নতুন বছরের আহ্বান

Facebook Twitter Google Digg Reddit LinkedIn StumbleUpon Email
“ছন্দে ছন্দে পদে পদে অঞ্চলের আবর্ত-আঘাত/ উড়ে হোক ক্ষয়/ ধুলিসম তৃণসম পুরাতন বৎসরের যত/ নিষ্ফল সঞ্চয়।” আজ বছরের প্রথম দিন। সূর্যের হিসাবেই বাংলা সনের হিসাব। বাংলা পঞ্জিকার প্রথম মাস বৈশাখের ১ তারিখ বাংলা সনের প্রথম দিন, তথা বাংলা নববর্ষ। প্রত্যেক জাতিই নববর্ষকে উদযাপন করে। ১ বৈশাখ দিনটি বাঙালি জাতির বর্ষবরণের দিন। দিনটিতে জাতি-ধর্ম নির্বিশেষে, ধনী দরিদ্র নির্বিশেষে সকলেই নির্মল আনন্দে মেতে ওঠে। আবহমানকাল থেকে এটা হয়ে আসছে। এ উৎসব সকল বাঙালির। যে ধর্মনিরপেক্ষ চিন্তা বাঙালি সংস্কৃতির একান্ত একটি বৈশিষ্ট্য, সেটি নববর্ষের উৎসবে সহজেই শনাক্ত করা যায়। কিন্তু কিছুসংখ্যক উদ্ভট ধর্মান্ধ মানুষ পহেলা বৈশাখ উদযাপনের বিরোধিতা করে আসছে। তারা পহেলা বৈশাখ পালনকে ইসলামবিরোধী বলে ঘোষণা দিয়েছে। অথচ নববর্ষ পালনের সঙ্গে ধর্মের কোনো সম্পর্ক নেই। থাকতেও পারে না। এই উদ্ভট তত্ত্ব যারা ছড়ায়, তারা পহেলা বৈশাখ পালনকে হিন্দুয়ানী বলে মনে করে। এবং সেজন্য তারা বোমাবাজি করে মানুষ হত্যা করে পহেলা বৈশাখ উদযাপন বন্ধ করতে চেয়েছিল। এরাই রমনা বটমূলে সঙ্গীতানুষ্ঠানে বোমা নিক্ষেপ করে মানুষ হত্যা করেছিল। বাংলা সন যুগ যুগ ধরে এদেশের বেশিরভাগ মানুষের জীবন প্রবাহের সাথে সম্পর্কিত হয়ে আছে। তবে সেই সন ও তারিখ বাঙালির জীবনে অনেকক্ষেত্রে গৌরবের সাথে যুক্ত করতে পারিনি, যদিও বাঙালি হিসেবে আমরা মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে বাংলাদেশ স্বাধীন করেছি, তারপরও চার দশকের বেশি সময় পার হতে চললো। রাষ্ট্রব্যবস্থায় স্বাধীনভাবে নিজেদের জীবনের বৈশিষ্ট্য ও ঐতিহ্য সংহত করার সুযোগ পাওয়ার পরও আমরা সেই সুযোগ কাজে লাগাতে পারিনি। আর সে কারণে বেশিরভাগ বাঙালির কাছে গ্রহণযোগ্য হয়ে থাকার কথা থাকলেও বাংলা সন ও তারিখ আজও সরকারি উদ্যোগে রাষ্ট্রের বিভিন্ন পর্যায়ে প্রতিষ্ঠিত নয়। আর সেই কারণে বাংলা সন ও তারিখ অনুযায়ী বাংলাদেশে এখনো বাজেট প্রণয়ন, অর্থবছর, শিক্ষাবর্ষ, অনুষ্ঠান-সভা-দিবস ইত্যাদি নির্ধারিত হয় না। বাংলা সন ও তারিখ যদি উল্লিখিত পর্যায়ে আমরা প্রতিষ্ঠিত করতে পারি তাহলে বাংলা নববর্ষ উদযাপন আরও কাছের মনে হবে। অর্থবহ মনে হবে। বাঙালির ভিত্তিমূল আরও শক্তিশালী হবে, বাঙালির সংস্কৃতি আরও সম্মুখবর্তী হবে। নতুন বৎসরকে সত্যিই উজ্জ্বল ও ভাস্কর করে তুলতে হলে দুটো বিপদকে মোকাবিলা করতে হবে। একদিকে মৌলবাদের ঘৃণ্য সন্ত্রাসী কাজ, অপরদিকে দেশে বিচারহীনতা ও গণতন্ত্রহীনতার পরিবেশ ও কর্তৃত্ববাদী শাসন। সবচেয়ে বড় কথা, পাকিস্তানি ভাবাদর্শে অনুপ্রাণিত ধর্মান্ধ মৌলবাদীদের সম্পূর্ণরূপে নির্মূল করতে না পারলে গোটা জাতিই ভয়াবহ অন্ধকারে নিমজ্জিত হবে। নতুন বৎসরে নতুন শপথে আমরা জেগে উঠবো মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় বাঙালি জাতীয়তাবাদ, ধর্মনিরপেক্ষতা অসাম্প্রদায়িকতা, গণতন্ত্র ও সমাজতন্ত্রের মহান আদর্শে। এখন জনগণের জন্য শান্তি, কল্যাণ ও উন্নয়ন নিশ্চিত করতে পারস্পরিক হিংসা-দ্বেষ পরিহার করে একযোগে কাজ করতে হবে। বাঙালির প্রীতি ও সৌহার্দ্যের সম্পর্ক আরও সুদৃঢ় হোক। বাংলা নববর্ষে আর একটি দীর্ঘদিনের ঐতিহ্য হলো ব্যবসা-প্রতিষ্ঠান ও দোকানে ‘হালখাতা’ উদযাপন। সাজিয়ে গুছিয়ে পরিপাটি করে গ্রাহকদের দাওয়াত দেয়া, মিষ্টিমুখ করানো ও ইত্যাদির আয়োজন করা হয়। নতুন করে হিসাব খোলা হয়, লেনদেন হয়, বকেয়া পরিশোধ করা হয়। এই ঐতিহ্য বেশ পুরনো ও উদ্দীপক, বিশেষত ব্যবসা সংশ্লিষ্ট মানুষের কাছে। এই ঐতিহ্যের ধারা কিছুটা কম হলেও অনেকের কাছে এখনো বেশ গুরুত্ব বহন করে থাকে। এই ধারাটি আরও উজ্জ্বল হওয়া প্রয়োজন। পুরনো বছরের জরা ও গ্লানি ঝেড়ে ফেলে এ দিনটিতে নতুনকে বরণ করি। স্বাগত জানাই ১৪২৬ বঙ্গাব্দকে। শুভ হোক, মঙ্গলময় হোক প্রতিটি বাঙালির জীবন।

Print প্রিন্ট উপোযোগী ভার্সন



Login to comment..
New user? Register..