কবি তসলিমা কি চিরনির্বাসিতই থাকবেন?

Facebook Twitter Google Digg Reddit LinkedIn StumbleUpon Email
সজল অনিরুদ্ধ: সম্প্রতি হ্যাশট্যাগ মিটু ঝড়ে দুনিয়া তোলপাড় হয়ে গেছে। দফ্ করে জ্বলে আবার কফ করের মতো নিভেও গেছে। আপাতত এ নিয়ে পত্রপত্রিকায় কোনো ধরনের উচ্চবাচ্য দেখছি না। তবে যতটুকু উচ্চবাচ্য হয়েছে এটাও কম কিসে? হ্যাশট্যাগ মিটু ঝড়টা প্রথম শুরু হয়েছে হলিউডে। তারপর বলিউড হয়ে সোজা বাংলাদেশে ঢুকে পড়েছে। অনেক রথী-মহারথীর মুখোশ উন্মোচন করে দমকা হাওয়াটা এখন কোন দিকে ধাবিত হয়েছে ঠিক বুঝতে পারছি না। তবে যেদিকেই ধাবিত হোক এর তেজ যেন নষ্টদের পুড়িয়ে ছারখার করে এই আশাই রাখি। কিন্তু এই আশার মধ্যেও মূলত কিছু নিরাশার কথা বলতেই দুয়েক ছত্র লিখতে বসেছি। আমাদের দেশে বোধকরি হ্যাশট্যাগ মিটু ঝড়টা প্রথম তুলেছিলেন তসলিমা নাসরিন। তিনি যখন তার বিভিন্ন লেখায় মহামান্যদের মুখোশ উন্মোচন করে চলছিলেন, তখন আমাদের দেশের কোনো নারীবাদীকে তার পাশে দাঁড়াতে দেখিনি। এমনকি গুটিকয়েক মানুষ ছাড়া কাউকে বলতে শুনিনি আমার দেশের কবি বিদেশে থাকবেন কেন? কিন্তু দেখলাম হ্যাশট্যাগ মিটু ঝড়টা যেই না হলিউড-বলিউড হয়ে বাংলাদেশে প্রবেশ করলো আমাদের উন্মাদনার শেষ নাই। কিন্তু কতিপয় মানুষের চরিত্র উন্মোচনের জন্য তসলিমার ভাগ্যে ‘বেশ্যা’ শব্দটিই জুটেছিল। সম্ভবত বিদেশ থেকে আমদানি না হলে আমাদের কোনো তত্ত্বই মুখে রুচে না। হ্যাশট্যাগ মিটু নিয়ে তেমন কিছু বলার নেই। সমগ্র দুনিয়াই যখন যৌন নিপীড়নকারীদের অভয়রাণ্য, সেখানে শুধুমাত্র কতিপয় মহারথীর মুখোশ উন্মোচন করে ক্ষণিকের বাহাবা নিয়ে মানুষের পৃথিবী বপন করা যাবে না। আমার বক্তব্য ভুল বুঝবেন না। আমরা চাই সমাজের সকল যৌন নিপীড়নকারীর মুখোশ উন্মোচন। কিন্তু কিভাবে সেটা সম্ভব? একটি সমাজের প্রতিচ্ছবি তার গণমাধ্যম। কিন্তু বর্তমান বুর্জোয়া পৃথিবীতে গণমাধ্যমগুলোও অনেক বেশি নষ্ট। তারা পত্রিকার কাটতি বাড়ে এমন সংবাদেই সচরাচর প্রকাশ করে থাকে। যে কারণে তারা নানা পাটেকার আর তনুশ্রীর ঘটনা যতটা না রসিয়ে পরিবেশন করে, গ্রাম্য বালিকা রহিমার দগদগে ক্ষত উন্মোচনে তারা ততটা আগ্রহী নয়। যাই হোক ফিরে আসি নির্বাসিত কবি তসলিমা নাসরিন প্রসঙ্গে। মূলত মৌলবাদীদের আঁতে ঘা দেয়ার জন্যই তাকে দেশ ছাড়তে হয়েছিল। কিন্তু তসলিমা নাসরিনকে যে সময়ে দেশ ছাড়তে হয়েছিল তখন বিএনপি সরকার ক্ষমতায় ছিল। এদেশের প্রগতিশীল মানুষ আশা করেছিল মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের শক্তি আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসলে তসলিমা নাসরিনকে হয়ত দেশে ফিরিয়ে আনার উদ্যোগ নেওয়া হবে। কিন্তু বাস্তবে দেখা গেল আওয়ামী লীগ সরকার বার বার ক্ষমতায় আসার পরেও তসলিমাকে ফিরিয়ে আনার কোনো উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। বরং মুক্তমনা অনেক ব্লগার লেখক জঙ্গি গোষ্ঠীর হাতে প্রাণ দিয়েছে। কেউ কেউ আবার প্রাণের ভয়ে বিদেশ চলে গেছেন। অতএব তসলিমা নাসরিন প্রসঙ্গটি এখন অনেকটাই অপ্রাসঙ্গিক। অবশ্য সুবিদাবাদী লোকজন ছাড়া গুটিকয়েক বোকাসোকা মানুষ তসলিমা নাসরিনকে মনে রেখেছে। ২০১৩ সালে তসলিমা নাসরিনকে ফিরিয়ে আনার দাবিতে রাজধানী ঢাকায় মানববন্ধন করেছে তার ভক্ত ও বন্ধুরা। তারা অবশ্যই সাধুবাদ পাওয়ার যোগ্য। কারণ ঘাতকের শানিত তরবারিকে উপেক্ষা করে তারা রাজপথে দাঁড়িয়েছিল। তসলিমা নাসরিন প্রায়ই তার বিভিন্ন লেখায় প্রিয় বাংলাদেশে ফিরে আসার কথা বলেছেন। কিন্তু বাংলাদেশ অ্যামব্যাসি তার পাসপোর্ট রিনিউ করেনি। মৌলবাদী শক্তির বিরুপভাজন হওয়ার আশঙ্কায় আওয়ামী লীগ সরকারও তার ব্যাপারে কোনো গরজ দেখায়নি। বলতে গেলে তসলিমা নাসরিন চ্যাপ্টারটিই ক্লোজ হয়ে গেছে। সেই চ্যাপ্টারের পাতাটি খুলে ধরতেই সরকারের কাছে বিন¤্র অনুরোধ- কবিকে কৃষ্ণচূড়ার ঘ্রাণ নিতে দিন। অমর একুশে বইমেলায় নিশঙ্ক চিত্তে পা রাখুক কবি তসলিমা নাসরিন।

Print প্রিন্ট উপোযোগী ভার্সন



Login to comment..
New user? Register..