ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের দিনগুলো-২

Facebook Twitter Google Digg Reddit LinkedIn StumbleUpon Email
মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম : (গত সংখ্যার পর) মুক্তিযুদ্ধ ছিল বাঙালি জাতির ইতিহাসে তার শ্রেষ্ঠ অর্জন। সেই মহান মুক্তিযুদ্ধের আগে ও পরে আমি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ছিলাম। একাত্তরে আমি ছাত্র ইউনিয়নের কেন্দ্রীয় সাধারণ সম্পাদক ছিলাম। তাই, যেহেতু ছাত্র আন্দোলন ছিল মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম প্রধান কেন্দ্র, আমি সেকারণে আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধকে কেন্দ্রীয়ভাবে পরিচালনার কাজেও অনেকটা করার কাজেও যুক্ত থাকতে পেরেছিলাম। একই সাথে মুক্তিযুদ্ধ ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে এভাবে সম্পৃক্ত থাকতে পারাটিকে আমি আমার জীবনের শ্রেষ্ঠ অর্জন বলে এখনো মনে করি। কিশোর বয়স থেকেই আমার মধ্যে দেশপ্রেমের জাগরণ ঘটতে শুরু করেছিল। তার প্রকাশও ঘটে চলেছিল নানাভাবে। এর একটি দৃষ্টান্ত দেই। সে সময়ে পায়জামা-পাঞ্জাবী পরিধান করাটি জাতীয় আত্মপরিচয়ের একটি প্রকাশ বলে গণ্য হতো। আমি সেন্ট প্রেগরিস হাই স্কুলে ইংলিশ মিডিয়ামের ছাত্র ছিলাম। মাঝে-মাঝেই আমি স্কুলে পায়জামা-পাঞ্জাবী পরে যেতাম। ১৯৬২ সালে সেখানকার অষ্টম শ্রেণির ছাত্র থাকা অবস্থায় আমি ‘জুনিয়র রেডক্রসের’ একটি ৫ জনের (২ জন পূর্ব পাকিস্তান থেকে ও ৩ জন পশ্চিম পাকিস্তান থেকে। এ ক্ষেত্রেও বৈষম্য!) প্রতিনিধি দলের সদস্য হিসেবে রেডক্রসের শতবর্ষ অনুষ্ঠানে যোগদানের জন্য দেড় মাসের সফরে আমেরিকা গিয়েছিলাম। সেখানে, প্রেসিডেন্ট কেনেডির সাথে সাক্ষাত-অনুষ্ঠানসহ বিভিন্ন অনুষ্ঠানে আমি খুব সচেতনভাবেই সাদা পায়জামা-পাঞ্জাবী পরিধান করতাম। আমার সেই প্রাথমিক ‘জাতীয় গর্ববোধ’ গভীরতর ‘দেশপ্রেম’ হিসেবে সচেতনতা ও অর্থপূর্ণতা পেয়েছিল ছাত্র ইউনিয়ন ও কমিউনিস্ট পার্টির কাজে যুক্ত হওয়ার পর। এ কারণে আমার দেশপ্রেমের মধ্যে জাতীয় মুক্তিসংগ্রামের চেতনা এবং বিপ্লবী মানবতাবাদ ও আন্তর্জাতিকতাবাদ যুক্ত হতে পেরেছিল। এক্ষেত্রে মুক্তিযুদ্ধের পটভূমির প্রতি একটু দৃষ্টি দিতে হয়। ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনামলে কমিউনিস্টরাই প্রথম ‘পূর্ণ স্বাধীনতার’ দাবি তুলেছিল। ১৯৪৭ সালে ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসকরা সাম্প্রদায়িক দ্বি-জাতি তত্ত্বের ভিত্তিতে পাকিস্তান সৃষ্টির পরে-পরেই কমিউনিস্টরা আওয়াজ তুলেছিল– ‘ইয়ে আজাদী ঝুটা হ্যায়, লাখো ইনসান ভুখা হ্যায়’। পাকিস্তানে ভাষার অধিকার, জাতীয় আত্মনিয়ন্ত্রণ, গণতন্ত্র, শোষণ মুক্তি, সাম্রাজ্যবাদকে রুখা ইত্যাদি দাবিতে যে কঠিন সংগ্রাম চালাতে হয়েছিল, তার প্রধান বোঝা বহন করতে হয়েছিল কমিউনিস্ট ও বামপন্থিদেরকে। এসব সংগ্রাম সমগ্র জাতিকে ক্রমেই এগিয়ে নিয়েছিল মহান মুক্তিযুদ্ধ অভিমুখে। সেই ঐতিহ্যমণ্ডিত উত্তরাধিকারকে ধারণ করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কে কেন্দ্র করে মহান মুক্তিযুদ্ধে আমার অংশগ্রহণ ঘটেছিল। বাংলাদেশের স্বাধীনতার প্রসঙ্গটি ঘুরেফিরে আমাদের চিন্তায় ও কাজকর্মে আগাগোড়াই চলে আসতো। স্বাধীনতার দাবি প্রকাশ্যে না তুললেও, নিজেদের মধ্যে সে বিষয়ে আলোচনা হতো। স্বায়ত্তশাসন, গণতন্ত্র, সাম্রাজ্যবাদ, শোষণমুক্তি– ইত্যাদি প্রসঙ্গগুলোকে প্রকাশ্যে সামনে আনা হতো। জাতিগত শোষণ-বৈষম্য, স্বৈরতন্ত্র, সাম্প্রদায়িকতা ও সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে সভা-সমাবেশ-মিছিল-ধর্মঘট-হরতালসহ নানা বীরত্বপূর্ণ সংগ্রাম ধারাবাহিকভাবে চলতো। পাশাপাশি বাঙালির সাংস্কৃতিক আত্মপরিচয়কে সমুন্নত রাখার জন্য ছাত্র ইউনিয়ন, সংস্কৃতি সংসদ, ছায়ানট, উদীচী প্রভৃতি সংগঠনের উদ্যোগে নানা কর্মকাণ্ড পরিচালিত হতো। ‘আমার সোনার বাংলা’ গানটিকে জনপ্রিয় করে তোলা, পহেলা বৈশাখ পালন, ‘আমরা বাঙালি ভুট্টা খাবো না’ স্লোগান নিয়ে প্রতিবাদ সংগ্রাম ইত্যাদি লাগাতারভাবে চলতো। সেগুলো পরিচালিত হতো প্রধানত ঢাকা বিশ্বদ্যিালয়কে কেন্দ্র করে। এধরনের বহুমাত্রিক ও বহুমুখী কর্মকাণ্ডের অগ্রভাগে আমি যুক্ত থাকতাম। ১৯৬৯-এর এপ্রিলে ঢাকার দক্ষিণাঞ্চলে টর্নেডোর পর এবং ১৯৭০-এর অক্টোবরে দেশের উপকূলে প্রলয়ঙ্করী ঘূর্ণিঝড়ের পর বিশ্ববিদ্যালয়ের সহকর্মীদের নিয়ে আমি দলবলসহ দু’টি এলাকায়ই মাসাধিককাল করে রাত দিন একনাগাড়ে পড়ে থেকে ত্রাণ কাজ চালিয়েছিলাম। এর ফলে অনার্স পরীক্ষার প্রস্তুতিতে বিঘ্ন ঘটেছিল। কিন্তু, পরে ‘ওভারটাইম’ পড়াশুনা করে তা পুষিয়ে নেয়ার ব্যবস্থা করেছিলাম। লেখাপড়ায় কখনো ফাঁক ঘটতে দেইনি। ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থান ছিল একনাগাড়ে চলা এক বিপ্লবী কর্মযজ্ঞ। পুলিশের সাথে লড়াই, গুলির মুখেও মিছিল নিয়ে এগিয়ে যাওয়া, উত্তাল জনস্রোতকে আন্দোলনের সংগঠিত ধারায় সম্পৃক্ত করা, কারফিউ মোকাবেলা করে লড়াই অব্যাহত রাখা ইত্যাদি ঘটনাবলী ছিল একটি ছোট-খাটো বিপ্লবী কর্মকাণ্ডের মতো। অন্য অনেকের সাথে আমি এসবের কেন্দ্রে ছিলাম। সফল হয়েছিল গণঅভ্যুত্থান। পতন হয়েছিল আইয়ুব শাহীর। আইয়ুবের পতনের পর ইয়াহিয়া খানের সামরিক সরকার সাধারণ নির্বাচন দিতে বাধ্য হয়েছিল। সত্তরের সেই নির্বাচনে আওয়ামী লীগ একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেলেও পাকিস্তান সরকার তার হাতে ক্ষমতা হস্তান্তর করতে অস্বীকার করেছিল। এমন একটি ষড়যন্ত্র ও বিশ্বাসঘাতকতার ঘটনা ঘটানো হতে পারে বলে আমরা আগে থেকেই কিছুটা আঁচ করতে পেরেছিলাম। ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থানের পর কমরেড মণি সিংহ বলেছিলেন– ‘এটি আরো বড় সংগ্রামের ড্রেস রিহার্সেল মাত্র। সেই সংগ্রামের জন্য প্রস্তুত হও।’ কমরেড মোহাম্মদ ফরহাদ বলেছিলেন– ‘সশস্ত্র সংগ্রাম এখন এজেন্ডাতে এসে গেছে।’ একাত্তরের ফেব্রুয়ারির শুরুতে ছাত্র ইউনিয়নের বিশেষ কাউন্সিল ডেকে সংগঠনের ঘোষণাপত্রে ‘পূর্ব বাংলা ও প্রতিটি জাতির বিচ্ছিন্ন হওয়ার অধিকারসহ পূর্ণ আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকার দিতে হবে’– এই বাক্যটি যুক্ত করা হয়। সাধারণ সম্পাদক হিসেবে কাউন্সিল সভায় এ প্রস্তাব আমি উত্থাপন করেছিলাম। ২১ ফেব্রুয়ারির পরদিন শহীদ মিনারে অনুষ্ঠিত ছাত্র ইউনিয়নের জনসভা থেকে স্পষ্ট ভাষায় জানিয়ে দেয়া হয়েছিল যে ‘ভোটের রায় যদি সমগ্র পাকিস্তানে বাস্তবায়ন হতে না দেয়া হয় তাহলে, পূর্ব বাংলাকে স্বাধীন করে হলেও আমরা সে রায় নতুন সেই স্বাধীন রাষ্ট্রে বাস্তবায়ন করবো।’ অনার্স পরীক্ষার জন্য একাগ্র মনযোগ নিবদ্ধ রেখেও এসব কাজে আমি নিজেকে পরিপূর্ণ যুক্ত রেখেছিলাম। ১৯৭১-এর শুরু থেকেই আমার অনার্স পরীক্ষা চলছিল। ১ মার্চ মাত্র একটি পরীক্ষা বাকি ছিল। মনে আছে, সেদিন সকাল থেকে মহসিন হলে আমার ৬৬০ নম্বর রুমে বসে আমি বইপত্র খুলে পরীক্ষার প্রস্তুতি নিচ্ছিলাম। এমন সময় খবর এলো যে, ইয়াহিয়া খান ঢাকায় অনুষ্ঠিতব্য নবনির্বাচিত পার্লামেন্টের নির্ধারিত অধিবেশন স্থগিত করে দিয়েছে। মুহূর্তের মধ্যে আমি বুঝে নিয়েছিলাম যে, স্বাধীনতার জন্য সশস্ত্র সংগ্রাম শুরু হয়ে গেছে। খোলা বই বন্ধ করারও সময় না দিয়ে তখনই বিদ্যুৎবেগে বেরিয়ে পড়েছিলাম রাজপথে। সঙ্গে সঙ্গে ঝাঁপিয়ে পড়েছিলাম