শ্রমিক আন্দোলনের পথিকৃৎ আমাদের মালেক ভাই

Facebook Twitter Google Digg Reddit LinkedIn StumbleUpon Email
অনুলিখন: সুতপা বেদজ্ঞ : নদী-বন আর সমুদ্রবেষ্টিত বাংলাদেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের অন্যতম প্রধান শহর হিসেবে এদেশের অর্থনীতি, রাজনীতি, শ্রমিক-কৃষক আন্দোলনে ও মহান মুক্তিযুদ্ধে খুলনার গুরুত্ব অপরিসীম। ব্রিটিশ আমলেই এ অঞ্চলে গড়ে ওঠে অসংখ্য পাটকল, নিউজপ্রিন্ট মিলসহ আরও অনেক কল-কারখানা। স্বাধীন বাংলাদেশে কল-কারখানার শ্রীবৃদ্ধি ঘটে এবং খুলনা তৃতীয় শিল্পনগরী হিসেবে খ্যাতি লাভ করে। এ সকল কল-কারখানায় হাজার হাজার শ্রমিক কাজ করতেন। অধিকাংশ কল-কারখানা ছিল রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন। ১৯৭৮ সালে এ রকমই একটি রাষ্ট্রায়ত্ব পাটকলে চাকরি নিয়ে কর্মজীবন শুরু করেছিলেন আমাদের কমরেড মালেক ভাই। পুরো নাম আব্দুল মালেক মোল্লা। ছোটখাট গড়নের সদাহাস্য কমরেড আব্দুল মালেক মোল্লা জন্মগ্রহণ করেন ১৯৪৯ সালের ৩০ অক্টোবর। বর্তমান নড়াইল জেলার কালিয়া উপজেলার পুরুরিয়া গ্রামে। পিতা- গোলাম হোসেন মোল্লা, মাতা- বড়ু বিবি। কমরেড মালেক মোল্লার পিতা ছিলেন স্বচ্ছল কৃষক। সে সময়টা বর্তমান সময়ের মত এত আত্মকেন্দ্রিকতাপূর্ণ ছিল না। তিনি চাইতেন তার সন্তানেরা লেখাপড়া শিখে দেশ ও মানুষের সেবায় আত্মনিয়োগ করুক। ১৯৫৫ সালে ৬ বছর বয়সে মালেক মোল্লার পিতা তাঁকে স্থানীয় প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ভর্তি করে দেন। স্কুলে লেখাপড়ার পাশাপাশি খেলাধুলায় সবার দৃষ্টি আকর্ষণ করতে সক্ষম হন তিনি। ছোটবেলা থেকেই গ্রামের দরিদ্র কৃষক পরিবারের সন্তানদের সাথে মালেক ভাইয়ের সখ্যতা ছিলো বেশি। স্কুলে পড়াকালীন সময়েই তিনি বড়দের সাথে ক্লাব, লাইব্রেরির কাজসহ বিভিন্ন সামাজিক কাজে উৎসাহের সাথে যোগ দিতেন। স্কুলে থাকা অবস্থায়ই তিনি সমবয়সীদের নেতৃত্ব দিতে শুরু করেন। ১৯৬৫ সালে পুরুরিয়া মাধ্যমিক বিদ্যালয় থেকে কৃতিত্বের সাথে মাট্রিক পাস করেন এবং নড়াইল ভিক্টোরিয়া কলেজে ভর্তি হন। কলেজে ভর্তির পরপরই তার ছাত্র রাজনীতিতে হাতেখড়ি হয়। ১৯৬৫ সালে কমিউনিস্ট পার্টির অনুসারী অন্যতম বৃহৎ প্রগতিশীল ছাত্র সংগঠন ছাত্র ইউনিয়ন জাতীয় নানা ইস্যু ছাড়াও আর্ন্তজাতিক কমিউনিস্ট আন্দোলনের বিভিন্ন বিষয়ে তাত্ত্বিকভাবে জড়িয়ে দ্বিধা-বিভক্ত হয়ে যায়। মস্কোপন্থিদের অনুসারী অংশ ছাত্র