চাষির ঘাম বনাম ফসলের দাম

Facebook Twitter Google Digg Reddit LinkedIn StumbleUpon Email

এস এম চন্দন: শেষ মাঘের সন্ধ্যায় ছেতরা হাটে ছোট ছোট দোকানগুলোতে বাতি জ¦লে উঠেছে। হাটের মাঝখানের বিশাল মাঠে আলুবোঝাই বস্তা। একটি একটি ট্রাক্টর এসে দাঁড়াচ্ছে আর বস্তাগুলো দিয়ে ভরে যাচ্ছে ট্রলি। পাশে চায়ের দোকানে বসে থাকা মানুষগুলো চরম খেদ নিয়ে বলছিলেন, ‘কৃষককে কীভাবে চুষে খাওয়া যায়, সেই ধান্ধায় থাকে সবাই। আর আবাদ-সুবাদ করবোনা, তারচেয়ে ব্যবসা করা যায় কিনা দেখবো’। কথা হচ্ছিলো দিনাজপুরের বিরল উপজেলার রাজারামপুর ইউনিয়নের বেশ বড় হাট ছেতরায়। সদর উপজেলা কৃষক সমিতির নেতা আশিষ মুন্না কয়েকজন প্রবীণের সাথে পরিচয় করিয়ে দিলেন। তাদের সাথেই টুকটাক আলাপন। সরকারিভাবে ৩৩ শতকে এক বিঘা ধরা হলেও উত্তরবঙ্গজুড়ে এই হিসেব ৪৮ শতক। তেভাগার দাবিতে ৮৬ জন কৃষক জীবন দিলেও তেভাগা সংগ্রামের জন্মস্থান দিনাজপুরেই নেই তেভাগা, চলে আধি প্রথা। বর্গা নিয়ে জমি চাষ করলে উৎপন্ন ধানের অর্ধেক দিতে হবে জমির মালিককে। আবাদের সমুদয় খরচ অবশ্যই বর্গাচাষির। সাম্প্রতিক আমন ধানের সময়ে প্রতি বস্তা স্বর্ণা ধানের দাম ক্ষেত্রবিশেষে ১১৫০ থেকে ১২৫০ টাকা পর্যন্ত ছিলো। এক বস্তা মানে ৭৫ কেজি ধান। এখানে আবার আছে আরেক প্রতারণা। দিনাজপুর জেলা কৃষক সমিতির সভাপতি অধ্যাপক বদিউজ্জামান বাদল জানালেন, ধানের ওজন ৭৫ কেজি, পাটের তৈরি বস্তা ৭০০ থেকে ৮০০ গ্রাম- কিন্তু সেটি ধরে নেওয়া হয় পুরো দুই কেজি। ফলে ৭৫ কেজি ধানের বস্তা ৭৭ কেজি হিসেবে ওজন দেখানো হয়, কৃষককে দেওয়া হয় ৭৫ কেজি ধানের দাম। প্রকৃত পক্ষে বস্তায় থাকে ৭৬ কেজি ধান, আর গড়ে এক কেজি ওজনের বস্তা। তার মানে প্রত্যেক বস্তায় অন্তত এক কেজি করে ধান বিনা টাকায় দিয়ে দেয় কৃষক। একই ধরনের প্রতারণা এক সময় চলতো খুলনার গ্রামাঞ্চলে। তিল ব্যবসায়ীরা চাষিদের কাছ থেকে তিল কিনতো ৪২ সেরে এক মণ হিসেবে। শহরে সেটাই তারা বিক্রি করতো ৪০ সেরে এক মণ দরে। প্রতি মণে তিলচাষি লোকসান করতো দুই সের। কমরেড রতন সেনের নেতৃত্বে কৃষক সমিতির ডাকে তিলচাষিদের ধর্মঘট হয়েছিলো। শেষ পর্যন্ত হার মেনেছিলো অসাধু ব্যবসায়ীরা। এক মণ মানে ৪০ সের- এই হিসেবই চালু করতে বাধ্য হয় তারা। দিনাজপুরেও ইতোমধ্যে কৃষক সমিতি ধানের বস্তায় ওজন কারচুপির প্রতিবাদে আন্দোলনে