ভোটাধিকারের সংগ্রামে ছাত্র-জনতা এক হও

Facebook Twitter Google Digg Reddit LinkedIn StumbleUpon Email
সৈয়দ আবু জাফর আহমেদ : একসময় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কে বলা হতো প্রাচ্যের অক্সফোর্ড। এখন আর সে গৌরব নাই। তারপরও দেশের প্রধান বিদ্যাপীঠ হিসেবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় তার গৌরব ধরে রাখতে পেরেছে। লেখাপড়ার পাশাপাশি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় তার রাজনৈতিক সংস্কৃতি তৎপরতার ঐতিহ্য ধরে রাখতে পেরেছে। এই বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ, ডাকসুকে বলা হতো গণতন্ত্রের সুতিকাগার, এই ডাকসুর নির্বাচন নিয়ে শুধু বিশ্ববিদ্যালয়ের ৪৬ হাজার শিক্ষার্থীর মধ্যেই ব্যাপক উৎসাহ উদ্দীপনা ছিল তা নয়, দেশবাসীর সচেতন মহলেও এ ব্যাপারে উৎসাহের কমতি ছিল না। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ, ডাকসু ও ১৮টি হল ছাত্র সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয় দীর্ঘ ২৮ বছর পর। ১৯৭২ সাল থেকে ১৯৯০ সাল, এই ১৮ বছরে ডাকসু ও হল সংসদ ও নির্বাচন হয়েছে মোট সাতবার এবং দীর্ঘ আটাশ বছর নয় মাস বিরতির পর এবারের নির্বাচন হয়েছে ১১ মার্চ ২০১৯ তারিখে। এমনিতে কর্তৃপক্ষ এই নির্বাচন দেয়নি। অনেক আন্দোলন সংগ্রাম করতে হয়েছে এই নির্বাচনের জন্য। শেষ পর্যন্ত হাই কোর্ট-সুপ্রিম কোর্ট পর্যন্ত গড়ায় বিষয়টি। আদালত নির্দেশ দেয় এই নির্বাচনের জন্য। তাই আদালতের বেঁধে দেওয়া সময়ের মধ্যে কর্তৃপক্ষ ১১ মার্চ ২০১৯ তারিখে ডাকসু ও হল সংসদ নির্বাচনের আয়োজন করে। তাই শিক্ষার্থীদের মধ্যে নির্বাচন নিয়ে আগ্রহ ছিল প্রচুর। ডাকসুর ভিপি পদে ২১ জন ও সাধারণ সম্পাদক পদে ১৪ জন, সহ-সাধারণ সম্পাদক পদে ১৩ জন এবং ১৮টি হল সংসদে প্রার্থী হিসেবে ৫০৯ জনের প্রতিদ্বন্দ্বিতার মধ্যে নির্বাচনের ব্যাপারে ছাত্র-ছাত্রীদের ব্যাপক আগ্রহের প্রমাণ। দেশবাসীর সচেতন মহল সারাদেশ নিয়ে গণতান্ত্রিক অধিকার নিয়ে ভাবেন তারা অনেকেই মনে করেন ডাকসু নির্বাচন নিয়মিত হলে প্রতি বছর এক ঝাঁক মেধাবী তরুণ রাজনীতিতে যোগ দিতেন। যদি তাই হতো তা হলে আজকের মত এত সহজে আমলা ও ব্যবসায়ীরা এসে রাজনীতির মাঠ এর স্থান দখল করে নিতে পারত না। এই আশাবাদ নিয়ে অনেকেই ডাকসু নির্বাচনে স্বাগত জানিয়েছিলেন। শেষ পর্যন্ত ১১ মার্চের ডাকসু নির্বাচনেও যখন ৩০ ডিসেম্বরের জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পুনরাবৃত্তি হলো তখন মানুষের আশাবাদ ভেঙ্গে গেল। ডাকসু নির্বাচন অবাধ ও নিরপেক্ষ করার জন্য সরকার সমর্থক ছাত্র সংগঠন ছাত্রলীগ ছাড়া অন্য সকল সংগঠন, স্বতন্ত্র প্যানেল ও ছাত্র অধিকার সংরক্ষণ পরিষদ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের কাছে পূর্বাপর দাবি