ইউনিয়ন মতিয়া গ্রুপ এবং চীনাপন্থি অংশ মেনন গ্রুপ হিসেবে পরিচিতি লাভ করে। মালেক ভাই যুক্ত হন ছাত্র ইউনিয়ন মতিয়া গ্রুপের সাথে। কলেজ ছাত্র সংসদ নির্বাচনে ছাত্র ইউনিয়ন মতিয়া গ্রুপ থেকে তিনি নির্বাচনে অংশ নেন। মালেক ভাই যখন কলেজের ছাত্র রাজনীতিতে সক্রিয়, দেশে তখন আইয়ুব খানের শাসন চলছে। শিক্ষাব্যবস্থায় টালমাটাল অবস্থা। মানসম্মত স্কুল-কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয় হাতেগোনা। উচ্চশিক্ষার সুযোগ নেই বললেই চলে। গরিব-মেহনতি মানুষের সন্তানেরা শিক্ষার সুযোগ থেকে বঞ্চিত। এ দেশের মানুষ বিভিন্নভাবে শোষণ-বঞ্চনার শিকার। শোষকের বেড়াজাল ছিন্ন করতে রাজনৈতিক অঙ্গন তখন উত্তাল। এরই মধ্যে এল ৬৬ র ৬-দফা আন্দোলন। কমিউনিস্ট পার্টি তখন ৬-দফাকে বাঙালির ন্যায্য দাবি মনে করলেও একে মুক্তি সনদ বলতে রাজি ছিলো না। কারণ ৬ দফায় কৃষক-শ্রমিক-মেহনতি মানুষের মুক্তির কথা ছিলো না। এই সীমাবদ্ধতা সত্ত্বেও কমিউনিস্ট পার্টি ৬-দফাকে সমর্থনের নীতি গ্রহণ করে। মালেক ভাই তখন পার্টি সদস্য না হয়েও নেতৃবৃন্দের পরামর্শে পার্টির গৃহিত নীতি অনুসরণ করেন। ৬ দফা ভিত্তিক আন্দোলনে সক্রিয় ভূমিকা পালন করে সামনের কাতারের ছাত্রনেতা হিসেবে পরিচিত হয়ে উঠলেন কমরেড মালেক মোল্লা। ১৯৬৭ সাল থেকে ১৯৬৯ এর শুরু পর্যন্ত ছাত্র-সমাজের শিক্ষাজীবনে নানা সমস্যা নিয়ে ছাত্রলীগ, ছাত্র ইউনিয়নের দুই গ্রুপ ঐক্যবদ্ধ কার্যক্রম গ্রহণ করে। ছাত্রসমাজের এই আন্দোলনে মালেক ভাই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। ছাত্র আন্দোলনের ধারাবাহিকতায় ১৯৬৯ সালের জানুয়ারী মাসে প্রণীত হয় ৬-দফা সম্বলিত ঐতিহাসিক ১১-দফা কর্মসূচি। ১১-দফা দাবিতে কেন্দ্রীয় ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের ১৭ জানুয়ারি থেকে যে আন্দোলন শুরু হয় তার সাথে সঙ্গতি রেখে নড়াইলেও ছাত্র আন্দোলন শুরু হয়। মাত্র এক সপ্তাহের মধ্যে ছাত্র গণ-আন্দোলন গণ-অভ্যুথানে পরিণত হয়। এই গণঅভ্যুত্থানে মালেক ভাই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। ১৯৬৯ সালের ২৫ মার্চ আইয়ুব খানের পতনের পর নড়াইলে ছাত্র-জনতার এক বিশাল বিজয় সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়। মালেক ভাই ওই সমাবেশে বক্তৃতা করেন। ১৯৭০ সালে কমরেড মালেক নড়াইল ভিক্টোরিয়া কলেজ থেকে বি এ পাশ করেন। ১৯৭১ এ আসন্ন মুক্তিযুদ্ধে জনগণকে ঐক্যবদ্ধ ও প্রস্তুত করার জন্য সভা, সমাবেশ ও সাংগঠনিক প্রস্তুতি গ্রহণ করতে স্থানীয়ভাবে মালেক ভাই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। ২৫ মার্চের গণহত্যার সংবাদ পাওয়ার সাথে সাথে সীমিত অস্ত্র-শস্ত্র ও সঙ্গী-সাথীদের নিয়ে যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়েন। দেশের অভ্যন্তরে, যারা ভারতে গিয়ে ট্রেনিং এর সুযোগ ও সময় পাননি, এমন অনেক ছাত্র ইউনিয়ন ও কমিউনিস্ট কর্মী মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করেন। কমরেড মালেক ভাই ছিলেন তাদেরই একজন। দেশ স্বাধীন হবার বেশ কিছুদিন পরে তিনি খুলনার ফুলতলায় স্থায়ীভাবে বসবাসের জন্য চলে আসেন এবং আলীম জুটমিলে চাকুরির সুবাদে শ্রমিক রাজনীতির সাথে যুক্ত হন। অল্পদিনের মধ্যেই তিনি শ্রমিকদের প্রিয় নেতায় পরিণত হন। মিলের প্রধান শ্রমিক নেতা হিসেবে শ্রমিকদের দাবি-দাওয়া আদায়ে সবসময়ই সোচ্চার ছিলেন তিনি। শ্রমিক ইউনিয়ন নির্বাচনে অংশগ্রহণ করে তিনি সহ-সভাপতি পদে বারবার নির্বাচিত হয়েছেন। কমরেড মালেক মোল্লা স্বপ্ন দেখতেন শ্রেণিহীন সমাজের। কৃষক-শ্রমিক-মেহনতি মানুষের মুক্তি আন্দোলনের ভাবনা তাকে উদ্দীপ্ত করে রাখত। বিপ্লবের লাল ঝান্ডা উড়িয়ে এদেশের মানুষের মুক্তির শপথ নিয়ে তিনি ১৯৮০ সালে বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি (সিপিবি)’র গর্বিত সদস্যপদ লাভ করেন। ১৯৮৬ সালে ফুলতলা উপজেলা কমিটির সম্পাদকের দায়িত্ব গ্রহণ করেন। প্রতিকূল পরিস্থিতির মধ্যেও তিনি ফুলতলা উপজেলায় কমিউনিস্ট পার্টির লাল পতাকা ঊর্ধ্বে তুলে ধরেছেন। পরবর্তীতে মালেক ভাই খুলনা জেলা কমিটির সংগঠক নির্বাচিত হন। ফুলতলা উপজেলা কমিটির সম্পাদকের দায়িত্বে থাকাকালীন এরশাদবিরোধী আন্দোলনে যোগ দেন। ১৯৮৮ সালে আন্দোলনে যুক্ততার অপরাধে তাকে গ্রেফতার করা হয়। দীর্ঘসময় কারাভোগের পর তিনি মুক্তি লাভ করেন। ১৯৯০ সালে স্বৈরাচারী এরশাদের পতনের পর কমরেড মালেক আরও নিবিড়ভাবে শ্রমিক আন্দোলনের অগ্রসৈনিক হিসেবে দায়িত্ব পালন করতে থাকেন। তিনি ট্রেড ইউনিয়ন কেন্দ্র খুলনা জেলা শাখার সভাপতি ও কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য ছিলেন। আলীম জুটমিলে চাকরি করলেও শ্রমিক নেতা হিসেবে খালিশপুরের ক্রিসেন্ট, প্লাটিনাম জুট মিল, দৌলতপুর জুট মিল, আফিল জুট মিলসহ অন্যান্য মিলের শ্রমিকদের অধিকার আদায় ও তাদের নির্বাচনে প্রত্যক্ষ ভূমিকা রাখতেন। মৃত্যুর