নেমেছে। আগামী মে মাসে জেলা প্রশাসকের কার্যালয় ঘেরাও এর কর্মসূচিও ঘোষণা করা হয়েছে। এক বিঘা জমিতে সবকিছু ঠিক থাকলে সর্বোচ্চ ২৪ মণ ধান উৎপন্ন হতে পারে। বীজতলা তৈরি থেকে শুরু করে ধান কাটা-মাড়াই শেষে হাট পর্যন্ত আনতে খরচ পড়ে বিঘাপ্রতি অন্তত ৯ হাজার টাকা। উৎপন্ন ধানের অর্ধেক দিতে হবে বর্গাদার, অর্থাৎ জমির মালিককে। তার মানে ২৪ মণের ১২ মণ গেলো আধিতে। এবার থাকলো ১২ মণ। মানে ৬ বস্তা। প্রতি বস্তা ১২০০ টাকা হলে এলো ৭২০০ টাকা। খরচ কিন্তু আগেই বলা হয়েছে ৯০০০ টাকা। কেজিপ্রতি দাম এসে ঠেকলো ১৫ টাকায়। এই ধানটাই চাল হয়ে বেরিয়ে আসার পর ওই দিনাজপুর শহরের বাহাদুর বাজারে বিক্রি হচ্ছে বস্তাপ্রতি ১৪৪০ টাকায়। এটির নাম গুটি স্বর্ণা। এক বস্তা চাল মানে ৫০ কেজি। প্রতি কেজি চালের দাম ২৯ টাকা। আলোচনাগুলো সাম্প্রতিক আমন ধানের বিষয়ে। যারা কাটারীভোগ চালের ধান আবাদ করেছেন, তারা দাম ভালোই পেয়েছেন। এই ধান বিক্রি হচ্ছে বস্তাপ্রতি ৩৪০০ টাকায়। এবারে আলোচনা করা যাক আলুর আবাদ নিয়ে। এক বিঘা জমিতে আলুর ফলন বেশ ভালোই হয়। প্রকৃতি ও আবাদ অনুকূল থাকলে প্রতি বিঘায় সর্বোচ্চ ১২০ মণ আলু পাওয়া যেতে পারে। একজন আলুচাষি জানালেন, আলুর আবাদে প্রতি বিঘায় ২০ থেকে ২৫ হাজার টাকা ব্যয় হয়। হিমাগারে রাখলে আনা ও নেওয়ার পরিবহণ খরচ বাদে হিমাগার ভাড়া লাগে প্রতি বস্তা আলুর জন্য ৩৫০ টাকা। এক বস্তায় থাকে ৮২ থেকে ৮৪ কেজি আলু। যদিও প্রচলিত হিসেবে ৪০ কেজিতে এক মণ ধরা হয়, কিন্তু দীর্ঘদিন ট্রাকে বা গুদামে থাকায় আলু শুকিয়ে ওজন কমে যেতে পারে বলে আলু ব্যবসায়ীরা ৪২ কেজিতে এক মণ ধরে আলু কেনে। স্থানীয় ভাষায় (দিনাজপুর) এটিকে বলা হয় ধলতা। আলু আবাদে মোটামুটি কেজি প্রতি সাড়ে পাঁচ টাকা খরচ হয়েছে। এই আলু বিক্রি হয়েছে ছয় থেকে আট টাকায়। লোকসান অনেকের হয়নি, এটা ঠিক- কিন্তু যে লাভটা পেয়েছেন, সেটা একেবারেই নগণ্য। শহরের বাহাদুর বাজারে আলু বিক্রি হচ্ছে ধারাপ্রতি (এক ধারা মানে ৫ কেজি বা এক পাল্লা) ৪০, ৫০ ও ৬০ টাকায়। আলুর নানান প্রকার আছে, সেই হিসেবে সর্বনিম্ন ৪০ আর সর্বোচ্চ ৬০ টাকা। অন্য আবাদের দিকে তাকালেও আশাব্যঞ্জক কিছু খুঁজে পাওয়া মুশকিল। বগুড়া থেকে প্রকাশিত দৈনিক করতোয়ায় ৩ ফেব্রুয়ারি ২০১৯ এর প্রতিবেদনে বলা হচ্ছে, ‘ঠাকুরগাঁও চিনিকলে সাড়ে চার হাজার আখচাষি