নদীর পায়ে বেড়ি পরালে ঘটবে সর্বনাশ

Facebook Twitter Google Digg Reddit LinkedIn StumbleUpon Email
অনিল বিশ্বাস ও ইকবাল কবির জাহিদ : [কমরেড অনীল বিশ্বাস ও কমরেড ইকবাল কবির জাহিদের গবেষণালব্ধ যে প্রতিবেদন ‘ডেলটা প্লান-২১০০, বঙ্গীয় ব-দ্বীপ পরিস্থিতি : পটভূমি দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চল’ পুস্তিকা আকারে প্রকাশিত হয়েছে, তার সাধারণ ধারণামূলক কিয়দাংশ কিঞ্চিত সম্পাদিত করে এখানে মুদ্রিত হলো। বিস্তারিতের জন্য ৩২ পৃষ্ঠার সমগ্র পুস্তিকাটি পাঠ্য।– সম্পাদক, একতা] বাংলাদেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের জনপদে জনজীবন এক কঠিন পরিবেশ বিপর্যয়ের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। এর প্রথম প্রকাশ, বিগত শতকের পঞ্চাশের দশকে। এই অঞ্চলে তখন সৃষ্টি হয়েছিল কঠিন লবণাক্ততা। যার প্রভাবে ঘটেছিল উপর্যুপরি ফসলহানি। সে সময় হাজার হাজার মানুষ অভাবের তাড়নায় খেতে না পেয়ে এলাকা ছেড়ে পালিয়েছিলেন। প্রতিকারের উপায় হিসেবে সে সময় সরকার এলাকাগুলোকে কতকগুলি পোল্ডারে বিভক্ত করেছিল। নদীর পাড়ে ও তৎসংলগ্ন সমতল ভূমিতে অর্থাৎ ফসলের মাঠের চারিধারে বাঁধ দেয়ার ব্যবস্থা করেছিল। এর নাম হলো ‘কর্ডন পদ্ধতি’। এতে সাময়িককালের জন্য নোনা পানির হানা থেকে ফসল বাঁচানো গেলেও দেখা দিয়েছিল জলাবদ্ধতা। এই পোল্ডার ব্যবস্থার ফলেই তা ঘটেছিল। এই অভিজ্ঞতায় একথা আরো স্পষ্ট হয়েছে যে, ব্রিটিশ সরকারের সময় থেকে এ অঞ্চলের নদীব্যবস্থার ওপর অন্যায় হস্তক্ষেপই সমস্যার উৎস। প্রকৃতির নিয়ম না মেনে তার বিকৃতি ঘটানো প্রকৃতি মেনে নেয় না। ‘কর্ডন ব্যবস্থার’ ক্ষেত্রে প্রকৃতির নিয়ম মানা হয়নি। সম্প্রতি প্রণীত ডেল্টাপ্লান-২১০০ সেই ভ্রান্ত ও ক্ষতিকর নীতিকে বহাল রেখেই রচিত হয়েছে। ‘কর্ডন ব্যবস্থার’ পেছনে বিগত ষাট বছরে হাজার হাজার কোটি টাকা খরচ হয়েছে। এখনও একই রকম কর্মসূচি অব্যাহত রয়েছে। আমেরিকা, বিশ্বব্যাংক, এডিবি ও নেদারল্যান্ডের পরামর্শ ও সহযোগে বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ড এসব কর্মসূচি বাস্তবায়ন করে চলেছে। দেশি-বিদেশি পরামর্শদাতা ও বাছা বাছা এনজিওদের এসব কাজের সাথে যুক্ত রয়েছে। ইদানিং বৈশ্বিক উষ্ণায়ন ও জলবায়ু পরিবর্তন একটি নতুন বিপদ হিসেবে যুক্ত হয়েছে। জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাতে বিশ্বের সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত দেশগুলোর মধ্যে অন্যতম হলো বাংলাদেশ। জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায়ও সেই একই ধরনের ভ্রান্ত ও ক্ষতিকর নীতি অনুসরণ করা। কিন্তু এই পথ অনুসরণ করে এখনও