সুবর্ণচরে তরমুজের ফলন বিপর্যয়

Facebook Twitter Google Digg Reddit LinkedIn StumbleUpon Email
নোয়াখালী সংবাদদাতা : সদ্য শেষ হওয়া মৌসুমে ১২ একর জমিতে তরমুজ আবাদ করেছিলেন নোয়াখালীর সুবর্ণচরের দক্ষিণ কচ্ছপিয়া গ্রামের কৃষক জাহাঙ্গীর আলম। বীজ, সার ও কীটনাশক বাবদ এতে তার খরচ হয়েছিল ৫ লাখ ৮০ হাজার টাকা। এর মধ্যে এনজিওসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান থেকে ঋণ নিয়েছিলেন ২ লাখ ৯০ হাজার টাকা। চড়া সুদে ঋণ নিয়েছিলেন স্থানীয় মহাজনের কাছ থেকেও। কিন্তু উৎপাদন শেষে এ কৃষক মাত্র ১ লাখ ৩০ হাজার টাকার তরমুজ বিক্রি করতে পেরেছেন। ফলে লাভ তো দূরের কথা, ফলন বিপর্যয়ের কারণে এবার তিনি উৎপাদন খরচের অর্ধেকও তুলতে পারেননি। দিশেহারা হয়ে পড়েছেন ঋণ পরিশোধের দুশ্চিন্তায়। জাহাঙ্গীর আলমের মতো এবার সুবর্ণচরে তরমুজ চাষে লোকসানে পড়েছেন ১৬ হাজারের বেশি কৃষক। তাদের সবাই ব্যাংক, এনজিও ও সমিতিসহ প্রায় অর্ধশত সংস্থা থেকে কমবেশি ঋণ নিয়েছেন। অনেকে ঋণ করেছেন ৫০ হাজার থেকে ৭ লাখ টাকা পর্যন্ত। এসব ঋণপ্রদানকারী সংস্থার মধ্যে গ্রামীণ ব্যাংক, ইসলামী ব্যাংক, এনজিও প্রতিষ্ঠান ব্র্যাক, আশা, এনআরডিএস, এসডি, দ্বীপ উন্নয়ন সংস্থা ও সাগরিকা অন্যতম। এছাড়া রয়েছে চড়া সুদে ঋণপ্রদানকারী স্থানীয় মহাজনরাও। কৃষকদের দাবি, ফলন বিপর্যয়ের কারণে এখন তাদের ঋণ পরিশোধের উপায় নেই। এ পরিস্থিতিতে শঙ্কা দেখা দিয়েছে আসন্ন মৌসুমের আমন আবাদ নিয়েও। অনেকেই ঋণ পরিশোধের চাপে রীতিমতো পালিয়ে বেড়াচ্ছেন। সংশ্লিষ্টরা জানান, এক দশকেরও বেশি সময় ধরে সুবর্ণচরের কৃষকরা অন্য ফসলের পাশাপাশি তরমুজ চাষ করছেন। স্বল্পসময়ে বেশি লাভের পাশাপাশি সহজ বাজারজাতের সুবিধার কারণে তারা তরমুজ চাষে আগ্রহী হয়ে ওঠেন। এর মধ্যে গত বছর এ অঞ্চলের কিছু তরমুজ ক্ষেতে ছত্রাক, ব্যাকটেরিয়া ও ভাইরাসজনিত রোগ দেখা দেয়। তবে এবার ব্যাপকভাবে এ রোগ ছড়িয়ে পড়ায় কৃষকরা আবাদকৃত তরমুজের সিকিভাগও তুলতে পারেননি। উপজেলার পূর্ব চরবাটা গ্রামের ছানা উল্যাহ বলেন, এবার তিনি সাত একর জমিতে তরমুজ চাষ করেছেন। এতে তার খরচ হয়েছে ৩ লাখ টাকার মতো। এর বিপরীতে মাত্র ১ লাখ ৩০ হাজার টাকার তরমুজ বিক্রি করে তার লোকসান হয়েছে ১ লাখ ৭০ হাজার টাকা। এখন বাজারে গেলেই কীটনাশক ও সার ব্যবসায়ীরা ঋণ পরিশোধের তাড়া দিচ্ছেন। প্রতি সপ্তাহে বাড়ি আসছেন ঋণপ্রদানকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর মাঠকর্মীরা। উপায় না দেখে অধিকাংশ সময়ই তাকে এদের কাছ থেকে পালিয়ে বেড়াতে হচ্ছে। এরই মধ্যে তার গ্রামের চার-পাঁচজন কৃষক তরমুজ বিক্রির জন্য চট্টগ্রাম যাওয়ার নাম করে পালিয়ে গেছেন। কৃষি বিভাগ বলছে, উপজেলায় এবার তরমুজ আবাদ হয় ৯ হাজার ২৫০ হেক্টর। আবাদের সঙ্গে জড়িত ১৬ হাজার থেকে ১৬ হাজার ৫০০ কৃষক। তবে তাদের কাছে ক্ষতিগ্রস্ত কিংবা ঋণগ্রস্ত কৃষককের হিসাব নেই। কিন্তু স্থানীয় এনজিওসহ অর্থলগ্নিকারী অর্ধশত সংস্থা এ বছর তরমুজ চাষিদের মৌসুমী ঋণ বিতরণ করেছে। এসব সংস্থার হিসাবমতে, তরমুজ চাষে প্রতি হেক্টরে একজন কৃষকের অন্তত ১ লাখ টাকা খরচ হয়। ফলন বিপর্যয়ের কারণে এবার এ অঞ্চলের কৃষকরা মারাত্মক ক্ষতির সম্মুখীন হয়েছেন। এবার তাদের উৎপাদন খরচই উঠছে না। অথচ কাঙ্খিত ফলন হলে তরমুজের বিক্রি ২৫০ কোটি টাকা ছাড়িয়ে যেত। ঋণের বিষয়ে জানতে চাইলে এনজিও সাগরিকা সমাজ উন্নয়ন সংস্থার নির্বাহী পরিচালক সাইফুল ইসলাম সুমন বলেন, এ বছর সুবর্ণচরে তরমুজে ব্যাপক ফলন বিপর্যয় হয়েছে। যে কারণে প্রায় সব কৃষকই কম-বেশি ঋণগ্রস্ত হয়েছেন। সরকারি দাতা সংস্থা পিকেএসএফের অর্থায়নে সংস্থাটি এর মধ্যে শুধু তারাই প্রায় দুই হাজার কৃষকের মধ্যে ৫ কোটি টাকার ঋণ বিতরণ করেছে। এখন সরকারিভাবে ক্ষতিগ্রস্তদের তালিকা তৈরি করার পাশাপাশি ফলন বিপর্যয়কে দুর্যোগ হিসেবে ঘোষণা করলে কৃষকদের পুনরায় স্বল্পসুদে ঋণ সুবিধা দেয়া যেতে পারে। এ বিষয়ে তারা পিকেএসএফ কর্তৃপক্ষকে অনুরোধ করবেন। এদিকে ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকের কোনো পরিসংখ্যান না থাকার কথা স্বীকার করেছেন জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক ড. আবুল হোসেন। তিনি বলেন, ক্ষতিগ্রস্তদের আর্থিক সহযোগিতা দেয়ার কোনো সুযোগ তাদের নেই। তবে সরেজমিন পরিদর্শন করে ক্ষতির বিষয়টি খতিয়ে দেখে আগামী মৌসুমে কৃষক চাইলে বীজ সহায়তা দেয়ার সুযোগ রয়েছে।

Print প্রিন্ট উপোযোগী ভার্সন



Login to comment..
New user? Register..