নুসরাত একটি প্রতীকী নাম

Facebook Twitter Google Digg Reddit LinkedIn StumbleUpon Email

ডমিনিক ক্যাডেট : প্রায় প্রতিদিনই দেশের কোথাও না কোথাও কোনও না কোনও নারী বা শিশু ধর্ষিত হচ্ছে। অনেকেই জানতে চান- কেন আমরা এসব বিষয় নিয়ে কথা বলি না। এটা ঠিক যে, সত্যি আমরা দেশের আনাচে-কানাচে প্রতিদিনের অসংখ্য ধর্ষণের বিরুদ্ধে দাঁড়াই না। কতজনের জন্যেই বা আমরা দাঁড়াতে পারি!! রাজনৈতিক দল হিসেবে আমাদেরও একটা সীমাবদ্ধতা অবশ্যই আছে। দেশে এত এত সমস্যা যে আমরা কোনটা রেখে কোনটাকে প্রাধান্য দেবো? তাছাড়া রাজনৈতিক দল হিসাবে আমাদেরও কিছু রুটিন কাজ অবশ্যই থাকে। তবুও এত এত ঘটনার মাঝে অবশ্যই কিছু কিছু ঘটনা হৃদয় ছুঁয়ে যায়। নুসরাত জাহান রাফি ঠিক এমনই একটা নাম আমাদের কাছে। যে কিনা রক্ষণশীল পরিবারের ইচ্ছায় নিজেকে সুরক্ষার জন্য ভর্তি হয়েছিলো মাদ্রাসায়। মাদ্রাসা হলো দ্বীন-ই-ইসলাম শিক্ষার কেন্দ্র। তার পরিবার বুঝেছিলো, বাইরের চলমান শিক্ষা কেবল উশৃঙ্খলতা শিক্ষা দেয়। সুতরাং মেয়েকে মাদ্রাসায় পাঠাও। সেই মাদ্রাসাই নুসরাতের জন্য কাল হয়ে দাঁড়ায়। সে যে মাদ্রাসায় পড়তো তার নাম সোনাগাজী ইসলামিয়া ফাজিল (ডিগ্রি) মাদ্রাসা। ফেনী জেলার সোনাগাজী বাজারের ঠিক মাঝ বরাবর যার অবস্থান। মাদ্রাসার অধ্যক্ষ সিরাজ-উদ্-দৌলা। যে কিনা নুতরাতের বাবার বয়সী। এই অধ্যক্ষ হলেন একজন নারী ললুপ হিংস্র হায়েনা। নুসরাতের ঘটনা জানাজানি হবার বহু আগ থেকেই যার বিরুদ্ধে অসংখ্য যৌন নিপীড়নের সংবাদ ইতোমধ্যে দেশবাসী জানতে পেরেছে। নুসরাতের এইচএসসি সমমানের ফাইনাল পরীক্ষা চলাকালীন গত ২৭ মার্চ নারী ললুপ সিরাজ তার পিয়নকে দিয়ে নুসরাতকে তার রুমে ডেকে নিয়ে যায়। যেহেতু নুসরাতসহ তার সহপাঠিরা আগে থেকেই সিরাজের দুঃশ্চরিত্রের কথা জানতো, তাই নুসরাত তার সহপাটিদের অধ্যক্ষের রুমের বাইরে দাঁড় করিয়ে সে রুমে প্রবেশ করে। সিরাজ নুসরাতকে একা পেয়ে তার গোপন অভিলাষ ব্যক্ত করে। সে প্রস্তাব করে- যদি নুসরাত সিরাজের অভিলাষ পূর্ণ করে তবে সে নুসরাতকে পরীক্ষা শুরুর আধাঘণ্টা পূর্বে প্রশ্নপত্র সরবরাহ করবে। পিতার বয়সী অধ্যক্ষের কাছ থেকে এই জঘন্য কথা শোনার পর নুসরাত কাঁদতে কাঁদতে বাইরে বেরিয়ে আসে এবং পরীক্ষা শেষে বাড়িতে গিয়ে তার মাকে সবকিছু খুলে বলে। তার মা এদিনই সিরাজের নামে থানায় যৌন নিপীড়ক সিরাজের নামে মামলা দায়ের করেন, যার প্রেক্ষিতে সিরাজ গ্রেফতার হয়। গ্রেফতার হওয়ার পর সিরাজ জেলে বসেই ষড়যন্ত্রের জাল বুনতে থাকে বাইরে তার অসংখ্য চেলা-চামুণ্ডাদের নিয়ে। তারা নুসরাত ও নুসরাতের পরিবারকে মামলা প্রত্যাহার জন্য চাপ প্রয়োগ করতে থাকে এবং সফল হতে ব্যর্থ হলে তারা সিরাজের নির্দেশে নুসরাতকে পুড়িয়ে ‘আত্মহত্যা’ বলে চালিয়ে দিতে ব্রতী হয়। যার ধরাকাহিকতায় ৬ এপ্রিল মাদ্রাসার ছাদে নুসরাতের গায়ে কেরোসিন ঢেলে আগুন লাগিয়ে দেয়া হয়। না, নুসরাত সেদিন মরেনি। আগুনে ঝলসানো শরীর নিয়ে নুসরাত অন্ধকারের শক্তির বিরুদ্ধে লড়াই করার সংকল্প নিয়ে ঢাকা মেডিকেলের বার্ন ইউনিটে ভর্তি হয়ে বারবার একই কথা উচ্চারণ করেন- ‘আমি এই অন্যায়ের প্রতিবাদ করে যাবো শেষ নিঃশ্বাস পর্যন্ত, আমি সারা বাংলাদেশের কাছে বলব, সারা পৃথিবীর কাছে বলব এই অন্যায়ের প্রতিবাদ করার জন্য।’ বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির প্রতিটি কমেরেডের কানে বাজে নুসরাতের এই “শেষ উচ্চারণ”। কমিউনিস্ট পার্টি তার ঐতিহ্যগতভাবে একজন লড়াকু যোদ্ধার পাশে দাঁড়িয়েছে বরাবরের মতো। নুসরাতের আত্মা দেহত্যাগ করে ১০ এপ্রিল। পার্টি নুসরাতেকে আগুনে ঝলসে দেয়ার পর থেকেই দেশের বিভিন্ন স্থনে সুষ্ঠু তদন্ত ও বিচারের দাবিতে সংগ্রাম জোরদার করে এবং নুসরাতের মৃত্যুর পর ব্যাপক আকারে সারা দেশে একযোগে ১৩ এপ্রিল সকাল ১১টা থেকে ১২টা পর্যন্ত মানববন্ধন করে। নুসরাত হত্যার বিচার যেন সরকার বরাবরের মতো ভিন্ন খাতে প্রবাহিত করতে পা পারে এবং তরিৎগতিতে যেন বিচার সম্পন্ন হয় তার জন্যে রাজধানী ঢাকায় বঙ্গভবন থেকে গণভবন পর্যন্ত মানববন্ধনের আয়োজন হয়। কমিউনিস্ট পার্টির আহ্বানে সারা দিয়ে সেদিন সারাদেশে যে মানববন্ধন অনুষ্ঠিত হয় তাতে পার্টির কমরেডগণ ছাড়াও দেশের বিবেকবান অগণিত মানুষ অংশগ্রণ করে বিচারহীনতার আবাহমান সংস্কৃতির যুগে নুসরাত হত্যার বিচার যেন সরকারী কোন ষড়যন্ত্রের চোরাগলিতে হারিয়ে না যায় সে ব্যাপারে হুশিয়ারী উচ্চারণ করেন। কারণ, নুসরাত হত্যার সাথে ইতোমধ্যে সরকারি দল আওয়ামী লীগের স্থানীয় নেতা তথা রাঘব বোয়ালরা জড়িত থাকার খবর পত্র-পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছে। গত ১ মে মহান মে দিবসে শুধু এই ঢাকার বিভিন্ন স্থানে পার্টির পাঁচটি সমাবেশ ছিলো। পার্টির সকল কমরেডগণ সেই সমাবেশে অক্লান্ত পরিশ্রম করে ঠিক তার পরদিন খুব সকালে ঢাকা থেকে সোনাগাজীর উদ্দেশ্যে ‘রোডমার্চ’-এ অংশ নিতে ঢাকার মুক্তাঙ্গনে সমবেত হয়েছে কেবল নুসরাতের জন্যই নয়, বরং দেশব্যাপী নারীর ওপর অব্যাহত যৌন নিপীড়ন, ধর্ষণ, সন্ত্রাস ও বিচারহীনতার সংস্কৃতির বিরুদ্ধে লড়াইয়ে সামিল হতে। এখানে উল্লেখ্য যে, রোডমার্চে কমিউনিস্ট পার্টি ছাড়াও বাম গণতান্ত্রিক জোটভুক্ত অপরাপর দলগুলিও অংশগ্রহণ করে। উল্লেখযোগ্য নেত্রীবৃন্দের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন- কমরেড মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম, কমরেড শাহ আলম, কমরেড ক্বাফি রতন, কমরেড রুহিন হোসেন প্রিন্স, কমরেড সাজ্জাদ জহির চন্দন, কমরেড মুনিরা অনু, কমরেড লুনা নূর, কমরেড খালেকুজ্জামান, কমরেড বজলুল রশিদ ফিরোজ, কমরেড সাইুফুল হক, কমরেড বহ্নিশিখা জামালী প্রমুখ। সকাল সাড়ে সাতটায় মুক্তাঙ্গনে কমরেড মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম-এর বক্তব্যের মাধ্যমে রোডমার্চের সূচনার পর যাত্রা শুরু করে রোডমার্চ কাঁচপুর ব্রিজের অপর প্রান্তে পৌঁছালে নারায়ণগঞ্জ থেকে আসা কমিউনিস্ট পার্টি ও বাসদের বিপুল সংখ্যক নেতাকর্মীর উপস্থিতিতে মানববন্ধন অনুষ্ঠিত হয়। মানববন্ধনে বক্তব্য রাখেন কমরেড মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম, কমরেড