কমরেড এ. এস. এম. মানিক লাল সালাম

Facebook Twitter Google Digg Reddit LinkedIn StumbleUpon Email

মিজানুর রহমান সেলিম : কমিউনিস্ট নেতা কমরেড এ. এস. এম. মানিক তাঁর শোষণমুক্ত দেশ গড়ার স্বপ্ন অসমাপ্ত রেখে গত ২ মে ২০১৯ খ্রিষ্টাব্দে আমাদের সবাইকে ছেড়ে চলে গেলেন। তাঁর মৃত্যুর সংবাদ আমাদের বিশ্বাস করতে কষ্ট হচ্ছিল। কারণ সবশেষ ছাত্রদের একটি বিষয় নিয়ে পার্টি অফিসে বৈঠকেও মানিক ভাই অত্যন্ত মনোযোগী ও দৃঢ় ছিলেন; তিনি এ বৈঠকে বলেছেন- “যে কোনও সমস্যার সমাধান তৎক্ষণাৎ হওয়াই ভাল, দেরিতে বিষয়টি গুলিয়ে যায়, এটা ভেবেই শরীরটা খারাপ হলেও হেঁটে হেঁটে অফিসে এসেছি।” এটাই ছিল আমাদের সাথে মানিক ভাইয়ের শেষ কথা। আগের দিন ছিল মহান মে দিবস। পার্টির উদ্যোগে আয়োজিত বরিশাল জেল গেট ইলিশ চত্বরের সভায় মাথায় কাপড় বেঁধে কোমড়ে হাত রেখে বক্তৃতা দিয়েছেন মানিক ভাই। বক্তৃতায় কমরেড মানিক শ্রমিক কৃষক মেহনতি মানুষের জীবনের দুঃখ-দুর্দশা ও লাঞ্ছনার কথা তুলে ধরলেন এবং মেহনতি মানুষের মুক্তির পথ শোষণমুক্ত সমাজতান্ত্রিক সমাজ প্রতিষ্ঠার লড়াইয়ে শ্রমজীবী মানুষকে শামিল হওয়ার আহ্বান জানালেন। এ সময়ে আমাদের সমাবেশের সামনে দিয়ে হাতি ঘোড়া সাজিয়ে মালিকপক্ষের অর্থ সহায়তায় লাল টুপি–লাল গেঞ্জি পড়ে অসংখ্য শ্রমজীবী মানুষের একটি মিছিল যাচ্ছিল এবং শ্লোগান দিচ্ছিল- ‘মালিক শ্রমিক ভাই ভাই, উৎপাদন বৃদ্ধি চাই’। এ শ্লোগান শুনে বক্তৃতার মধ্যে মানিক ভাই বললেন, এতো সর্বনাশ! নিজেদের পায়ে কুড়াল মারা। ৩৬৪ দিন যে মালিক শ্রমিকদের ওপর শোষণ, নিপীড়ন এবং অমানবিক নির্যাতন চালায় সেই মালিকের পৃষ্ঠপোষকতায় একদিনের হাতি ঘোড়া ও লাল টুপির উৎসবতো উৎসব নয়। এতো শ্রমিক আন্দোলনকে বিভ্রান্তির ফাঁদে ফেলে মুক্তির পথকে ভুলিয়ে দেয়া। না না এটা কোনক্রমেই মানা যায় না। আমাদেরকে অবশ্যই শ্রমিক শ্রেণিকে বিভ্রান্তির ভুল পথ থেকে সরিয়ে এনে একটি বিপ্লবী ধারার শ্রমিক আন্দোলন গড়ে তুলতে হবে। প্রচণ্ড রোদের মধ্যে কমরেড মানিক এ বক্তৃতাগুলো দিচ্ছিলেন। আমাদের সকলের চোখের সামনে এখনও সে ছবিটি ভাসছে। আমাদের ছাত্র বন্ধুরা সে ছবিটি ফেজবুকেও ছড়িয়ে দিয়েছিলেন। এ সময় পার্টি ও পার্টির বাইরে অসংখ্য মানুষ তার হঠাৎ মৃত্যু খবর বিশ্বাস করতে পারছিলেন না। বার বার ফোনে ঘটনার সত্যতা জানার জন্য উদগ্রীব হয়ে ফোন করতে থাকেন। এখনতো মানিক ভাই ছাড়া পার্টি অফিস শূন্য মনে হয়। প্রতিদিন পার্টি অফিসের দপ্তরের সকল কাজ তিনিই করতেন। পুরো অফিস, ফাইলের কাজ, হিসাব-নিকাশ, খরচের ভাউচার আদায়ে তাগিদ দেয়া, পার্টির ব্যানার, পতাকা, লিফলেট, পোস্টার, একতা পত্রিকা কাঠের ফোল্ডারে গুছিয়ে রাখা যেন তাঁর একারই কাজ ছিল। তিনি মনপ্রাণ দিয়ে এ কাজগুলো করতেন। পার্টির ডায়েরি ধরে ধরে কমিউনিস্ট আন্দোলনের ঐতিহাসিক দিবস পালন, বিপ্লবীদের স্মরণসভা, আলোচনা সভা আয়োজনের উদ্যোগ তিনিই নিতেন এবং বলতেন এসব কর্মকাণ্ডে পার্টির কর্মীরা জীবন্ত থাকে। এগুলো পালন করাও আন্দোলন সংগ্রামের মতো