পূর্ব মুহূর্ত পর্যন্ত তিনি ছিলেন সিপিবি ফুলতলা উপজেলার সভাপতি ও খুলনা জেলা কমিটির সদস্য। সুন্দরবন বিনাশী মংলার রামপালে কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র বন্ধের দাবিতে তিনি ছিলেন সোচ্চার। তেল-গ্যাস-বিদ্যুৎবন্দর রক্ষা জাতীয় কমিটির ফুলতলা উপজেলার সদস্য সচিব ছিলেন মালেক ভাই। রামপাল কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র বন্ধের দাবিতে জাতীয় স্বার্থে তেল-গ্যাস-বিদ্যুৎবন্দর রক্ষা কমিটি যতবার খুলনাভিমুখি লংমার্চ বা অন্য কর্মসূচি গ্রহণ করেছে প্রত্যেকবারই মালেক ভাই খুলনার প্রবেশমুখ ফুলতলায় তোড়ন নির্মাণ করে, কখনো লাল পতাকার মিছিল করে বা লাল পতাকা উড়িয়ে তাদের স্বাগত জানিয়েছেন। হঠাৎই গত দেড় বছর আগে মরণব্যাধি ক্যান্সারে আক্রান্ত হন মালেক ভাই। তার যখন কেমোথেরাপি চলছিল তখনও তিনি মনোবল হারাননি। খুলনা জেলা পার্টি তার পাশে এসে দাঁড়িয়েছে। এই বিপদের মধ্যেও পার্টিকে তিনি পরামর্শ দিয়েছেন। মালেক ভাই বিশ্বাস করতেন তিনি সুস্থ হয়ে উঠবেন খুব তাড়াতাড়ি। আবার মিছিলে হাঁটবেন। আবার সংগঠিত করবেন শ্রমিক-মেহনতি মানুষদের। খুলনার মরা শিল্পাঞ্চল শ্রমিকের দৃপ্ত পদচারণায় হবে মুখরিত। কমিউনিস্ট পার্টি শক্তিশালী হবে। তিনি থাকবেন সামনের সারিতে। ধীরে ধীরে অসুস্থতা বাড়তে লাগল। রেডিওথেরাপি দেয়া শুরু হল। কথা বলতে কষ্ট হচ্ছিল। হাসপাতালের বিছানায় যখন মৃত্যু যন্ত্রণায় ছটফট করছিলেন তখন পরিবারের কাছে তার শেষ ইচ্ছের কথা জানিয়েছিলেন -কমরেড ডাঃ মনোজ, কমরেড রশিদ ও অন্য কমরেডদের সাথে তিনি কথা বলতে চান, তাদের দেখতে চান। খবর পেয়ে কমরেডরা দ্রুত ছুটে গিয়েছিলেন বিপ্লবী সহযোদ্ধার শয্যাপাশে। কমরেডদের দেখে মৃত্যু পথযাত্রী কমরেডের মুখে, ঠোঁটে ফুটে ওঠে হাসির রেখা। পার্টির পরামর্শে মৃত্যুর পূর্বমুহূর্ত পর্যন্ত কমরেড এস এ রশীদ কমরেড মালেক ভাইয়ের শয্যা পাশেই ছিলেন। ১৮ মার্চ সকাল ৬ টায় মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েন শ্রমিক নেতা কমরেড মালেক মোল্লা। কিন্তু তার চির নতুন স্বপ্নকে তিনি ছড়িয়ে দিয়ে যান কমরেডদের হৃদয়ে। সমাজ প্রগতির যে রক্ত শপথ ও স্বপ্ন কমরেড মালেক ভাই দেখেছিলেন তাঁর সহযোদ্ধারা তা অগ্রসর করে নিয়ে যাবেন। কমরেড মালেক ভাই- লাল সালাম। তথ্যসূত্র: কমরেড এস এ রশীদ ও কমরেড মনোজ দাশ

Print প্রিন্ট উপোযোগী ভার্সন



Login to comment..
New user? Register..