পাট শিল্পে শ্রমিক অসন্তোষ দায়ী ভ্রান্তনীতি ও অদক্ষ প্রশাসন

Facebook Twitter Google Digg Reddit LinkedIn StumbleUpon Email
শহিদুল্লাহ চৌধুরী: সারাদেশের সরকারি পাটকলে তীব্র শ্রমিক আন্দোলন অব্যাহত আছে, সর্বশেষ ২, ৩ ও ৪ এপ্রিল শ্রমিকরা রাজপথ রেলপথ অবরোধ কর্মসূচি পালন করেন। অমানবিক অবস্থায় মানবেতর জীবনযাপনের কারণে সরকারি ৩২টি পাটকলের প্রায় ৩৫ হাজার শ্রমিক এই আন্দোলনে নামতে বাধ্য হয়েছেন। এই আন্দোলন কোনো নতুন দাবির ভিত্তিতে গড়ে উঠেনি। তারা কাজের বিনিময়ে যে বেতন-মজুরি প্রাপ্য হন তা সরকারের অব্যবস্থাপনার কারণে না পাওয়ায় এই আন্দোলন। কোনো কোনো পাটকলে ৮ থেকে ১২ সপ্তাহ তারা বেতন মজুরিহীন অবস্থায় আছেন। এর ফলে তাঁদের দৈনন্দিন জীবন হুমকির মুখে পড়েছে। এই অবস্থায় খেয়ে পড়ে বেঁচে থাকাই তাঁদের কঠিন হয়ে পড়েছে। সাময়িক বেঁচে থাকার চেষ্টায় বিভিন্ন দোকান থেকে বাকিতে খাদ্য ক্রয় ও নগদ অর্থ ধার করে আধপেটা খেয়ে-পরে কোনোমতে চলছিলেন তাঁরা। কিন্তু দীর্ঘসময় ধরে প্রতিষ্ঠানসমূহ তাদের বেতন-মজুরি পরিশোধ না করায় সেই ঋণ তারা পরিশোধ করতে পারছে না। ফলে শ্রমিক অঞ্চলের ছোট বড় দোকানগুলোসহ সকল অর্থনৈতিক প্রতিষ্ঠান অচল হয়ে পড়ছে। এই অবস্থায় তাঁরা বাঁচার জন্য বাধ্য হয়ে সড়ক পথ-রেলপথ অবরোধের মত কঠোর কর্মসূচি দিতে বাধ্য হচ্ছে। সরকার তাদের প্রাপ্য বেতন-মজুরি পরিশোধের উদ্যোগ গ্রহণ না করায় পাটকল শ্রমিকরা ১৫ এপ্রিল থেকে আবার ৯২ ঘণ্টা অবরোধের ঘোষণা দিয়েছেন। সরকার যদি দ্রুত তাদের দাবি মেনে নিয়ে বেতন-মজুরি পরিশোধ না করে তবে শ্রমিকের এই শান্তিপূর্ণ আন্দোলন তাদের বাঁচার তাগিদে সহিংস আন্দোলনে রূপ নিতে পারে। যা কোনোভাবেই দেশবাসীর কাম্য নয়। শ্রমিকরা যেসকল দাবিতে আন্দোলন করছে তা কোনো নতুন চাওয়া নয়, আইনগতভাবে তাদের প্রাপ্যতা নিশ্চিত করা, নিজেদের পাওনা বুঝে পাওয়ার আইনসঙ্গত দাবি। তাদের দাবিগুলোর মধ্যে রয়েছে– তাঁদের আইনসঙ্গত বকেয়া বেতন-মজুরি পরিশোধ করা। ২০১৩ সাল হতে অবসর প্রাপ্ত শ্রমিক কর্মচারীদের প্রাপ্য বকেয়া গ্র্যাচুয়েটি ও জমাকৃত প্রভিডেন্ড ফান্ডের টাকা পরিশোধ করা। তাঁদের জন্য জমাকৃত প্রভিডেন্ড ফান্ড