আমাদের কৃষি ও নারী

Facebook Twitter Google Digg Reddit LinkedIn StumbleUpon Email

মনির তালুকদার: কৃষির আবিষ্কার নারীর হাতে। নারীর বহুমাত্রিক শ্রম, মেধা, ও দক্ষতায় বিকশিত হয়েছে কৃষি। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস) পরিচালিত শ্রমশক্তি জরিপ অনুসারে কৃষিতে নারী শ্রমিকের সংখ্যা ১ কোটি ৫০ লাখের বেশি। আবহমান কাল থেকে আমাদের কৃষিতে নারী প্রধানত দুই ধরনের ভূমিকা পালন করে আসছে। একটি মাঠ কৃষি, অপরটি পারিবারিক বা বসতবাড়ির কৃষি। প্রথমটি নারী সহায়ক এবং দ্বিতীয়টি তার একান্তই নিজস্ব। চিরায়ত মাঠ কৃষিতে বৈশাখ জ্যৈষ্ঠ মাসে আউস ধান বোনার মাধ্যমে শুরু হতো কৃষি মৌসুমের। এই সময় অঞ্চল ভেদে জমির ধরন, আবহাওয়া, পারিবারিক ঐতিহ্যকে মাথায় রেখে নারী সংরক্ষণ করত কয়েক শ’প্রজাতির ধান। উঁচু জমির জন্যে কুমড়ি, জটাষাইট, লক্ষ্মীজটা, বাকতুলসি এবং অপেক্ষাকৃত নিচু জমির জন্যে, রাখত শনি, দলগোড়া জাতের ধান। অতিবৃষ্টি, অনাবৃষ্টি ও রোগ বালাই সহনশীল আগাম জাতের ধানের সাথে একই সময়ে বিলের জমিতে বোনা হত সাদাকঁচা, কলামোচা, দিঘা, বেঙ্গুড় জাতের ধান। রাজশাহীর বরেন্দ্র অঞ্চলের পুকুরে ফলত হিদা, দলকচু, অনজা, মেটেকরল জাতের ধান। বন্যা সহনশীল এই জাতের ধান বিল বা পুকুরে পানির সাথে পাল্লা দিয়ে বেড়ে উঠত। প্রাকৃতিক দুর্যোগ মোকাবিলা করে টিকে থাকার অসম্ভব ক্ষমতা ছিল ওই সকল ধানের। আমন মৌসুমে পাইজাম, নাজিরশাইল, লতিশাইল, দয়াশাইলের চিকন সরু চালের ভাত স্বাদে-গন্ধে ছিল অতুলনীয়। বরিশালের বালাম চাল এতই চিকন ও সরু ছিল যে, নারীর নাকের নোলক পরার ছিদ্র দিয়ে প্রবেশ করানো যেত। রাধুনি পাগল, কালোজিরা, বাঁশফুল, চিনিশংকর, বাদশাভোগ, চালের পোলাও। খিচুড়ি রান্নার সময় তার সুগন্ধ ছড়িয়ে পড়ত এক বাড়ি থেকে অন্য বাড়ি। পারিজাত, সোনাখোল, মুগি, ঝুলন ধানের চাল একটু মোটা হলেও ফলনে পুষিয়ে যেত। আগাম বন্যা বা মৌসুম শেষের বন্যা অথবা অনাবৃষ্টিতে ফসলের ক্ষতি পুষিয়ে নিতে আবাদ হতো গাঞ্জা জাতের ধান। আশ্বিন মাসে বন্যার পর চারা তৈরি করে জমিতে রোপন করলেও বন্যার ক্ষতি পুষিয়ে যেত। বগুড়ার কিছু কিছু এলাকায় এখনও ওই ধান আবাদ হয়ে থাকে। এমনিভাবে উপকূলীয় অঞ্চল, হাওর অঞ্চল, পাহাড়ের জুমে বৈচিত্র্য ও বৈশিষ্ট্যে অবাক করার মতো প্রায় আট হাজার প্রজাতির ধানের বিশাল সংগ্রহের পুরোটা ছিল নারীর নিয়ন্ত্রণাধীন। মাঠে কৃষিতে ধানের পাশাপাশি রবিমৌসুম গম,যব, বিভিন্ন ধরনের ডাল, তিল, তিষি, সরিষা-মসলা জাতীয় ফসল, পিয়াজ, রসুন, আদা, ধনিয়ার মতো একই ফসলের একাধিক প্রজাতিসহ অসংখ্য বীজের নিয়ন্ত্রণও ছিল নারীর হাতে। মাঠ কৃষিতে সনারী সহযোগী হলেও পরিবারের