প্রথম শোনা গেল মঙ্গলে মার্শকোয়েক

Facebook Twitter Google Digg Reddit LinkedIn StumbleUpon Email

একতা বিজ্ঞান ডেস্ক : মঙ্গলের অন্দর (কোর) থেকে এই প্রথম শোনা গেল গোঙানির আওয়াজ। যার নাম- ‘মার্শকোয়েক’। শুধু শব্দ নয় থরথর করে কেঁপে উঠল মঙ্গল। দফায় দফায় সেই আওয়াজ শোনা গেল চার দিন। যা অনুভব করার জন্য প্রায় ৫০ বছর ধরে অপেক্ষায় বসেছিলেন বিজ্ঞানীরা। যার ফলে বোঝা গেল এখনও পুরোপুরি মরে যায়নি লাল গ্রহ। বদলাচ্ছে তার গঠন, বদলাচ্ছে তার অন্দর। ভূমিকম্পে যেমন থরথর করে কেঁপে ওঠে পৃথিবী এই প্রথম দেখা গেল ঠিক তেমনটাই ঘটে মঙ্গলেও। যার জেরে মঙ্গলের অন্দরের সেই আওয়াজ শুনল নাসার পাঠানো মহাকাশযান ‘ইনসাইট’-এর ল্যান্ডারে থাকা ‘সিসমিক এক্সপেরিমেন্ট ফর ইন্টিরিয়র স্ট্রাকচার’ (সিস) যন্ত্রটি। যা আদতে একটি ফরাসি যন্ত্র। ‘সিস’ রেকর্ড করে সেই শব্দ পাঠিয়েও দিয়েছে গ্রাউন্ড স্টেশনে। তার পর সেই শব্দকে আমাদের শ্রবণযোগ্য করে তোলা হয়েছে। নাসার তরফে জানানো হয়েছে, মোটামুটি ভালভাবে তা শোনা গিয়েছে গত ৬ এপ্রিল। তবে তার আগে, পরে আরও তিন দিন ওই শব্দ শুনেছে সিস। যদিও তা খুবই নীচু স্বরে। গত ১৪ মার্চ, ১০ এপ্রিল এবং ১১ এপ্রিলে। মঙ্গলে নাসার ল্যান্ডার ইনসাইট পা ছোঁয়ানোর ১২৮তম দিনে ঘটেছে এই ঘটনা। যা পৃথিবীর সাড়ে ১২৫ দিনের সমান। কারণ, পৃথিবীর দিন-রাতের আয়ু যতটা, মঙ্গলের দিন-রাতের আয়ুও প্রায় ততটাই। ঘণ্টার হিসেবে তাই মঙ্গলের একটি দিন (দিন ও রাত মিলে) আমাদের চেয়ে সামান্য একটু বড়। তার দৈর্ঘ্য ২৪ ঘণ্টা ৩৭ মিনিট থেকে ২৪ ঘণ্টা ৩৯ মিনিটের মধ্যে। এটাকেই বলে ‘সল’। ওয়াশিংটনে নাসার সদর দফতর থেকে মিশন অপারেশনসের সায়েন্স অপারেশন ওয়ার্কিং গ্রুপের চেয়ার জ্যোতির্বিজ্ঞানী অমিতাভ ঘোষ লিখেছেন, ‘এটা একটা অসাধারণ সাফল্য। অভূতপূর্ব। এই প্রথম মঙ্গলের কম্পন ধরা পড়ল আমাদের কোনো যন্ত্রে। লাল গ্রহের অন্দরে এখনও কী কী ঘটে চলেছে, তা জানাতে এই ঘটনা খুবই সাহায্য করবে। কম্পন যেহেতু তরঙ্গই, তাই তা আরও ছড়াবে। আর তা যত ছড়াবে, ততই আমাদের পক্ষে মঙ্গল। কারণ, এই ধরনের কম্পনের ঘটনা আরও বাড়বে। আমাদের পাঠানো সিস যন্ত্রটি আরও ভাল ভাবে শুনতে পারবে লাল গ্রহের অন্দরের সেই গোঙানি। আর সেই সব খতিয়ে দেখেই আমরা জানতে পারব. মঙ্গলের একেবারে ভিতরটা (কোর) কোন কোন পদার্থ দিয়ে গড়া, সেগুলি রয়েছে কী কী অবস্থায়, সেটা কতটা পুরু, সব কিছুই। জানতে পারব