খালেকুজ্জামান, কমরেড সাইুল হকসহ অন্যান্য নেত্রীবৃন্দ। রোডমার্চের পরবর্তী স্পট ছিলো নারায়ণগঞ্জের সোনারগাঁওয়ের মোগড়াপাড়া। এখানে বক্তব্য রাখেন কমিউনিস্ট নেত্রী লুনা নূর, মনিরা অনু প্রমুখ। আমাদের পরবর্তী স্পট ছিলো ভবের চর। সেখানে উপস্থি জনতার উদ্দেশ্যে বক্তব্য রাখেন কমরেড শরীফুজ্জামান শরীফ। ভবেরচরের পরবর্তী স্টপিজ কুমিল্লা জেলার চান্দিনায়। এখানে কুমিল্লা জেলা থেকে আগত কমিউনিস্ট পার্টিসহ বাম গণতান্ত্রিক জোটের বিপুল নেতাকর্মী অংশগ্রহণ করেন। কমিউনিস্ট নেতা কমরেড পরেশ কর ছাড়াও সমাবেশে বক্তব্য রাখেন কমরেড সাইফুল হক, কমরেড মনিরা অনু। ব্যাপক জনগণের অংশ গ্রহণে চান্দিনা বাজারের সমাবেশ থেকে নুসরাতসহ সকল নারীর য়ৌন হয়রানির দ্রুত বিচারের দাবি প্রতিধ্বনিত হয়। এরপর রোডমার্চ যাত্রা শুরু করে কুমিল্লার পদুয়ার বাজারে। সেখানে উপস্থিত জনতার উদ্দেশ্যে বক্তব্য রাখেন কমরেড পরেশ কর। বিকেল প্রায় সাড়ে তিনটায় আমাদের রোডমার্চ গেয়ে পৌঁছায় সোনাগাজী। সেখানে কমরেড শাহ আলম, কমরেড খান লাবলু কমরেড রুহিন হোসেন প্রিন্স, কমরেড সাজ্জাদ জহির চন্দ, কমরেড ক্বাফি রতন, কমরেড ডা. ফজলুর রহমান, কমরেড শিবনাথ চক্রবর্তী, কমরেড হাফিজুল ইসলাম, কমরেড মৃণাল চৌধুরী, কমরেড অশোক সাহাসহ কমিউনিস্ট পাটির সোনাগাজি, ফেনী, নোয়াখালী ও চট্টগ্রাম থেকে আগত বিপুল সংখ্যক নেতাকর্মীর একটি বিক্ষোভ মিছিল নুসরাতের কবরে যায়। সেখানে নুসরাতের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে এক মিনিট নীরবতা পালন করা হয়। এরপর আমাদের মিছিল নুসরাতের বাড়ি যায়। এখানে আমাদের নারী কমরেডগণ বাড়ির ভেতরে প্রবেশ করে নুসরাতের মায়ের সাথে কথা বলেন আর বাইরে নুসরাতের ছোট ভাই উপস্থিত সকল জনতার সাথে সার্বিক পরিস্থিতি নিয়ে কথা বলেন। নুসরাত হত্যার দ্রুত বিচারের দাবিতে সে সারা দেশবাসীকে সোচ্চার হবার আহ্বান জানান। আমাদের রোডমার্চ এরপরে সোনাগজী জিরো পয়েন্টে এক বিশাল প্রতিবাদ সভা করে। ফেনী শহীদ মিনারে হয় আমাদের শেষ সমাবেশ। এখানে উপস্থিত কমিউনিস্ট পার্টির সহানীয় নেতা ছাড়াও বক্তব্য রাখেন কমরেড লুনা নূর, কমরেড বহ্নিশিখা জামালী, কমরেড শম্পা বসু প্রমুখ। কমিউনিস্ট পার্টির স্হানীয় নেতা মিল্কি তার বক্তব্যে বলেন- একের পর এক নুসরাতরা ধর্ষিতা হবে, খুন হবে আর আমরা মানববন্ধন করবো, প্রতিবাদ করবো, কিন্তু এই রাষ্ট্র এই সকল ব্যাপারে তেমন কিছুই করবে না। আইনের মারপ্যাঁচে আটকে থাকবে বিচার। এই বিচারহীনতার সংস্কৃতির বিরুদ্ধে জাতিকে মরণপণ লড়াইয়ে অবতীর্ণ হতে হবে। রাষ্ট্র ক্ষমতা থেকে টেনে নামাতে হবে অপশক্তিকে এবং জনগণের সরকার কায়েম করতে হবে। তা না হলে আমাদের একের পর এক নুসরাত, তনু, আফসানা, সাগর-রুনী, ত্বকী, কল্পনা চাকমাদের জন্যে বিচার ভিক্ষা করতে হবে। নুসরাত হোক বর্তমান সময়ের প্রতীকী নাম। অবসান চাই নারীর বিরুদ্ধে ঘটমান সকল যৌন সন্ত্রাসের। লেখক : যুবনেতা

Print প্রিন্ট উপোযোগী ভার্সন



Login to comment..
New user? Register..