জানিয়ে আসছিল। কিন্তু কর্তৃপক্ষ তাদের কোনো দাবির প্রতি কর্ণপাত করেনি। তাদের দাবি ছিল হলে হলে ভোট কেন্দ্র না করে প্রশাসনিক ভবনে ভোট কেন্দ্র স্থাপন করা। গত ১০ বছর ধরে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন সরকারি সমর্থক নীল দলের থাকায় হলগুলোতে সরকারি ছাত্র সংগঠনের দখল-দারিত্ব বা একক আধিপত্য কায়েম হয়। তারা গেস্টরুম, গণরুম সংস্কৃতি চালু করে। সেই গেস্ট রুম, গণ রুমে প্রায় ২৫০০ শিক্ষার্থী থাকেন। যারা ভয়ে অথবা নানা প্রভাবে সরকারি দলের অনুগত থাকেন বা থাকতে বাধ্য হন। হলে হলে ভোট কেন্দ্র হলে তাদেরকে ব্যবহার করে সরকারি দলের পক্ষে কেন্দ্র দখলে রাখা সম্ভব। ভোটের দিন তার প্রমাণও পাওয়া যায়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রায় ৪০% শিক্ষার্থী অনাবাসিক। নির্বাচনের দিন অনাবাসিক শিক্ষার্থীরা যাতে ভোট দিতে না পারে তার জন্য গেস্ট রুম, গণরুমের শিক্ষার্থীদের ব্যবহার করে বুথ জ্যাম করে দেয়া হয়েছিল। এভাবে সরকারি ছাত্র সংগঠন ছাড়া অন্য সকলে ভোট দেওয়ার সময় বাড়ানো দাবি, ভোটের আগের রাতে হলে হলে ব্যলট পেপার ও ব্যালট বাক্সে না পৌঁছানো, স্বচ্ছ ব্যালট বাক্সের ব্যবস্থা করার দাবি করে আসছিল। কর্তৃপক্ষ বলেছিলেন এগুলোর কারণে কোনো সমস্যা হবে না। তারা শিক্ষকদের ওপর ভরসা রাখতে বলেছিলেন। শিক্ষার্থীরা শিক্ষকদের ওপর আস্থা রেখে এত প্রতিকূলতার মধ্যেও নির্বাচনে অংশ নিয়েছিল। কিন্তু শিক্ষকেরা সেই আস্থার মর্যাদা রাখেন নি। তারা ৩০ ডিসেম্বরের মতো ভোটের আগের রাতে ব্যালট পেপারে ভোট দিয়ে বাক্স ভর্তি করে রাখেন। ছাত্রীদের হাতে সেগুলো ধরাও পড়ে, কয়েক ঘণ্টা ভোট বন্ধ থাকে। এভাবে শিক্ষার্থীদের গণতান্ত্রিক অধিকারকে রুদ্ধ করে দেওয়া হয়। দুর্নীতির দায়ে এক শিক্ষিকাকে তাৎক্ষণিকভাবে দায়িত্ব থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়। কিন্তু নৈতিক স্খলনজনিত অপরাধের কি কোনো শাস্তি হবে? নির্বাচনের দিন এবং নির্বাচনের আগে ও পরে প্রার্থীদের ওপর হামলা করা হয়, মারধর করা হয়। কর্তৃপক্ষ তার কোনো প্রতিকার করেন নাই। নির্বাচনের দিন বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ মিডিয়ার ওপর কড়াকড়িভাবে নিয়ন্ত্রণ আরোপ করেছিল। সরকার বিগত ১০ বছর ৩০টি টেলিভিশন চ্যানেল দেওয়ার জন্য গর্ববোধ করেন। আর এই সরকারের আমলে ডাকসু নির্বাচনের মতো নির্বাচনে, যেখানে ১৮টি হলে ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে ভোট কেন্দ্র– সেখানে ১১টি টেলিভিশনের ৪টি ইউনিট ও একটি সংবাদপত্রের দুই জন সাংবাদিককে ডাকসু নির্বাচন কাভারের অনুমতি দেওয়া হয়। গত দশ বছর ধরে বিশ্ববিদ্যালয়ে আবাসিক হল তথা ক্যাম্পাস ছিল সরকার সমর্থক ছাত্র সংগঠন- ছাত্রলীগের দখলে। অন্য ছাত্র সংগঠন ক্যাম্পাসে তাদের স্বাভাবিক কাজকর্ম