বিরোধী দল : আসল, ভেজাল ও গৃহপালিত

Facebook Twitter Google Digg Reddit LinkedIn StumbleUpon Email
মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম: দেশে ‘সরকারি দল’ হিসেবে এখন কোন-কোন দলকে গণ্য করা যেতে পারে তা নিয়ে কিছুটা ধোঁয়াশা রয়েছে। কিন্তু আরো বড় ধোঁয়াশা রয়েছে এ প্রশ্ন নিয়ে যে– দেশের ‘বিরোধী দল’ এখন কারা? এ নিয়ে বেশ গুরুতর আলোচনার প্রয়োজন। বাস্তব ক্ষেত্রে দেখা যাচ্ছে যে আমাদের দেশে এখন রয়েছে তিন ধরনের বিরোধী দল। তাদের মধ্যে একরকম হচ্ছে সরকার দ্বারা নির্দেশিত হয়ে সৃষ্ট ‘গৃহপালিত’ বিরোধী দল, দ্বিতীয় হচ্ছে ‘ভেজাল’ তথা ‘মেকি’ বিরোধী দল এবং তৃতীয় হচ্ছে ‘আসল’ তথা ‘প্রকৃত’ বিরোধী দল। সেই বিচারে বুঝে নিতে হবে যে বর্তমানে দেশে কোনটি কি ধরনের বিরোধী দল এবং ‘আসল’ বিরোধী দল সেক্ষেত্রে কোনটি? বর্তমান মন্ত্রীসভায় ৩ জন নির্দলীয় ‘টেকনোক্র্যাট’ মন্ত্রী ব্যতীত অন্য সকলেই আওয়ামী লীগের সদস্য। সে হিসেবে আওয়ামী লীগকে প্রশ্নাতীতভাবে ‘সরকারি দল’ বলে আখ্যায়িত করা যায়। কিন্তু আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে অনেক বছর ধরে রয়েছে একটি ১৪-দলীয় জোট। সরকার গঠনের উদ্দেশ্যে তারা একত্রে একই ‘নৌকা’ মার্কা নিয়ে এর আগে এবং এবারও নির্বাচন করেছে। তাই একথাও সন্দেহাতীতভাবে বলা যায় যে, এই সরকার হচ্ছে ১৪-দলীয় জোটের সরকার। সেই হিসেবে বর্তমান মন্ত্রিসভায় এসব দলের প্রতিনিধিত্ব না থাকলেও, এই জোটে অন্তর্ভুক্ত সব দলকেই সরকারি দল হিসেবে গণ্য করাই হবে সঠিক ও বাঞ্ছনীয়। এদিকে আওয়ামী লীগ এরশাদের নেতৃত্বাধীন জাতীয় পার্টি ও বি. চৌধুরীর নেতৃত্বাধীন যুক্তফ্রন্টকে সাথে নিয়ে ১৪-দলসহ ‘মহাজোট’ গঠন করে নির্বাচন করেছিল। এই দল দু’টি আওয়ামী লীগ কর্তৃক বরাদ্দকৃত আসনে প্রার্থী দিয়ে হয় ‘নৌকা’ অথবা ‘লাঙল’ মার্কা নিয়ে ভোটে অংশ নিয়েছিল। এসব আসনে জয়ী হয়ে তারা সংসদ সদস্য হয়েছে। তাই, এ দু’টি দলকেও ‘সরকারি’ দল বলে গণ্য না করার কোনো যুক্তি থাকতে পারে না। মন্ত্রীসভা হলো প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্বাধীনে যৌথভাবে রাষ্ট্রীয় কাজের নির্বাহী দায়িত্ব পালনের সর্বোচ্চ সংস্থা। মন্ত্রীসভায় কোনো দলের প্রতিনিধিত্ব থাকার সোজা-সরল অর্থ হলো সেই দল ‘সরকারের’ অবিচ্ছেদ্য অংশ বলে বিবেচিত হওয়া। অন্যদিকে, নির্বাচনী জোটের মাধ্যমে (যেমন আওয়ামী লীগের সাথে ১৪-দল ও মহাজোটের সব দল একসাথে) ‘ভোট’ করে ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হয়ে সরকার গঠন করা হলে সেই জোটের সব দলকেই ‘সরকারি দল’ হিসেবে বিবেচনা করাটিই যুক্তিসংগত। আর সাময়িক নির্বাচনী জোটের চেয়ে যদি তা এক ধাপ উপরে, অর্থাৎ তা যদি অনেক আগে থেকেই ধারাবাহিকভাবে সক্রিয় থাকা একটি ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক জোট হয়, তাহলে সেই জোট বা মহাজোটের সব শরিক দলকেই ‘সরকারি দল’ রূপে আখ্যায়িত করার ব্যাপারে কোনো সন্দেহই থাকতে পারে