আত্মশিক্ষা প্রসঙ্গে

Facebook Twitter Google Digg Reddit LinkedIn StumbleUpon Email
কাজী রিতা : আত্মশিক্ষা একটি কথাই মনে করিয়ে দেয়, তা হচ্ছে নিজের শিক্ষা, আত্ম উপলব্ধি। আত্মশিক্ষা তখনই সফল হবে, যখন সাধারণ মানুষের জানা হবে যে, কিভাবে এবং কোন বিষয়ে জ্ঞান অর্জন করতে হবে। নাদেজদা ক্রুপস্কায়ার বই “শিক্ষাদীক্ষা”র একটি অংশ হলো আত্মশিক্ষা। এ বইটি লেখা হয়েছিল সেভিয়েত রাশিয়ায় যখন সমাজতান্ত্রিক ব্যবস্থা নির্মাণের চেষ্টা চলছিল, সে সময়ের শ্রমিক-কৃষক-শিক্ষার্থীদের জন্য। কিন্তু এই আত্মশিক্ষা বইটি পড়ে মনে হয়েছে এখন আমরা যে ধরনের বিশৃঙ্খলভাবে জ্ঞান অর্জনের চেষ্টা করে থাকি, তার চেয়ে সঠিকভাবে জ্ঞান অর্জন করে তা সচেতনভাবে কাজে লাগানোর এবং জনসাধারণের উপকারে প্রয়োগের সুশৃঙ্খল পরিকল্পনা পাওয়া যায় এই বইটিতে। আমি বিশৃঙ্খলভাবে বলেছি তার একটা উদাহরণ দেয়া যেতে পারে, আমরা অনেক সময় বই পড়ে থাকি এখান থেকে এক খাবলা, ওখান থেকে এক খাবলা, পুরো অর্থ বুঝতে চেষ্টা করি না এবং ভাসা ভাসা মন্তব্য করি পুরোপুরি অর্থ না বুঝে। আমরা অনেকেই সঠিক নির্দেশনার অভাবে বই পড়তে বা জ্ঞান অর্জন কিভাবে করতে হয় জানি না, আমাদের জন্য সহায়ক হতে পারে ক্রুপস্কায়ারের বইটি। বেশিরভাগ সময় দেখা যায়, কী ভাবে শুরু করবো, কেমন করে পড়তে হবে, কিছুই আমাদের অনেকের জানা নেই। বইপড়ার জন্য যে প্রাথমিক অভ্যাসগুলোর প্রয়োজন তাও আমাদের নেই। এর ফলে দেখা যায় এমন বই পড়ে ফেলি যেটির কিছুই বুঝতে পারি না। আমরা অনেকেই যে কাজটি করি তা হচ্ছে, আয়ত্ত করার জন্য প্রয়োজনীয় দক্ষতা না থাকলেও শুরুতেই মার্কস, লেনিনের বই পড়ি। ফলে শেখা হয় কিছু কথা, কিছু স্লোগান, কিন্তু যার আসল মানে বুঝতে পারি না, নিজের বাস্তবতার সাথে সেই বাস্তবতাকে মিলিয়ে দেখতে পারি না। এই পৃথিবীর বিশাল জ্ঞানভাণ্ডার থেকে যা প্রয়োজন, তা গ্রহণ করতে হবে। এই জ্ঞান নিজের জীবনে, প্রকৃতিতে কাজে লাগতে পারে, সমাজের পরিবর্তন ঘটাতে পারে। যে কোনো বিষয় আয়ত্ত করার ব্যাপারে বই হলো মূল উপকরণ। বর্তমান ঘটনাবলি বুঝতে হলে পুঁজিবাদী ব্যবস্থা, তার গঠন, পুঁজিবাদী মতাদর্শের বিষয়েও অধ্যয়ন করতে হবে। মানবসমাজ বুঝতে হলে সামাজিক বিকাশের নিয়মগুলো অনুধাবন করতে হবে। একইভাবে আদিম সমাজ, পুঁজিবাদী সমাজ, জীবন জগৎ, প্রকৃতি বিজ্ঞান, যার যে বিষয়ে ভালো লাগে তাকে সে বিষয়গুলো চর্চা করতে হবে। লোকের মুখের কথা বিশ্বাস করলে চলবে না, নিজের অনুভব করতে হবে। আমরা সাধারণত সমসাময়িক