চীনের অর্ধেক আকাশের অধিকারী নারী

Facebook Twitter Google Digg Reddit LinkedIn StumbleUpon Email

শান্তা মারিয়া: বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম অর্থনীতির দেশ চীন। গত তিন দশকে চীনের উন্নতি বিস্ময়কর। আর এই উন্নয়নের পেছনে চীনের নারীদের অবদান পুরুষের চেয়ে কোনো অংশে কম নয়। অথচ ১৯৫০ সালের আগে সামাজিক রীতিনীতি ও দৃষ্টিভঙ্গীর কারণে নারীরা ছিল নানা রকম নির্যাতন ও বৈষম্যের শিকার। সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবের পর নতুন চীনে নারীদের প্রতি সকল রকম বৈষম্য বিলোপ করা হয়। আইন ও রাষ্ট্রের চোখে তারা সকল ক্ষেত্রে পুরুষের সম অধিকার পান। রাষ্ট্রীয় উন্নয়ন নীতিতে নারীর সম অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা হয়। চীন বিপ্লবের মহানায়ক চেয়ারম্যান মাও সে তুং বলেন, চীনের অর্ধেক আকাশ ধরে রেখেছে নারীরা। কথাটি যে কত সত্যি তা মর্মে মর্মে উপলব্ধি করলাম চীন দেশে বসবাসের সময়। প্রথম যখন বেইজিং শহরে চীন আন্তর্জাতিক বেতারের সাংবাদিক হিসেবে কাজে যোগ দিলাম তখন দেখেছি এখানে অসংখ্য নারী সংবাদকর্মী পুরুষের পাশাপাশি সমান দক্ষতা নিয়ে কাজ করে চলেছেন। চীন আন্তর্জাতিক বেতারের বিভিন্ন বিভাগে পুরুষের চেয়ে নারীর সংখ্যাই বেশি। বাংলা বিভাগের পরিচালক একজন নারী। সহকারী পরিচালকও নারী। শুধু সি আর আই-তে নয় বেইজিংয়ে অফিস আদালত, দোকানপাট, রাজপথ যেদিকেই তাকাই না কেন, নারীর ব্যস্ত পদচারণা চোখে পড়ে সর্বত্র। অসংখ্য নারী যেমন ডেস্কে বসে কাজ করছেন তেমনি দৈহিক শ্রমনিভর্র কাজগুলোও করে চলেছেন যোগ্যতা ও দক্ষতার সঙ্গে। কলে-কারখানায় পুরুষের সমান সংখ্যক নারী শ্রম দিচ্ছেন, উৎপাদনে সমৃদ্ধ করছেন দেশকে। কৃষি ক্ষেত্রেও নারীরা ফলাচ্ছেন সোনালি ফসল। আমার সহকর্মীদের কাছ থেকে জানতে পারলাম চীনের অর্থনীতিতে নারীর অবদান অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। চীনের জিডিপির ৪১ শতাংশ নারীর অবদান। ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা নারীরা চীনের অর্থনীতিকে বেগবান করেছেন। চীনে শিল্প কারখানার উন্নয়নের পিছনে প্রথম ও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তা নারীরা। বলতে গেলে দেশটিকে নারীরা তাদের শ্রমে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছেন। নারীর প্রতি সরকারি সুযোগ সুবিধাও এখানে প্রচুর। মাতৃত্বকালীন ছুটি ৮ মাস থেকে ১ বছর। এই সময়ে নারীরা সবেতন এবং পদোন্নতিসহ ছুটি পান। শিশুদের জন্য রয়েছে দিবাযত্ন কেন্দ্র। প্রতিটি প্রতিষ্ঠানে কর্মরত নারীরা দিবাযত্ন