কথা রাখেনি বিজেএমসি, পাটকল শ্রমিকদের ধর্মঘটের ডাক

Facebook Twitter Google Digg Reddit LinkedIn StumbleUpon Email

বকেয়া পাওনার দাবিতে ডেমরায় লতিফ বাওয়ানী ও করিম জুট মিলের শ্রমিকদের ধর্মঘট ও সড়ক অবরোধ
একতা প্রতিবেদক : শ্রমিকদের বকেয়া পাওনা পরিশোধের প্রতিশ্রুতি দিয়েও কথা রাখেনি বাংলাদেশ পাটকল করপোরেশন (বিজেএমসি)। এর ফলে রাষ্ট্রায়ত্ত পাটকলের শ্রমিকেরা আবারও রাস্তায় নেমে আসার ঘোষণা দিয়েছেন। সারাদেশে আগামী ১৩ মে থেকে অনির্দিষ্টকালের শ্রমিক ধর্মঘট ডেকেছেন পাটকল শ্রমিকরা। একই সঙ্গে সড়ক ও রেলপথ অবরোধ করে রাজপথেই ইফতারের ঘোষণা দিয়েছেন তাঁরা। মজুরি না পাওয়ায় সবশেষ গত ৫ মে রাতে খুলনা-যশোর অঞ্চলের তিনটি পাটকলের শ্রমিকররা কাজ বন্ধ করে দেন। পরদিন ৬ মে আরো ছয়টি পাটকলের শ্রমিক তাদের সঙ্গে আন্দোলনে যোগ দেন। এতে সব পাটকলে উৎপাদন বন্ধ হয়ে যায়। এর আগে বাংলাদেশ পাটকল শ্রমিক লীগ এবং সিবিএ ও নন-সিবিএ পরিষদ যৌথভাবে ১২ দফা দাবিতে এই ধর্মঘটের ডাক দিয়েছিল। এই দাবিতে শ্রমিকরা এপ্রিল মাসে দুই দফা ধর্মঘট পালন করেন এবং নির্দিষ্ট সময়ের জন্য রেল ও রাজপথ অবরোধ করে বিক্ষোভ দেখান। পূর্বঘোষণা অনুযায়ী শ্রমিকরা ১৫ এপ্রিল থেকে ৯৬ ঘণ্টার ধর্মঘট শুরু করেন। ধর্মঘটের প্রথম দিন বিকেলেই ঢাকায় শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে শ্রমিক নেতাদের সঙ্গে বৈঠকের জন্য আমন্ত্রণ জানানো হয়। শ্রম অধিদপ্তরের সভাকক্ষে অনুষ্ঠিত এ বৈঠকে শ্রম ও কর্মসংস্থান প্রতিমন্ত্রী মন্নুজান সুফিয়ানসহ বিজেএমসি’র ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন। বৈঠকে কতগুলো সিদ্ধান্ত হয়। তার মধ্যে রয়েছে- ২৫ এপ্রিলের মধ্যে ১০ সপ্তাহের বকেয়া মজুরি পূবের হারে এবং তিন মাসের বেতন পরিশোধ করা হবে। পবিত্র শবেবরাত উপলক্ষে শ্রমিকদের এক সপ্তাহের মজুরি মিল থেকে পরিশোধ করা হবে। এরপরই ধর্মঘট প্রত্যাহারের ঘোষণা দেওয়া হয়। কিন্তু সেই প্রতিশ্রুতি মতো শ্রমিকরা বকেয়া বেতন না পাওয়ায় ফের ৫ মে থেকে তিনদিনের ধর্মঘটে যায়। খুলনার খালিশপুর জুটস মিলসের সিবিএ সভাপতি আবু দাউদ দ্বীন মোহাম্মদ বলেন, ‘বারবার প্রতিশ্রুতি দেয়া হলেও তা পূরণ হচ্ছে না। এর আগে একবার ২৮ মার্চের ভেতর বকেয়া বেতন ও অন্যান্য পাওনা পরিশোধের কথা বলা হয়েছিল। কিন্তু হয়নি। পরে আবার আন্দোলন শুরু হলে ২৫ এপ্রিলের মধ্যে দাবি-দাওয়া পূরণের প্রতিশ্রতি দেয়া হয়। এবারও তা পূরণ হয়নি। শ্রমিকরা স্ব-উদ্যোগে ধর্মঘট ডেকেছেন। আমরা শ্রমিক লীগের পক্ষ থেকে সিবিএ ও নন-সিবিএ নেতারা সমর্থন দিয়েছি।’ কার্পেটিং জুট মিলসের সিবিএ সাধারণ সম্পাদক নজরুল ইসলাম বলেন, ‘আমরা নয় দফা দাবি দিয়েছিলাম। সেই দাবি বাস্তবায়ন হয়নি। বকেয়া মজুরি রয়েছে ১২ থেকে ১৩ সপ্তাহের। বকেয়া বেতন রয়েছে তিন মাসের। জাতীয় মজুরি কমিশন বাস্তবায়ন হয়নি। বারবার আশ্বস্ত করা হলেও আমাদের দাবি পূরণ করা হয় না। চুক্তি অনুযায়ী ২৫ তারিখের মধ্যে আমাদের সব দাবি পূরণের কথা ছিল। চুক্তির কোনো একটি বিষয়েরও বাস্তবায়ন ঘটায়নি সরকার।’ তবে এ ব্যাপারে বাংলাদেশ পাটকল করপোরেশনের (বিজেএমসি) চেয়ারম্যান শাহ মোহাম্মদ নাসিম বলেন, ‘বিজেএমসি’র হাতে টাকা থাকলে দিতে সমস্যা ছিল না। অর্থমন্ত্রী দেশের বাইরে ছিলেন। আমরা তাঁর অপেক্ষায় ছিলাম। প্রধানমন্ত্রী এখন দেশের বাইরে। তিনি দেশে ফিরলেই আশা করি ১০ মে থেকে এ সমস্যার সমাধান হয়ে যাবে। তিনি দেশে ফেরার পরই ভালো খবর পাওয়া যাবে। দ্রুতই বরাদ্দ পাওয়া যাবে বলে আমরা আশা করছি।’ এদিকে, প্রতিশ্রুতি পূরণ না হওয়ায় সারাদেশের পাটকলে আগামী ১৩ মে থেকে অনির্দিষ্টকালের শ্রমিক ধর্মঘটের ঘোষণা এসেছে। ধর্মঘট চলাকালে প্রতিদিন বিকেল ৪টা থেকে সন্ধ্যা ৭টা পর্যন্ত রাজপথ-রেলপথ অবরোধ করা হবে। এবং রাজপথে ইফতার করার ঘোষণা দিয়েছেন শ্রমিকরা। গত ৮ মে বিজেএমসি শ্রমিক ও কর্মচারী ইউনিয়নের (সিবিএ) কার্যালয়ে পাটকল শ্রমিক লীগ ও সিবিএ ও নন-সিবিএ’র বৈঠকে ওই সিদ্ধান্ত আসে। আন্দোলনরত শ্রমিক নেতারা জানান, খুলনার রাষ্ট্রায়ত্ত ক্রিসেন্ট, প্লাটিনাম, খালিশপুর, দৌলতপুর, স্টার, আলিম, ইস্টার্ন এবং যশোরের কার্পেটিং ও জেজেআই জুট মিলে বর্তমানে ১৩ হাজার ২৭১ শ্রমিক কাজ করছেন। মজুরি বকেয়া থাকায় শ্রমিকরা পরিবারের সদস্যদের নিয়ে অর্ধাহারে-অনাহারে দিন কাটাচ্ছেন। শ্রমিকদের ঘোষিত দাবির মধ্যে রয়েছে- সরকারঘোষিত জাতীয় মজুরি ও উৎপাদনশীলতা কমিশন-২০১৫ সুপারিশ বাস্তবায়ন, অবসরপ্রাপ্ত শ্রমিক-কর্মচারীদের পিএফ গ্র্যাচুইটি ও মৃত শ্রমিকের বিমার বকেয়া টাকা প্রদান, টার্মিনেশন ও বরখাস্ত শ্রমিকদের কাজে পুনর্বহাল, শ্রমিক-কর্মচারীদের নিয়োগ ও স্থায়ীকরণ, পাট মৌসুমে পাট ক্রয়ের অর্থ বরাদ্দ, উৎপাদন বৃদ্ধির লক্ষ্যে মিলগুলোকে পর্যায়ক্রমে বিএমআরই করা। বিজেএমসির অধীনে ঢাকা, চট্টগ্রাম ও খুলনা জোনে মোট ২৬টি পাটকল রয়েছে। তার মধ্যে চট্টগ্রাম জোনে রয়েছে আমিন জুট মিলস লিমিটেড ও ওল্ড ফিল্ডস লিমিটেড, গুল আহমেদ জুট মিলস লিমিটেড, হাফিজ জুট মিলস লিমিটেড, এমএম জুট মিলস লিমিটেড, আরআর জুট মিলস লিমিটেড, বাগদাদ-ঢাকা কার্পেট ফ্যাক্টরি লিমিটেড, কর্ণফুলী জুট মিলস লিমিটেড, ফোরাত কর্ণফুলী কার্পেট ফ্যাক্টরি, গালফ্রা হাবিব লিমিটেড ও মিলস ফার্নিসিং লিমিটেড। অন্যদিকে খুলনায় রয়েছে ক্রিসেন্ট, প্লাটিনাম, খালিশপুর, দৌলতপুর, স্টার, ইস্টার্ন, আলিম এবং যশোরের জেজেআই ও কার্পেটিং জুট মিল। ডেমরা-যাত্রাবাড়ী ও ডেমরা-রামপুরা সড়ক অবরোধ আন্দোলনের অংশ হিসেবে গত ৭ মে সকাল থেকে কয়েকশ শ্রমিক ডেমরা-যাত্রাবাড়ী ও ডেমরা-রামপুরা সড়ক অবরোধ করে রাখেন। রাস্তায় গাছের গুঁড়ি ফেলে এবং টায়ায়ে আগুন জ্বালিয়ে যান চলাচল বন্ধ করে দেয় শ্রমিকরা। সকাল ৮টা থেকে লতিফ বাওয়ানী জুট মিল ও করিম মিলের শ্রমিকরা অবরোধ কর্মসূচি পালন করে। ওই দুই মিলের শ্রমিকরা কাজে যোগ না দিয়ে রাস্তায় অবস্থান নেন। এ সময় পাটকলের শ্রমিকরা বলেন, আমাদের রোজা, নামাজ, ঈদ সব রাস্তায় হবে। আমাদের পাওনা দেওয়ার কথা ছিল, অথচ আমরা এখনও তা পাইনি। আমরা এতদিন ঘরে থাকার চেষ্টা করেছি। এখন আর থাকা যাচ্ছে না। কারণ আমরা ঋণে জর্জরিত।

Print প্রিন্ট উপোযোগী ভার্সন



Login to comment..
New user? Register..