হারকিউলিস নাকি ফ্রাঙ্কেনস্টাইন?

Facebook Twitter Google Digg Reddit LinkedIn StumbleUpon Email
বাকী বিল্লাহ : ২৯ আগস্ট ২০১৮। চট্টগ্রাম নগরের হালিশহরে বাসা থেকে তুলে নিয়ে যাওয়া হয় এক নারীকে। এর আগে তাকে ধর্ষণ করা হয়। প্রায় অচেতন অবস্থায় সীতাকুণ্ডের কুমিরা গেট এলাকার নির্জন একটি জায়গায় কোমরে ২ হাজার ইয়াবা ট্যাবলেট গুজে দিয়ে তাকে ফেলে দেয়া হয়। রাত দেড়টার দিকে ওই এলাকায় দায়িত্ব পালনরত সীতাকুণ্ড থানার এসআই সিরাজ মিয়া দলবল নিয়ে ঘটনাস্থলে গিয়ে ইয়াবাগুলো জব্দ করেন। ওই নারী অচেতন থাকায় তাকে সীতাকুণ্ড স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে যাওয়া হয়। চিকিৎসক ভর্তির পরামর্শ দিলেও শোনেননি এসআই সিরাজ মিয়া। পরদিন সীতাকুণ্ড থানায় মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইনে করা মামলায় ওই নারীকে কারাগারে পাঠানো হয়। এই সাজানো মামলায় ইতোমধ্যে চার মাস কারাভোগ করেছেন তিনি। এই ধর্ষণের ঘটনা ও সাজানো ইয়াবা মামলার কুশীলব সীতাকুণ্ড থানার সাবেক ওসি ইফতেখার হাসান (বর্তমানে মীরসরাইয়ের জোরারগঞ্জ থানায় কর্মরত) সহ তিন পুলিশ কর্মকর্তা। তাদেরকে সহযোগিতা করেন ওই নারীর স্বামীর প্রথম স্ত্রীর সন্তানেরা সহ মোট ১৩ জন। স্ত্রীকে মিথ্যা মামলায় ফাঁসানোর অভিযোগে আদালতে মামলা করেন ভিকটিমের স্বামী। আদালতের নির্দেশে তদন্ত শুরু হলে বেরিয়ে আসে এসব অবিশ্বাস্য তথ্য। গত কিছুদিনের মধ্যে পরপর বেশ কয়েকজন ধর্ষণ মামলার আসামি রহস্যজনকভাবে খুন হয়েছে। লাশের গলায় পাওয়া গেছে ‘আমি ধর্ষক’ লেখা ট্যাগ। সর্বশেষ ঘটে যাওয়া ঘটনায় খুন হওয়া ধর্ষণ মামলার আসামী ২০ বছর বয়সী রাকিব মোল্লার লাশের গলায় লাল সুতা দিয়ে ঝোলানো সাদা কাগজের চিরকুটটিতে লেখা ছিল ‘আমি পিরোজপুরের ভান্ডারিয়ার.. (অমুকের) ধর্ষক রাকিব। ধর্ষকের পরিণতি ইহাই। ধর্ষকেরা সাবধান– হারকিউলিস।’ রাকিব ভান্ডারিয়ার ১৩ বছর বয়সী এক মাদরাসাছাত্রীকে ধর্ষণের মামলার মূল আসামি। এই মামলার অন্য আসামি সজল জামাদ্দারও একইভাবে খুন হয়েছে, তার লাশ পাওয়া গেছে ঝালকাঠি জেলার কাঠালিয়া উপজেলার বলতলা গ্রামে। সজলের গলাতেও ‘হারকিউলিসের’ হুশিয়ারিসহ একই চিরকুট পাওয়া গেছে। থ্রিলার ছবির স্ক্রিপ্টের মত গুপ্ত শক্তির হাতে অপরাধীদের এরকম ‘সিরিয়াল কিলিং’ আমাদের ইতিহাসে আগে কখনো ঘটেনি। উপরন্তু গ্রিক মিথলজির বীর হারকিউলিসের নাম নিয়ে এক সুপার হিরোর ঘটনামঞ্চে আবির্ভাব রহস্য আরো বাড়িয়ে তুলেছে। গ্রিক মিথের প্রধান পুরুষ দেবরাজ জিউস স্বভাবে বহুগামী। দেবী মানবী নির্বিশেষে কখন কার ওপর প্রেমানুভূতি বা কাম জাগ্রত হবে জিউসের– তার কোনো গ্যারান্টি নেই। তার বহুগামিতার এক একটি কাহিনি ধরে গ্রিক