ইন্দুভূষণ রায়

Facebook Twitter Google Digg Reddit LinkedIn StumbleUpon Email

সুব্রতা রায় : উত্তরাঞ্চল নানান নামে আখ্যায়িত হলেও দেশগড়ার ভূমিকায়, আন্দোলনে-সংগ্রামে এর আছে দীর্ঘ ইতিহাস। যাঁর বা যাঁদের কথা লিখছি তাঁরা চিরদিন কমিউনিস্ট পার্টির জন্য বিশেষ ভূমিকা রেখে গেছেন, নিজেকে নিবেদন করেছেন মানুষের জন্য। কমরেড ইন্দুভূষণ রায়ের জন্ম ১৩৩০ বঙ্গাব্দের ৪ঠা মাঘ। মাতা- বরদা রায়, পিতা- ডা: ঈশ্বর চন্দ্র রায়। বর্তমান ঠিকানা, গ্রাম- বৈদ্যের বাজার, ইউনিয়ন-ছিনাই, উপজেলা- রাজারহাট, জেলা- কুড়িগ্রাম। বাবা-মায়ের তিন সন্তানের বড় সন্তান তিনি। পাঙ্গারানী লক্ষ্মীপ্রিয়া স্কুল থেকে মাইনর পাস করার পর এখানে হাই স্কুল না থাকায় তিনি ১৯৩৯ সালে ডোমার হাইস্কুল থেকে ম্যাট্রিকুলেশন শেষ করেন। বাবা ডা: ঈশ্বর চন্দ্র রায় কলকাতা মেডিকেল স্কুল থেকে পাস করা এল.এম.এফ ডাক্তার ও সরকারি চাকুরে ছিলেন। মা বড়দা রায় ছিলেন কমিউনিস্ট পাটির একজন দক্ষ কর্মী। মূলত: স্বামীর অনুপ্রেরণায় তিনি যুক্ত হন পার্টিতে। তেভাগা আন্দোলন, বিভিন্ন নারী আন্দোলন, ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলনে বড় দা রায়ের ভূমিকা ছিল অনন্য সাধারণ। দুর্ভিক্ষের সময় বৈদ্যের বাজার গ্রাম থেকে ১০ মাইল মিছিল করে কুড়িগ্রাম মহকুমা ম্যাজিস্ট্রেট এর বাসভবন ঘেরাও করেন। কয়েক বস্তা রিলিফের কাপড় আদায় করে মহিলাগণ নিজেরাই মাথায় বহন করে পায়ে হেঁটে পুনরায় গ্রামে ফিরে আসেন। ঐ সব কাপড় বস্ত্রহীনদের মাঝে, বিশেষ করে নারী ও শিশুদের মাঝে বিতরণ করেন। ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলন করায় তার স্বামীর বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি হয়। ফলে বাড়ি বাড়ি রাতে বাড়িতে ঐ সময় কোনো পুরুষ মানুষ থাকত না। পুলিশ রাতে বাড়িতে হানা দিলে তিনি নিজেই সব সামলে নিতেন। তবু কখনও ভেঙে পরেননি। বাবা ডাক্তার হওয়ায় এবং পার্টি সদস্য হওয়ায় ঐ বাড়িতেই দেশ-বিদেশের বড় বড় নেতাকর্মীসহ নানান মানুষের সমাগম ছিল। কমরেড সুধীর মুখার্জী, রানী মুখার্জী, জীবন দে, শংকর বসু, মনিকৃষ্ণ সেন, জীতেন দত্ত, চিত্তরঞ্জন দেব, ভবেন শোয়ার, জগবন্ধু রায়, বসন্ত চক্রবর্তী সহ নাম না জানা বহু কমরেডের সার্বক্ষণিক যাতায়াত ছিল এই বাড়িটিতে। বিশেষ করে রানী মুখার্জী তাঁর দুই কন্যা সন্তানকে নিয়ে ১৫ দিন থেকে মাস অব্দি এই বাড়িতেই থাকতেন, মেয়েরা বড় হলে একা আসতেন- অঞ্চল জুড়ে পার্টির কাজ করতেন। একসময় বাবা-মায়ের সাথে সাথে তিনিও ওতপ্রোতভাবে আন্দোলন প্রক্রিয়ায় জড়িয়ে পড়েন। বৃহত্তর রংপুরের ব্রিটিশ বিরোধী মিছিলে সকল ধরনের কাজে অংশগ্রহণ করেন তিনি। ১৩৫০ সালে দুর্ভিক্ষ, মহামারি, বসন্ত, কলেরায় মানুষ আক্রান্ত হয়। প্রচণ্ড খাদ্যাভাব দেখা দেয় সর্বত্র। সেই সময় সাধারণ মানুষের পাশে দাঁড়ানোর ভূমিকা ছিল তাঁর অনন্য কীর্তি। পার্টির তরফ থেকে ক্ষুধার্ত ও অসুস্থ মানুষের খাবারের জন্য বিভিন্ন স্থানে খোলা হয় লঙ্গরখানা, চিকিৎসার জন্য ডাক্তারখানা। লালমনিরহাট ও কুড়িগ্রাম উভয় মহকুমার লঙ্গরখানা ও চিকিৎসাসেবার মূল দায়িত্বে ছিলেন ইন্দুভূষণ রায়। (লঙ্গরখানায় কাজ করতে গিয়ে তাঁর একটি বাস্তব অভিজ্ঞতার গল্প উল্লেখ করতে চাই- মনখুশী একজন নারী, যার স্বামী অভাবের তাড়নায় তাকে বিক্রি করে দেয়। মনখুশী কোনভাবে সেখান থেকে পালিয়ে আসেন এবং ঘটনাচক্রে এই বাড়িতে আশ্রয় পান- কাজের সাথে যুক্ত হন। একদিন লঙ্গরখানায় মনখুশীর স্বামী খেতে আসেন আর ওখানেই দুজনার দেখা হয়। একে অপরকে জড়িয়ে ধরেন- কান্নায় ভেঙে পড়েন এবং পরবর্তীতে দুজনে একসঙ্গে কাজ করেন। ইন্দুভূষণ রায়ের কাছে বিচ্ছেদের অনেক গল্প শুনেছি কিন্তু এই মিলনের গল্প তাঁকে অত্যন্ত আনন্দ দিয়েছিল তাই উল্লেখ করা হলো।) লঙ্গরখানা ও চিকিৎসাসেবার জন্য বরাবরের মত সেই সময় তাঁর বাড়িটাই হয় অফিস। বাড়ির দুটি কাছারি ঘরের একটি হয় অফিস অন্যটিতে একটি পোস্ট অফিস প্রতিষ্ঠিত হয়। প্রথম পোস্ট মাস্টার হন ডা: ঈশ্বর চন্দ্র রায়, কিছুদিন পরই মেজ ছেলে হিমাংশু শেখর রায় দায়িত্ব গ্রহন করেন। ডা: ঈশ্বর চন্দ্র রায় চিকিৎসা সেবা দিতেন। তাঁকে সহযোগিতা করতেন কলকাতা, বোম্বে, লক্ষ্মৌ, মাদ্রাজ, দিল্লী থেকে আসা বড় বড় ডাক্তার। সাত জনের স্কোয়াড আসতো, ওষুধ আসতো বড় বড় ট্রাংক বোঝাই। সকল মানুষের থাকা ও খাওয়ার ব্যবস্থা এই বাড়িতেই হতো। এই অঞ্চলের ৫ জন কম্পাউন্ডারের প্রধান ছিলেন ইন্দু ভূষণ রায়। মূলত: তিনিই সকল রেজিষ্টার মেইনটেইন করতেন এবং সার্বক্ষণিকভাবে চিকিৎসাসেবার কাজে জড়িত ছিলেন। পরবর্তীতে সুস্থ থাকা অবধি তিনি একজন ভালো ডাক্তার হিসেবে পরিচিতি লাভ করেন এবং ৭০ বছর সুনামের সাথে মানুষকে চিকিসাসেবা দেন। সরকারের গুদামে চাল নেই, সরকারের লোক গ্রামে গ্রামে গিয়ে কৃষকদের ধানের গোলা ‘সিজ’ করা শুরু করে। সে সময়ের কমিউনিস্ট পার্টির শক্ত আন্দোলন সরকারের সে প্রচেষ্টাকে ব্যর্থ করে দেয়। ঐ অঞ্চলেও তাঁদের ভূমিকার কারণে সরকারি লোক কারো গোলা সিজ করতে পারেনি। তিনি যেমন একজন ভালো ডাক্তার ছিলেন তেমনি শিল্পীও ছিলেন। সঙ্গীত, অভিনয়, বাদ্যযন্ত্র বাজাতে পটু ছিলেন, বিশেষভাবে বেন্জু বাদ্যযন্ত্রটি অসাধারণ বাজাতেন। তিন ভাইয়ের মধ্যে তিনিই বড়। ছোট দুই ভাই হিমাংশু শেখর রায় অত্যন্ত ভালো গায়ক ও বাদক ছিলেন, পোস্টমাস্টার থাকাকালীন সময় মারা যান। ছোট ভাই বিমলকৃষ্ণ রায় ভারতের উচ্চপদস্থ আর্মি অফিসার ছিলেন, তিনিও মারা যান। বাবা-মা, ছোট দুইভাই এর মৃত্যুতে তিনি কষ্ট পেয়েছেন, কিন্তু বিচলিত ছিলেন না। অতি কঠিন বিষয়কেও স্বাভাবিকভাবে নেবার শক্তি তাঁর ছিল। সাড়াজীবন সৎ ও সুন্দর অভ্যাসের একজন মানুষ ছিলেন। জীবনের শেষদিনের আগের দিনও তিনি তাঁর সবজি বাগানের, ফুল বাগানের যত্ন নিয়েছেন, বাইরের উঠোন ঝাড়ু দিয়েছেন, বাড়ির সামনের রাস্তা ঝাড়ু দিয়েছেন। মৃত্যুর আগের দিনও তিনি পরিমাণ মতো খাবার গ্রহণ করেছিলেন। হয়তো তাই ৯৬ বছর বয়সেও কোন রোগ তাঁকে ছুঁতে পারেনি। ২২ ফেব্রুয়ারি ২০১৯ খ্রিস্টাব্দ ইন্দুভূষণ রায় ও সুনীতি রায়ের ৭৬তম বিবাহবার্ষিকী ছিল। মৃত্যুর মাত্র ১৩ দিন আগেও তিনি ছিলেন প্রাণবন্ত। গত ৭ মার্চ ২০১৯ খ্রিস্টাব্দ সন্ধ্যা ৬.১০ মিনিটে কাউকে বিন্দুমাত্র কষ্ট না দিয়ে তিনি মৃত্যুবরণ করেন।

Print প্রিন্ট উপোযোগী ভার্সন



Login to comment..
New user? Register..