প্রসঙ্গ আত্মহত্যা ও নির্যাতন

Facebook Twitter Google Digg Reddit LinkedIn StumbleUpon Email

হাবীব ইমন: সাম্প্রতিক সময়ে নারী নির্যাতন ও আত্মহত্যার মাত্রা বেড়ে গেছে। বাংলাদেশে পুরুষের তুলনায় নারীদের আত্মহত্যার প্রবণতা বেশি। বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্থার প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আত্মহত্যার দিক দিয়ে বিশ্বে বাংলাদেশের অবস্থান দশম। এ দেশে আত্মহত্যার ক্ষেত্রে নারীদের সংখ্যাই বেশি, যাদের বয়স ১৪ থেকে ৩০ বছর। দেশে দিন দিন মানুষের মধ্যে আত্মহত্যার প্রবণতা বাড়ছে, সেইসাথে আত্নহত্যার সংখ্যা। বাংলাদেশে প্রতিবছর ফাঁসিতে ঝুলে, বিষ খেয়ে ও ট্রেনে কাটা পড়ে গড়ে ১০ হাজার মানুষ আত্মহত্যা করছেন। যারা আত্মহত্যা করেছেন, তাদের মধ্যে ৬০ ভাগ নারী। তাছাড়া, প্রতিদিন খবর প্রকাশ পাচ্ছে, নারী ও শিশুদের ওপর নির্যাতন হচ্ছে। অথচ বাংলাদেশে অনেক আইন রয়েছে, যেখানে প্রতিটি অপরাধের দ্রুত বিচার সম্ভব। তারপরও আমরা দেখি, দিনের পর দিন মামলাগুলো ঝুলে থাকে। আবার এটাও ঠিক, কঠোর আইন ও তার কঠোর বাস্তবায়ন একটি নেতিবাচক ধারণা। কঠোর শাস্তি দিলেই যে অপরাধ প্রবণতা কমে যায়, এমনটা পৃথিবীর কোথাও গবেষণায় প্রমাণিত হয়নি। নারীর প্রতি সহিংসতার ক্ষেত্রে প্রতিকারের তুলনায় প্রতিরোধকেই বেশি গুরুত্ব দিতে হবে। বর্তমানে নারীর প্রতি সহিংসতা ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। ঘরের ভেতর একভাবে, ঘরের বাইরে অন্যভাবে নারীরা সহিংসতার শিকার হচ্ছেন। নারী বাইরের কাজ করলেও তাকে বেশিরভাগ ক্ষেত্রে বাসার কাজও করতে হয়। নারীরা ক্ষমতায়ন ও অধিকার সম্পর্কে যখন সচেতন হয়ে ওঠেন, তখন অনেক ক্ষেত্রে তারা পারিবারিক নির্যাতন বা সহিংসতার শিকার হন। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে যৌন হয়রানি নিয়ে হাইকোর্টের রায় আছে। কিন্তু সে রায়টিকে এখন পর্যন্ত আইনে বাস্তবায়ন করা যায়নি। অনেক সময় সালিশের নামে নির্যাতিত নারীর ওপর চাপ সৃষ্টি করা হয়। নারী নির্যাতনের বিরুদ্ধে জোর প্রতিবাদ না হলে একটি সুন্দর সমাজ নির্মাণ করা সম্ভব হবে না। নারীর প্রতি সহিংসতার বিরুদ্ধে আন্দোলনের ফলে এটি যে একটি শাস্তিযোগ্য অপরাধ, সেটি প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। আন্দোলনের ফলে বেশ কিছু আইন হয়েছে, মানুষের মধ্যে সচেতনতা সৃষ্টি হয়েছে। আবার দেখা যাচ্ছে, কিশোরী মেয়েরা যৌন নিপীড়ন ও উত্ত্যক্তের শিকার হয়ে আত্মহত্যার পথ বেছে নিচ্ছে। এখানে আমাদের সমাজ কিংবা রাষ্ট্রের অবক্ষয়ের চিত্র ফুটে উঠছে। অনেক সময় কোনও সাহসী মেয়েকেও সমাজ মেনে না নিয়ে তিরস্কার করে। এভাবেও নারীকে আত্মহত্যার দিকে ঠেলে দেওয়া হয়। মেয়েদের যে সমাজে অবদমিত করে রাখা হয়, মেয়েদের বিকাশের সুযোগ দেওয়া হয় না, এগুলোও তাদের আত্মহত্যার দিকে ধাবিত করে। মানসিক অবসাদ, পারিবারিক