মিথলজিতে নতুন নতুন শাখা-প্রশাখা গজিয়েছে। স্বামী জিউসের স্বভাব ভালোমতই জানেন তার স্ত্রী হেরা এবং সারাক্ষণ চোখে চোখে রাখেন। শেষ পর্যন্ত কোনোবারই জিউসকে নিরস্ত করতে পারেন না হেরা, কিন্তু তার ক্রোধের আগুনে দগ্ধ হয়ে পুড়ে মরতে হয় দ্বিতীয় পক্ষকে। জিউসের এরকমই এক মুহূর্তের কামানলের ফসল মানবী মাতার গর্ভে জন্ম নেয়া কিংবদন্তি চরিত্র ‘প্রমিথিউস’। জিউসের নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে পৃথিবীর মানুষকে আগুন পৌঁছে দেয়ার অপরাধে আজো যাকে ভয়ানক এক শাস্তি পেতে হচ্ছে। জিউসের বহুগামিতার আরেক ফসল মানবী মাতা আক্লমিনার গর্ভে জন্ম নেয়া হারকিউলিস। যথারীতি হেরার ক্রোধের শিকার হন হারকিউলিস। শিশু অবস্থাতে হারকিউলিসকে হত্যা করার জন্য হেরা দুটো সাপ পাঠিয়ে দেন। কিন্তু ঘুমন্ত অবস্থা থেকে জেগে উঠে হারকিউলিস দুটো সাপকেই গলা টিপে মেরে ফেলেন। প্রাপ্তবয়স্ক হয়ে একবার হেরার অভিশাপে উন্মাদ হয়ে যান হারকিউলিস, অপ্রকৃতস্থ অবস্থায় নিজের স্ত্রী-পুত্রদের খুন করে ফেলেন। সম্বিত ফিরে পেয়ে এহেন কাজের জন্য অনুতাপ ও অনুশোচনায় আত্মহত্যা করার সিদ্ধান্ত নেন হারকিউলিস। কিন্তু শেষ পর্যন্ত আত্মহত্যা না করে বিশুদ্ধ হবার জন্য প্রায়শ্চিত্ত শুরু করেন। সেই প্রক্রিয়াতেই বৃহত্তর মঙ্গলের জন্য একের পর এক অসম্ভব সব কাজ করেন হারকিউলিস, যে কাজগুলোর জন্য মূলত তাকে বীর হিসেবে মনে রাখা হয়েছে। অর্থাৎ হারকিউলিসের ভাল কাজগুলোর উৎস মূলত অনুশোচনা। আমাদের এখানে এখানে সুপারহিরো হিসেবে আবির্ভূত হওয়া ধর্ষণ মামলার আসামিদের হত্যাকারী হারকিউলিসের পরিচয় আমরা জানি না। তবে ধারণা করা যায়, এই ব্যক্তি অথবা ব্যক্তিবর্গ হারকিউলিসের মিথ সম্পর্কে সচেতন। ইতিহাসের সকল পর্বেই এ ধরনের গুপ্ত শক্তির বেড়ে ওঠার পর্বগুলিতে কোনো না কোনো প্রেক্ষাপট বিরাজমান থাকে। সাম্প্রতিক সময়ে ধর্ষণ ও যৌন নিপীড়নের নানান ধরনের খবর সারাক্ষণই পঙ্গপালের মত আমাদের ঘিরে থাকে। ঠিক যে সময়ে এই লেখাটি লিখছি, আমাদের সোশাল মিডিয়া উত্তাল হয়ে আছে এক সাবেক সেনা অফিসার পিতা কর্তৃক তার ৭ বছর বয়সী মেয়েকে ধর্ষণের খবরে। আলাদা করে যদি শিশু ধর্ষণের তালিকা করতে বসি, তাতেই শব্দ এবং সময় সব ফুরিয়ে যাবে। প্রতিটি ঘটনাই পৈশাচিক, অবর্ণনীয়। একটু তলিয়ে দেখলে অধিকাংশ ক্ষেত্রেই ক্ষমতা এবং রাজনৈতিক প্রভাবের প্রত্যক্ষ সম্পর্ক পাওয়া যাবে। যে সময়টিতে ধর্ষণ ও অন্যান্য যৌন অপরাধ মহামারির মত বাড়ছে, ঠিক একই সময়ে রাষ্ট্র ও সমাজে ন্যায়বিচার ধারণাটি দুর্বল ও ক্ষয়িষ্ণু হয়েছে ক্রমাগত। প্রাতিষ্ঠানিক বিচার বিভাগ অনেকখানিই ধসে পড়েছে। রাজনীতি বা কেন্দ্রিক ক্ষমতা কাঠামো জবাবদিহিতার নীতি থেকে অনেক দূরে সরে গিয়ে ‘বীরভোগ্যা