কেন্দ্রের সুবিধা পান। নারী-পুরুষের মজুরিতে কোনো বৈষম্য নেই। এখানে পাঠকদের আরেকটি তথ্য জানাচ্ছি। বেইজিং নারীর জন্য খুব নিরাপদ শহর। দক্ষিণ এশিয়ার বিভিন্ন দেশে তো বটেই, পাশ্চাত্যের অনেক বড় শহরেও পথে-ঘাটে বিভিন্ন হয়রানির শিকার হতে হয় নারীকে। ইভটিজিং বা নারীর প্রতি অশোভন আচরণ ও যৌন হয়রানি এশিয়া আফ্রিকার পাশাপাশি পাশ্চাত্যের অনেক দেশে অনেক নামজাদা শহরের সাধারণ ঘটনা। অথচ এদিক থেকে বেইজিংয়ের নারীরা অত্যন্ত নিরাপদ। নারীর প্রতি অশোভন আচরণ করার কথা এখানে কল্পনাও করা যায় না। পরবর্তীতে চীনের অনেক শহরে ভ্রমণের অভিজ্ঞতা হয়েছে। সব শহরেই দেখেছি নারীরা খুবই নিরাপদ। পুরো চীন দেশ নারীর জন্য অত্যন্ত নিরাপদ। আমি ছিংদাও শহরে দেখেছি মধ্যরাতেও সমুদ্রতীরে নারীর যৌন হয়রানির শিকার হওয়ার বিন্দুমাত্র আশঙ্কা নেই। বর্তমানে আমি কুনমিং এ একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক হিসেবে কাজ করছি। কুনমিং শহরে এবং বিশ্ববিদ্যালয় শহরে নারীর প্রতি কোনো ধরনের যৌন হয়রানি কল্পনাও করা যায় না। আমি যে বিভাগে রয়েছি সেখানে ডিন এবং ভাইস ডিন দুজনই নারী। অত্যন্ত যোগ্যতার সঙ্গে কাজ করছেন নারী শিক্ষকরা। বিভিন্ন আবাসিক ভবনে হাউজ ম্যানেজমেন্টের দায়িত্বে থাকা নারীরা অত্যন্ত কর্মকুশলী। এমনকি মেকানিক, শ্রমিক নারীরাও অত্যন্ত দক্ষ। এখানে শ্রম বিভাজনে নারী পুরুষের বৈষম্য চোখে পড়ে না। অসংখ্য নারী নির্মাণ শ্রমিক, বাস চালক, মেট্রো রেলের চালক, ইলেকট্রিক মেকানিক, দোকান কর্মী রয়েছেন। আবার চিকিৎসক, প্রকৌশলী, বিমানচালক নারীও অসংখ্য। আমি যে কথাটা বলতে চাচ্ছি সেটা হলো শারীরিক পরিশ্রম, মানসিক পরিশ্রম কোনদিক থেকেই নারীরা পিছিয়ে নেই। চীনের গ্রাম পরিদর্শনের অভিজ্ঞতাও আমার রয়েছে। গ্রাম সরকারেও নারী-পুরুষে কোনো বৈষম্য নেই। বৈষম্য নেই ক্ষমতার ক্ষেত্রেও। সি আর আইতে এবং বর্তমানে বিশ্ববিদ্যালয়ে আমার নারী সহকর্মীদের কর্মকুশলতা ও প্রাণশক্তি আমাকে মুগ্ধ করেছে। এরা একইসঙ্গে ঘর-সংসার, সন্তান ও কাজ সামলাচ্ছেন হাসিমুখে অক্লান্তভাবে। এরা যেমন দেহে ও মনে সুস্থ ও সাবলীল তেমনি মেধাবী। স্বাধীনতা কেউ কাউকে দেয় না, তা অর্জন করে নিতে হয় এবং স্বাধীনতা, অধিকার ও দায়িত্ব কর্তব্য যে একটি অন্যটির ওপর নির্ভরশীল ও পরিপূরক তা-ও এদের দেখলে অনুভব করা যায়। সংসারে এরা যেমন সমঅধিকার অর্জন করেছেন তেমনি সংসার চালানোর গুরুদায়িত্বভারও সমভাবেই বহন করছেন। নারীমুক্তির এই প্রকৃত রূপটি চীনে না আসলে হয়তো অদেখাই থেকে যেতো।

Print প্রিন্ট উপোযোগী ভার্সন



Login to comment..
New user? Register..