চালাতে পারেনি। ফলে বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রিক ছাত্র রাজনীতিতে এক ধরনের শূন্যতা সৃষ্টি হয়। ছাত্রলীগ ছাড়া অন্য সংগঠনগুলো ডাকসু ও হল সংসদে পূর্ণ প্যানেল দিতে পারেনি। এত প্রতিকূলতা, শূন্যতা, বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের পক্ষপাতিত্ব ইত্যাদির পরও ডাকসুতে ছাত্রলীগ ভিপির মতো গুরুত্বপূর্ণ পদসহ আরও একটি পদে হেরেছে। বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্র রাজনীতির গণতান্ত্রিক পরিবেশ থাকলে সরকারি ছঅত্র সংগঠনের অবস্থা আরও খারাপ হতো। ডাকসুর পূর্বের নির্বাচনগুলোর ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায় ডাকসুতে সরকারি ছাত্র সংগঠন প্রায় বরাবরই হেরেছে এবং অধিকাংশ ডাকসুতে বামপন্থি অথবা বাম ধারার ছাত্র সংগঠন জিতেছে। এবার তার ব্যতিক্রম। এবারের ডাকসুতে বাম প্রগতিশীল ছাত্র সংগঠনগুলো সে ধারা বজায় রাখতে পারেনি। তারা নিশ্চয়ই ফলাফল বিপর্যয়ের কারণ খুঁজে বের করে দ্রুত ঘুরে দাঁড়াবে। ছাত্রলীগের দখলদারিত্বের যুগে যেখানে সহ-অবস্থানের সংস্কৃতি ভেঙ্গে পড়েছে সেখানে বাম ধারার ছাত্র সংগঠনের পক্ষে স্বাভাবিক কাজ করা হয়তো অসম্ভব। এরই মধ্যে বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রদের মধ্যে গড়ে ওঠা ‘কোটা সংস্কার আন্দোলন’ ব্যাপক সমর্থন ও সহানুভূতি লাভ করে। সরকার এবং ছাত্রলীগ এই আন্দোলনের কর্মীদের ব্যাপক নির্যাতন, মামলা দায়ের করাসহ সকল প্রকার দমননীতি প্রয়োগ করার পরও এই আন্দোলনকে দমন করতে না পেরে দাবি মানতে বাধ্য হয়। এবারের ডাকসু নির্বাচন তারা ‘সাধারণ শিক্ষার্থী অধিকার সংরক্ষণ পরিষদ’ নামে একটি প্ল্যাটফর্ম গঠন করে ডাকসুতে প্যানেল দেয়। সেই প্যানেল থেকে সহ-সভাপতি সহ আরও একজন ডাকসুতে জয়লাভ করেন। ছাত্র সমাজের জীবন জীবিকার সংগ্রামে দমন-পীড়ন-হামলা-মামলা উপেক্ষা করে লেগে পড়ে থাকে গড়ে তুলতে পারলে এবং সে আন্দোলনকে ধারাবাহিকভাবে তার যৌক্তিক পরিণতির দিকে নিয়ে যেতে পারলে ছাত্র সমাজের আস্থা-ভালবাসা শ্রদ্ধা অর্জন করা সম্ভব। ছাত্র সমাজের দৈনিক জীবনের সমস্যার পাশাপাশি গণতান্ত্রিক অধিকারের সংগ্রামও গুরুত্বপূর্ণ। বাম প্রগতিশীল ধারার ছাত্র সংগঠনকে এই বিষয়টির ওপরে অধিক গুরুত্ব দিতে হবে। ছাত্র সমাজের ভোটাধিকারের সংগ্রাম বর্তমানে দেশবাসীর ভোটের অধিকার সংগ্রাম থেকে বিচ্ছিন্ন নয়। তাই ছাত্র সমাজের ভোটাধিকারের সংগ্রাম ও দেশবাসীর ভোটের অধিকার আদায়ের সংগ্রাম সমন্বিতভাবে চালাতে হবে। শ্রমিক কৃষক মেহনতি মানুষের সংগ্রামও এক্ষেত্রে বিচ্ছিন্ন নয়। সেকারণে এ স্লোগানটাও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে– ‘শ্রমিক-কৃষক ছাত্র-জনতা এক হও, এক হও’।

Print প্রিন্ট উপোযোগী ভার্সন



Login to comment..
New user? Register..