কমরেড প্রসাদ রায় স্মরণে

Facebook Twitter Google Digg Reddit LinkedIn StumbleUpon Email

আবদুল জব্বার ৭ ফেব্রুয়ারি কমরেড প্রসাদ রায়ের ২৩তম মৃত্যুবার্ষিকী। মহান মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সংগঠক, খাপড়া ওয়ার্ডের লড়াকু যোদ্ধা, শ্রমিক-মেহনতি মানুষের বন্ধু, আজীবন বিপ্লবী কমিউনিস্ট পার্টির এই নেতা শোষণমুক্ত বাংলাদেশ গড়ার স্বপ্ন অসমাপ্ত রেখেই ১৯৯৬ সালের এই দিনে সবাইকে ছেড়ে পৃথিবী থেকে চলে গিয়েছিলেন। ১৯২৮ সালের ৫ আগস্ট কমরেড প্রসাদ রায় পাবনার সম্ভ্রান্ত পরিবারের প্রতাপ ভবনে জন্মগ্রহণ করেন। পাবনা শহরের এই পরিবারটির স্বপরিচিতি ছিল অসাম্প্রদায়িক মূল্যবোধ ও সাংস্কৃতিক আবহের কারণে। পরবর্তীতে অবশ্য প্রতাপ ভবনকে সর্বস্তরের মানুষ চিনতো সেসময়ের মডারেট ও লিবারেল আন্দোলনের কেন্দ্রস্থল হিসাবে। প্রসাদ রায় সহ পাঁচভাইই যুক্ত ছিলেন সক্রিয় কমিউনিস্ট রাজনীতির সাথে। পরিবারে অসাম্প্রদায়িক মূল্যবোধ ও সাম্যবাদী চিন্তার পথিকৃত ছিলেন তাঁর মা শবাসনা দেবী। প্রসাদ রায় দীর্ঘ কারাজীবনে নিজেকে আরোও শাণিত করে মুক্তি পাওয়া মাত্র নিজেকে সামিল রেখেছেন মেহনতি মানুষের লড়াইয়ের পুরোভাগে। সর্বমোট ১৯ বছর ৬ মাস থেকেছেন জেল খানার মধ্যে। ১৯৪৮ সালের অন্ধকার যুগে জীবন বাজি রেখে কালের বরফ ভাঙার দায়িত্ব কাঁধে নিয়ে বেরিয়েছিলেন ঘর থেকে। আমৃত্যু দমন পীড়ন আর আন্দোলন সংগ্রামের মধ্যে দিয়ে নিজেকে অবিচল রেখেছিলেন শ্রমিক শ্রেণির পার্টি কমিউনিস্ট আদর্শে। প্রথম কারাবরণ করেন ১৯৪৮ সালের আগস্ট মাসে, রাজবন্দীদের মুক্তির দাবিতে পোস্টার লাগাতে গিয়ে গ্রেফতার হন তিনি। ১৯৫৩ সাল পর্যন্ত টানা ৪ বছর ৮ মাস জেলে ছিলেন তিনি। এরপর ১৯৫৪ সালে দুইবার গ্রেফতার হন। ১৯৫৫ সালের শুরুর দিকে পুলিশ স্ট্রাইকের মামলায় পূনর্বার তাঁকে গ্রেফতার করেন। ১৯৫৬-র সেপ্টেম্বরে মুক্তি লাভের পর আয়ুব সরকারের সামরিক শাসন জারির পরে আবারও কারাবরণ, ১৯৬২ সালে মুক্তিলাভের পর পাক-ভারত যুদ্ধের শুরুতে জেলে গিয়ে ১৯৬৮ সালে মুক্তি পান। ১৯৬৯ এর গণঅভ্যুত্থানে উত্তাল হয়ে ওঠে তৎকালীন পূর্বপাকিস্তান। তার ঢেউ আছড়ে পড়ে উত্তরবঙ্গের প্রবেশদ্বার পাবনাতে। মিছিল করার সময় গ্রেফতার হন প্রসাদ রায়। এরপর মুক্ত স্বাধীন বাংলাদেশে ১৯৭৫ সালে ১৫ আগস্ট প্রতিক্রিয়াশীল শক্তির ষড়যন্ত্রে পরিবারসহ জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে নিষ্ঠুরভাবে হত্যাকাণ্ডের পর প্রথম গ্রেফতার হন কমরেড প্রসাদ রায়। ১৯৭৮ এ কারামুক্ত হয়ে ১৯৮৪ সালে আবারও গ্রেফতার হন স্বৈরশাসকের শাসনামলে। দীর্ঘ জেলজীবনের ফাঁকে ফাঁকে যুক্ত থেকেছেন পার্টি গড়ার