না। কিন্তু এক্ষেত্রে এবার গোলমাল বাধিয়েছে ক্ষমতাসীনদের নেতৃত্বকারী দল আওয়ামী লীগ নিজেই। আওয়ামী লীগ নিজেও জানে যে, নির্বাচনে তার ‘বরাদ্দ’ দেওয়া আসন গ্রহণ করে নির্বাচন করায় ১৪-দল ও মহাজোটের শরিক কোনো দলকেই ‘সরকারি দল’ ব্যতীত অন্য কিছু বলে বিবেচনা করা যায় না। অথচ আওয়ামী লীগের এবার ‘খায়েশ’ হয়েছে তার এসব মিত্র দলকে এবার ‘বিরোধী দল’ বানাতে হবে। আওয়ামী লীগ গাছেরটাও খাবে, আবার তলারটাও কুড়াবে বলে গোঁ ধরেছে! ‘সরকারি দল’ হয়ে উঠতে পারার নোংরা অভিযানে জোট সঙ্গীদের কাজে লাগানোর পর এবার তাদেরকে ‘বিরোধী দল’ হওয়ার ‘নির্দেশ’ দেয়া হয়েছে। জাতীয় পার্টি ইতিমধ্যে সংসদে বিরোধী দলের আসনে উপবেশন করছে। স্বৈরশাসক এরশাদ স্বয়ং বিরোধী দলের নেতার দায়িত্ব নিয়েছেন। জাসদ, ওয়ার্কার্স পার্টিসহ ১৪-দলের দলগুলোর কাছেও ‘বিরোধী দলে’ পরিণত হওয়ার জন্য আওয়ামী লীগের একই ‘নির্দেশনা’ এসেছে। অথচ এ দু’টি দলের নেতৃদ্বয় বিগত সরকারের মন্ত্রী হিসেবেই ‘নৌকা’ মার্কা নিয়ে এবারও ‘ভোট’ করেছিলেন। মন্ত্রিসভায় এবার কোন দপ্তর পাবেন এবং আরো একজন বেশি মন্ত্রী এবার পাওয়া যায় কিনা তা নিয়ে যখন তারা জল্পনা করতে ও ‘আশার ফানুস’ উড়াতে মগ্ন ছিল, তখন বজ্রপাতের মতো তাদের কাছে ‘বিরোধী দল’ হওয়ার ‘রাজকীয় ফরমান’ এসে তাদের সব হিসেব-নিকেশ ল-ভ- করে দিল। এ যেন ‘পাশ তো দূরের কথা, ফেল নিয়ে দেখি টানাটানি’। ১৪-দলের অন্য শরিকদের ভাগ্যেও এবার নেমে এসেছে একই ‘কপাল’। মনে মনে তারা সবাই ‘সরকারি দল’। কিন্তু সরকারের নির্দেশে তাদেরকে এখন হতে হবে ‘সরকার-বিরোধী দল’! কি চমৎকার কৌতুক ও ভাঁওতাবাজী! দেশবাসী ‘গৃহপালিত বিরোধী দল’ আগেও দেখেছে। কিন্তু এবার আরেক কাঠি উপরে! এ হলো ‘সরকারি নির্দেশনায় সৃষ্ট’ বিশেষ মর্যাদার ‘গৃহপালিত বিরোধী দল’। এরূপ তামাশা না করলেই কি হতো না? এরশাদ এখন ‘গেজেটেড বিরোধী দলীয় নেতা’। এবং জাসদ, ওয়ার্কার্স পার্টি প্রভৃতি ১৪-দলের শরিকরা ‘বিরোধী দল’ হিসেবে তকমা প্রাপ্ত। এরাই হলো ‘গৃহপালিত বিরোধী দল’। কিন্তু দেশবাসী, মিডিয়া এবং এমনকি সরকারি দলের কাছে এখনো প্রধান বিরোধী দল হলো বিএনপি। গ্রাউন্ড রিয়ালিটি বা বাস্তবতা হলো এমন যে প্রধান বিরোধী দল হিসেবে বিএনপির স্বক্ষমতা হ্রাস পেলেও, সেই পরিচয় তার এখনও লোপ পায়নি। বর্তমানে আওয়ামী লীগের ক্ষমতাকে সমানে-সমান চ্যালেঞ্জ করার মতো শক্তিশালী দল হলো বিএনপি। যতোদিন রাজনৈতিক শক্তি-ভারসাম্য এরূপ থাকবে এবং অন্য কোনো দল এ দু’টি দলের সমপর্যায়ের অথবা কাছাকাছি পর্যায়ে শক্তিশালী দল হিসেবে আবির্ভূত না হতে পারবে, ততোদিন জনগণের কাছে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় থাকাকালে ‘বিরোধী দল’ হিসেবে বিএনপি, এবং বিএনপি ক্ষমতায় থাকাকালে ‘বিরোধী দল’ হিসেবে আওয়ামী লীগ বিবেচিত হবে। বামপন্থিরা রাজনীতির এই দ্বি-কেন্দ্রীক ‘মিউজিক্যাল চেয়ারের’ কাঠামো ভেঙ্গে ‘বাম-গণতান্ত্রিক বিকল্প’ উত্থান ঘটানোর জন্য কাজ করে যাচ্ছে। কিন্তু