে দাম চড়া হলে তখন তা বিক্রি করবে বলে ধরে রাখতে পারছে। ক্ষুদে উৎপাদকরাই দেশের সিংহভাগ ‘ধান’ উৎপাদন করে থাকে। কিন্তু সাধারণ ভোক্তারা ‘ধান’ কেনেন না। তারা কেনেন ‘চাল’। তাই, কৃষকরা ভোক্তাদের কাছে তাদের ক্ষেতের ধান সরাসরি বিক্রি করতে পারেন না। ভোক্তাদের কাছে বাজারজাত করার আগে প্রথমে তাদেরকে কেটে আনা ধানকে চালে প্রক্রিয়াকরণ করতে হয়। এই প্রক্রিয়াকরণ কাজটি বিচ্ছিন্নভাবে ক্ষুদে আকারে করা তুলনামূলক ব্যয়বহুল। ঢেকি এখন প্রায় অচল হয়ে পড়েছে। ধানকে চালে রূপান্তর করার জন্য তাদেরকে তাই বিত্তবান ও মুনাফা শিকারী ব্যক্তিগত মালিকানাধীন ‘রাইস মিলের’ কাছে ‘পানির দামে’ তাদের ধান বিক্রি করে দেয়া ছাড়া অন্য কোনো উপায় থাকে না। ক্ষুদে উৎপাদকরা অনেকজন মিলে যদি সমবায়ের ভিত্তিতে আধা-যান্ত্রিক রাইস মিল স্থাপন করার সুযোগ পেত, তাহলে তারা ধানকে চালে পরিণত করার প্রক্রিয়ার অংশীদার হতে সক্ষম হতো। সরকারি মালিকানায় আধুনিক রাইস মিল থাকলে তাতেও ক্ষুদে উৎপাদকরা, তার ওপর তাদের গণতান্ত্রিক নিয়ন্ত্রণ আরোপ করে, কিছু সুবিধা পেতে পারত। কিন্তু সে ধরনের অর্থনৈতিক-সামাজিক ব্যবস্থা না থাকায় বিশাল এই ক্ষুদে উৎপাদক শ্রেণিকে এবারও রাইস মিলের বিত্তবান মালিকদের উপর নির্ভরশীল হয়ে থাকতে হচ্ছে। তাদের কাছেই ‘পানির দামে’ ধান বেঁচে দিতে হবে। এ অবস্থা অনেকটুকু নিরসন করা যেত যদি সরকার খোদ উৎপাদনকারী- কৃষকের কাছ থেকে সরাসরি ধান (চাল নয়, ধান!) কেনার ব্যবস্থা করতো। সেজন্য যদি লাভজনক দাম (উৎপাদন খরচের ১০ শতাংশ বেশি) নির্ধারণ করে দিত। ওয়ার্ডে-ওয়ার্ডে না হলেও অন্তত ইউনিয়নে-ইউনিয়নে যদি ‘সরকারি ধান ক্রয় কেন্দ্র’ স্থাপন করে, কোনোরকম কারসাজি বা ‘কমিশন’ খাওয়া-চাঁদাবাজি ব্যতিরেকে, মৌসুমের গোড়া থেকেই ধান কেনা শুরুর ব্যবস্থা নিশ্চিত করতো। কিন্তু সরকার ২৫ লক্ষ মণ (১০ লক্ষ টন) চাল কেনার ঘোষণা দিলেও মাত্র ৩ লক্ষ ৭৫ হাজার মণ (১.৫ লক্ষ টন) ধান কেনা হবে বলে জানিয়েছে। উৎপাদিত ৫ কোটি মণ (২ কোটি টন) ধানের মধ্যে এটি একটি অতি ক্ষুব্ধ অংশ মাত্র। এসব কারণে সরকারি ‘চাল ক্রয় কার্যক্রমের’ প্রত্যক্ষ সুবিধার সবটাই ক্ষুদে কৃষকের বদলে পাবে বিত্তবান রাইস মিল মালিকরা। এভাবে, দেশের বাজারজাত চালের সরবরাহ ও বাজার নিয়ন্ত্রণের ক্ষমতা খোদ কৃষকের হাত থেকে স্থানান্তরিত হয়ে তুলনামূলকভাবে মুষ্টিমেয় সংখ্যক রাইস মিল মালিকদের হাতে কেন্দ্রীভূত হয়ে পড়েছে। এই কেন্দ্রীভবন আরেক দফা ঘটবে বিপণন ব্যবস্থাপনার স্তরে। বেপারি, আড়তদার, মোকাম মালিকরা চালের কেনা-বেচার ব্যবসায়িক বাজারের নিয়ন্ত্রক হয়ে আছেন। ‘বিশুদ্ধ প্রতিযোগিতাকে’ বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে, গড়ে তুলেছেন চালের বাজারের একচেটিয়া-কারবারি গোষ্ঠী। দেশের কোটি-কোটি ক্রেতা আজ তাদের এসব মুনাফালোভী ও গণবিরোধী মহল দ্বারা ‘নিয়ন্ত্রিত বাজার’ ও ‘সিন্ডিকেট ব্যবসার’ কাছে জিম্মি হয়ে রয়েছে। কৃষকের বঞ্চনার অবসান ঘটাতে হলে তাই প্রয়োজন কৃষিব্যবস্থা ও গ্রাম-জীবনের আমূল বিপ্লবী পুনর্গঠন। একটি পূর্ণাঙ্গ সমাজবিপ্লব ব্যতীত কৃষকের বঞ্চনার অবসান হবে না। কিন্তু তার আগেও কিছু কিছু ক্ষেত্রে কৃষকের কল্যাণে নানা পদক্ষেপ গ্রহণ করা সম্ভব। তবে এসব অর্জন সম্ভব করে তোলার জন্যও প্রয়োজন শক্তিশালী কৃষক আন্দোলন। কৃষক তার মাথার ঘাম পায়ে ফেলে যে সম্পদ সৃষ্টি করে তার ন্যায্যমূল্য প্রাপ্তি নিশ্চিত করতে নিম্নলিখিত কয়েকটি ব্যবস্থা নেয়া যেতে পারে: (১) সরকারের উদ্যোগে প্রতিটি ইউনিয়নে ‘ক্রয় কেন্দ্র’ স্থাপন করে লাভজনক দামে সরাসরি কৃষকের নিকট থেকে কিংবা তাদের সমবায়ের নিকট থেকে শস্যসহ কৃষি সামগ্রী ক্রয় করা। (২) সরকারিভাবে ‘ধান’ ক্রয় করতে হবে এবং ক্রয়ের পরিমাণ কয়েকগুণ বৃদ্ধি করা। (৩) ‘আদ্রতা’, ‘মান’ ইত্যাদি অজুহাতে প্রতারণা বন্ধ করা। (৪) চূড়ান্ত ভোক্তা যে দামে কৃষি পণ্য কিনে, খোদ উৎপাদককে তার ৭৫ শতাংশ মূল্য প্রাপ্তি নিশ্চিত করা। (৫) রাইস মিলগুলোর মালিকানায় মেহনতি কৃষকের অংশীদারিত্ব নিশ্চিত করা এবং কৃষক সমবায়ের উদ্যোগে রাইস মিল প্রতিষ্ঠায় উৎসাহ ও সহায়তা প্রদান করা। (৬) সরকারের উদ্যোগে পর্যাপ্ত সংখ্যক আধুনিক রাইস মিল স্থাপন করা। (৭) খোদ মেহনতি কৃষকদেরকে নিয়ে ‘উৎপাদক সমবায়’ এবং ভোক্তাদের নিয়ে ‘ভোক্তা সমবায়’ গড়ে তোলা। দুই প্রান্তের এই দুই সমবায়ের মধ্যে সরাসরি কৃষি পণ্য বেচা-কেনার ব্যবস্থা করা। (৮) উৎপাদক-কৃষকদের নাম রেজিস্ট্রেশন করে তাদেরকে কৃষক-আইডি কার্ড প্রদান করা। রাষ্ট্রের উদ্যোগে, প্রয়োজনে ভর্তুকি দিয়ে তাদেরকে স্বল্পমূল্যে কৃষি উপকরণসমূহ সরবরাহের ব্যবস্থা করা। (৯) গ্রামের গরিব মানুষের সাংসারিক ব্যয় সীমার মধ্যে রাখার জন্য রেশনিংসহ গণবণ্টন ব্যবস্থা চালু করা। নাকের কাছের এসব জরুরি ‘মিশন’-এর দিকে দৃষ্টি না দিয়ে যতই শুধু দূরের ‘ভিশন’ নিয়ে হৈচৈ করা হোক না কেন, কৃষকের দুর্দশা তাতে মোটেও দূর হবে না। আশি বছর আগে মহাকবি আল্লামা ইকবালের লেখা কবিতার সেই কথাগুলো মনে রাখতে হবে। তিনি লিখে গেছেন– “যে দেশের ক্ষেতে পায় না চাষিরা পেটের ক্ষুধায় অন্ন সে দেশের প্রতিটি শস্যকণায় আগুন লাগিয়ে দাও।” গ্রামাঞ্চলের পরিস্থিত আজ তেমনই ধরনের অগ্নিগর্ভ হয়ে আছে!

Print প্রিন্ট উপোযোগী ভার্সন



Login to comment..
New user? Register..