লুটপাটের অর্থনীতি

Facebook Twitter Google Digg Reddit LinkedIn StumbleUpon Email
আমাদের দেশকে সমাজ, অর্থনীতি, রাজনীতি, নীতি-নৈতকিতা, সামাজিক দর্শন ও মনস্তত্ত্ব ইত্যাদি ক্ষেত্রে মৌলিক অবক্ষয় গ্রাস করে ফেলছে। এর অনেক কিছুই সহজে চোখে ধরা পড়ে না কিন্তু অনুভব করা যায়। কোনটাই বিচ্ছিন্ন নয়। একটি থেকে আরেকটি জন্ম নিচ্ছে। অবক্ষয়-অধোগতি সর্বত্র বিস্তৃত হয়ে পড়েছে। এক শতাব্দীর মধ্যে এ দেশের মানুষ তিন-তিনবার তাদের ‘দেশ’ বদল হতে দেখেছে। দেশ বদলের পাশাপাশি ডজন-ডজনবার দেশের ‘সরকার’ বদল হয়েছে। অথচ কোনো কিছুতেই মানুষের ‘অবস্থার’ মৌলিক কোনো বদল সাধিত হয়নি। দারিদ্র্য, বৈষম্য, দুঃসহ জীবন যন্ত্রণা, অনিশ্চয়তা, শোষণ, লুটপাট, ঘুষ-দুর্নীতি, সন্ত্রাস, সরকারের দমন-পীড়ন, ভুয়া ভোট, গণতন্ত্রহীনতা, সাম্প্রদায়িক শক্তির আস্ফালন, সাম্রাজ্যবাদের শোষণ-ডিকটেশন– এসবের অবসান হওয়ার পরিবর্তে তা অব্যাহতই আছে। অনেক ক্ষেত্রে এসব যন্ত্রণা ও বিপদ বরঞ্চ বাড়ছে। এই দুঃসহ জীবনের বদল হওয়ার সম্ভাবনা একবার সৃষ্টি হয়েছিল একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধের পরে। কিন্তু সে আলোকিত সম্ভাবনা সহসাই নিভে গিয়েছিল। মানুষের মনের স্বাভাবিক প্রশ্ন– এমনটি কেন ঘটে চলেছে যুগ যুগ ধরে? দেশের রাজনীতিতেও বিরামহীন অস্থিরতা, নৈরাজ্য ও অনিশ্চয়তার অবসান ঘটার কোনো ভিত্তি এখনো রচিত হচ্ছে না। এ অবস্থা থেকে পরিত্রাণের জন্য মানুষ বার বার আশায় বুক বেঁধেছে। প্রতিবার যখন সরকার বদল হয়েছে, নতুন কোনো শক্তি গদিতে আসীন হয়েছে, মানুষ প্রত্যাশা করেছে যে এবার হয়তো অবস্থার হেরফের হবে। মুক্তিযুদ্ধের ধারা তথা জাতীয়তাবাদ, সমাজতন্ত্র, গণতন্ত্র, ধর্মনিরপেক্ষতার ৪ মূলনীতির ভিত্তিতে দেশ পরিচালিত হবে। রাজনীতিতে স্থীতিশীলতা প্রতিষ্ঠা হবে। কিন্তু তাদের সেই আশা কোনবারই পূরণ হচ্ছে না। আমাদের দেশে চলছে ‘সাম্রাজ্যবাদনির্ভর উন্মুক্ত ও অবাধ বাজার অর্থনীতির’ ব্যবস্থা। এই ব্যবস্থায় দেশের যে সম্পদ তৈরি হচ্ছে তার প্রায় অর্ধেকটাই জমা হচ্ছে মুষ্ঠিমেয় ব্যক্তির অপ্রদর্শিত ও অবৈধ আয় হিসেবে। এই বেআইনি সম্পদকেই প্রচলিত ভাষায় বলা হয় কালো টাকা। সাবেক অর্থমন্ত্রী স্বয়ং বলেছিলেন যে এই কালো টাকার পরিমাণ জিডিপির ৮০ শতাংশ পর্যন্ত হওয়াটা অসম্ভব নয়। এই কালো টাকার সবটাই রয়েছে দেশের ১ শতাংশ লুটেরা বিত্তবানদের