বোরো ধানে বিপাকে কৃষক

Facebook Twitter Google Digg Reddit LinkedIn StumbleUpon Email
আবিদ হোসেন ঃ বলা হতো সোনার ফসল ধান কৃষকের স্বপ্ন সফলের একমাত্র উপায়-অবলম্বন। স্বপ্ন সফল তো দূরের কথা ধান ফলানো এখন আর কৃষকের দু’বেলা খেয়েপরে বেঁচে থাকার উপায় অনুসঙ্গও নয়। ধান ফলানো পেশা সবচেয়ে দীর্ঘমেয়াদী কার্যকর পেশার মধ্যে অন্যতম। কাদা-পানি মিশিয়ে ক্ষেত তৈরি করে বীজ দিয়ে বীজ তলা তৈরি করা, চাড়া তুলে আবার আগাছা পরিষ্কার করে গোছায় গোছায় সারি সারি চাড়া রোপন করা, সার-কীটনাশক দফায় দফায় ছিঁটানো, আগাছা পরিষ্কার করা- এ সবকিছুর আয়োজনে পাকা ধান যখন বাতাসে দোল খায়- তখন কৃষকের প্রাকৃতিক দুর্যোগের আতঙ্ক আর স্বল্প সময়ে পাকা ধান কাটার শ্রমিক সংকটের শেষে ধান বিক্রির লোকসানের অংক গুণে গুণে কৃষকের দুঃশ্চিতার বলিরেখা আরো স্পষ্ট হয়ে ওঠে। বৃষ্টিতে ভিজে-রোদে পুড়ে আর বজ্রপাতে মৃত্যুকে হাতের মুঠোয় করে কৃষক-কৃষি শ্রমিক যে ফসল উৎপাদন করে তাতে মানুষের খাদ্যের জোগান হলেও কৃষক-কৃষি শ্রমিকের জীবন কাটে এক সংকটময়, দুর্দশাগ্রস্ত, দুঃস্বপ্নের মধ্য দিয়ে। ধান বেচেই কৃষক বাঁচতে চায়। কিন্তু নিজের উৎপাদন করা ধান, গম, পাট, আলুসহ কোনও ফসলের বিক্রির দাম কৃষক নির্ধারণ করতে পারে না। এক অদৃশ্য মহাশক্তিধর সিন্ডিকেটের হাতে সারাদেশের কৃষিবাজার নিয়ন্ত্রিত। কাগজে-কলমে সংবিধানে-শাসনে দেশে সরকার থাকলেও, শ্রমিক-কৃষক-মেহনতি জনগোষ্ঠীর জীবন-জীবিকার নিশ্চয়তা বিধানে সর্বময় সরব সরকারের নীরবতাই স্পষ্ট করে তোলে– ভোটারবিহীন ভোটে স্বনির্বাচিত সরকার ঊর্ধ্বমুখী উন্নয়নের অজুহাতে কৃষককে সংকটের মুখে ফেলে দিয়ে মূলতঃ দেশকে এক গভীর সংকটের দিকে নিয়ে যাচ্ছে। অথচ এই কৃষি বাঁচলেই কৃষক বাঁচবে, কৃষক বাঁচলেই দেশ বাঁচবে। গত ৫ জুলাই ২০১৮ সর্বশেষ হালনাগাদ কৃষি পরিসংখ্যানে সারাদেশে মোট পরিবার ২,৮৬,৯৫,৭৬৩টি এর মধ্যে মোট কৃষি পরিবার ১,৫১,৮৩,১৮৩টি। সরাসরি কৃষিতে নিয়োজিত জনশক্তি ৪০.৬ শতাংশ। এই জনশক্তি জাতীয় আয়ের ১৪.১০% (২০১৭-১৮) অবদান রাখছে। অথচ এই কৃষি শ্রম শক্তিকে অগ্রাধিকার গুরুত্ব না দিয়ে সিন্ডিকেট বাজার অর্থনীতি, লুটপাততন্ত্র আর দলীয় চামুণ্ডাদের পকেট ভারি করায় বিশেষ অবদান রাখছে। এ বছর বোরো ধানের অধিক ফলনে সরকারের স্বস্তি হলেও কৃষক এই ধান নিয়ে পড়েছে বিপাকে। ঘূর্ণিঝড় ফণী’র হামলায় অধিকাংশ কৃষক ধান কাটতে পারেনি। উপকূলীয় অঞ্চলে বাঁধ ভেঙে কৃষি ফসল তলিয়ে গেছে হাওর অঞ্চলে, বিশেষত সুনামগঞ্জের ৬টি হাওরের বাঁধ ভেঙে কৃষকের বোরো