বায়ান্নো হাজার মেট্রিক টন আখ সরবরাহ করেছেন। কিন্তু টাকা পাননি। তাঁদের পাওনা রয়েছে নয় কোটি টাকা’। বাস্তব চিত্র হলো, প্রতি বছরই এভাবে কৃষকের দুর্দশার কথা পত্রিকায় আসে। সরকার সেসব লাঘবে অনেক আশ্বাস দেয়। রাজনৈতিক দলসমূহের পক্ষ থেকেও আন্দোলন হয়। কিন্তু শেষ পর্যন্ত চিত্রটা একই রকম থেকে যায়। খোদ কৃষকের সাথে আলাপ করলে তাঁরা পরিষ্কারভাবে বললেন, পরিকল্পিত কৃষিনীতি প্রণয়ন আর তার সুষ্ঠু বাস্তবায়ন না হলে কোনো সমস্যার কোনোই সমাধান মিলবেনা। শস্যবর্ষের শুরুতেই নির্ধারণ করে নিতে হবে, এবারে কোন ফসল কতটুকু আবাদ হবে। উৎপাদিত সেই ফসল কোথায় কীভাবে কাজে লাগানো হবে- সেটারও পরিকল্পনা সেরে ফেলতে হবে প্রথমেই। ধান কেনার আগে সরকারি যে দাম ঠিক করা হয়, তা খোদ উৎপাদক চাষির হাতে পৌঁছে দিতে অবশ্যই ইউনিয়ন পর্যায়ে সরকারিভাবে সরকারি দামে কৃষকের কাছ থেকে ধান কিনতে হবে। উৎপাদন ব্যয় কমাতে হবে। রোধ করতে হবে মধ্যস্বত্বভোগী-ফড়িয়া-দালালদের উৎপাত। ইউনিয়ন পর্যায়ে কৃষকবাজার স্থাপন করে এই উৎপাত ঠেকানো সম্ভব। ডিজেলের দাম ও ট্রাক ভাড়া হ্রাস এবং পথে পথে চাঁদাবাজী বন্ধ করতে হবে। পণ্য পরিবহণে রেলকে সহনশীল ব্যয়ের মধ্যে আনতে হবে। আলুর উৎপাদনও এখন বছরে প্রায় এক কোটি টনের কাছাকাছি চলে এসেছে। তাই এই কৃষিপণ্যটিরও সরকারি দাম ঠিক করা যায় কিনা সেটা ভেবে দেখতে হবে। সরকারি প্রতিষ্ঠান, যেমন হাসপাতাল, কারাগার, হোস্টেল, সেনানিবাস, ব্যারাক, এতিমখানায় বেশি করে আলু কিনে সংরক্ষণের ব্যবস্থা করা হলে আলু তোলার সময়েই আলুচাষিরা লাভজনক দাম পেতে পারেন। আলু রপ্তানি এবং পটেটো স্টার্চ তৈরির প্রসার ঘটাতে হবে। টমেটো এখন আর শীতকালীন সবজি নয়। উত্তরবঙ্গে টমেটোর আবাদও হয় ব্যাপক হারে। বিস্ময়কর ব্যাপার হলো, পুরো উত্তরবঙ্গজুড়ে টমেটো সংরক্ষণের জন্য কোনো হিমাগার নেই। টমেটোচাষিদের জন্য এটা দারুণ আক্ষেপের বিষয়। চিরিরবন্দর এবং সদরের গাবুড়া এলাকার কিছু টমেটোচাষি জানালেন, টমেটো সংরক্ষণের জন্য এই অঞ্চলে একটি হিমাগার আছে বলে তারা শুনেছেন, তবে সেটির অবস্থান কোথায়- সেটা তারা কেউ বলতে পারলেননা। এবারের শীত মৌসুমে যেটি লক্ষ্য করা গেছে, সেটি হলো- সবজির দাম বেশ সহনশীল পর্যায়েই ছিলো বা এখনও আছে। উত্তরের বাজারগুলোতে আলু বিক্রি হচ্ছে এখন কেজিপ্রতি ৮ থেকে ১২ টাকায়, বেগুন ও গাজর ১০ থেকে ১৫ টাকা, কাঁচামরিচ ৩০ টাকা, পেঁয়াজ ১৫ টাকা। ভোক্তা পর্যায়ে এটি সুখবর হলেও উৎপাদকদের জন্য দুঃসংবাদ। এখন প্রশ্ন আসে, তাহলে সবজির দাম বাড়াতে হবে কি? না হলে চাষির লাভ হয় কীভাবে? সে ক্ষেত্রে একবার ফসলের লাভজনক দামের দাবিতে মিছিল করে পরদিন আবার নিত্যপণ্যের মূল্যহ্রাসের দাবিতে মানববন্ধন করাটা স্ববিরোধিতা হয়ে যাবে। আসলে এই প্রশ্নের জবাব পেতে হলে যেতে হবে গোড়ায়। প্রতিটা ফসলের আবাদব্যয় বেড়েছে কয়েক গুণ। বীজ, সার, ডিজেল, বিদ্যুৎ, পানি, কৃষি শ্রমিকের মজুরি, পণ্য পরিবহণ- সবকিছুর খরচ বৃদ্ধি পাওয়ায় তুলনামূলকভাবে সব ফসলের দাম পূর্বাপেক্ষা বাড়বে, এটাই স্বাভাবিক। ভোক্তা পর্যায়েও তাই কিছু জিনিসের দাম যৌক্তিক হারে বাড়বে, সেটাও স্বাভাবিক। একটা সময় গেছে, যখন রেস্টুরেন্টে বসে এক প্লেট ভাত আর একটা ডিম ১০ টাকায় পাওয়া যেতো। এখন সেই ডিমের দাম ১৫ টাকা, ভাত ১০ টাকা। ছয় টাকার ডিম পনেরো টাকা, আর চার টাকার ভাত দশ টাকা। এই জিনিসগুলোর দাম দ্বিগুণেরও বেশি হয়েছে, ২০০৭ সালে ইউরিয়া সারের দাম ছিলো কেজিপ্রতি ৬ টাকা, সেটি এখন ১৮/২০ টাকা- কিন্তু কৃষি ফসলের দাম সেই অনুপাতে বেড়েছে, এটা বলা যাবেনা। সেজন্য পত্রিকায় খবর বেরিয়েছে, রাজশাহীর বাগমারায় দুই মণ পেঁয়াজ বিক্রি করে এক কেজি খাসির মাংস পাওয়া যাচ্ছে। সুতরাং যৌক্তিক হারে পণ্যের মূল্যবৃদ্ধির বিষয়টি গ্রহণযোগ্য। তবে সেটা হতে হবে কারণসঙ্গত। মূল্যবৃদ্ধিরও একটা নিয়ম থাকা জরুরি। বৃষ্টি হচ্ছে বলে আজ দাম বেশি, রোদ আজ চড়া তাই দাম বেশি- এরকম হাজারটা কারণ দেখিয়ে যে গণ্ডায় গণ্ডায় আমাদের দেশে জিনিসপত্রের দাম বাড়ে, সেটা কোনোভাবেই কৃষকের কোনো উপকারে আসেনা। ভোক্তাদের জন্য এটা ক্ষতিকর। লাভ শুধু মুষ্টিমেয় ব্যবসায়ী আর মজুতদারের। কাজেই এটা স্পষ্ট যে, নিত্যপণ্যের দাম ধীরে ধীরে বাড়বেই। তবে সেই বৃদ্ধি হতে হবে উৎপাদনমূল্যের সাথে সঙ্গতিপূর্ণ। ক্ষেতে আলু বিক্রি হবে ৬ টাকায়, আর কাওরানবাজারে তার দাম হবে ৩৫ টাকা, এটা কোনোভাবেই মেনে নেওয়ার মত না। মধ্যস্বত্বভোগীদের প্রভাব রোধ করে রাষ্ট্রীয় উদ্যোগ গ্রহণের মাধ্যমে কৃষিজাত পণ্যের বাজারজাতকরণ ও বিপণন এইসব সংকট-সমস্যার সমাধান হতে পারে। লেখক : প্রাবন্ধিক, শ্রমিক আন্দোলনের সংগঠক

Print প্রিন্ট উপোযোগী ভার্সন



Login to comment..
New user? Register..