জরুরি। সবার শেষে পার্টি অফিসের কাগজপত্র পত্রিকা গুছিয়ে আলমিরা বন্ধ করে লাইট নিভিয়ে গেটে তালা দিয়ে হেঁটে হেঁটে বাসায় যেতেন। এটা তার নিত্যদিনের কাজ ছিল। এখন তার অভাব আমরা প্রচ-ভাবে অনুভব করছি। ছয় ভাইবোনের মধ্যে কমরেড মানিক বড়। বাবা সমাজ সচেতন একজন ব্যবসায়ী ছিলেন। ১৯৫৫ সালে বরিশাল শহরের আমানতগঞ্জে তাঁদের নিজ বাড়িতে জন্মগ্রহণ করেন। প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষা বরিশাল শহরেই সম্পন্ন হয়। উচ্চ মাধ্যমিক পর্যায়ে লেখাপড়া শেষ করে প্রথমে ছোটখাটো ব্যবসা পরে বিএডিসি’র চাকরিতে যোগ দেন। কর্মক্ষেত্রে তিনি সকলের কাছে অত্যন্ত বিশ্বস্ত ছিলেন। সদালাপি আত্মপ্রচার বিমুখ মানুষটি সকলের হৃদয়ে স্থান করে নিয়েছেন সহজেই। ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ এবং স্বাধীন বাংলাদেশের অভ্যুদয়ে আলোড়িত মানিক ভাই ১৯৭২ সালের ডিসেম্বর মাসে বরিশালের জাসদ নেতা অ্যাড. জহিরুল ইসলাম পান্নার সংস্পর্শে এসে জাসদের রাজনীতিতে যুক্ত হন। এ সময় তাঁর সাথে জে কে মুকুল ও রাজ্জাক ভুইয়া জাসদ করতেন। তাঁরা তিনজনই জাসদের রাজনীতিতে সক্রিয় ভূমিকা রেখেছেন। সে সময় মানিক ভাই তার নিকট আত্মীয়ের একটি মেশিনারি পার্টস এর দোকানে বসতেন। বরিশালের কমিউনিস্ট পার্টির তৎকালীন এক শীর্ষ নেতা ঐ দোকানে যেতেন। তখন তাদের দু’জনের মধ্যে রাজনীতির নানা বিষয়ে তর্কবিতর্ক চলতো। যুক্তিতর্কের প্রতি আস্থাবান মানিক ভাই ১৯৮১ সালে বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির মতাদর্শ, রাজনৈতিক লাইন ও কর্মসূচির প্রতি বিশ্বাস স্থাপন করে কমিউনিস্ট পার্টির রাজনীতিতে যুক্ত হন। জে কে মুকুল এবং আঃ রাজ্জাক ভূইয়াও এসময় কমিউনিস্ট পার্টিতে যোগ দেন। পরবর্তীতে এরশাদ স্বৈরাচার বিরোধী গণতান্ত্রিক আন্দোলনে পার্টির সকল সংগ্রাম এবং ১৫ দলীয় জোটের কর্মসূচিতে কমরেড মানিক সক্রিয় ভূমিকা পালন করেছেন। পার্টি সংগঠনের দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে তিনি পার্টির গঠনতন্ত্রের বিধি বিধান অনুসরণে অত্যন্ত আন্তরিক ছিলেন। পার্টির শাখা কমিটির প্রত্যেকটি সভায় তিনি পার্টির ন্যূনতম ছয়টি কাজের তাগিদ দিতেন। এগুলোর ওপর আলোচনা পর্যালোচনা ছাড়া কেউ তাড়াহুড়া করলে তিনি রাগ হয়ে যেতেন। আমরা দেখেছি কমরেড মানিক প্রত্যেকটি সভায়ই পার্টির কোন নেতা, কর্মী বা শুভানুধ্যায়ীর মৃত্যু অথবা কোনও দুর্যোগে দেশ-বিদেশের কোনো মানুষের মৃত্যু হলে তাদের প্রতি শ্রদ্ধা প্রদর্শন ও শোক প্রস্তাব গ্রহণের জন্য সর্বাগ্রে সকলের দৃষ্টি আকর্ষণ করতেন এবং বলতেন “মানুষের প্রতি দরদি হওয়াই হল একজন কমিউনিস্ট হয়ে ওঠার প্রথম সোপান।” বরিশালে কমিউনিস্ট পার্টির পক্ষে কখনো তেমন কোন কৃষক আন্দোলন গড়ে তোলা সম্ভব হয়নি। তথাপি দীর্ঘদিন কৃষক সংগঠনের কাজে কমরেড মানিকই দায়িত্বপ্রাপ্ত ছিলেন এবং চেষ্টা করেছেন সংগঠন ও আন্দোলন দাঁড় করাবার। কমরেড মানিকের পার্টি জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল ১৯৮৯-৯০ সালে বিলোপবাদীদের