ঘটনা বা বিষয় জানতে চাই, কৌতুহল বোধ করি। আমাদের তাই পড়া উচিত খবরের কাগজ। খবরের কাগজ জানার পরিধি বাড়িয়ে তোলে ও সমস্যা বিশ্লেষণে সাহায্য করে। খবরের কাগজের সাথে সাথে উপযুক্ত সাহিত্যও পড়া দরকার। “বইকে আমাদের কাস্তে হাতুড়ির কাজে লাগাতে হবে”- (এই কথাটি নাদেজদা ক্রুপস্কায়ার লেখা “শিক্ষাদীক্ষা” বইয়ের আত্মশিক্ষা অংশ থেকে নেয়া হয়েছে)। বই আমাদের এমনভাবে পড়া উচিত যেন কাজের ক্ষেত্রে সহায়ক হয়। বইয়ের কাজ হলো জ্ঞান আহরণে সাহায্য করা, আরো উৎপাদনশীল করে তোলা। এমন বই দিয়ে আমাদের পড়া শুরু করা উচিত যা সহজে বুঝতে পারা যায়। যে বিষয় নিয়ে আমার কোন আগ্রহ নেই, সে বিষয়ের বই মনে কোনো সাড়া জাগাবে না। আগ্রহের ফলে মনোযোগের জন্ম হয়, মনোযোগ যে কোনও কিছু মনে রাখার জন্য দরকার। তাই বইপড়ার অভ্যাস গড়ে তোলা প্রয়োজন এবং যে বই ভালো লাগে, সে বই পড়তে হবে। বইতে ক্রুপস্কায়া তাই লিখেছেন-“আগ্রহের ফলে স্বেচ্ছাপ্রণোদিত মনোযোগের জন্ম, মনোযোগ আবার হল মনে রাখার পক্ষে অত্যন্ত প্রয়োজনীয়।” “শিক্ষাদীক্ষা” বইয়ের আত্মশিক্ষা অংশ থেকে নেয়া হয়েছে। বই পড়তে হলে কিভাবে বা কোন পদ্ধতিতে পড়া উচিত, তা নিয়ে আলোচনা করা যাক। বইয়ের যে অংশগুলো বুঝতে পারি, আর যে অংশগুলো বুঝতে পারি না তা চিহ্নিত করে রাখতে পারি। যে অংশগুলো বুঝতে পারি না, তা বিশ্লেষণ করা শিখতে হবে এবং একাধিকবার পড়তে হবে, নতুন শব্দ নতুন চিন্তা থাকলে তা লিখে রাখতে হবে। যে সব মন্তব্য বা কথা ভালো লাগলো, তা লিখে রাখা উচিত। কোন কিছু পড়ার সময় মোটেও তাড়াহুড়ো করা উচিত হবে না। আত্মশিক্ষায় তাড়াহুড়ো খুবই ক্ষতিকর। এই অভ্যাস এমনভাবে করতে হবে যেন সময় নষ্ট না হয়। ছোট ছোট লেখা দিয়ে শুরু করতে হবে। বইপড়া ছাড়াও নতুন জায়গা, নতুন মানুষের চিন্তা জানতে চেষ্টা করা উচিত। মানুষের জীবন থেকেও জ্ঞান আহরণ করা যেতে পারে। তবে প্রথমে ঠিক করে নিতে হবে জীবনে কী করতে চাই, কেন করতে চাই? জীবনের লক্ষ্য ঠিক করা জরুরি। আরো ভালো হয় আমরা যদি যৌথভাবে কাজ করতে পারি, তাহলে আরো বেশি সুফল পাওয়া সম্ভব। এই সব কিছু করার জন্য সময়ের ব্যবহার খুবই গুরুত্বপূর্ণ। যেটুকু সময় পাওয়া যায়, তার যথার্থ ব্যবহার করতে হবে। আমরা কি আমাদের সময়ের সঠিক ব্যবহার করি? হয়ত আমাদের দপ্তর বা প্রোগ্রামের কাজ সময়মত করি, বাকী সময়টা হয় কাটিয়ে দিই বন্ধুদের সাথে আড্ডা দিয়ে, না হয় রাত জেগে ফেসবুক চালিয়ে, হয়ত তখন মনে হলো সারাদিন বৃথা গেল, বইপড়া যাক। কিন্তু তখন শরীর