দেশকে বন্যা, নদীভাঙন, জলোচ্ছ্বাস ও লবণাক্ততার সংকট থেকে মুক্ত করা যায়নি। বরং আগের তুলনায় বন্যার পৌনপৌণিকতা ও ক্ষয়-ক্ষতির পরিমাণ বেড়েছে। বিগত শতকের পঞ্চাশের দশকে ‘ক্রুগ মিশনের’ প্রস্তাব অনুযায়ী সারা দেশে বন্যা প্রতিরোধ এবং উপকূলীয় অঞ্চলকে নোনা পানির হানা থেকে চিরতরে মুক্ত রাখার উদ্দেশ্যে পোল্ডার ও উপকূলীয় বাঁধের কর্মসূচি বাস্তবায়ন করা শুরু হয়েছিল। কিন্তু ক্রুগ পরিকল্পনা অনুসারে বাস্তবায়িত ‘কর্ডন ব্যবস্থা’ দ্বারা সাময়িক কয়েক বছর নোনা পানির আগ্রাসন ঠেকানো গেলেও পরবর্তীতে জলাবদ্ধতার সমস্যা আরো প্রকট বিপদ হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। সম্প্রতি সরকার নেদারল্যান্ডের অভিজ্ঞতা, পরামর্শ ও সহযোগিতা নিয়ে নয়া পানিনীতি ঘোষণা করেছে। এই নয়া পানিনীতির নাম দেয়া হয়েছে ‘বাংলাদেশ ডেল্টা ওয়াটার-২১০০’। সংক্ষেপে ‘ডেল্টা প্লান-২১০০’। ইতোমধ্যে নতুন এই পানি নীতি বাস্তবায়নের কাজ শুরু হয়ে গেছে। এ জন্য অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র হিসাবে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলকে বেছে নেয়া হয়েছে। ১৯২৩ সালে উত্তর বাংলায় বন্যার পর ব্রিটিশ গভর্নমেন্ট অধ্যাপক ড. প্রশান্ত মহালনবীশকে দায়িত্ব দিয়েছিল বন্যা নিয়ন্ত্রণের উপায় অনুসন্ধানের। পর্যবেক্ষণ ও পর্যালোচনার পর ১৯২৮ সালে তিনি যে রিপোর্ট দেন তাতে বলা হয়েছে, বন্যার পানি যাতে দ্রুত বেরিয়ে যেতে পারে তার জন্য বাধা অপসারণ করতে হবে। নদীর তীর বরাবর সমান্তরাল বাঁধ দিয়ে বন্যা ঠেকানোর পরিকল্পনা কোনও বুদ্ধিমানের কাজ নয়। এতে ভবিষ্যতে বন্যা দীর্ঘস্থায়ী রূপ নেয়ার সম্ভাবনাই বেশি। কারণ প্লাবন-ভূমিতে পলি ওঠা বন্ধ হয়ে গেলে ভূমি উঁচু হওয়ার কাজ থেমে যাবে। উল্টো, পলি জমে নদীখাদ উঁচু হয়ে উঠবে। তখন আবার বাঁধ উপচে সমতলে পানি ঢুকবে। সে পানি সহজে নিষ্কাশিত হবে না। মহালনবীশের সেই পর্যবেক্ষণের সত্যতা প্রমাণিত হয়েছে। ষাটের দশকে বন্যা নিয়ন্ত্রণ কর্মসূচি সম্পর্কে মার্কিন বিশেষজ্ঞ জেনারেল হার্ডিন (ঐধৎফরহ) এবং ওলন্দাজ বিশেষজ্ঞ প্রফেসর থিস (ঞযরলংব) যে অভিমত দেন তাও মহালনবীশ রিপোর্টের সাথে মিলে যায়। সর্বশেষ, প্রফেসর পিটার রোজার্স (জড়মবৎং) ‘বাঁধ পদ্ধতির বিরোধিতা’ করেছেন। তিনি সোজাসাপটা বলে দিয়েছেন বাংলাদেশের জন্য বন্যাই হলো উপকারী। তাই তিনি বন্যা মেনে নেয়ার পক্ষেই মত দিয়েছেন। খুলনার ডাকাতিয়ার জনপদ দীর্ঘদিন জলাবদ্ধ ছিল। জনগণ ওয়াপদার বাঁধ কেটে জোয়ারের পানি তুলে বিল পলি-ভরাট করে নেন। এতেই তাদের জলাবদ্ধতার অবসান হয়। এরপর জনগণ ভরতভায়নার বিল ও ডহুরির বাঁধ কেটে একই কায়দায় জোয়ারে পলি