দেখা মিলল উজ্জলতম পালসারের

Facebook Twitter Google Digg Reddit LinkedIn StumbleUpon Email

একতা বিজ্ঞান ডেস্ক : হাজার হাজার আলোর উজ্জলতম ‘ঝাড়বাতি’র খোঁজ মিলল মহাকাশে। জ্যোতির্বিজ্ঞানের পরিভাষায় এই ‘মহাজাগতিক ঝাড়বাতি’কে বলে ‘পালসার’। এত উজ্জ্বল ‘পালসার’ এর আগে আর দেখা যায়নি এই মহাবিশ্বের আর কোথাও। ‘হাজার বাতির আলো’য় তা রীতিমতো ঝকঝকে আলো ছড়াচ্ছে মহাকাশে। আর তার খোঁজ মিলল এই মহাবিশ্বের প্রথম পালসার আবিষ্কারের (১৯৬৭) ঠিক ৫০ বছরের মাথায়। এক সেকেন্ডে যতটা আলো উগরোয় এই ‘মহাজাগতিক পালসার, সেই পরিমাণ আলো আর শক্তি আমাদের সূর্য উগরোয় পাক্কা সাড়ে তিনটি বছর ধরে। পালসারটি নাম- ‘এনজিসি-৫৯০৭-ইউএলএক্স’। খুব সম্প্রতি নাসার ‘নিউস্টার’ (‘নিউক্লিয়ার স্পেকট্রোস্কোপিক টেলিস্কোপ অ্যারে’) টেলিস্কোপের চোখেই ধরা পড়েছে এই হাজার আলোর পালসারটা। ইউরোপিয়ান স্পেস এজেন্সির (ইএসএ বা ‘এসা’) ‘এক্সএমএম-নিউটন’ উপগ্রহের চোখেও ধরা পড়েছে এই পালসারটি। এই পালসারটি রয়েছে আমাদের থেকে ৫০ লক্ষ আলোকবর্ষ দূরে। তার মানে, পৃথিবীতে মানুষ বা তার আদিপুরুষের জন্মের আগেই জন্ম হয়েছিল এই বিরল পালসারটির। যা আদতে একটি নিউট্রন স্টারও বটে। এই সাড়াজাগানো গবেষণাপত্রটি প্রকাশিত হয়েছে আন্তর্জাতিক বিজ্ঞান-জার্নাল ‘সায়েন্স’-এ। ‘এসা’র উপগ্রহের পাঠানো তথ্য বিশ্লেষণের পর সংশ্লিষ্ট আরও একটি গবেষণাপত্র প্রকাশিত হয়েছে আন্তর্জাতিক বিজ্ঞান-জার্নাল ‘অ্যাস্ট্রোফিজিক্যাল জার্নাল লেটার্স’-এ। মূল গবেষক ইতালির ‘আইএনএএফ-অসারভেটরিও অ্যাস্ট্রোনমিক্যা দ্য রোমা’-র জ্যোতির্বিজ্ঞানী গিয়ান লুকা ইজরায়েল লিখেছেন, ‘সূর্যের মতো কোনো নক্ষত্র বা তারা মৃত্যুপথযাত্রী হলে তাদের দু’রকম অবস্থা হতে পারে। হয় তারা বন্ট্যাক হোল হয়ে যায়। আর তা না হলে তারা হয়ে পড়ে নিউট্রন স্টার বা নিউট্রন নক্ষত্র। পালসার তেমনই একটি নিউট্রন নক্ষত্র। যার চারপাশের চৌম্বক ক্ষেত্রটি অসম্ভব রকমের জোরালো। আর সেই নিউট্রন নক্ষত্রটা একেবারে লাট্টুর মতো বনবন করে ঘুরছে। পালসার থেকে আলোর বিকিরণ বেরিয়ে আসে দু’টি তীব্র উজ্জ্বল আলোর স্রোতে। অনেকটা ধূমকেতুর পুচ্ছের মতো তা ছড়িয়ে পড়ে মহাকাশে।’ সান ডিয়েগো সহযোগী গবেষক, জন্স হপকিন্স বিশ্ববিদ্যালয়ের জ্যোতির্বিজ্ঞান বিভাগের অ্যাসোসিয়েট প্রফেসর মি. বন্দ্যোপাধ্যায় বলেছেন, ‘এই পালসারটির আবিষ্কার মহাবিশ্বের উজ্জ্বলতম পালসারের ইতিহাসে একটি নতুন রেকর্ড গড়ল। এর আগে মহাবিশ্বের উজ্জ্বলতম পালসারটি ছিল ‘এম-৮২-এক্স-২’। যা রয়েছে আমাদের থেকে অনেক অনেক দূরে, এক কোটি ২০ লক্ষ আলোকবর্ষ দূরত্বে। আর সেটি রয়েছে ‘সিগার গ্যালাক্সি’- ‘মেসিয়ার-৮২’-তে। সদ্য আবিষ্কৃত পালসারটি আগেরটির চেয়ে ১০ গুণ বেশি উজ্জ্বল। শুধু তাই নয়, কোনও নিউট্রন নক্ষত্রের ঔজ্জ্বল্য যতটা হতে পারে বলে এত দিন মনে করতেন জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা, এই সদ্য আবিষ্কৃত পালসারটির ঔজ্জ্বল্য তার অন্তত ১ হাজার গুণ। এই আবিষ্কার আমাদের পালসার ও নিউট্রন নক্ষত্র সম্পর্কে যাবতীয় ধ্যানধারণা বদলে দিয়েছে। এমনকী, দশটা সূর্য শেষ হয়ে গিয়ে যে বন্ট্যাক হোল তৈরি করে, তার অ্যাক্রিশন ডিস্ক থেকে যতটা আলো ঠিকরে বেরিয়ে আসে, এই পালসারের ঔজ্জ্বল্যতা তার ১০ গুণেরও বেশি। তবে এত ঔজ্জ্বল্য কী ভাবে পেল ওই সদ্য আবিষ্কৃত পালসারটি, তা আমরা এখনও বুঝে উঠতে পারছি না। এটা আমাদের কাছে এখনও রহস্যাবৃতই রয়ে গিয়েছে। কেউ কেউ বলেন, ওই পালসারের চৌম্বক ক্ষেত্রটি অসম্ভব রকমের জোরালো। নিউট্রন নক্ষত্রের জোরালো অভিকর্ষ বলের টানে যে মহাজাগতিক বস্তুগুলি ধেয়ে আসছে ওই নক্ষত্রটির দিকে, নক্ষত্রের অসম্ভব জোরালো চৌম্বক ক্ষেত্র তাকে মহাকাশে নানা দিকে ছড়িয়ে ছিটিয়ে দিচ্ছে।’ পালসার আবিষ্কারের ৫০ বছরের মাথায় ঘটল আরও একটি বিরলতম ঘটনা। চলতি বছরের গোড়ায় হদিশ মিলল মহাবিশ্বের প্রথম কোনও ‘হোয়াইট ডোয়ার্ফ পালসার’-এর। যার নাম- ‘এআর-স্করপি’। যা রয়েছে আমাদের থেকে ৩৮০ আলোকবর্ষ দূরে। ‘স্করপিয়াস’ নক্ষত্রপুঞ্জে। যে সাদা বামন নক্ষত্রটি থেকে এই পালসারটির জন্ম, তার আকার আমাদের পৃথিবীর মতো হলেও ভরে তা আমাদের গ্রহের প্রায় ২ লক্ষ গুণ বেশি। সাড়ে তিন ঘণ্টায় ওই পালসারটি পাক মারছে তার ঠাণ্ডা নক্ষত্রটিকে। গবেষণাপত্রটি প্রকাশিত হয়েছে ‘নেচার-অ্যাস্ট্রোনমি’ জার্নালে।

Print প্রিন্ট উপোযোগী ভার্সন



Login to comment..
New user? Register..