ধান তলিয়ে গেছে। হাওরসহ দেশের অন্যান্য অঞ্চলে বোরো ধানে চিটা হয়ে যাওয়ায় এমনিতেই কৃষক ক্ষতিগ্রস্ত ছিলো। তার উপর ফণী’র আগ্রাসন সেইসঙ্গে বাঁধ ভেঙে ফসল তলিয়ে যাওয়ায় কৃষক দিশেহারা। উন্নয়নের মহোৎসবের নামে ব্যাপক লুটপাট হচ্ছে। এই লুটপাটের উন্নয়নের নিদর্শনগুলো হচ্ছে হাওর-উপকূলীয় অঞ্চলের বাঁধগুলো। প্রতি বছরই অপরিকল্পিতভাবে বাঁধগুলোর মেরামতের নামে চলে লুটপাট। পরিকল্পিতভাবে স্থায়ী ব্যবস্থা গ্রহণ না করলে দেশের কৃষি অর্থনীতির পরিণতি হবে ভয়াবহ। প্রতি বছরই কৃষক ধানের দাম পায় না। এ বছর ধানের দাম নিয়ে এক অনিশ্চয়তার মধ্যে আছে কৃষক। সরকার এবার বোরো মৌসুমে ২৬ টাকা দরে ধান সংগ্রহের ঘোষণা দিয়েছে। এই হিসেবে মণ প্রতি ১০৪০ টাকা বিক্রি করার কথা, কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে দেশের কোনো জায়গাতেই সরকার নির্ধারিত দামে ধান বিক্রি করতে পারছে না। এলাকা ভেদে মণ প্রতি ৫০০ টাকা থেকে ৬৫০ টাকা দরে ফড়িয়ারা কৃষকের কাছ থেকে ধান সংগ্রহ করছে। অথচ এক মণ ধান উৎপাদন করতে কৃষকের গুণতে হয় ৮০০ টাকা থেকে ৯০০ টাকা। ৩৩ শতাংশের জমি ৬ মাসের জন্য ভাড়া ৫৫০০ টাকা। এর মধ্যে জৈব সার বাবদ ৮০০ টাকা, রাসায়নিক সার ১৭০০ টাকা, চাষ ৮০০ টাকা, জমি তৈরি ৩০০ টাকা, রোপন ৮০০ টাকা, চারা ৬০০ টাকা, সেচ ১১০০ টাকা, নিড়ানি ১২০০ টাকা, বালাইনাশক ৯০০ টাকা, কর্তন ও মাড়াই ২৫০০ টাকা খরচ হয়। সব মিলে মোট খরচ ১৬,২০০ টাকা। ৩৩ শতাংশ জমিতে ধান উৎপাদন হয় ২০ মণ। প্রতি মণ ধান উৎপাদনে খরচ পড়ে ৮১০ টাকা। আর বাজারে ধানের মণ ৫০০ টাকা থেকে ৬৫০ টাকা। এতে মণ প্রতি লোকসান গুণতে হয় ১৫০ টাকা থেকে ৩০০ টাকা। মাঝখানে নিজের আর পরিবারের শ্রম দিতে হচ্ছে বেগার। এবার বোরো মৌসুমে যেখানে ১০ লাখ টন সিদ্ধ চাল কেনার লক্ষমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে সেখানে ধান কেনার লক্ষমাত্রা মাত্র দেড় লাখ টন। ধান সংগ্রহ কম করার ফলে আর সিন্ডিকেটের বাজার নিয়ন্ত্রণের কারণে কৃষক লোকসান গুণেই ফরিয়াদের কাছে ধান বিক্রি করতে বাধ্য হচ্ছে। কৃষক যদি এই ধানই মাসখানেক পর বিক্রি করতে পারতো তাহলে কিছুটা লাভের কাছাকাছি যেতে পারতো। গরিব কৃষকের যেখানে পরিবার নিয়ে মাথা গোজার ঠাঁই নিয়েই ঠাসাঠাসি করতে হয় সেখানে ধান রাখার জায়গা পাবে কোথায়। এছাড়া কৃষক ধান ফলাতে পরতে পরতে নানান মাধ্যমে ঋণগ্রস্ত হয়ে পরে। ফলে দ্রুতই ধান কেটে বিক্রি করতে বাধ্য হতে হয়। সরকারের উচিত ভেজা ধান কিনে সরকারি ব্যবস্থাপনায় চাতাল করে সংরক্ষণ করা। সেই সাথে