তুলে নিজেদের নিচু বিল উঁচু করে নিয়েছিলেন। এতেই সেখানকার জলাবদ্ধতার নিরসন হয়েছিল। এতে কোনও অর্থ খরচ করতে হয়নি। ২০০৭ সালে সাতক্ষীরার তালা উপজেলার জালালপুর ইউনিয়নের কৃষকেরা কপোতাক্ষ নদের বেড়িবাঁধ কেটে জোয়ারের পানি ঢুকিয়ে জেঠুয়ার বিল পলি ভরাট করে নিয়েছিলেন। কৃষকরা কেটে দিয়েছিলেন বাঁধের ৬ ফুট জায়গা। পরে আইলায় বাঁধ ভেঙে প্রবেশমুখ ৩০ ফুট ফাঁক হয়ে যায়। মাত্র আড়াই মাসে দেখা গেল, জেঠুয়া বিলের তলি পলি-ভরাট হয়ে ৬/৭ ফুট উঁচু হয়ে গেছে। পাখিমারা বিলের পাশাপাশি এই জেঠুয়া বিলেও সরকারি অর্থ ব্যয় করে পানি উন্নয়ন বোর্ডের ‘জোয়ারধারা প্রকল্প’ তথা টিআরএম (ঞরফধষ জরাবৎ গধহধমবসবহঃ) করার প্রস্তাব পাস হয়েছিল। কিন্তু সে কাজে নামার আগেই, কোনও সরকারি টাকা খরচ না করেই শুধুমাত্র কৃষকের অভিজ্ঞতা আর প্রকৃতির অমোঘ শক্তি কাজে লাগিয়েই সে কাজ সম্পন্ন হয়েছিল। জোয়ারে উঠে আসা পলিতে দ্রুত বিল পলি-ভরাট হয়েছিল। জোয়ারের ভরবেগ বৃদ্ধি পাওয়ায় নদীর তলদেশে জমে থাকা ম-পলি সাগরে নেমে গিয়েছিল। তাতেই সাময়িকভাবে নদীর মোহনা উন্মুক্ত হয়ে পড়েছিল। গভীরতাও বেড়েছিল। কর্ডন পদ্ধতির ক্ষতির দিক (১) কর্ডন এলাকার আয়তন বাড়ার সাথে পানির প্রাকৃতিক প্রবাহক্ষেত্র সংকুচিত হবে এবং পর্যায়ক্রমে প্লাবনতলের উচ্চতা ও ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ বাড়বে। (২) মাছের প্রজনন ও বিচরণ ক্ষেত্র সংকুচিত হবে ও উৎপাদন হ্রাস পাবে। (৩) প্লাবন সমতলে পলি উঠতে না পারায় জমির উর্বরতা হ্রাস পাবে। (৪) পাতাল জলের ভাণ্ডার পুনর্ভরণে বিঘ্ন ঘটবে। (৫) মোহনা অংশে পলি-ভরাট হয়ে নদী নাব্যতা হারাবে, বিল থেকে নদীখাত উঁচু হয়ে উঠবে এবং স্থায়ী জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হবে। আরও অনেক ধরনের ক্ষতির কথা বলা যায়। মুক্ত প্লাবনের সুবিধা (১) পলি জমে অবনমন পূরণ হয়ে ভূমির উচ্চতা বাড়বে। (২) জমি উর্বর হবে। প্লাবন শেষে বিনা চাষে পলিযুক্ত মাটিতে ছিটে বীজ ছড়িয়ে দিয়ে ডাল, সরিষা ও রাই জাতীয় ফসল ফলানো সম্ভব হবে; চাষের খরচ ও শ্রম দুই-ই সাশ্রয় হবে। (৩) প্রতিবছর মুক্ত বন্যায় ভূ-নিম্নস্থ পানির ভাণ্ডার (ধয়ঁরভবৎ) পূর্ণ হয়ে উঠবে। (৪) ভূমির অম্লতা কমে আসবে। মাটি ও পানি আর্সেনিক মুক্ত থাকবে। (৫) পরিবেশের আর্দ্রতা বাড়বে। উষ্ণতা হ্রাস পাবে। (৬) গাছপালা পুষ্ট ও সবুজ হয়ে উঠবে। (৭) বন্যায় পরিবেশ নির্মল হবে; মশার উপদ্রব কমবে; জনস্বাস্থ্যেরও উন্নতি হবে। (৮) সমতলে পলি উঠায় নদীতে অতিরিক্ত পলি জমবে না, তাতে নদীখাত গভীর থাকবে। (৯) নদীর গভীরতা বাড়লে পাড় ভাঙন কমে আসবে। (১০) উজানের মিঠে পানির প্রবাহে লবণাক্ততা দূরীভূত