ট্রাস্টের টাকা সরকার অন্যত্র খরচ করায় শ্রমিকরা তাদের প্রয়োজনে ঋণ পচ্ছে না। তাই ফাণ্ডের টাকা পুনরায় জমা করে শ্রমিকের জন্য ঋণ নিশ্চিত করা। সরকারি মজুরি কমিশন বাস্তবায়নসহ অন্যান্য দাবিতে এই আন্দোলন। রাষ্ট্রায়ত্ত সরকারি পাটকলসমূহে এই পরিস্থিতি তৈরির অন্যতম কারণ– ১) এই প্রতিষ্ঠানসমূহের জন্য সরকারের ভ্রান্তনীতি। ২) উপর থেকে নীচ পর্যন্ত দুর্নীতি। ৩) আমলাদের অদক্ষতা। ৪) অপচয় ও উৎপাদনহীনতা। পাট শিল্পখাতের দীর্ঘ দাবির প্রেক্ষিতে বিজেএমসি’র পরিচালনা পর্ষদ গড়ে তোলা হয়। সেই সময় পাট শিল্পে যুক্ত অভিজ্ঞ শ্রমিক কর্মচারীদের নিয়ে চুক্তিভিত্তিক পরিচালনা পর্ষদ গঠিত হয়। তাদের তত্ত্বাবধানে ২০১০ থেকে ২০১৩ এই চার বছরে এ শিল্পে সামগ্রিক অগ্রগতি পরিলক্ষিত হয়। পাটশিল্পে সহনশীল অবস্থা ফিরে আসে এবং শ্রমিকদের অসন্তোষ দূর হতে থাকে। কিন্তু এই পর্ষদের চুক্তির মেয়াদ শেষ হওয়া ও দায়িত্বপ্রাপ্ত মন্ত্রীর পরিবর্তনে এই পরিচালনা পর্ষদের নীতি পরিবর্তন হয়ে যায়। পাটশিল্পে অভিজ্ঞ শ্রমিক কর্মচারীর পরিবর্তে পর্ষদে স্থলাবিভক্ত হন অবসরপ্রাপ্ত সামরিক কর্মকর্তাগণ। অনভিজ্ঞ এসকল কর্মকর্তাদের ভুল পরিকল্পনা, অপচয়ে, দুর্নীতি-লুটপাট এমনকি অনাকাঙ্ক্ষিত রাজনৈতিক হস্তক্ষেপও বৃদ্ধি পায়। এই অদক্ষ পর্ষদ শ্রমিক কর্মচারীদের মজুরি, অবসর প্রাপ্তদের গ্রাচুয়েটি, পিএফসহ সামগ্রিক পাওনা প্রদান করতে ব্যর্থ হয়। ফলে শ্রমিক কর্মচারীদের জীবনে চরম অভাব অনটন নেমে আসে। আমলাদের তথা অদক্ষ, দুর্নীতিগ্রস্থ মাথা ভারী প্রশাসনের ও সরকারের ভ্রান্তনীতির জন্য আজ মানবেতর জীবনযাপন করছে শ্রমিকরা আর ধ্বংসের মুখে পাট শিল্প। এই শ্রমিকদের এবং শিল্পকে বাঁচাতে প্রথমেই অদক্ষ দুর্নীতিগ্রস্থ মাথাভারী প্রশাসনকে অপসারণ করে পাট শিল্পে যুক্ত দক্ষ শ্রমিক কর্মচারীদের দিয়ে প্রশাসন গঠন করা এবং সরকারের ভ্রান্তনীতি পরিত্যাগ করা প্রয়োজন। বাংলাদেশের প্রধান শিল্প ছিল পাট শিল্প। এই শিল্পের ছিল গৌরবোজ্জ্বল ইতিহাস, ঐতিহ্য। এই শিল্পে অপার সম্ভাবনা থাকার পরেও শুধুমাত্র ভ্রান্তনীতি ও অদক্ষ আমলাদের কারণে এই শিল্প আজ ধ্বংসের মুখে। এই সময়ে বেসরকারি পাট কলগুলোর সাথে