বসুন্ধরার’ নীতিতে চলছে। অর্থাৎ গায়ের জোরে যে টিকে থাকতে পারবে, ক্ষমতা কেবল তারই অনুগত হবে। ধর্ষকামী হয়ে ওঠা, অর্থাৎ গায়ের জোরমূলক যে কোনো কিছু চরিতার্থ করার জন্য এটা এক আদর্শ পরিস্থিতি। এরকম সময়ের অন্যতম এক গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য হল– বিচার ব্যবস্থার ওপর মানুষের আস্থা সম্পূর্ণরূপে দূরীভূত হয়ে যাওয়া। এরকম একটি সময়ে আকস্মিকভাবে হারকিউলিসের নাম নিয়ে ধর্ষণ মামলার আসামিদের খুন করে নিকেশ করা বিকল্প ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার এক ধরণের ইঙ্গিত দেয়। এখন খুঁজে দেখার ব্যাপার হল– এই শক্তিটি সত্যি সত্যিই মানুষের প্রত্যাশার গর্ভ থেকে জন্ম নেয়া কোনো হারকিউলিস, নাকি কথিত অসম্ভবকে সম্ভব করার বিজ্ঞাপনের নায়ক অনন্ত জলিলের মত কোনো ক্যামোফ্লেজ? যদি মানুষের প্রত্যাশার ‘ডানার করাত’ হয় হারকিউলিস– তাহলে নিশ্চিতভাবে ধরে নেয়া যায়, এই হারকিউলিস হবে রাষ্ট্র ও বিদ্যমান ব্যবস্থার চরম বিরোধী; ক্ষুব্ধ, দ্রোহী এক চরিত্র। যে নিশ্চিহ্ন করে দিতে চাইবে ধর্ষকামী রাষ্ট্রচরিত্রটিকেই। অন্তত কার কতটুকু রাজনৈতিক প্রভাব আছে– হত্যার টার্গেট নির্ধারণের ক্ষেত্রে সে বিবেচনা মুখ্য হবে না তার কাছে। হারকিউলিসের হাতে খুন হওয়া পিরোজপুরের ভান্ডারিয়ার উপজেলার রাকিব মোল্লার বাবার ভাষ্যে জানা যাচ্ছে, ধর্ষণের অভিযোগ ওঠার পর রাকিব গ্রাম ছেড়ে ঢাকায় চলে আসে। গত ২৫ জানুয়ারি শুক্রবার, রাকিব তার আরেক বন্ধুকে সাথে নিয়ে নবীনগরের গণস্বাস্থ্য বিশ্ববিদ্যালয় এলাকার একটি চায়ের দোকানে বসে চা খাচ্ছিল। সন্ধ্যা ছয়টার দিকে একটি কালো ও একটি সাদা রঙের মাইক্রোবাস এসে রাকিব ও তার বন্ধুকে তুলে নিয়ে যায়। পরে রাকিবের বন্ধুকে ছেড়ে দেয়া হয়। এরপর থেকে খুন হওয়ার আগ পর্যন্ত সে নিখোঁজ ছিল। ঘটনার পরদিন রাকিবের মা নিখোঁজ হওয়ার ঘটনা নিয়ে জিডি করার জন্য আশুলিয়া থানায় যান। তবে পুলিশ জিডি নেয়নি। রাকিবের বাবার সন্দেহ, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী তার ছেলেকে তুলে নিয়ে গুলি করে মেরে ফেলেছে। (তথ্যসূত্র: দৈনিক প্রথম আলো) রাকিবের বাবার সন্দেহের পেছনে যথেষ্ট যুক্তিসঙ্গত কারণ আছে। পুরো বর্ণনাটি শুনলে প্রায় স্পষ্ট বোঝা যায়, তুলে নিয়ে যাওয়া শক্তিটি ঠিক গোপন কোনো গোষ্ঠী নয়, তারা রাষ্ট্রের সাথে সম্পর্কিত কেউই হবেন। আর তুলে নিয়ে যাওয়া শক্তি এবং খুনি সুপারহিরো হারকিউলিস যে একই গোষ্ঠীভুক্ত হবেন– এ নিয়ে আর সন্দেহের কী আছে। তাছাড়া এরকম চাঞ্চল্যকর খুনগুলির প্রেক্ষিতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীগুলোর কোনো ধরনের নড়ন-চড়ন আমাদের চোখে পড়েনি। লেখার শুরুর দুই প্যারায় চট্টগ্রামের হালিশহরের হতভাগ্য এক নারীর কথা উল্লেখ করেছিলাম। যিনি প্রথমে ধর্ষণের শিকার হন এবং পরে সাজানো ইয়াবা মামলায় চার মাস জেল খাটেন। এই পুরো ঘটনার নৈপথ্যে ছিলেন সীতাকু- থানার তৎকালীন ওসি সহ একাধিক কর্মকর্তা। ঘটনাটি কয়েক মাস আগের। সৌভাগ্যক্রমে আদালতের হস্তক্ষেপে মাত্র ক’দিন হল প্রকৃত সত্য সামনে এসেছে। এরকম আরো শত শত ঘটনা চাপা পড়ে যাচ্ছে। বাস্তবতা হল– আমাদের আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীগুলো একটা ভয়ানক অপরাধমূলক দুর্বৃত্ত ব্যবস্থার সহযোগী। ধর্ষকামিতার গুণাগুণ তাদের মধ্যে প্রবল। নিয়োগ থেকে শুরু করে তাদের অভ্যন্তরীণ সকল ক্ষেত্রে দুর্নীতির সংশ্লিষ্টতাও প্রবল। তাদের হাতে বিচার-বহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের যে সিস্টেমেটিক ফর্ম (ক্রসফায়ার), তাও বহুধা প্রশ্নের কালো অন্ধকারে ঢাকা। ভুলে গেলে চলবে না যে নারায়ণগঞ্জের সাত খুনও ছিল গতানুগতিক অন্য বিচার-বহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের মতই ঘটনা; দুর্ভাগ্যক্রমে (তাদের জন্য) যেটির ভেতরের বিষয়াদি ফাঁস হয়ে গেছে। ক্রসফায়ারের আগের ভার্সন বহুল ব্যবহৃত হয়ে দুর্বল হয়ে পড়ছে। সম্ভবত তাদের এখন দরকার তরতাজা নতুন কোনো ফর্ম। যার কাজ হবে একই, মাঝখান থেকে হাততালিও কুড়িয়ে নেয়া যাবে। এর জন্য প্রথমে দরকার কিছু ক্লিন টার্গেট। এই সময়ে যেহেতু ধর্ষকদের বিরুদ্ধে একটা প্রবল জনমত আছে, সুতরাং ধর্ষণ মামলার আসামি টার্গেট করাই হারকিউলিসের জন্ম দেয়া এবং বৈধতা তৈরি করে নেয়ার মোক্ষম সময়। এই চিন্তাগুলোর অনেকটুকুই হয়ত অনুমান। কিন্তু এমন এমন সময় আসে যে তুলনামূলক গ্রহণযোগ্য অনুমানের ওপর নির্ভর করা ছাড়া সত্য দেখতে পাওয়ার আর কোনো রাস্তা থাকে না। এই লেখার শিরোনামে আছে তিন শব্দের একটি প্রশ্ন– হারকিউলিস নাকি ফ্রাঙ্কেনস্টাইন? হারকিউলিস দেবী হেরার শাপে উন্মাদ হয়ে নিজের স্ত্রী-পুত্রদের খুন করেছিল। কিন্তু শেষ পর্যন্ত সে যে শুভর পথে হাঁটতে পেরেছিল, তার কারণ হারকিউলিসের বোধোদয়। কিন্তু আমাদের রাষ্ট্রচরিত্রের বোধোদয়ের কোনো লক্ষণ আমরা দেখতে পাচ্ছি না। ফ্রাঙ্কেনস্টাইনের নিয়তি হারকিউলিসের বিপরীত। সে মৃতকে প্রাণ দিতে চেয়েছিল, আর এর মধ্য দিয়ে জন্ম হয়ে যায় এক ভয়ংকর দানবের– যে তার স্রষ্টা সহ সবকিছুকেই ধ্বংস করে দিতে চায়। আমরাও চেয়েছি, আমাদের এই মরা সময়কে বদলে দিতে– ধর্ষণ এবং ধর্ষকামিতার ভয়াবহতার হাত থেকে মুক্ত হতে। কিন্তু নতুন কোনো দানবের জন্ম হলে এবং আমরা তাকে অনুমোদন দিলে সেই কাজটি আরো অসাধ্য হয়ে উঠবে। লেখক : সাবেক ছাত্রনেতা ও অনলাইন অ্যাকটিভিস্ট

Print প্রিন্ট উপোযোগী ভার্সন



Login to comment..
New user? Register..