হবে। (১১) নৌপথের উন্নতি ঘটবে; জ্বালানি খরচ কম হবে ও বায়ুদূষণ হ্রাস পাবে। (১২) কৃষিপণ্য পরিবহনে খরচ কমবে। (১৩) সর্বোপরি উন্মুক্ত নীতির পাশাপাশি নদী ও খালের নেটওয়ার্ক পুনরুজ্জীবিত করে এক এলাকার বাড়তি পানি ভিন্ন ভিন্ন খাতে প্রবাহিত করা যাবে। তার ফলে পাড় উপচানো উচ্চ প্লাবনের বিপদ কমবে। এটাই বন্যা নিয়ন্ত্রণের সম্ভাব্য শ্রেষ্ঠ উপায় হতে পারে। (১৪) সেই সাথে অববাহিকার বিল, বাওড় প্রভৃতি প্রাকৃতিক জলাশয় ও ছোট বড় পুকুরগুলি জলাধার হিসাবে ব্যবহার করা যেতে পারে। ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের ভেতর দিয়ে স্বাধীন হয়েছে বাংলাদেশ। ওয়াপদা ভেঙে বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ড গঠিত হয়েছে। কিন্তু আজ পর্যন্ত পানিনীতি প্রণয়নে ‘ক্রুগ মিশন’-এর সুপারিশের বাইরে যাওয়া সম্ভব হয়নি। বিদেশি প্রভাব বলয়ের জাল ছিন্ন করে স্বাধীন দেশে স্বাধীন পানিনীতি গ্রহণ সম্ভব হয়নি। ‘ফ্যাপ’ বাস্তবায়ন কাল পর্যন্ত ক্রুগ মিশন প্রস্তাবের মূলনীতিই অনুসরণ করা হয়েছিল। ডেল্টা প্লান-২১০০ এ সেই নীতি অনুসরণের কথা সরাসরি বলা না হলেও পরোক্ষভাবে তা প্রয়োগ করা হয়েছে। এ যেন সেই নতুন বোতলে পুরাতন মদ পরিবেশনের কায়দা। ডেল্টা প্লান-২১০০ বাস্তবায়িত হলে যে ক্ষতি হবে আগামী শত বছরেও তা পূরণ হবে না। তাই তড়িঘড়ি করে ডেল্টা প্লান বাস্তবায়ন না করে, আগে দেশি ও প্রকৃত দেশপ্রেমিক বিশেষজ্ঞদের মতামত পরামর্শ গ্রহণ করা প্রয়োজন। ভূ-প্রকৃতির তাৎপর্য বিচারে বাংলাদেশ নদীমাতৃক দেশ। বাংলাদেশ গাঙ্গেয় ব-দ্বীপের অংশ। এখানে নদী থেকে প্লাবন ভূমিকে বিচ্ছিন্ন করার ইঞ্জিনিয়ারিং প্রকল্প মাতৃ নাড়ি থেকে গর্ভস্থ শিশুকে বিচ্ছিন্ন করার সামিল। গাঙ্গেয় ব-দ্বীপের মৌলিক চরিত্রকে উপেক্ষা করে এখানে কোনও ধরনের ইঞ্জিনিয়ারিং মডেল কাজে আসবে না। তা কেবল বিপদই সৃষ্টি করবে। তাই, অগ্রাধিকারের ভিত্তিতে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের ভূ-প্রাকৃতিক পরিস্থিতির সাথে সামঞ্জস্য রেখেই পরিকল্পনা নিতে হবে। ডেল্টা প্লান-২১০০ প্রস্তাবনা বাস্তবায়ন সুন্দরবন সহ সমগ্র দক্ষিণ-পশ্চিম উপকূলীয় অঞ্চলকে আরও সুদূরপ্রসারী বিপর্যয়ের মধ্যে ফেলে দেবে। ক্রুগ মিশন, আইইসিও, এনডব্লিউপি, ফ্যাপ ইত্যাদি বৈদেশিক সাহায্যনির্ভর প্রকল্প জনপদ, ভূ-প্রকৃতি ও জীববৈচিত্র্যের জন্য দারুণ বিপর্যয়ের কারণ হয়েছে। বর্তমান ডেল্টা প্লান-২১০০ অতীতের পানি নীতিরই নয়া সংস্করণ। এটি প্রকৃতি, জনপদ ও জাতীয় স্বার্থবিরোধী। অভিজ্ঞতা একথাই বলে যে, ‘কর্ডন পদ্ধতি’ নয়, বরঞ্চ ‘উন্মুক্ত পদ্ধতিই’ পানি-নদী ব্যবস্থাপনা ও প্রকৃতি পরিবেশ রক্ষায় সুদূরপ্রসারী