নিরাপত্তাহীনতায় নারী

Facebook Twitter Google Digg Reddit LinkedIn StumbleUpon Email
সাম্প্রতিক সময়ে সারাদেশে নারী-শিশু নির্যাতন ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে। গত ৬ মে কিশোরগঞ্জের বাজিতপুরে স্বর্ণলতা পরিবহনের চলন্ত বাসে ইবনে সিনা হাসপাতালের সিনিয়র স্টাফ নার্স শাহিনুর আক্তার তানিয়াকে গণধর্ষণ শেষে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়। শুধু কিশোরগঞ্জের বাসে এই বর্বরতায় নয়, সারাদেশেই নারী-শিশু নির্যাতন-ধর্ষণ-হত্যা ক্রমান্বয়ে বেড়েই চলেছে। প্রতিদিন পত্রিকা খুললেই খুন-ধর্ষণ-অপহরণ-নির্যাতনের ঘটনা। একটি নির্যাতনের ঘটনা বীভৎসতায়, বর্বরতায় আগেরটিকে ছাপিয়ে যাচ্ছে। আর সবকিছু যেন আমাদের গা সওয়া হয়ে যাচ্ছে। গত পাঁচ বছরে বাংলাদেশে ৩ হাজার ৫৮৭ জন নারী ধর্ষণের শিকার হয়েছেন। ধর্ষণের পর হত্যা করা হয়েছে ২৭৮ জনকে। ধর্ষণের শিকার নারীদের মধ্যে ৮৬ শতাংশই শিশু ও কিশোরী। ৬ বছর থেকে ১২ বছর বয়সী মেয়েরাই সবচেয়ে বেশি ধর্ষণের শিকার। এই মে মাসের প্রথম ৮ দিনেই ৪১ জন শিশুকে ধর্ষণ করা হয়েছে। চলতি বছরের প্রথম তিনমাসে ১৮৯ জন নারী ধর্ষণের শিকার হন। এর মধ্যে ১৫ জনকে ধর্ষণের পর হত্যা করা হয়। অনেক ধর্ষণের খবর সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিতও হয় না। এই সমাজে নারী, শিশু কেউই নিরাপদ নয়। ঘরে-বাইরে, মাঠে-ঘাটে, অফিস-আদালতে, বিশ্ববিদ্যালয়ে, বাসে, ট্রেনে, লঞ্চে, নৌকায়, হাটে-বাজারে, ধর্মালয় কোথাও আজ নারীদের জন্যে নিরাপদ নয়। ভয়াবহ বিষয় হলো, ধর্ষণের পর খুনও করা হচ্ছে। ফেনীর সোনাগাজীতে মাদ্রাসার শিক্ষকের যৌনাপরাধ ঢাকতে মাদ্রাসাছাত্রীকে আগুনে পুড়িয়ে মারার ঘটনা একটা উদাহরণ মাত্র। শিকারের মধ্যে শিশু আছে, নারী আছেন, বালক আছে। শিকারি কিন্তু পুরুষই। মানবিক মূল্যবোধ তৈরির কাজটা আমাদের শিখাতে হবে নিজের ঘর থেকে। নিজের শিশুটাকে দিতে হবে মূল্যবোদের শিক্ষা। ঘরের শিশুই একদিন ঘরে কিংবা রাস্তায় বের হলে, খেলার ছলেও যেন সে একজন নারীকে, একজন শিশুকে, একজন মানুষকে অপমানিত না করে। পাশাপাশি পরিবারে, স্কুলে, গণমাধ্যমে, নাটকে, গানে, সিনেমায় নারীকে হেয়জ্ঞান করা বন্ধ করতে হবে। সচেতন ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে যারা নারীতে কেবলই ভোগপণ্য হিসেবে সমাজের চোখে উপস্থাপন করতে চায়, যারা নারীকে শরীরসর্বস্ব বলে হাজির করতে চায় তাদের ললুপ চেহারাগুলো সমাজকে চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিতে হবে। এদের প্রতি ঘৃণা আর থু থু ছুড়ে দিতে হবে। অন্যদিকে নারীকে নারীর সমানাধিকার, সমমর্যাদা, সমান অংশগ্রহণ নারীকে অধস্তন ভাবা, নির্যাতনযোগ্য ভাবা বন্ধ করতে হবে। পাশাপাশি বিশেষত যা দরকার তা হলো বিচারব্যবস্থা। রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থাকে কার্যকর করা। বর্তমানে দেশের চালচিত্রটা এমন যে, ভুক্তভোগীরা নারী-শিশু নির্যাতনের বিচার চাইতে গেলেও তাদের সবচেয়ে বেশি অপদস্থের শিকার হয়, পদে পদে বাধার সম্মুখীন হতে হয়। নারী-শিশু নির্যাতন এতো ভয়াবহ মাত্রায় আসার একটি অন্যতম কারণ বিচার না হওয়া। এর আগে চলন্ত বাসে ধর্ষণের পর কলেজছাত্রী রুপা হত্যা মামলার আসামিদের ফাঁসির রায় অনুমোদনের জন্য এক বছরেরও বেশি সময় আগে হাইকোর্টে ডেথ রেফারেন্স পাঠানো হলেও তার ওপর এখনো শুনানিই হয়নি। ২০১৭ সালে টাঙ্গাইলে বাসে নিহত রূপা হত্যার বিচারকাজ এক বছর ধরে ঝুলে আছে। ৩ বছর হয়ে গেছে তনু হত্যা মামলার চার্জশিটই গঠিত হয়নি। আর কল্পনা চাকমার অপহরণ মামলার তো ২১ বছর পার হয়ে গেল। আমরা জানি, নির্যাতনের যত ঘটনা দেশে ঘটে তার অধিকাংশ ক্ষেত্রে মামলা হয় না। যেসব ক্ষেত্রে মামলা হয় সেগুলোও বছরের পর বছর ঝুলতে থাকে। সহজে নিষ্পত্তি হয় না। দেখা যায়, যে মামলাগুলোর নিষ্পত্তি হয়েছে তার মাত্র ৩ শতাংশের সাজা হয়েছে। একের পর এক ধর্ষণের ঘটনার যদি বিচার হতো, যদি ধর্ষক দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি পেতো, তাহলে ধর্ষকরা ভয় পেতো। আমাদের আবারও জাগতে হবে আর দোষীদের বিচার এবং শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে। নারী-শিশুর অবমাননা, ধর্ষণ, যৌন হয়রানির বিরুদ্ধে একটা সামাজিক আন্দোলন, সামাজিক প্রতিরোধের আন্দোলন গড়ে তুলতে হবে। অন্যথায় ধর্ষণ-নির্যাতন-নিপীড়নকারীদের বর্বরতা বাড়তেই থাকবে।
সম্পাদকীয়
কৃষকের দুর্দশা

Print প্রিন্ট উপোযোগী ভার্সন



Login to comment..
New user? Register..