বাঙালির মনস্তাত্ত্বিক ভাবনা প্রেক্ষিত পহেলা বৈশাখ

Facebook Twitter Google Digg Reddit LinkedIn StumbleUpon Email
আকমল হোসেন : আজকের বিশ্বে সাতশ’ কোটি মানুষের মধ্যে প্রায় ২ হাজার ৯০০ রকমের ভাষাভাষির মানুষ এবং লোকাচারগত বৈশিষ্ট্যে অসংখ্য জাতির উপস্থিতি দৃশ্যমান। মানবিকতা, স্বাধীন চিন্তা, পরমত সহিষ্ণুতা, বন্ধুত্বমূলক স্বভাব, আন্তরিকতার নানান লোকাচার ও চিরায়ত ঐক্যে সমৃদ্ধরাই জাতি বলে বিবেচিত। তবে সংকীর্ণ জাতীয়তাবোধ বিশ্ব ভ্রাতৃত্বের ক্ষেত্রেই নয়, মিলেমিশে বসবাসের ক্ষেত্রেও বিপদজন?, তার উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত–হিটলার কর্তৃক জার্মান জাতিকে বড় করে দেখা। অর্থবিত্ত, ক্ষমতা, পেশীশক্তি আর রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি জাতীয়তার কমন বৈশিষ্ট্যের শক্তিকে যেমন দুর্বল করেছে, তেমনি তুলনামূলক বিবেচনায় অধিকতর কম সমৃদ্ধশালী জাতীয়তার ওপর প্রভাব ফেলেছে। জাতীয়তার অন্যতম প্রধান বৈশিষ্ট্য ভাষার বিচারে বাংলার অবস্থান পৃথিবীতে চতুর্থ। বাংলাদেশ, ভারতের পশ্চিমবঙ্গ, আসাম, ত্রিপুরা, উড়িষ্যাসহ পৃথিবীর বিভিন্ন অঞ্চলের প্রায় ৪০ কোটি মানুষ বাংলা সংস্কৃতির ধারক ও বাহক। বাংলা জাতীয়তাবোধের মূলসুর অসাম্প্রদায়িতকতা। পল্লীগীতি, বাউল সংগীত আর বিভিন্ন সময়ে অনুষ্ঠিত গ্রামীণ মেলা, নবান্নের উৎসব মানুষের জীবনবোধের অসাম্প্রদায়িক চিন্তার প্রকাশ। বাঙালি ধর্মীয় চিন্তায় হিন্দু-মুসলিম-বৌদ্ধ-খ্রিস্টান; কিন্তু ভাষাভাষি চিন্তায় বাংলা নববর্ষ, নবান্নের উৎসব আর গ্রামীণ মেলার আনন্দে তারা সমভাগী, একই পরিবারের সদস্য, সবাই বাঙালি। পহেলা বৈশাখ বা বাংলা নববর্ষ বাঙালি সংস্কৃতিরই একটা অংশ মাত্র। বাঙালি লোকাচারের অনেকগুলি পার্বণ রয়েছে, আর এগুলির সম্মিলিত রূপই বাঙালি সংস্কৃতি। ‘গ্রামই ছিল এক সময় সমাজ-সভ্যতার প্রাণকেন্দ্র’ আজও বাংলাদেশের গ্রাম, গ্রামীণ সংস্কৃতির প্রাণ। ১৬ কোটি মানুষের ১৪ কোটিই ৬৯ হাজার গ্রামের বাসিন্দা। ছোটখাট বিরোধ ও হিংসাদ্বেষ ছাড়াই নানা পার্বণের মাধ্যমে সবাই মিলেমিশে আছে একই প্রকৃতির সন্তান হিসেবে। হিন্দুর ১২ মাসে ১৩ পূজায় মুসলমানের যেমন পদচারণা ও অংশগ্রহণ হতো, তেমনি মুসলমানের ঈদ উৎসবে হিন্দুর উপস্থিতি ছিল এবং এখনও রয়েছে। কামার-কুমার, জেলে, তাঁতী, কৃষকসহ নানা বিত্তের মানুষের মিলন তো গ্রামেই। এক গ্রাম থেকে ৫ গ্রামের মানুষের চেনা-জানা, এর চেয়ে আর বেশি সামাজিকীকরণ কাকে বলে? নবান্নে ফসল ওঠার পর নতুন চালের শিরনি, পৌষ পার্বণ, চৈত্র সংক্রান্তিতে গ্রামীণ মেলা, গাজী কালু, চম্পাবতীর মেলা, দুর্গাপূজার মেলা, বিভিন্ন পীর পয়গমম্বর ফকির দরবেশের জন্ম-মৃত্যু স্মরণে মেলা ও গানের উৎসবের সাথে বাঙালি নববর্ষ পালনের উৎসবও জমে উঠেছে। গ্রামীণ সংস্কৃতির এই পার্বণটি আজ গ্রাম থেকে শহরে বিস্তৃতি ঘটেছে। তবে ক্ষেত্র বিশেষে তার বৈশিষ্ট্যও কিছু পরিবর্তন হয়েছে। তথাকথিত আধুনিকতার সাথে যুক্ত হওয়ায় তার কিছুটা অঙ্গহানি ঘটেছে। তবে ইতিহাস-ঐতিহ্য একটি সমৃদ্ধ জাতির গুরুত্বপূর্ণ বিষয়, এটিকে যথাযথভাবে সংরক্ষণ ও বিকাশ সাধন করা অত্যন্ত জরুরি। নববর্ষে বাঙালির উৎসব/অনুষ্ঠান: পুরাতনের বিদায় আর নতুনের আগমনকে বরণ করতে দোকান-পাট থেকে শুরু করে বাড়ি-ঘর পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন করা দিয়ে বৈশাখের যাত্রা শুরু। উপহার পাওয়া নতুন পোশাকে সেজে অনেকেই সকালে পান্তা-ইলিশ, ধুতি-পাঞ্জাবি, লুঙ্গি, মাথায় যেন গামছার মুকুট, লাঙ্গল, ফলা, ঢোল, করতাল, কদুর খোলে একতারা, প্রকৃতির সন্তান মানব-মানবী, শিশু-কিশোর থেকে আবালবৃদ্ধার জনসমুদ্রে ‘এসো হে বৈশাখ এসো এসো’ ধ্বনি যেন নতুন শব্দের কলতান। হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিস্টানের নয়, এ যেন মানুষের পাঠ, মানুষের অনুষ্ঠান, কারো আসতে নেই মানা, করো নাচতে নেই মানা। কবির কবিতা ‘বিশ্বমানব হবি যদি কায়মনে বাঙালি হ’, সবাই যেন কবির কবিতাকে গ্রহণ করেছে তাদের মনোলোকে। ব্যবসায়িদের হালখাতা, অতিথি আপ্যায়নে মিষ্টি, আগতদের শুভেচ্ছা, পারস্পরিক শুভকামনায় আলিঙ্গন নববর্ষেরই পাঠ। নববর্ষের আর একটি আকর্ষণীয় অনুষ্ঠান বৈশাখী মেলা, নাগরদোলা, তালপাতার ভেঁপুর আওয়াজ, ঘর গৃহস্থালির জন্য মাটির তৈরি রঙবেরঙের জিনিসপত্র, তাল পাখা, খেলনা, হাঁড়িকুড়ি, লোকসমাজে বেশি চেনা, মেয়েদের ব্যবহার্য চুরি-মালার দোকান, বাউলগান আর লোকসংগীতের সুরের মুর্ছনা। বাঙালির বিনোদনের অন্যতম উপাদান। পহেলা বৈশাখের এই মেলা সকল ধর্মের সকল শ্রেণির নারী-পুরুষ, শিশু-বৃদ্ধের ঘর থেকে বের করে পারস্পারিক মিলনের সেতুবন্ধন হিসেবে কাজ করে থাকে। নানান বিশ্বাসের মানুষকে বাঙালির কমন বৈশিষ্ট্যে উদ্বুদ্ধ করে। বাঙালি সংস্কৃতিতে অপসংস্কৃতির হামলা: সংস্কৃতি মানুষের জীবনবোধ, যেটি মানুষের লোকাচার দ্বারা গড়ে ওঠে এবং দীর্ঘ সময়ের চর্চার ভিতর দিয়ে তার একটি আইডেনটিটি নির্ধারিত হয়। হেরিডিটি, পিতা-মাতার বৈশিষ্ট্য শিক্ষণ, সঙ্গ ও বন্ধুত্ব থেকে এগুলির চর্চা হলেও মনোবিজ্ঞানের ভাষায় ব্যক্তির দ্বারা এটি হয়ে থাকে। একজনের নিকট যেটা গ্রহণীয় নয় অন্যজনের নিকট সেটি আকর্ষণীয় না-ও হতে পারে। শিক্ষা ও বিত্তে অনগ্রসর এমন অনেক জাতি কুকুর, শাপ, তেলাপোকা ভক্ষণ করে, বাঙালিরা সেটা করে না। এটি বাঙালিদের জন্য অপসংস্কৃতি হলেও অন্যের নিকট সেটি তাদের সংস্কৃতি। বেশ-ভূষা ও পোশাক-আশাকে ইংরেজরা যেভাবে খোলামেলা বাঙালিরা ততোটা নয়। এর পেছনে অনেকগুলি কারণ আছে। বাংলা