কাজে, শ্রমিক আন্দোলনে। ১৯৪৭ এ দেশবিভাগের পর সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের বিপুলসংখ্যক মানুষ ভারতে চলে যান। কমিউনিস্ট কর্মীরাও বাদ রইলেন না। ১৯৪৯ সালে যখন পাকিস্তানি সরকার ব্যাপকভাবে ধরপাকড় শুরু করে কমিউনিস্ট পার্টির কর্মীদের তখন দুটি প্রতিকূলতার সম্মুখিন হতে হয়। একদিকে কমিউনিস্ট মানেই পাকিস্তানবিরোধী, রাষ্ট্রদ্রোহী, অন্যদিকে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ভুক্ত। যারা ছিলেন তাদের অনেকেই ১৯৫০ সালের পর সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার পর ভারতে চলে যান। সেসময়ে কমিউনিস্ট কর্মীদের বেশিরভাগই ছিলেন সংখ্যালঘু সম্প্রদায় থেকে আসা। তাই যাদের পরিবার ও আত্মীয়স্বজন ভারতে পাড়ি জমালেন, তারাও বাধ্য হলেন তাদের অনুগামী হতে। কেউ কেউ রয়ে গেলেন আদর্শিক কারণে স্বাধীন বাংলাদেশে। প্রসাদ রায় তাদের একজন। পারিবারিক সিদ্ধান্তের ঊর্ধ্বে পার্টির সিদ্ধান্তকে মেনে নিয়ে একা রয়ে গেলেন স্বদেশে। দীর্ঘ কারাজীবনে সবচেয়ে বেশি নির্যাতনের শিকার হন ১৯৫০ সালে ২৪ এপ্রিল রাজশাহী জেলের খাপড়া ওয়ার্ডে। কারা সংস্কারের দাবিতে আন্দোলনরত বন্দিদের অমানুষিক নির্যাতনের বিরুদ্ধে রাজশাহী জেলে সোচ্চার হয়েছিল কমিউনিস্টরা। ১৯৪৭ সালে দেশবিভাগের পর এটিই ছিল কমিউনিস্টদের প্রথম প্রকাশ্য বিদ্রোহ। আর এ বিদ্রোহকে দমন করতে রাজশাহী জেলের সকল কমিউনিস্ট বন্দিদের খাপড়া ওয়ার্ডে নিয়ে বন্দি অবস্থায় নির্বিচারে গুলি চালানো হয়। সে সময় হাতের কাছে যা ছিল তাই নিয়ে প্রতিরোধ গড়ে তোলেন কমিউনিস্টরা। বেপরোয়া গুলির পর দুই ঘণ্টা ধরে চলেছিল বিরামহীন লাঠিচার্জ। সেদিনের বিদ্রোহে সাতজন কমরেড শহীদ হন। মারাত্মকভাবে জখমের তালিকার একেবারে শুরুর দিকে ছিলেন কমরেড প্রসাদ রায়। তাঁর বাম উরুতে গুলি লেগেছিল সাতটি, লাঠিচার্জে উপড়ে গিয়েছিল সামনের পাটির দাঁত, মাথা ফেটে অস্বাভাবিক রক্তপাত হয়েছিল। গভীর রাতে ঘটে যাওয়া হত্যাযজ্ঞের পর আহত কমরেডদের হাসপাতালে নেয়া হয় পরদিন বিকেলে। ৭ জন শহীদের মধ্যে রক্তক্ষরণজনিত কারণে কয়েক জনের মৃত্যু হয়। সময়মতো হাসপাতালে নেয়া হলে শহীদের তালিকা হয়তো কিছু কম হতো। আশ্চর্যজনকভাবে সেদিন বেঁচে গিয়েছিলেন প্রসাদ রায়। যতোবার তাঁর কাছে খাপড়া ওয়াডের্র ঐতিহাসিক আন্দোলনের কথা শুনেছি, প্রতিবারই বলতেন বেঁচে আছি এটাইতো বোনাস। ২২ বছর বয়সে যেমন বুক চিতিয়ে দাঁড়িয়ে ছিলেন গুলির মুখে, আমৃত্যু দেখেছি তেমনই বিরূদ্ধ বাতাসে রুখে দাঁড়াতে। কখনো তাঁর মনোবলে চিড় ধরতে দেখিনি। নব্বই দশকের শুরুতে সিপিবিতে প্রকাশ্য বিভক্তির সময়ে ছুটে বেড়িয়েছেন সারাদেশ। সাহস