অভ্যন্তরে, বসতবাড়িতে, বসতবাড়ির আশপাশের পতিত জমিতে রাস্তার ধারে, ফলের বাগানে, বন-জঙ্গলের কৃষিকে ঘিরে নারীর নিজস্ব একটা আলাদা জগৎ ছিল। নারীর তত্ত্বাবধানে ঘরের চালে বা মাচায় লাউ, মিষ্টি কুমড়া, নলকুমড়া, শিম, পুঁইশাক, চিচিংগা, বরবটি ফলাত। পরিত্যক্ত জমিতে বিচিত্র স্বাদের, আকৃতির, নামের ও জাতের বিচিও কাঁচাকলাসহ শতাধিক প্রজাতির কলা, পেঁপে, মানকচু, ওল জন্মাত। বনে-জঙ্গলের ছায়া যুক্ত স্থানে গড় আলু, তেপাতা আলু, মাছরাঙ্গা আলুর মতো বেশ কয়েক প্রকার মেটে আলু, আদা, হলুদ হতো। পেয়ারা, জাম, বাতাবি লেবু, বরই, বেল, তাল, তেঁতুল, আমড়া, আতার মতো মৌসুমি ফল অযতেœ-অবহেলায় যেখানে-সেখানে হতো এমনটা মনে হলেও এর নেপথ্যে ছিল নারীর পরিকল্পিত শ্রম ও অভিজ্ঞতালব্ধ জ্ঞান। শাক-সবজি বা ফলমূল ছাড়াও গরু, ছাগল, হাঁস-মুরগি পালন, গরুর গোয়াল পরিষ্কার, দুধ দোহন, গর্ভবতী গরু ছাগলের বিশেষ যত্ন নেয়া, ডেলিভারি করানো, হাঁস-মুরগির ডিম থেকে বাচ্চা ফোটানো, খাবারের উচ্ছিষ্ট পশু খাদ্য হিসেবে ব্যবহার, গরু ছাগল, হাস-মুরগির বিষ্ঠা থেকে উৎকৃষ্ট জৈব সার তৈরি, সবই হতো নারীর হাতে। বসতবাড়ি ও মাঠ কৃষিকে ঘিরে এমন হাজারো উৎপাদন শীল দক্ষশ্রমে এবং অভিজ্ঞতা কৃষির উন্নতি ও অগ্রগতির প্রধান চালিকাশক্তি ছিল নারী। নারীর এই বহুমাত্রিক শ্রম, দক্ষতা, এবং জ্ঞানকে পাশকাটিয়ে বিগত ৫০ বছরে কৃষিতে বৃহৎ পুঁজির অনুপ্রবেশ, আধুনিক কৃষির নামে উচ্চ ফলনশীল বীজের ব্যবহার, রাসায়নিক সার, কীটনাশক এবং প্রযুক্তির প্রভাবে বদলে গেছে নারীর সেই চিরায়ত ভূমিকা। নারীর শ্রম এবং অভিজ্ঞতালব্ধ জ্ঞানের দখল এখন বহুজাতিক প্রতিষ্ঠানের হাতে। বীজ সংগ্রহ ও সংরক্ষণের কাছ এখন আর নারীর আওতায় নেই। উচ্চ ফলনশীল হাইব্রিড নামে যে সকল ধান ও অন্যান্য শস্য আবাদ হচ্ছে- তার যোগান দিচ্ছে বড় বড় বীজ কোম্পানি। এই বীজ থেকে ফসল আবাদে প্রয়োজন পড়ে বিশেষ ধরনের যতেœর। নিয়মিত সেচ, রাসায়নিক সার, কীটনাশক ও হরমোনের ব্যবহার এই বীজ থেকে ফসল উৎপাদনের অপরিহার্য উপাদান। হাইব্রিড বীজে ফলন বেশি হয়, কিন্তু তা সংরক্ষণ করা যায় না। এই বীজ বন্ধ্যা। বীজ কোম্পানি এবং বহুজাতিক প্রতিষ্ঠানগুলো শুধু নারীকে বীজের মালিকানা থেকে উচ্ছেদ করে ক্ষান্ত হয়নি বরং কৃষি উৎপাদনে ব্যবহৃত উৎপাদন উপকরণের সকল ধরনের মালিকানা থেকে নারীর শ্রম এবং দক্ষতাকে অকার্যকর করে গোটা কৃষি ব্যবস্থাকে জিম্মি করে রেখেছে। নারীর দক্ষতা এবং জ্ঞানকে উপেক্ষা করে কৃষিতে যে প্রযুক্তি ব্যবহৃত হচ্ছে তার কোনটাই নারী বান্ধব নয়। নারী ব্যবহার করতে পারে এমন চিন্তা করে কোনো প্রযুক্তি আবিষ্কার করা হয়নি। প্রযুক্তি ব্যবহারে নারীর সক্ষমতা বৃদ্ধি নিয়ে কোনো ভাবনাও কারো