লাল গ্রহের ম্যান্টলটা কেমন? তা কোন কোন পদার্থ দিয়ে তৈরি? জানতে পারব, কোন ধরনের পরিবর্তন এখনও হয়ে চলেছে মঙ্গলের সেই ভিতরটার ঠিক উপরে থাকা স্তরটির মধ্যে (ক্রাস্ট, যা মঙ্গলের পিঠ পর্যন্ত বিস্তৃত)। কত দিন আগে শেষ কম্পন অনুভূত হয়েছিল মঙ্গলের অন্দরে? তা কত বার হয়েছে লাল গ্রহের জন্মের পর থেকে? জানতে পারব, কীভাবে মঙ্গল গ্রহের জন্ম হয়েছিল? আর কী ভাবেই বা তার কোর, ম্যান্টল আর ক্রাস্টটা তৈরি হয়েছিল?’ ইন্ডিয়ান সেন্টার ফর স্পেস ফিজিক্স (আইসিএসপি)-এর অধিকর্তা সন্দীপ চক্রবর্তী বলছেন, ‘মঙ্গলের কোরের তাপমাত্রা দেড় হাজার ডিগ্রি সেলসিয়াসেরও বেশি। যে তাপমাত্রায় লোহা বা ইস্পাতের মতো ধাতু বা ধাতব পদার্থ গলে না ঠিকই, কিন্তু তা শিলা, পাথর গলিয়ে দেওয়ার পক্ষে যথেষ্টই। ফলে, পৃথিবীর কোরে যেমন রয়েছে লোহার গনগনে ¯্রাোত, লাল গ্রহের অন্দরটাও তেমনই। তার উপর রয়েছে মঙ্গলের ক্রাস্ট। কোরের সেই গনগনে ¯্রােতের জন্য ক্রাস্টের ওঠা-নামা হচ্ছে। সেগুলি এ-দিক, ও-দিকে সরে যাচ্ছে। তাদের সংকোচন হচ্ছে। ফলে, নড়াচড়া হচ্ছে মঙ্গলের পিঠের ঠিক নীচেই। যার ফলে সৃষ্টি এই আওয়াজের। পাসাডেনায় নাসার জেট প্রোপালসান ল্যাবরেটরির (জেপিএল) বিশিষ্ট বিজ্ঞানী- প্রযুক্তিবিদ গৌতম চট্টোপাধ্যায় জানান, পৃথিবীর ভূমি-কম্পনের সাথে এর তফাৎ রয়েছে। পৃথিবীতে ভূকম্পনের জন্য দায়ী থাকে বিভিন্ন টেকনোটনিক প্লেটের মধ্যে ধাক্কাধাক্কি। সেই ধাক্কাধাক্কিতে একটি প্লেট চলে যায় অন্য প্লেটের নীচে। তার ফলে কোনো কোনো এলাকায় তৈরি হয় ফাটল বা চ্যূতি। আর সেই ফাটল ধরেই কোরে জন্মানো শক্তি বাইরে বেরিয়ে আসতে চায়। তখনই হয় ভূকম্পন। আর পৃথিবীর ম্যান্টলে থাকা অসম্ভব গরম পদার্থের তরল ¯্রােত উপরে উঠে আসে আগ্নেয়গিরির উদ্গীরণের সময়। কিন্তু মঙ্গলে কোনো টেকনোটনিক প্লেট নেই। সেখানে ক্রাস্টের বালিকণার নড়াচড়ার ফলেই তৈরি হয় কম্পন। এটাই মার্সকোয়েক। সন্দীপ জানান, লাল গ্রহের এই কম্পনে জানা যাবে জন্মের পর নিজের কক্ষপথে কতটা জোরে ঘুরতো লাল গ্রহ। কারণ, প্রতিটি ভূকম্পন হলে যেমন দিন-রাতের আয়ু একটু একটু করে কমে পৃথিবীতে, একই ঘটনা ঘটে মঙ্গলেও। তা ছাড়া, যে কোনো কম্পনেই সংকোচন হয়। ফলে, বার বার ভূকম্পনে মঙ্গলও আগের চেয়ে আকারে ছোট হয়েছে কি না, হলে তা কতটা এ বার সেটাও জানার রাস্তাটা খুলে গেল।

Print প্রিন্ট উপোযোগী ভার্সন



Login to comment..
New user? Register..