তুলনামূলক চিত্রেই এই খাতের সম্ভাবনা বোঝা যায়। বাংলাদেশ জুট স্পিনার্স এসোসিয়েশন (বিজেএসএ) ও বাংলাদেশ জুট মিলস্ এসোসিয়েশন (বিজেএমএ) যেখানে যৌথভাবে ৫৭৮১ কোটি টাকা রপ্তানি করে সেখানে বাংলাদেশ জুট মিলস কর্পোরেশনের (বিজেএমসি) রপ্তানির পরিমাণ মাত্র ৭২০ কোটি টাকা। এবং অভ্যন্তরীণ ব্যবহারের ক্ষেত্রে বাংলাদেশ জুট স্পিনার্স এসোসিয়েশন (বিজেএসএ) ও বাংলাদেশ জুট মিলস্ এসোসিয়েশন (বিজেএমএ) ১ লক্ষ মেট্রিক টন বাজারজাত করে সেখানে বাংলাদেশ জুট মিলস্ কর্পোরেশন (বিজেএমসি) বাজারজাত করে মাত্র ৩৭,০০০ মেট্রিক টন। ১৯৮৩-৮৪ সালে বিজেএমসি পাট রপ্তানি ছিল ২.৯০ লক্ষ মেট্রিক টন তার বিপরীতে বিজেএমএ ও বিজেএসএ এর রপ্তানি ছিল ২.১৩ লক্ষ মেট্রিক টন। সর্বশেষ ২০১৭-১৮ সালে বিজেএমসি এর রপ্তানি কমে দাঁড়িয়েছে ০.৮৬ লক্ষ মেট্রিক টন আর বিজেএমএ ও বিজেএসএ এর রপ্তানি বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৭.৪৬ লক্ষ মেট্রিক টনে বিজেএমসির বিদেশি ভায়ার সংগ্রহ ও তাদের থেকে কাজ গ্রহণের ব্যর্থতা ও উদাসীনতা এই বিপুল পরিমাণ রপ্তানির সম্ভাবনাকে নষ্ট করছে। ২০১০ সালে পাট শিল্পের দক্ষ শ্রমিক কর্মকর্তাদের নিয়ে গঠিত পর্ষদ যখন দায়িত্ব নেয় তখন প্রথম বছর ২০১০-১১ সালে রপ্তানি ও অভ্যন্তরীণ ব্যবহারে ১৪৪.৪১ লক্ষ মেট্রিক টন। এই পর্ষদের শেষ বছরে এর পরিমাণ বৃদ্ধি পেয়ে দাঁড়ায় ২০৭.৪৯ লক্ষ মেট্রিক টন। এই পরিষদের মেয়াদ শেষে ২০১৩-১৪ সালে অদক্ষ-অনভিজ্ঞ সামরিক কর্মকর্তাদের নিয়ে গঠিত পর্ষদ প্রথম বছরে রপ্তানি ও অভ্যন্তরীণ ব্যবহারে ১২২.৩৫ লক্ষ মেট্রিক টন যা তার আগের বছরের অর্ধেক। সর্বশেষ তাদের রপ্তানি ও অভ্যন্তরীণ ব্যবহারের পরিমাণ ১২৯.৬৫ লক্ষ মেট্রিক টন। সার্বিকভাবেই দেখা যায় সরকারের ভ্রান্তনীতি ও অদক্ষ প্রশাসনের কারণেই সম্ভাবনাময় লাভজনক পাট শিল্প আজ হুমকির মুখে। অপরদিকে সরকারের অবহেলা ও ভ্রান্তনীতির কারণে উৎপাদনের কাঁচামাল সঠিক সময়ে সংগ্রহ ও সরবরাহ না থাকা, উৎপাদন যন্ত্রসমূহ (তাঁত) বিকল ও পুরাতন হয়ে পড়ায় উৎপাদন কমে যাচ্ছে। ফলে লোকসানের মুখোমুখি হতে হচ্ছে পাট শিল্পকে। ২০১৮-১৯ সালে বিজেএমসি’র পাট ক্রয়ের লক্ষ্য মাত্রা ছিল ১৭.