সংস্কৃতিতে ইসলাম ধর্মের যেমন প্রভাব আছে, তেমনি সনাতন ধর্মেরও প্রভাব রয়েছে। সেই সাথে নদী অববাহিকায় গড়ে ওঠা সমতল ভূমির মানুষের জীবন-যাপন, খাদ্যগ্রহণ আর পোশাক-আশাকের অনেক মিল রয়েছে, ধর্মীয় অমিল থাকা সত্ত্বেও। বাঙালি সংস্কৃতি ধর্মের বাউন্ডারিকে দুর্বল করে মানুষ হিসেবে একই প্রকৃতির সন্তান হিসেবে একত্রিত করেছে, এটি মৌলবাদীদের নিকট গোসা করার অন্যতম একটি কারণ। আর ভোগবাদ, লুটেরা পুজিতন্ত্র এবং মুনাফাখোর ব্যবসায়ি বেনিয়অ বাঙালি সংস্কৃতির ওপর যে নগ্ন আক্রমণটা করেছে সেটি মোল্লা-পুরোহিতরা পুঁজি করে বাঙালি সংস্কৃতিচর্চার বিরোধিতা করেছে। প্রকৃত বাঙালি এ ধারাটির বিপক্ষে। বাঙালি সংস্কৃতিতে যাত্রাপালা একটি গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম। অথচ সেখানে স্বল্প বসনে মেয়েদের যেভাবে নৃত্যে এবং অভিনয়ে উপস্থাপন করা হচ্ছে তা বাঙালি সংস্কৃতির সাথে খাপ খায় না। পৃথিবীর অনেক জাতির ইতিবাচক অনেক কাজ নিয়ে বাংলা সংস্কৃতিকে সমৃদ্ধ করা সম্ভব। অন্যেরটা নিতে হবে, তবে নিজেরটি পরিত্যাগ করে নয় বরং অন্যেরটা গ্রহণের মাধ্যমে বাঙালির সংস্কৃতি যদি আরো সবল ও সমৃদ্ধ হয় তাতে মন্দ কি? আরবি-ফারসি ও ইংরেজির অনেক শব্দ বাংলায় এসে বাংলার রূপ গ্রহণ করেছে, এটা সমৃদ্ধ ভাষারই লক্ষণ। স্বাধীন দেশে বাংলা ও বাঙালি সংস্কৃতির প্রকৃত চর্চা ও বিকাশে রাষ্ট্রযন্ত্রের কেমন যেন উদাসীনতা লক্ষ্যযোগ্য। সংবিধানের চার মূলনীতির মধ্যে অন্যতম মূলনীতি হলো বাঙালি জাতীয়তাবাদ। অথচ অফিস আদালতে এখনো বাংলা উপেক্ষিত। অফিস-আদালতে বাংলা চর্চায় উচ্চ আদালতের রুল থাকলেও তার বাস্তবায়ন নেই। যে সর্বোচ্চ আদালত এই রুল দিয়েছে সেখানেও রায় লেখা হয় ইংরেজিতে, দুঃখটা সেখানেই। বিগত সময়ে বাঙালি সংস্কৃতির চর্চাকারী বৃহৎ সংগঠন উদীচী’র ওপর হামলা, ছায়ানট’র পহেলা বৈশাখের অনুষ্ঠানে বোমা হামলা, দেশের বিভিন্ন সিনেমা হল ও যাত্রা মঞ্চে বোমা বর্ষণের আতঙ্কে বাংলা সংস্কৃতির অনেক অনুষ্ঠানই করা সম্ভব হয়নি। বর্তমানে রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় শিল্পকলা একাডেমি, শিশু একাডেমি, বাংলা একাডেমি এবং জেলা প্রশাসনের মাধ্যমে সংস্কৃতির যে চর্চা শুরু হয়েছে, সেখানে চলছে দলীয়করণের মহড়া। রুলিং পার্টির বাইরে সংস্কৃতিসেবীদের স্থান যেমন সেখানে নেই, তেমনি সাধারণের অংশগ্রহণও সেখানে নেই। রাজনীতির প্রগতিশীলতা এবং দেশপ্রেমের অনুপস্থিতিতে পুঁজিবাদ, লুটপাট আর ভোগবাদের রাজনৈতিক সংস্কৃতি বাংলা সংস্কৃতি বিকাশের অন্তরায় এবং নবশত্রু হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। লেখক: সাংগঠনিক সম্পাদক, বাকবিশিস

Print প্রিন্ট উপোযোগী ভার্সন



Login to comment..
New user? Register..