সশস্ত্র সংগ্রামের প্রত্যক্ষ প্রস্তুতি কাজে। সংগঠিত করা শুরু করেছিলাম ছাত্র-তরুণদের মধ্য থেকে সম্ভাব্য সশস্ত্র মুক্তিযোদ্ধাদের অসংখ্য ‘ব্রিগেড’। প্রতিদিন বিকেলে শহীদ মিনারে ছাত্র-গণ সমাবেশ থাকতো। সেখানে মাইকে বক্তৃতা করে করণীয় সম্পর্কে প্রকাশ্যে দিকনির্দেশনা ও ‘ব্রিফিং’ দেয়া হতো। মলোটভ ককটেল, হাই এক্সপ্লোসিভ, বুবি ট্র্যাপ ইত্যাদি তৈরির কাজ শুরু হয়ে গিয়েছিল। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় খেলার মাঠে ছাত্র ইউনিয়নের উদ্যোগে অস্ত্র চালানোর প্রশিক্ষণ শুরু হয়েছিল। মার্চের তৃতীয় সপ্তাহে রাইফেল কাঁধে নিয়ে ছাত্র ইউনিয়নের এক বিশাল ব্রিগেড বাহিনী ঢাকা শহরের প্রধান সড়কগুলোতে সুসজ্জিত প্যারেড সংগঠিত করেছিল। অস্ত্র জোগাড় করে ‘লাইভ-ফায়ারিং’-এর প্রশিক্ষণও শুরু করা হয়েছিল। বিস্ফোরক তৈরির কাজেও হাত দেয়া হয়েছিল। এসব কাজ সংগঠিত করার ক্ষেত্রেও আমি দায়িত্বরত ছিলাম। ছাত্র ইউনিয়নের এসব কাজের কেন্দ্র হিসেবে সাইন্স এনেক্স, শহীদ মিনার, বিশ্ববিদ্যালয় খেলার মাঠকে আমরা প্রতিষ্ঠা করেছিলাম। ছাত্রলীগ ‘একা চলার’ নীতি গ্রহণ করে ঊনসত্তরের কাঠামোর ভিত্তিতে ‘ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ’ গঠনের প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করে দলীয় ‘সংগ্রাম পরিষদ’ গঠন করেছিল। কলা ভবনকে কেন্দ্র করে তারাও তাদের কর্মকাণ্ড পরিচালনা করছিল। ২৫ মার্চ কালো রাত্রিতে আমাদের আগে থেকে পরিকল্পিত ‘অতি কাঁচা’ ধরনের সামান্য কিছু প্রতিরোধের চেষ্টা হয়েছিল। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আশেপাশে কিছু ব্যারিকেড নির্মাণের চেষ্টা করা হয়েছিল। আমাদের এসব প্রতিরোধ-প্রয়াস সফল হয়নি। বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস হানাদার বাহিনীর প্রধান টার্গেটে পরিণত হয়েছিল। শহীদ মিনার, ‘বটতলার’ বটগাছ গোলার আঘাতে বিচূর্ণ করা হয়েছিল। শুরু করা হয়েছিল বর্বর গণহত্যা। চালানো হয়েছিল নিষ্ঠুর ধ্বংসযজ্ঞ। ক্যাম্পাসকে পরিণত করা হয়েছিল ধ্বংসস্তূপে ও বধ্যভূমিতে। পরে আমরা আরো শক্তি সঞ্চয়ের মাধ্যমে সশস্ত্র প্রতিরোধ সংগ্রাম এগিয়ে নেয়ার স্বার্থে আমাদের শক্তিকে মাসখানেকের মধ্যে ‘রিগ্রুপ’ করে ভারতে চলে গিয়েছিলাম। কর্মীদের একটি অংশকে দায়িত্ব দিয়ে দেশের ভেতরে রেখে গিয়েছিলাম। আমি নিজে ন্যাপ-কমিউনিস্ট পার্টি-ছাত্র ইউনিয়ন যৌথ গেরিলা বাহিনীর যোদ্ধা