যুগিয়েছেন কমরেডদের। বিলোপবাদীদের দুঃস্বপ্ন আর তরুণ কমরেডদের প্রাণশক্তি হয়ে অবস্থান করেছেন পার্টি অফিসে। ১৯৭১ এ মুক্তিযুদ্ধকালীন সময়ে ন্যাপ-কমিউনিস্ট পার্টি-ছাত্র ইউনিয়নের যৌথ উদ্যোগে বিশেষ গেরিলা বাহিনী গঠিত হলে এই গেরিলা মুক্তিযোদ্ধাদের অন্যতম সংগঠক ছিলেন তিনি। ভারতের করিমপুর মুক্তিযোদ্ধা ক্যাম্পে পরিচালকের দায়িত্ব পালন করেছেন। প্রতিনিয়ত মৃত্যুর সামনে দাঁড়িয়ে স্থির ও অবিচলভাবে সিদ্ধান্ত নিতে পারতেন। অন্যায়ের বিরুদ্ধে ‘না’ বলতে পারতেন খুব স্পষ্টভাবে। অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ করাই ছিল তাঁর বৈশিষ্ট্য। স্বাধীনতার পর একবার পাবনা জেলা প্রশাসনের ডাকা আইনশৃঙ্খলা রক্ষা কমিটির এক সভায় স্বাধীনতা বিরোধীদের প্রতিনিধিদের উপস্থিতি দেখামাত্র প্রতিবাদ করেছিলেন, স্বাধীনতা বিরোধীদের সাথে কোনভাবেই একসাথে আলোচনা হতে পারে না, কোনও ইস্যুতেই না। বিপাকে পড়ে প্রশাসন প্রস্তাব করেছিল সভাটি বাতিল করার। কিন্তু তাঁর ধমকের মুখে শেষ পর্যন্ত জেলা প্রশাসন বাধ্য হয়েছিল জামাতের প্রতিনিধিদের বের করে দিয়ে সভা চালাতে। নিজস্ব স্বভাবসুলভ দৃঢ়তার কারণেই তিনি পরিণত হয়েছিলেন পাবনাসহ উত্তরবঙ্গের রাজনৈতিক অভিভাবকে। সকল রাজনৈতিক সংকটে তাঁর বাড়িই ছিল সভাস্থল। শেষ সিদ্ধান্তের জন্যে তাঁর দিকেই দৃষ্টি সবার। আর সরল সমাধান আসতো তাঁর কাছ থেকেই, যা মানতে কারোরই কোনো দ্বিধা কাজ করতো না। ‘বোনাসে’ পাওয়া জীবন নিয়ে তার সাহসের অন্তত ছিল না। আচরণে ছিল একটা তোয়াক্কা না করা ভাব। এজন্যই শাসনযন্ত্র ভয় পেতো তাঁকে। বিষয়টা ঠিক উল্টো ছিলো সাধারণ মানুষের বেলায়। সকল স্তরের মানুষ তাঁকে বন্ধু ভাবতে পারতো অনায়াসে, ভালোবাসতো প্রাণ দিয়ে। সাহসের মতোই আরেক অনন্য হাতিয়ার ছিল তাঁর, তা হলো কণ্ঠ। ভরাট উদাত্ত কণ্ঠ ছিল তাঁর। কোনো অনুষঙ্গ দরকার হতো না, খালি গলায়ই গাইতেন গান। জেলখানায় প্রসাদ রায়ের উদাত্ত গণসঙ্গীতই ছিল প্রতিবাদের হাতিয়ার। জেলখানার মধ্যে রাজনৈতিক ক্লাসের ফাঁকে ফাঁকে গলা ছেড়ে গাইতেন গান। নবীন কমরেডরা প্রাণে উদ্দীপনা পেতেন তাঁর গানে। আর অমন দরাজ কণ্ঠে কণ্ঠ মেলালে বুকে সত্যিই বেড়ে যায় সাহস, মস্তিষ্কে ব্যাপৃত হয় বিপ্লবের স্বপ্ন। প্রসাদ রায় প্রাণ থেকে প্রাণে স্বপ্ন ছড়িয়ে দিতে পারতেন প্রাণে প্রাণ মেলাতে। দোতারা বাজাতে পারতেন নিপুন হাতে। শাস্ত্রীয় সঙ্গীতে ছিল তার অনায়াস দখল। দিনব্যাপী পার্টির জটিল তাত্ত্বিক সভার পর মধ্যরাতে তাঁর ঘর থেকে ভেসে আসতো ভরাট কণ্ঠে মিঁয়াকি মলার বা মালকোষের তান। আছন্ন ডুবে আছেন সুরে, একাকী। বিস্ময় জাগতো, মাঝে মাঝে কিছুটা যেন অচেনাও লাগতো। ১৯৮২ সালের ১ জানুয়ারি সামরিক শাসনামলে স্বৈরশাসক বিরোধী আন্দোলনে আমিসহ ৪ জন কর্মী পাবনার রাজপথে পুলিশের হাতে গ্রেফতার হয়েছিলাম। ওই দিন কমরেড প্রসাদ রায়ের নেতৃত্বে ১৫ দল ও ৭ দলের নেতারা পাবনা সদর থানা পুলিশের নিকট থেকে আমাকে মুক্তি করে এনেছিলেন। আমি ওই সময় বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির পাবনা শহর কমিটির সম্পাদক ছিলাম। ১৯৮১ সালের ১৮ মার্চ ঢাকা ইঞ্জিনিয়াস ইনিস্টিটিউশনে এক সমাবেশের মাধ্যমে বাংলাদেশ ক্ষেতমজুর সমিতি গঠন করা হয়। আমি ৪৫ সদস্য ক্ষেতমজুর সমিতির কেন্দ্রীয় কমিটি সদস্য নির্বাচিত হই। এরপর কমরেড প্রসাদ রায় বাংলাদেশ ক্ষেতমজুর সমিতির পাবনা জেলা কমিটির আহ্বায়ক নির্বাচিত হন। ১৯৮২ সালে সামরিক শাসন জারি হওয়ার পর বাসাতে কাউকে না বলে গ্রেফতার এড়াতে বেরিয়ে গিয়েছিলেন তিনি। তার সহধর্মিনী মীরা রায় আমাকে এবং বাদশা বিশ্বাসকে দায়িত্ব দিয়েছিলেন কমরেড প্রসাদ রায়কে খুঁজে বের করতে। আমরা দু’জন শহরের কুটিপাড়ার এক বাসায় গিয়ে দরজায় নক করি এবং আমাদের পরিচয় দেই। এসময় পরিচয় শুনে দরজা খুলে দেন পাবনা সাবেক সংসদ সদস্য এবং জেলা আওয়ামী লীগের নেতা এ্যাড. আমজাদ হোসেন। আমরা বাসার ভেতরে যাওয়ার পর আমজাদ চাচা দরজা বন্ধ করে দেন। তিনি আমাদের কাছ থেকে চানতে চাইলে আমরা ওই সময়ের পরিস্থিতি সম্পর্কে আমজাদ চাচাকে অবহিত করি। আমজাদ চাচার সঙ্গে অত্যন্ত ঘনিষ্ট সম্পর্ক ছিল কমরেড প্রসাদ রায়ের। ১৯৭৭ সালে জিয়াউর রহমানের শাসনামলে শর্তসাপেক্ষে দেশে রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড চালানোর সুযোগ দেয়া হয়। এ সময় বাংলাদেশ যুব ইউনিয়ন গঠিত হয়। আমি প্রথমে পাবনা জেলা আহবায়ক কমিটির সদস্য হই। ৮০ দশকের প্রথম দিকে বাংলাদেশ যুব ইউনিয়নে পাবনা জেলা কমিটির সম্মেলন অনুষ্ঠিত হলে আমি যুব ইউনিয়নের পাবনা জেলা কমিটির সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হই। ওই সময় যুব ইউনিয়নের কেন্দ্রীয় সভাপতি ছিলেন নুরুল ইসলাম নাহিদ ভাই। আমরা পাবনা শহরে সারা রাত ধরে পোস্টার সাঁটাতাম। ভোরে কমরেড প্রসাদ রায়ের বাসার সামনে এসে কথা বলতেই দেখেছি বাসার দোতলা থেকে উঁকি দিয়ে আমাদের দেখছেন তিনি। এরপর নেমে এসে বাসার দরজা খুলে দিয়ে তার সহধর্মিনী মীরা রায়কে নাস্তা এবং চা করার নির্দেশ দিতেন। মীরা রায়ও ঘুম থেকে উঠে আমাদের নাস্তা ও চায়ের ব্যবস্থা করতেন। মনে হতো সারা রাত জেগে থাকতেন কমরেড প্রসাদ রায়। আমাদের কোনো সমস্যা হয় কিনা ভেবে। একজন সৎ ও আদর্শবান মানুষ কমরেড প্রসাদ রায়কে লাল সালাম।

Print প্রিন্ট উপোযোগী ভার্সন



Login to comment..
New user? Register..