ক্লান্ত, পড়াটা আর হয়ে উঠে না। পরের দিন দেরি করে ঘুম থেকে উঠে সকালের সময়টাও নষ্ট করে ফেলি। আমরা কৃষকদের কাছ থেকে শিক্ষা নিতে পারি, তারা কাজে সময়ের কোনও অবহেলা করেন না, কখন জমিতে লাঙল দিতে হবে, কখন বীজ রোপন করতে হবে, বীজ রোপনের আগের সকল কাজ তারা উপযুক্ত সময় অনুসারে করেন, কোনও অবহেলা বা সময় নষ্ট করলে ফসল ঘরে আসবে না এটা কৃষক ভালো করেই জানেন। ছাত্রদের জীবনযাত্রায়ও সময় ও শ্রমের সঠিক ব্যবহার অতি জরুরি। সময়ের সঠিক ব্যবহার করতে হলে কাজকে ঠিকভাবে ভাগ করে নিতে হবে। যে সকল জিনিস কাজের জন্য ক্ষতিকর, তা সরিয়ে ফেলে কাজের গতিশীলতা তৈরি বরতে হবে। কখন কী করতে হবে তার রুটিন তৈরি করে ফেলতে হবে। আমরা আমাদের আশেপাশে তাকালেই দেখবো, একজন কৃষক, শ্রমিক, ডাক্তার, সাহিত্যিক, বিজ্ঞানী তাদের প্রতিটি কাজ রুটিন অনুযায়ী করেন। এমন হাজার রকম উদাহরণ দেয়া যাবে- বিখ্যাত সুইস অস্ত্রচিকিৎসাবিদ এমিল থিওডোর কোচের বৃদ্ধ বয়স পর্যন্ত প্রতিদিন নির্ধারিত কাজ রুটিন অনুযায়ী করতেন। একই সময় শুতে যেতেন, ব্যায়াম করতেন। লেভ তলস্তয়ের কথা যদি বলা হয়, গল্প উপন্যাস লেখা সম্পূর্ণ মেজাজের উপর নির্ভর করে, কিন্তু তার সময় ছিল বাধা একবার যা লিখতেন তা বার বার ঠিক করে নিতেন এবং লিখতেন। এই রকম হাজার দৃষ্টান্ত দেয়া যাবে, যারা নিজেদের জীবনে সময় ও শ্রমের সঠিক ব্যবহার করেছেন এবং সফলতা অর্জন করেছেন। সফলতা অর্জন করার জন্য সময় বাঁচিয়ে শ্রমের সঠিক ব্যবহার করতে হবে। কাজের জন্য সুন্দর পরিবেশ তৈরি করতে হবে, অনেক কারণে মন খারাপ হতে পারে, যেসব কারণে কাজে ব্যাঘাত ঘটাতে পারে তা সরিয়ে ফেলা দরকার। নিজের পরিকল্পনা অনুযায়ী কাজ সম্পন্ন করতে হবে। অনেক সময়ই দেখা যায় বই পড়ছি কিন্তু আমাদের মাথায় অন্য কোনো চিন্তা-ভাবনা খেলা করছে। তখন আর কোনো কিছুই বুঝতে পারা যাবে না এবং যা পড়ছি তার কিছুই মনে থাকবে না, পড়ার সময় যথাসম্ভব পড়াশোনায় ডুবে যেতে হবে। আমাদের প্রত্যেকেরই সুশৃঙ্খলবদ্ধ জ্ঞানচর্চার মাধ্যমে নিজেকে আত্মশিক্ষায় শিক্ষিত করে তুলতে হবে, নিজের ব্যক্তি জীবন এবং সমাজ পরিবর্তনের কাজের পরিকল্পনা করে সামনের সকল বাধা ভেঙে এগিয়ে যেতে হবে। সুভাষচন্দ্র বসুর একটি উক্তি দিয়ে শেষ করতে চাই- ‘‘আমরা যে সমস্ত বিষয় শিখিয়াছি তাহার অনেকটা ভুলিতে হইবে এবং যাহা আমাদিগকে শিখানো হয় নাই এমন অনেক বিষয় আমাদিগকে সর্বপ্রথম শিক্ষা করিতে হইবে।’’

Print প্রিন্ট উপোযোগী ভার্সন



Login to comment..
New user? Register..