নির্যাতন, ইভটিজিং, যৌতুক, প্রতারণা, সামাজিক নিরাপত্তাহীনতা, আর্থিক টানাটানি বা পারিবারিক কলহ হতাশা ও অতিরিক্ত আবেগ প্রবণতার কারণেই বেশিরভাগ আত্মহত্যার ঘটনা ঘটছে বলে জানিয়েছে মনোবিজ্ঞানীরা। আত্মহত্যার প্রবণতা রয়েছে এমন মানুষের ঠিক সময়ে দ্রুত চিকিৎসা ও কাউন্সেলিং করা হলে এদের বাঁচানো সম্ভব। তবে বাংলাদেশে এ ধরনের চিকিৎসাসেবার পর্যাপ্ত সুযোগ কম বলে জানিয়েছে চিকিৎসকরা। মেয়েকে যখন বখাটেরা উত্ত্যক্ত করে, তখন সে ঠিকমতো আশ্রয় পায় না। অনেক ক্ষেত্রে পরিবার, সমাজ তাকে দূরে ঠেলে দেয়। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে অপরাধীর কোনো সাজা হয় না। তাই আক্রান্ত মেয়েটি আরও বেশি নিগৃহীত হয়। সে মনে করে, আত্মহত্যা করা ছাড়া তার কোনো পথ খোলা নেই। খুন, ধর্ষণ, হত্যা, আত্মহত্যা, পরকীয়ার আধিক্য–ই এই বিক্ষুব্ধ সময়েরই প্রতিচ্ছবি। বাংলাদেশে পুরুষের তুলনায় নারীদের আত্মহত্যার প্রবণতা বেশি। আত্মহননকারী নারীদের বয়স ১৪ থেকে ৩০-এর মধ্যে। বিশ্লেষকরা বলছেন, যৌতুকের কারণে নির্যাতন, যৌন নিপীড়ন, পারিবারিক সহিংসতা, নারী হওয়ার কারণে অবদমিত করে রাখার সামাজিক মানসিকতা এবং অতিরিক্ত চাপ-অর্থাৎ সামাজিক, পারিবারিক, জেবিক এসব কারণ নারীকে আত্মহত্যায় উদ্বুদ্ধ করে। ঢাকা মেডিকেল কলেজের ফরেনসিক বিভাগ ২০০৮-০৯ সালে আত্মহত্যার ওপর একটি গবেষণা প্রতিবেদন প্রকাশ করে। ওই প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, বাংলাদেশে নারীদের ওপর শারীরিক, যৌন ও মানসিক নির্যাতনের কারণেই অধিকাংশ আত্মহত্যার ঘটনা ঘটে। সাম্প্রতিক সময়ে ইভটিজিংয়ের মতো ঘটনা ঘটছে ব্যাপকভাবে। অনেকে পরিস্থিতি সামাল দিতে না পেরে আত্মহত্যা করছেন। অবিবাহিত নারীদের ক্ষেত্রে বিয়ের আগে যৌন সম্পর্ক স্থাপনে বাধ্য হওয়া, অথবা স্বেচ্ছায় যৌন সম্পর্ক স্থাপনের পর গর্ভধারণের কারণে অনেকে আত্মহত্যা করেন। নারীর প্রতি সহিংসতা রোধের আন্দোলন সব সময় প্রতিকূল পরিবেশের মধ্য দিয়ে গেছে। বর্তমানে যে রাজনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডল সৃষ্টি হয়েছে, সেখানে নারী আন্দোলনকে চালিয়ে নিয়ে যাওয়াও কঠিন হয়ে দাঁড়িয়েছে। অনেক কঠোর আইন রয়েছে। তবে আইনগুলোর বাস্তবায়ন হচ্ছে কি না, সেটি দেখতে হবে। বিচার বিভাগ ও সমগ্র সমাজের নারীর প্রতি সংবেদনশীলতা কোন পর্যায়ে, তা দেখা জরুরি। মাঠপর্যায়ে নারীর প্রতি সহিংসতা রোধে সালিশি কার্যক্রমে যারা আসেন, তাদের ওপর রাজনৈতিক প্রভাব খাটানোর মাধ্যমে চাপ সৃষ্টি করা হয়। পেশিধারীরা সালিশি কার্যক্রমে দল নিয়ে আসে। এমনকি নারীর সহিংসতা রোধে কাজ করা সংগঠনের ওপর নানা চাপ সৃষ্টি করে। এছাড়া, সহিংসতার শিকার হওয়ার পর মামলাকারী একা গেলে তাকে নানা ধরনের সমস্যার মুখোমুখি হতে হয়। মামলা নিতে গড়িমসি করা হয়, বিভিন্ন ধরনের ভয়ভীতি দেখানো হয়। কঠোর আইন বিদ্যমান থাকা সত্ত্বেও বর্তমানে পরিবহন, বাজার, রাস্তা, বিভিন্ন ঘনবসতিপূর্ণ কিংবা খোলামেলা এলাকায় নারী নির্যাতনের যে ধরনের ঘটনা ঘটছে, তা সত্যিই আশঙ্কাজনক। এর একটি কারণ হচ্ছে তারুণ্য, ইন্টারনেট ও যোগাযোগ মাধ্যমগুলোর সহজলভ্যতা। এসব সহজলভ্যতার ফলে দিন দিন সামাজিক অবক্ষয় ঘটছে। সহিংসতা আগেও ছিল। সাম্প্রতিককালে এর স্বরূপ খুবই ভয়ানক আকার ধারণ করেছে। এর একটি বড় কারণ হলো, যোগাযোগমাধ্যমের অপব্যবহার। এর পেছনে তরুণদেরও দায়বদ্ধতা আছে। একটি স্মার্ট ফোনের ইতিবাচক-নেতিবাচক ব্যবহার সম্পর্কে এখনো সবাইকে সচেতন করা যায়নি। বাংলাদেশে অ্যাডাল্ট (বয়স্কদের) সাইটগুলো সার্চ করলেই পাওয়া যায়। ডিজিটাল আইনের মাধ্যমে এর নিয়ন্ত্রণ প্রয়োজন। এছাড়া, আরো একটি কারণ আমরা অবশ্যই চিহ্নিত করতে পারি, বাংলাদেশে সমাজে জাঁকিয়ে বসা পিতৃতন্ত্রের রক্তচক্ষু এবং নারীকে কেবল পরিবারের তত্ত্বাবধায়ক ও শুশ্রুষাকারী হিসেবে দেখার প্রবণতা। নির্যাতনের শিকার হওয়া একজন নারী আইনের আশ্রয় না নেওয়া পর্যন্ত আইন প্রয়োগকারী কর্তৃপক্ষ কোনো পদক্ষেপ নিতে চায় না। আবার দোষী ব্যক্তিদের ক্ষমতার চাপে মামলা করা যায় না। এ বিষয়গুলো নিয়ে কাজ করা উচিত। একটি অপরাধ হলে কী হতে পারে ও তার জন্য কী ধরনের সুরক্ষা পাওয়া যাবে, সে বিষয়গুলো বিভিন্ন গণমাধ্যমে ব্যাপকভাবে প্রচার করা উচিত। কেবল আইনই একমাত্র সমাধান নয়। আইনের বাইরেও অনেক কিছু করার আছে। বিশেষ করে শিক্ষাব্যবস্থায় পরিবর্তন আনতে হবে, প্রচার-প্রচারণা চালাতে হবে। আইন সম্পর্কে প্রত্যেকের সচেতন হওয়া উচিত। আইনের প্রয়োগ যাদের হাতে, তাদের ভূমিকা নিয়ে সাধারণ মানুষকে আরও সচেতন হতে হবে। মেয়েদের নিজের অধিকার সম্পর্কে সচেতন হওয়া উচিত। কোনো একটি ঘটনা ঘটার পর তার প্রতিবাদ করার জায়গা প্রতিনিয়ত কমে যাচ্ছে। বাংলাদেশে নানা ধরনের আইন হচ্ছে। রাষ্ট্র আইন প্রণয়ন করছে ঠিকই কিন্তু সেগুলোর প্রয়োগ ঠিকমতো হচ্ছে না। যখন কোনো কঠোর আইন করা হয়, কিন্তু পরে ক্ষমতাশালীদের সুবিধা দেওয়ার জন্য কিংবা রাজনৈতিক দলের প্রয়োজনে সেই আইন আর প্রয়োগ করা হয় না, তখন সে আইন অর্থহীন হয়ে যায়। নারী নির্যাতনের মামলা নিতে আগ্রহী নয় এমন কোনো পুলিশের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার ঘটনা আমাদের নজরে আসেনি। কর্মক্ষেত্রে নারীদের সুরক্ষা জোরদার করাও অত্যন্ত জরুরি। সারাবিশ্বে নারীরা দৈনিক কর্মক্ষেত্রে যে কী ভীষণ লাঞ্ছণার স্বীকার হচ্ছেন, ‘হ্যাশ মিটু’ আন্দোলনের সূত্র ধরে সে সম্পর্কে আমরা নতুন করে জানতে পেরেছি। নারীর প্রতি সহিংসতা রোধে নারী এবং পুরুষকে প্রতিপক্ষ হিসেবে দাঁড় করানো যাবে না; বরং উভয়ে মিলেই সমাধানের পথ খুঁজে বের করতে হবে। সবাই মিলে সমন্বিতভাবে কাজ করলে নারীর প্রতি সহিংসতা কমানো সম্ভব। এ ক্ষেত্রে গণমাধ্যমের ওপরও চাপ বিরাজমান। সমাজের প্রান্তিক গোষ্ঠীগুলোকে নিয়ে তাই বিশেষভাবে কাজ করা উচিত।

Print প্রিন্ট উপোযোগী ভার্সন



Login to comment..
New user? Register..