সুফল বয়ে আনতে পারে। সে লক্ষ্যে প্রয়োজন ক) উজানের পানি নিশ্চিত করার জন্য আন্তঃদেশীয় পানির হিস্সা নিশ্চিতকরণ; খ) বৃষ্টির পানি সকল নদীখাতে প্রবাহের জন্য সকল নদী ও খালের পূর্বেকার পরস্পর সংযোগগুলির পুনঃস্থাপন এবং নদীর উজানে জলাধার নির্মাণ; গ) পলি ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে নদীর নাব্যতা ও ভূমিগঠন প্রক্রিয়াকে বাধামুক্ত করা। ঘ) এই মুহূর্তে কোনও মতেই টিআরএম প্রকল্পগুলি বাতিল না করে সেগুলি চালু রাখা। ডেল্টা প্লান-২১০০ আসলে একটি দীর্ঘমেয়াদি মহাযজ্ঞ। দেশের অস্তিত্বের সাথে এটি সম্পর্কিত। নানাবিধ বিষয় বিবেচনায় ডেল্টা প্লান-২১০০ পরিকল্পনা বঙ্গীয় ব-দ্বীপ পরিস্থিতির সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। এই পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হলে সুন্দরবন সহ সমগ্র দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের জন্য মহাবিপর্যয় ডেকে আনবে। পুনরায় ভুলের খেসারত দিতে অনেক পুরুষ কেটে যাবে। হয়তোবা আরও শত বৎসর সময় লাগবে। “গঙ্গা আমার মা, পদ্মা আমার মা আমার দুই চোখে দুই জলের ধারা মেঘনা যমুনা।” যুগ যুগ ধরে এই ধরনের মরমি সুরের অনুরণনে বাঙালি হৃদয় সিক্ত হয়েছে। তারই সাথে মূর্ত হয়ে উঠেছে এক মরমি দর্শন। নদী ও মানব প্রকৃতির সম্পর্কের দর্শন। নদীকে বাংলার মানুষ মা ডাকে। প্রতিটি বাঙালি নদীকে ভালবাসে। শ্রদ্ধা করে। নদীর পলিতে বাংলা মায়ের জন্ম একথা বাঙালি ব্যতিরেকে আর কারও পক্ষে বোঝা সম্ভব নয়। বিদেশি বিশেষজ্ঞরা নদীকে মানব প্রকৃতির প্রতিপক্ষ ভাবতে পারেন! তাদের দৃষ্টিতে নদী ও বন্যা জনপদের জন্য কেবল ধ্বংসই ডেকে আনে! বিদেশিদের কাছে তাই বাঙালির নদী-সম্পর্কিত দর্শনেরই মৃত্যু ঘটে গেছে! সে কারণে নদীর পায়ে বেড়ি পরানোর ‘পরামর্শ’ দিতে তারা দ্বিধা করেন না! বিপরীতে বাংলার মানুষ চায় নদী ও মানব প্রকৃতির সম্পর্কের পুনঃস্থাপন। তারা চায় নদীকে বেড়িমুক্ত করতে। নদী বাঁচলে বাংলাদেশ বাঁচবে। নদী বাঁচানোর স্বার্থে বাংলাদেশকে ফিরে যেতে হবে মুক্ত প্লাবনে। বিশেষ করে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে তার জন্য খুলে দিতে হবে উজানে মাথাঙ্গার সাথে ভৈরবের উৎস মুখ। মোহনাই নদীর ভিত্তি। মোহনা মুক্ত হওয়ার সাথে সমন্বয় করে উজানের উৎস মুখ উন্মুক্ত করার কাজ সম্পন্ন হলে পুনরায় দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের নদী ও প্রকৃতির সাথে জনপদ ও জনগণ ফিরে পাবে তাদের স্বাভাবিক জীবনের ছন্দ। লেখকদ্বয় : বাংলাদেশের ওয়ার্কার্স পার্টির কেন্দ্রীয় নেতা

Print প্রিন্ট উপোযোগী ভার্সন



Login to comment..
New user? Register..