আছে এমনটা দেখা যায় না। ফলে মাঠ কৃষিতে বানের স্রোতের মতো নারী শ্রমিকের সংখ্যা বৃদ্ধি পেলেও প্রযুক্তি ব্যবহারে সক্ষমতা অর্জন করতে না পারলে অচিরেই সে এখান থেকেও বিতাড়িত হবে। মাঠ কৃষির বাইরে বসতবাড়ির আশপাশের কৃষিতে এতদিন যা ছিল নারীর ইচ্ছা স্বাধীন, এখন তা বাজারনির্ভর। তবে বাজারের সাথে নারীর কোনো সম্পর্ক নেই। বীজ সংগ্রহ, পরিচর্যা এবং রক্ষণাবেক্ষণের জন্যে রাসায়নিক সার, কীটনাশক, ছত্রাক নাশকের ব্যবস্থা করে নিয়মিত পরিচর্যা ছাড়া বাড়িতে দুটিট লাউ বা মিষ্টি কুমড়া ফলানো নারীর একার পক্ষে একেবারেই অসম্ভব। পরিবারের পুরুষ কর্তাটি যদি সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দেন তবেই সে বাড়িতে দুটি লাউ, দুইটা বেগুন বা শশা অথবা মিষ্টি কুমড়া ফলাতে পারে। নারীর এই কাজে সহযোগিতার মন-মানসিকতা আমাদের সমাজে কয়জন পুরুষের আছে? পরিত্যক্ত, অনাবাদি, পতিত জমি থেকে দেশি প্রজাতির গাছ এখন বিলুপ্ত। এই সকল জমি এখন ইউক্যালিপটাস, আকাশমনি, শিশু, মেহগনি, ঘোড়ানিম, ইপিলইপিল-এর মতো পরিবেশ ধ্বংসকারী গাছের দখলে। যা মাটির গভীর থেকে অতিরিক্ত পানি শোষণ করার ক্ষমা রাখে। অন্যদিকে এই গাছের নিচে আদা, হলুদ, মেটে আলু কেন, তার তলায় একটা দুর্বা ঘাসও জন্মানোর কোনো ধরনের ক্ষমতা রাখে না। তেমনি গবাদিপশু ও হাঁস মুরগির দেশি প্রজাতি এখন ধ্বংসের দ্বার প্রান্তে। উন্নত জাত বলে যে সকল প্রজাতির গবাদিপশু এবং হাঁস মুরগি লালন-পালন করার পরামর্শ দেয়া হচ্ছে তার সঙ্গে কি নারীর দক্ষতা এবং অভিজ্ঞতার সম্পর্ক আছে? একটা ফ্রিজিয়ান জাতের গাভী পালন বা ব্রয়লার মুরগি ছোট খামার করার স্বপ্ন কি গ্রামীণ কোনো প্রান্তিক নারী দেখতে পারে? যদি না পারে, তাহলে কেন দেশি প্রজাতিগুলোকে সংরক্ষণ এবং রক্ষণাবেক্ষণে নারীর জ্ঞান ও অভিজ্ঞতাকে কাছে লাগানো হচ্ছে না? নাকি এসবই নারীর সস্তা শ্রমে অধিক মুনাফা অর্জনের চক্রান্ত? আমাদের সামনে এখন এই প্রশ্ন গুরুত্বপূর্ণ হয়ে দেখা দিয়েছে যে, আমরা কী থাহলে আধুনিক কৃষি উৎপাদনের অন্যতম অনুসঙ্গ হাইব্রিড বীজ, রাসায়নিক সার, কীটনাশক, ছত্রাক নাশক, হরমনের ব্যবহারে নারীকে দক্ষ করে তুলবে? নাকি নারীর চিরায়ত জ্ঞানকে ধারণা করে সনাতন জৈব কৃষিতে ফিরে যাব? যদিও দু’টো থেকেই নারী এখন আপন ঘরে পরবাসী। আধুনিক কৃষির নামে হাজার হাজার প্রজাতির ফসল, চিরায়ত খাদ্য শৃঙখল, পরিবেশ প্রতিবেশ, জীব-বৈচিত্র্য ধ্বংস করে, নারীর বহুমাত্রিক, বৈচিত্র্যময় শ্রমের দখল নিয়ে কোন পথে এগোচ্ছে আমাদের কৃষি? অথবা কৃষির কোন পথে নারী? এই প্রশ্নের আপাত কোনো মীমাংসা না হলেও আলোচনাটা জরুরি।

Print প্রিন্ট উপোযোগী ভার্সন



Login to comment..
New user? Register..