হিসেবে বিশেষ গেরিলা ট্রেনিং নিয়ে অস্ত্র হাতে প্রত্যক্ষ সশস্ত্র সংগ্রামে ঝাঁপিয়ে পড়েছিলাম। আমি পূর্বাঞ্চলীয় সেক্টরে একজন অপারেশন কমান্ডার হিসেবে দায়িত্বে ছিলাম। এফএফ-সহ অন্যান্য বাহিনীর সদস্য হিসেবেও বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্ররা ও ছাত্র ইউনিয়নের কর্মীরা বীরত্বের সাথে যুদ্ধ করেছিল। আমি নিজে প্রত্যক্ষভাবে সশস্ত্র যুদ্ধে লিপ্ত থাকলেও ছাত্র ইউনিয়নের পক্ষ থেকে আমার নামসহ বিবৃতি দিয়ে ও তা লিফলেট আকারে ছাপিয়ে দেশের ভেতরে থাকা ছাত্রদের মাঝে বিতরণের ব্যবস্থা করা হয়েছিল। আন্তর্জাতিক সমর্থন সংগঠিত করার জন্য বিভিন্ন সংস্থায় ও দেশে-দেশে প্রতিনিধি পাঠানো হয়েছিল। এসব কারণে আমার নাম পাক-বাহিনীর ‘হিট লিস্টে’ অন্তর্ভুক্ত ছিল। আমার বাবা-মা-বোনরাসহ গোটা পরিবার টার্গেট হয়ে উঠেছিল। ১৯৭১ সালের ডিসেম্বরে প্রায় ২০০ জনের একটি বড় গেরিলা দলকে কমান্ড করে, অনেকটা ‘ফোসর্ড মার্চ’-এর কায়দায় ঢাকার উপকণ্ঠে প্রখ্যাত চুরাইন গ্রামে এসে আমরা ঘাঁটি স্থাপন করেছিলাম। ১৬ ডিসেম্বর ভোরবেলায় গোটা ‘গেরিলা দল’ নিয়ে ঢাকার দিকে যাত্রার চূড়ান্ত ‘অপারেশন’ শুরু করেছিলাম। একটি গ্রুপ মার্চ করে গজারিয়ায় পজিশন নিয়েছিল। এরকম অবস্থাতেই বিকেলবেলা জেনেছিলাম যে, ঢাকায় পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী আত্মসমর্পণ করেছে। পরদিন সকালে বুড়িগঙ্গা পার হয়ে সমস্ত বাহিনীসহ পায়ে হেঁটে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে এসে আমরা শপথ নিয়েছিলাম। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাইন্স এনেক্স ভবনকে আমরা আমাদের গেরিলা বাহিনীর ক্যাম্প হিসাবে স্থাপন করেছিলাম। বিশ্ববিদ্যালয়ের যে প্রাঙ্গণ থেকে ‘মুক্তি না হয় মৃত্যু’ এই শপথ নিয়ে নয় মাস আগে যাত্রা শুরু করেছিলাম, অস্ত্র হাতে বিজয়ীর বেশে সেখানে ফিরে এসেছিলাম। ডিসেম্বরের শেষ সপ্তাহেই বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে ছাত্র ইউনিয়নের কেন্দ্রীয় কমিটির বৈঠক অনুষ্ঠিত করেছিলাম। আমি হাতে অস্ত্র নিয়েই সেই বৈঠকে উপস্থিত হয়েছিলাম। বৈঠকে ‘লাখো শহীদের রক্তে মুক্ত স্বদেশ, এসো এবার দেশ গড়ি’-এই স্লোগানের ভিত্তিতে সার্বিক বহুমুখী কর্মকাণ্ডে ঝাপিয়ে পড়ার তাৎপর্যপূর্ণ সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়েছিল। বিশ্ববিদ্যালয়ের দেয়ালগুলো ভরে উঠেছিল এই নতুন