বৈশাখী রাজস্ব বনাম শোষিত সমাজের মুনাফা

Facebook Twitter Google Digg Reddit LinkedIn StumbleUpon Email
মো: নজরুল ইসলাম : সৌর পঞ্জিকানুসারে বাংলা বার মাস মুঘল আমলেরও অনেককাল আগে থেকেই পালিত হইত। এই পঞ্জিকা শুরু হইত গ্রেগীয় পঞ্জিকায় এপ্রিল মাসের মাঝামাঝি সময় হইতে। সৌর বছরের প্রথম দিন আসাম, বঙ্গ, কেরালা, মণিপুর, নেপাল, উড়িষ্যা, পাঞ্জাব, তামিলনাডু ও ত্রিপুরায় সংস্কৃতির অবিচ্ছেদ অংশ হিসেবে অনেক আগে থেকেই পালিত হইত। এখন যেমন নববর্ষ নতুন বছরের শুরুতেই একটি সার্বজনীন উৎসবে পরিণত হয়েছে, একসময় এমনটি ছিল না। তখন নববর্ষ বা পহেলা বৈশাখ আর্তব উৎসব তথা ঋতুধর্মী উৎসবে পালিত হতো। তখন এর মূল তাৎপর্য্য ছিল কৃষিকাজ। কারণ প্রাযুক্তিক প্রয়োগের যুগ শুরু না হওয়া পর্যন্ত কৃষকদের ঋতুর উপরেই নির্ভর করতে হতো। এক সময় বাংলা সনের মূল নাম ছিল তারিখ এ এলাহী। মোঘল সম্রাট আকবর ১৫৮৫ সালে তার রাজত্বকালে ২৯তম বর্ষের ১০ কিংবা ১১ মার্চ তারিখে এক ডিক্রি জারির মাধ্যমে তারিখ এ এলাহী প্রবর্তন করেন। সিংহাসনে আরোহনের পরপরই তিনি একটি বৈজ্ঞানিক, কর্মপোযোগী ও গ্রহণযোগ্য বর্ষপুঞ্জি প্রবর্তনের প্রয়োজনীয়তা উপলব্ধি করেন, যেখানে দিন ও মাসের হিসাবটা যথাযথ থাকবে। এই উদ্দেশ্যকে সামনে রেখে তিনি তৎতকালীন প্রখ্যাত বিজ্ঞানী ও জ্যোতির্বিদ আমীর ফতুল্লাহ সিরাজীকে নতুন বর্ষপঞ্জি তৈরির দায়িত্ব প্রদান করেন। বিখ্যাত পণ্ডিত ও সম্রাট আকবর এর মন্ত্রী আবুল ফজল এ সমন্ধে ব্যাখ্যা প্রদান করেন যে, হিজরী বর্ষপঞ্জি কৃষিকাজের জন্য মোটেও উপযোগী ছিল না। কারণ চন্দ্র বছরের ৩১ বছর হয় সৌর বছরের ৩০ বছরের সমান। চন্দ্র বছরের হিসাবেই তখন কৃষকদের নিকট থেকে রাজস্ব আদায় করা হতো। অথচ চাষবাস নির্ভর করত সৌর বছরের হিসাব মত। চন্দ্র বছর হয় ৩৫৪ দিনে, আর সৌর বছর ৩৬৫ বা ৩৬৬ দিনে। ফলে দুটি বর্ষপঞ্জির মধ্যে ব্যবধান দেখা যায় ১১ বা ১২ দিন। বাংলা সনের জন্ম ঘটে সম্রাট আকবরের এই রাজস্ব আদায়ের অভিনব কায়দার পেক্ষাপটে। অনুমান করা হয় বারটি নক্ষত্রের নাম নিয়ে পরবর্তীকালে নামকরণ করা হয় বাংলা মাসের। বিশাখা নক্ষত্র থেকে বৈশাখ, জায়িস্তা থেকে জৈষ্ঠ্য, শার থেকে আষাঢ়, শ্রাবণী থেকে শ্রাবণ, ভদ্রপদ থেকে ভাদ্র, আশ্বায়িনী থেকে আশ্বিন, কার্তিকা থেকে কার্তিক, আগ্রহায়ন থেকে অগ্রহায়ন, পৌউসা থোকে পৌষ, ফাল্গুনী থেকে ফাল্গুন, এবং চিত্রা নক্ষত্র থেকে চৈত্র। আনুষ্ঠানিকভাবে পহেলা বৈশাখ উদযাপন এর রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি সম্রাট আকবরই প্রদান করেন। তার আমলে রাজ্যে ১৪ টি উৎসব পালন হইত মহাসমারহে ও ধুমধামে। তারমধ্যে অন্যতম ছিল নওরোজ বা নববর্ষ উৎসব। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য যে ইতিবাচক চর্চাগুলো হ্রাস পেয়ে নেতিবাচক চর্চা প্রসারিত হচ্ছে। বৈশাখী মিলন মেলায় আনন্দের পাশাপাশি আগে থেকেই কমবেশি গ্রামীণ মেলা, হাতের তৈরি খেলনা গহনা পোশাকসহ বিভিন্ন আয়োজনে সীমিত আকারে অর্থনৈতিক দেনদরবার চলত। এদিক থেকে সামষ্টিক অর্থনীতিতে এর প্রভাবও কমবেশি দেখা যেত। অর্থনীতির ভাষায় টাকার যত বিনিময় ঘটবে অর্থনীতির চাকা তত গতিশীল থাকবে। সময়ের আবর্তে আধুনিকতার দাপটে এটি আজ উৎসব থেকে মহোৎসবে পরিণত হয়েছে। এই দিনকে কেন্দ্র করে এখন কারবার, ফটকা কারবার এবং বাজার অর্থনীতির নির্ভরশীলতাকে পিছনে ফেলে মুনাফাই যখন মূখ্য তখন বাকি সব আয়োজন হয়ে যাচ্ছে তুচ্ছ। বর্তমান মুনাফাকেন্দ্রিক উৎসব বহুকেন্দ্রিক নয় এককেন্দ্রিক। সেটি হলো বাজার কেন্দ্রিক মনোপলি ব্যবসা, যেটি গুটিকয়েক পরিবারকে ধনী থেকে আরো ধনী করছে। একদিকে আমরা দেখছি লোকায়ত সংস্কৃতির উপাদানগুলো হারিয়ে যাচ্ছে অন্যদিকে ভোগবাদীরা সেই উপাদনগুলোকে আত্মসাৎ করে তাকে প্যাটেন্টসহ নতুন রূপ দিয়ে গুটি কয়েক কোম্পানি বাজার দখলের প্রতিযোগিতায় নেমেছে এবং তারা বিজয়ীও বটে। যেমন- কৃষক নিজ হাতে সরিষার তৈল করে সংসার সামলাতেন। গ্রামে তৈল উৎপাদনকারীকে কুলু বলা হইত। তারা গাওয়াল করত। বৈশাখের দিন হাতের তৈরি তৈল দিয়ে ভর্তাসহ অন্যন্য তরকারির জুরি মেলা ছিল না। কাসিন্দ তৈরি ও গাওয়াল করা ছিল হিন্দুদের বিশেষ সম্প্রদায়ের প্রধান পেশা। হলুদ, মরিচ, আদাসহ অধিকাংশ মসলা নিজেরাই তৈরি করত এবং পাটায় বেটে রান্না করার মজাই ছিল আলাদা। মাটির হারিতে রান্না, বাসনে খাবার, কলাপাতায় সিরনী, পাটিতে দাওয়াত, হাতে ভাজা মুরি, খই, বিন্নিসহ হরেক রকমের খাবার ও তৈজসপত্রের ইয়ত্তা নেই। এগুলোর নাম ঠিক রেখে রূপ পরিবর্তন করে নতুন মোড়কে সাজিয়ে বেক্সিমকো, স্কয়ার, একমি, আরএফএলসহ গুটি কয়েক কেম্পানির করায়ত্বে জিম্মি হয়েছে এবং মুনাফার দরদামে ওঠানামা করছে উৎসবকেন্দ্রিক বৈশাখী উপাদান। সাংস্কৃতিক চর্চাগুলোতে অপসংস্কৃতির ছত্রছায়া চরমভাবে বিদ্যমান। যেমন: গান-বাজনায় আধুনিক সাজসরঞ্জাম, উচ্চতর ভলিওমের বাদ্যযন্ত্র, বিদেশি ভাষার গান কোমলমতি তরুণ প্রজন্মকে দ্রুত আকৃষ্ট ও নিজস্ব সংস্কৃতি থেকে বিপথগামী করছে। বিশ্বায়নের এই যুগে এগুলো দিয়ে আসক্তি করে প্রযুক্তির মাধ্যমে মুনাফা লুফে নিচ্ছে বিদেশি কর্পোরেট কোম্পানিগুলো। বাজার অর্থনীতিতে মানুষ নিজেই যখন পণ্যে পরিণত হয়েছে তখন উৎসব সম্পর্কিত লেখার আকার এই লেখায় আর বাড়াতে চাই না শুধুমাত্র উপাদানগুলোর কয়েকটি উদাহরণ টানলাম বিশ্লেষণ নয়। নতুন স্বপ্নে জ্বলজ্বল করে উঠুক আমাদের দুই নয়ন, আমাদের হৃদয় নত হোক মানবতার প্রার্থনায়, হাত শক্তিশালী হোক ও চিন্তার জগত সংগঠিত হোক। নুসরাত জাহান রাফির সাহসী প্রতিরোধ ভেঙে দিক নীরবতার সংস্কৃতি এবং আন্দোলন গড়ে উঠুক শোষিত সমাজের বিরুদ্ধে। আমরা এখনো বিশ্বাস ও আস্থা রাখি পশ্চাৎপদ শ্রেণির প্রতি- যাদের হাতে সৃষ্টি হবে নতুন পৃথিবী এবং সাংস্কৃতিক জাগরণের মাধ্যমে যারা গড়বে বহুত্ববাদী সামাজিক ন্যায্যতার কাঙ্ক্ষিত সমাজ।

Print প্রিন্ট উপোযোগী ভার্সন



Login to comment..
New user? Register..