৯০ লক্ষ কুইন্টাল। লক্ষ্য মাত্রার বিপরীতে ডিসেম্বর ২০১৮ পর্যন্ত পাট ক্রয় করা হয় ১.৫৮ লক্ষ কুইন্টাল যা লক্ষ্য মাত্রার মাত্র ৮.৮৩%। অপরদিকে ১১০২৩টি উৎপাদন যন্ত্রের বিপরীতে সচল আছে মাত্র ৫৫৪৮টি। ফলে ৮.৮৩% উৎপাদন কাঁচামাল আর ৫০% সচল উৎপাদন যন্ত্র (তাঁত) দিয়ে অদক্ষ আমলা প্রশাসনের ভ্রান্তনীতির বিপরীতে আমাদের পাটকল শ্রমিকরা তাঁদের দক্ষতায় সরকারি পাটকল সমূহকে বাঁচিয়ে রেখেছেন। অথচ আজ এই শ্রমিকের জীবন বিপন্ন হয়ে উঠেছে। বিপন্ন জীবন রক্ষায় শ্রমিক কারখানা ছেড়ে রাজপথে দাঁড়াতে বাধ্য হচ্ছে। এই সম্ভাবনাময় শিল্পকে বাঁচাতে দ্রুত শ্রমিকদের দাবি পূরণ করে শ্রমিকের অসন্তোষ দূর করতে হবে। এই অদক্ষ শ্রমিকরা বাঁচলেই এই শিল্প বাঁচবে। একইসঙ্গে সকল পাটকলসমূহকে পর্যায়ক্রমে আধুনিকায়ন করতে হবে। অদক্ষ প্রশাসনকে অপসারণ করে পাট শিল্পের সাথে যুক্ত দক্ষ ব্যক্তিদের দিয়ে প্রশাসন গড়ে তুলতে হবে। লুটপাট ও লোক দেখানো সংস্কারের নামে প্রজেক্ট করে অর্থ অপচয় না করে শ্রমিকের ও শিল্পের স্বার্থে অর্থ ব্যয় করতে হবে। আধুনিকায়ন প্রক্রিয়াটি যেন দ্রুত সম্পন্ন করা যায় এবং শতভাগ উৎপাদন নিশ্চিত করা যায় সেই উদ্যোগ নিতে হবে। একইসঙ্গে পাটের নতুন নতুন বাজার তৈরি করতে হবে দায়িত্বশীল ব্যক্তিদের। এর মধ্যদিয়েই আবার এই শিল্প তার পুরানো ঐতিহ্যের গৌরব ফিরে পাবে এবং বাংলাদেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নে প্রধান ভূমিকা পালন করতে পারবে। খেয়াল রাখতে হবে– সরকারের ভ্রান্তনীতি-অদক্ষ-দুর্নীতিগ্রস্থ প্রশাসনের ব্যর্থতার দায় যেন শ্রমিকদের ভোগ করতে না হয়। তাদের বকেয়া বেতন-মজুরি পরিশোধ না করে যদি সরকার ও প্রশাসনের ব্যর্থতার দায়ে মানবেতর জীবনযাপন করতে বাধ্য করা হয় তবে তাঁরা আজ কারখানা থেকে রাজপথে এসে অবরোধ করেছে আগামীতে নিজেকে ও অনাগত ভবিষ্যতের জন্য পাট শিল্পকে বাঁচাতে নীতি নির্ধারণের ভবনগুলোকে অবরুদ্ধ করে নীতি নির্ধারণ ও পরিচালনার দায়িত্ব গ্রহণে বাধ্য হবে। লেখক : উপদেষ্টা ও সাবেক সভাপতি, সিপিবি; সভাপতি, বাংলাদেশ ট্রেড ইউনিয়ন কেন্দ্র

Print প্রিন্ট উপোযোগী ভার্সন



Login to comment..
New user? Register..