হাত থেকে পার্টিকে রক্ষা করার সংগ্রামে। এ সময় পার্টির অনেক নেতাকর্মীরা হতাশ ও দোদুল্যমান ছিলেন। অনেক বড় নেতারাও পার্টিকে বিলুপ্ত করে একটি সুবিধাবাদী পার্টিতে রূপান্তরের অপচেষ্টা চালিয়েছেন। তার বিপরীতে দাঁড়িয়ে কমরেড মানিকের ছিল কমিউনিস্ট পার্টিকে কমিউনিস্ট পার্টির মৌলিক ভিত্তির উপর দাঁড় করাবার আপ্রাণ চেষ্টা। তিনি বলতেন, মার্কসবাদ লেনিনবাদের মতাদর্শগত ভিত্তি, শ্রমিক শ্রেণিকে পার্টির শ্রেণিগত ভিত্তি ও সমাজতন্ত্রই যে মানবমুক্তির একমাত্র পথ এই লক্ষ্যে স্থির থেকে পার্টিকে সকল ধরনের সুবিধাবাদ ও আপস থেকে দূরে রেখে পার্টির বিপ্লবী চরিত্র ঠিক রাখা অত্যন্ত জরুরি। পার্টির সেই সংকটকালে নুরুল ইসলাম মুন্সি, সৈয়দ জাহাঙ্গীর, এ কে আজাদ, বিশ্বনাথ দাস মুন্সি, এ এস এম মানিক, ডা: মোসাদ্দেক মাহমুদ গাজী, বিমল মুখার্জী, জাকির হোসেন বাচ্চু, মনীন্দ্র তালুকদার, দুলাল চন্দ্র মজুমদার, মিজানুর রহমান সেলিম প্রমুখ নেতৃবৃন্দ পার্টিকে বিলোপবাদের হাত থেকে রক্ষা করেছেন। এ সময় পার্টির অফিস না থাকায় ডা: মোসাদ্দেক মাহমুদ গাজী’র ফার্মেসিকে অফিস হিসেবে ব্যবহার করে এ. এস. এম. মানিকই সর্বক্ষণ একটি ফাইল হাতে নিয়ে পার্টির সকল শাখায় এবং পার্টির সকল সদস্যদের বাসায় বাসায় যেতেন এবং পার্টির সকল কর্মসূচিকে মাথায় রেখে যতদূর সম্ভব কর্মসূচিগুলো সফল করার আপ্রাণ চেষ্টা করেছেন। এভাবেই কমিউনিস্ট পার্টিকে তিনি মৃত্যুর আগ মুহূর্ত পর্যন্ত ৩৭ বছর সক্রিয় ছিলেন। বরিশাল মহানগর কমিটির সভাপতি এবং জেলা কমিটির সম্পাদকমণ্ডলীর সদস্য পদে দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি তিনি তেল-গ্যাস-খনিজ সম্পদ ও বিদ্যুৎ-বন্দর রক্ষা জাতীয় কমিটি বরিশাল শাখায় পার্টির পক্ষ থেকে দায়িত্ব পালন করেছে। সুন্দরবন রক্ষার আন্দোলন, পার্টির নিজস্ব কর্মসূচি ও স্থানীয় নানা ইস্যুভিত্তিক আন্দোলন ও বাম জোটের আন্দোলনেও তিনি সক্রিয় ছিলেন। শ্রমিক আন্দোলনেও তিনি যুক্ত হতেন। এছাড়াও বরিশালে চতুরঙ্গ নামে একটি সঙ্গীত বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার সাথে সম্পৃক্ত থেকে সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডেও যুক্ত ছিলেন। এভাবেই কমরেড এ এস এম মানিক মুক্ত মানুষের মুক্ত সমাজ প্রতিষ্ঠার স্বপ্ন বাস্তবায়নের জন্য ১৯৮১ সাল থেকে একটানা ৩৭টি বছর কমিউনিস্ট আন্দোলনের সাথে যুক্ত থেকে গত ২ মে ২০১৯ বিকাল ৫:৩০টায় আমাদের সকলের বন্ধন ছিন্ন করে চির বিদায় নিয়েছেন। আমাদের এ শূন্যতা সহজে পূরণ হবার নয়, তবে শোষণমুক্ত সমাজ গড়ার যে সংগ্রাম তিনি সারা জীবন করে গেছেন আমরা তাঁর সহযোদ্ধারা যদি সে সংগ্রামকে অগ্রসর করে নিয়ে যেতে পারি তাহলেই কমরেড মানিকের স্বপ্নের প্রতি আমাদের যথাযথ শ্রদ্ধা প্রদর্শন করা হবে। কমরেড এ. এস. এম. মানিক লাল সালাম। লেখক : সভাপতি, বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি, বরিশাল জেলা কমিটি

Print প্রিন্ট উপোযোগী ভার্সন



Login to comment..
New user? Register..