চালের পরিমাণের চেয়ে অধিক পরিমাণে ধান ক্রয় করা। পাশাপাশি প্রতিটি ইউনিয়নে সরকারি শস্য ক্রয় কেন্দ্র চালু করে সরাসরি উৎপাদক কৃষকের কাছ থেকে ধান সংগ্রহ করা। সরকার ২০১০ সালে প্রণীত সংগ্রহ নীতিমালা সংশোধন ও সময়োপযোগী করে ‘অভ্যন্তরীণ খাদ্যশস্য সংগ্রহ নীতিমালা-২০১৭’ জারি করেছে। এ বছর বোরো ধান সংগ্রহ হবে এই নীতিমালার নির্দেশনায়। এই নীতিমালা সরকারের অঙ্গীকার। ‘অভ্যন্তরীণ খাদ্যশস্য নীতিমালার’ ‘লক্ষ ও উদ্দেশ্য’ অনুচ্ছেদে নির্দেশিত আছে। ধান সংগ্রহের মাধ্যমে ‘ক. উৎপাদক কৃষকদের উৎসাহ মূল্য প্রদান; খ. খাদ্যশস্যের বাজার দর যৌক্তিক পর্যায়ে স্থিতিশীল রাখা; গ. খাদ্য নিরাপত্তা মজুত গড়ে তোলা এবং ঘ. সরকারি খাদ্য বিতরণ ব্যবস্থায় সরবরাহ অব্যাহত রাখা।’ অথচ উৎপাদক কৃষকদের কাছ থেকে সরকার ধান কেনার ক্ষেত্রে নানা ধানাই-পানাই করে, ধান্ধাবাজ দলীয় লোকজন, ফড়িয়াদের কাছ থেকে ধান কিনছে। স্বয়ং খাদ্যমন্ত্রী সম্প্রতি এক সাক্ষাৎকারেও তা স্বীকার করেছেন। কিন্তু তিনি কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণে অপারগ। এছাড়াও এই নীতিমালায় ‘সংগ্রহ উৎস’ অনুচ্ছেদে উল্লেখ আছে, ‘কৃষকের কাছ থেকে সরাসরি সংগ্রহ মৌসুমে উৎপাদিত ধান ও গম এবং বৈধ ও সচল চাল কল মালিকদের কাছ থেকে চুক্তির বিপরীতে সংশ্লিষ্ট মৌসুমের ধান থেকে ছাঁটাই করা চাল সংগ্রহ করা হবে।’ এছাড়াও ‘ধান ও গম সংগ্রহ পদ্ধতি’তে বলা আছে– ক. উপজেলা সংগ্রহ ও মনিটরিং কমিটি উপজেলার ধান ও গম সংগ্রহ লক্ষ্যমাত্রা উৎপাদন অনুযায়ী ইউনিয়ন ওয়ারি বিভাজন করবে; উপজেলা ছবি কর্মকর্তার সরবরাহ করা মৌসুমে আবাদকৃত জমির পরিমাণ এবং সম্ভাব্য উৎপাদনের পরিমাণসহ ডাটাবেজ হতে প্রয়োজনীয় সংখ্যক কৃষক নির্বাচন করবে। প্রান্তিক ও মহিলা কৃষকদের অগ্রাধিকার দিয়ে কৃষক নির্বাচন করতে হবে। এ তালিকায় অন্তর্ভুক্ত কৃষকদের নিকট থেকে ধান ও গম ক্রয় করা হবে। ক্রয়কারী কর্মকর্তা কৃষি উপকরণ সহায়তা কার্ড/জাতীয় পরিচয়পত্রের ভিত্তিতে তালিকাভুক্ত কৃষকদের সনাক্ত করবেন। তালিকা বহির্ভূত কারো নিকট হতে ধান ও গম ক্রয় করা যাবে না। খ. অধিক সংখ্যক কৃষককে সুযোগ প্রদানের লক্ষ্যে উপজেলা কমিটি একজন কৃষকের নিকট থেকে সর্বনিম্ন ৩ বস্তা পরিমাণ অর্থাৎ ১২০ কেটি ধান ও ১৫০ কেটি গম এবং সর্বোচ্চ ৩ মেট্রিক টন পর্যন্ত ধান/গম সংগ্রহ পরিমাণ নির্ধারণ করতে পারবে। নির্ধারিত পরিমাণ ধান/গম একজন কৃষক কিস্তিতেও বিক্রি করতে পারবে।’ সংগ্রহ মৌসুমে কৃষকদের অবহিত করার জন্য ব্যাপকভাবে প্রচার করতে হবে বলেও উল্লেখ করা আছে খাদ্যশস্য সংগ্রহ নীতিমালায়। কিন্তু দেশের কোনো অঞ্চলেই এ সংক্রান্ত কোনো প্রচারণা নেই। কৃষক জানেই না সরকারের নির্ধারিত দাম বা সরকার কিভাবে ধান/গম ক্রয় করে। কাগজে-কলমে নীতিমালা আছে ঠিকই বাস্তবে দেশের প্রতিটি উপজেলায় সংগ্রহ লক্ষমাত্রা অনুযায়ী ধান/গম সংগ্রহ হলেও কোনো প্রান্তিক কৃষক এক ছটাক ধানও সরকারের কাছে নির্ধারিত দামে বিক্রি করতে পারেনি। দলীয় লোকজন আর সিন্ডিকেট ফড়িয়াদের কাছ থেকে ধান/গম ক্রয় করে এক লুটপাটের রাজত্ব কায়েম করছে সরকার। এভাবে কৃষক নিঃস্ব হয়ে এখন আর ধান উৎপাদন করতে চাচ্ছে না। আবার বেঁচে থাকার উপায় না পেয়ে লোকসান গুণেই প্রতিবার বাধ্য হচ্ছে জীবিকার তাগিদে বৃষ্টিতে ভিজতে, রোদে পুড়তে, কাদাপানিতে মাখামাখি করে বজ্রপাতের মুখোমুখি হতে। কৃষি বাঁচলে কৃষক বাঁচবে আর কৃষক বাঁচলেই দেশ বাঁচবে। কৃষককে বাঁচাতে ধান, গম, পাট, আলুসহ সকল প্রকার ফসলের লাভজনক দাম নিশ্চিত করতে হবে। প্রতিটি ইউনিয়নে সরকারি শস্য ক্রয় কেন্দ্র করে সরাসরি উৎপাদক কৃষকের কাছ থেকে ধান/গম ক্রয় করতে হবে। কৃষি উৎপাদন ব্যয় কমাতে বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন করপোরেশন (বিএডিসি)’কে সচল করে স্বল্পমূল্যে বীজ, সার, কীটনাশক সরবরাহ করতে হবে। বাজার নিয়ন্ত্রণকারী সিন্ডিকেট ভেঙে কৃষকের সিন্ডিকেট-সমবায় ব্যবস্থা চালু করতে হবে। কৃষি ঋণের জটিলতা কমিয়ে সহজ নিয়ম করতে হবে। কৃষকের ওপর সার্টিফিকেট মামলা প্রত্যাহার করতে হবে। আসন্ন জাতীয় বাজেটে কৃষিখাতে বরাদ্ধ ও ভর্তুকি বাড়াতে হবে। কৃষককে সরাসরি ভর্তুকি দিতে হবে। শস্য বীমা চালু করে ফসলের নিরাপত্তা ব্যবস্থা চালু করতে হবে। ভূমি অফিস ও পল্লী বিদ্যুতের অনিয়ম-হয়রানি-দুর্নীতি বন্ধ করতে হবে। হাওর অঞ্চলের কৃষকদের জন্য বিশেষ বরাদ্দ রাখতে হবে। কৃষকরাই দেশের প্রাণ। সরকার যখন কৃষককে উন্নয়নের নামে ঊননয়নে দেখে তখন অধিকার আদায়ের জন্য কৃষককেই প্রাণপণ লড়াই করতে হবে। কৃষকের সংকটময় জীবন-যাপনের যন্ত্রণার বলিরেখা দূর করতে সোনার ফসল ধান কৃষকের স্বপ্ন সফলের উপায়-অবলম্বন করতে সংগঠিত শক্তিসমাবেশ গড়ে তুলতে হবে। কৃষক সমিতি গড়ে তুলে ধারাবাহিক আন্দোলন সংগ্রামের মধ্য দিয়েই দাবি আদায় করতে হবে। শ্রমিক-কৃষক-মেহনতি মানুষের লড়াই সংগ্রাম ছাড়া এযাবত কোনো কিছু আদায় হওয়ার নয়–এই ব্যাপক বৈষম্য বণ্টনের সমাজ কাঠামোয়। লেখক : সহ-সাধারণ সম্পাদক, কেন্দ্রীয় কমিটি, বাংলাদেশ কৃষক সমিতি

Print প্রিন্ট উপোযোগী ভার্সন



Login to comment..
New user? Register..