স্লোগানে। ‘সমাজতন্ত্রের পথে দেশ গড়ার’ বিপ্লবী লক্ষ্যকে সামনে রেখে সৃষ্টির উন্মাদনায় অধীর হয়ে উঠেছিল ছাত্র-ছাত্রীরা। সবচেয়ে আগে আমরা হাত দিয়েছিলাম স্বাধীন দেশের জন্য একটি যুগোপযুগী শিক্ষানীতি প্রণয়নের কাজে। ছাত্র ইউনিয়নের নিজস্ব উদ্যোগে শিক্ষানীতির খসড়া প্রস্তাবনা প্রণয়নের জন্য একটি কমিশন গঠন করা হয়েছিল। ১৯৭২ সালের ১৭ জানুয়ারি, অর্থাৎ মুক্তিযুদ্ধে বিজয়ের মাত্র একমাসের মাথায়, ছাত্র ইউনিয়নের এই নিজস্ব শিক্ষা কমিশনের প্রথম বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়েছিল। অনেকের হাতে তখনও অস্ত্র। কেউ অস্ত্র হাতে গোলাবারুদের ভাণ্ডার পাহারায়। কেউ নিকট পরিজনকে হারিয়ে শোকে মূহ্যমান। কিন্তু তার মধ্যেই অন্যান্য কাজের সাথে সাথে আমরা সর্বপ্রথম যে বড় কাজে ঝাঁপিয়ে পড়েছিলাম সেটি ছিল– স্বাধীন দেশের জন্য একটি উপযুক্ত শিক্ষানীতি প্রণয়নের কাজ। সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধের বিজয় অর্জনের দুই মাসের মধ্যে প্রস্তাবিত শিক্ষানীতির খসড়া দেশবাসীর সামনে আমরা তুলে ধরেছিলাম। পরে এই প্রস্তাবিত শিক্ষানীতি ড. কুদরত-ই-খুদা কমিশনেও প্রেরণ করা হয়েছিল। এই ঘটনা প্রমাণ করে, শিক্ষানীতির বিষয়টিকে আমরা স্বাধীন দেশের প্রেক্ষাপটে কত গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনায় নিয়েছিলাম। ‘সমাজতন্ত্রের পথে দেশ গড়ার’ বিজয় লগ্নের প্রত্যয় ও প্রচেষ্টাকে শুরু থেকেই নানা বাধা ও প্রতিবন্ধকতার সম্মুখীন হতে হয়েছিল। পাকিস্তানপন্থি পরাজিত আন্তর্জাতিক শক্তি ও তার দালাল চক্র অন্তর্ঘাতসহ ষড়যন্ত্রের জাল বিস্তৃত করতে শুরু করেছিল। শাসক দল আওয়ামী লীগের মধ্যেও ছিল নানাবিধ সীমাবদ্ধতা ও ভেজালের উপস্থিতি। অনেকে নিজের আখের গুছাতে ব্যস্ত হয়ে পড়েছিল। গড়ে উঠেছিল ‘নব্য ধনীকের’ একটি লুম্পেন গোষ্ঠী। একটি অংশ ‘বৈজ্ঞানিক সমাজতন্ত্রের’ স্লোগান তুলে বিভ্রান্তি ছড়াতে সক্ষম হয়েছিল এবং ‘অতি বিপ্লবী’ পদক্ষেপ গ্রহণ করে স্বাধীনতা সংহত করার কাজটিকে কঠিন করে তুলেছিল। এরকম পরিস্থিতিতে স্বাধীন দেশে প্রথম ডাকসু নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছিল। সেই নির্বাচনে জয়লাভ করে আমি ডাকসুর ভিপি-র দায়িত্ব পেয়েছিলাম। সে সময়কার কিছু কথা আগামী (এবং আপাততঃ শেষ) কিস্তিতে তুলে ধরার চেষ্টা করবো। (চলমান)

Print প্রিন্ট উপোযোগী ভার্সন



Login to comment..
New user? Register..