হাতে। এদিকে জিডিপির সিংহভাগও রয়েছে এদেরই হাতে। এ থেকেই অনুমান করা যায় যে বিপুল দারিদ্র্যের এই দেশে কিরূপ পাহাড় পরিমাণে লুটপাট চলছে। চলতি ‘সিস্টেম’ যতোদিন বহাল থাকবে, ততোদিন এই দু’টি দলের কারো পক্ষেই এসব অপশক্তিকে দল থেকে বিতাড়িত করার সুযোগ নেই। কারণ তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে গেলে তৎক্ষণাৎ তারা বিপক্ষ দলের খাতায় নাম লেখাবে। এই দুর্বৃত্ত ক্যাডাররা ভালভাবেই জানে যে সেই ‘পাল্টা’ দল সমাদরের সাথে তাদেরকে আশ্রয় দিবে। উভয় দলই মূলত: লুটপাটের সুযোগের লোভে যেনতেন উপায়ে ক্ষমতায় যাওয়ার লালসার কাছে জিম্মি হয়ে আছে। অন্যদিকে, দু’টি দলের ক্ষেত্রেই ক্ষমতায় যেতে পারার বিষয়টি জিম্মি হয়ে পড়েছে দুর্বৃত্ত ক্যাডার বাহিনী দ্বারা পুষ্ট পেশীশক্তির হাতে। এই ‘সিস্টেমকে’ বহাল রাখার জন্য চলতি রাজনীতিকে কতগুলো কাঠামোগত ব্যবস্থার মধ্যে আটকে ফেলা হয়েছে। এসব কাঠামোগত উপাদানের ভারসাম্যপূর্ণ পরস্পর সংযুক্তির ফলাফল হিসেবেই গোটা ‘সিস্টেমের’ চরিত্র ও স্বরূপ নির্ধারিত হয়। এই ভারসাম্যই ‘সিস্টেমের’ টিকে থাকতে পারাটা নিশ্চিত করে। ‘সিস্টেমেই’ হয়ে ওঠে সবকিছুর নিয়ন্ত্রক। এমনকি ‘সিস্টেমবিরোধী’ কিছু সীমিত প্রতিবাদ ও বিরোধিতাকে ধারণ করার সক্ষমতাও সেই ‘সিস্টেমের’ মধ্যেই রয়েছে। এসব হলো ‘সিস্টেমের’ কাঠামোকে উপড়ে ফেলার বিপদ থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্য ‘সিস্টেম দ্বারাই সৃষ্ট’ ‘সিস্টেমবিরোধী’ প্রয়াস। সুশাসন নিশ্চিত করার একটি পূর্বশর্ত হলো সৎ লোকের শাসন নিশ্চিত করা। তাই বলতে হয়, “সবার উপরে ‘সিস্টেম’ সত্য, তাহার উপরে নাই”। ‘সিস্টেম’ যদি ভালো হয়, এবং যদি তার দক্ষ পরিচালনা নিশ্চিত করা যায় তাহলে মানুষের অবস্থার মৌলিক অগ্রগতি সাধন করা সম্ভব হবে। কিন্তু ‘সিস্টেম’ যদি রুগ্ন হয়, তাহলে তা যতো দক্ষতার সাথেই পরিচালনা করা হোক না কেন, তার দ্বারা মানুষের অবস্থার মৌলিক অগ্রগতি সাধন করা যাবে না। ‘দেশ বদল হয়, সরকার বদল হয়– অথচ মানুষের অবস্থার বদল হয় না কেন’– মানুষের এই জিজ্ঞাসার জবাব রয়েছে এই সত্যের মাঝে। তাই সরকার বদলের পাশাপাশি ‘ব্যবস্থারও’ বদল ঘটাতে হবে। ‘সিস্টেমের’ বিরুদ্ধে লড়াইয়ে সাফল্য ছাড়া সাধারণ মানুষের মুক্তি নেই। লড়াই চালাতে হবে সেই লক্ষ্যে।

Print প্রিন্ট উপোযোগী ভার্সন



Login to comment..
New user? Register..