সে ধরনের শক্তি সমাবেশ এখনো পর্যাপ্ত মাত্রায় জোরদার হয়ে ওঠেনি। কিন্তু ‘নির্ভেজাল’ বা ‘আসল’ বিরোধী দল কাকে বলা যেতে পারে, এর পরেও সে প্রশ্ন থেকে যায়। বিরোধী দলের ভূমিকা সম্পর্কে সাধারণ ধারণা হলো, তাকে হতে হবে রাষ্ট্রক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হওয়ার প্রশ্নে সরকারের প্রতিপক্ষ। কিন্তু, রাজনীতিতে কোন দল ক্ষমতায় থাকছে সেটি যেমন একটি প্রধান প্রশ্ন, তার চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো ক্ষমতাসীন অনুসৃত নীতি-দর্শন ও আর্থ-সামাজিক কর্মসূচির প্রশ্ন। সেই দলই একটি ‘নির্ভেজাল’ বিরোধী দলের পরিচয় দাবি করতে পারে যে ‘ক্ষমতা’ ও ‘নীতি’ উভয় প্রশ্নে সরকারের বিরোধিতা করে। একটি দল যদি ‘নীতির’ প্রশ্নে সরকারের ‘সমমনা’ হয় এবং শুধু ‘ক্ষমতার’ প্রশ্নে তার বিরোধী হয় তাহলে তাকে ‘ভেজাল’ বিরোধী দল বললে খুব একটা ভুল হয় না। আওয়ামী লীগ ও বিএনপির মধ্যে সম্পর্কটি অনেকটা সেরকম। রাষ্ট্র পরিচালনার নীতি-দর্শনের প্রশ্নে এ দুটি দল মোটা দাগে ‘সমমনা’। তাদের উভয়ের নীতি-দর্শন হলো সমাজতন্ত্রসহ রাষ্ট্রীয় চার নীতির পরিপন্থি। তারা উভয়ই ‘অবাধ খোলা বাজারের’ নীতি-দর্শনের অনুসারী। গণতন্ত্র, সাম্প্রদায়িকতা, সাম্রাজ্যবাদ ইত্যাদি প্রশ্নে তাদের অবস্থান, একেবারে এক না হলেও, একই ধারায় এসে মিলেছে। গত প্রায় ৫ দশক ধরে এই নীতি-দর্শনের অনুসরণ দেশবাসীকে কেবল এর-ওর ‘দুঃশাসনেরই’ উপহার দিয়েছে। তারা মূলত সেই নীতি-দর্শন বাস্তবায়নের প্রশ্নে পরস্পরের ‘প্রতিযোগী’। এ ক্ষেত্রে তারা পরস্পরের ‘প্রতিপক্ষ’ নয়। শোষক শ্রেণিকে কে অধিকতর পরিমাণে ও দক্ষতার সাথে সেবা করতে পারবে, তা নিয়েই তাদের ‘কম্পিটিশন’। বাংলাদেশে বর্তমানে তিনটি দ্বন্দ্ব হলো মৌলিক। একটি হলো সাম্রাজ্যবাদের সাথে গোটা জাতির স্বার্থের দ্বন্দ্ব। দ্বিতীয়টি হলো সাম্রাজ্যবাদ-নির্ভর পরগাছা চরিত্রের লুটেরা পুঁজির সাথে শ্রমিক-কৃষক-মেহনতি মানুষ, মধ্যবিত্তসহ আম-জনগণের স্বার্থের। তৃতীয়টি হলো স্বাধীনতাবিরোধী উগ্র-সাম্প্রদায়িক জঙ্গিবাদী শক্তির সাথে অসাম্প্রদায়িক-মানবতাবাদী-গণতান্ত্রিক জনগণের দ্বন্দ্ব। সাম্রাজ্যবাদ, লুটপাটতন্ত্র ও সাম্প্রদায়িক জঙ্গিবাদ– এই তিনটি শক্তিই হলো বর্তমানে দেশ, জাতি ও জনগণের প্রধান শত্রু, তথা মূল প্রতিপক্ষ। আরেক দিক থেকে বললে বলা যায় যে, দেশে আজ দুটি মুখোমুখি পক্ষ বিরাজ করছে। একদিকে ১ শতাংশ লুটেরা ধনীক। অন্যদিকে ৯৯ শতাংশ শ্রমিক, কৃষকসহ সাধারণ মানুষ। দশকের পর দশক ধরে রাষ্ট্রক্ষমতা ১ শতাংশ শোষকের হাতে। তারাই এখন তাদের লালিত ‘এ-দল’ বা ‘ও-দল’ কে দিয়ে পরিচালিত ‘সরকার পক্ষ’। এর বিপরীত স্বার্থের ৯৯ শতাংশ হলো ‘সরকার-বিরোধী পক্ষ’। সমাজের মূল বিভাজন হলো এটিই। বাস্তব ঘটনাবলী থেকে এটিই প্রতীয়মান যে, দেশ-জাতি-জনগণের সাথে এই তিন শত্রু তথা সাম্রাজ্যবাদ, লুটপাটতন্ত্র ও সাম্প্রদায়িক জঙ্গিবাদের দ্বন্দ্বই যখন কিনা মৌলিক বিরোধ, সে ক্ষেত্রে আওয়ামী লীগ ও বিএনপির অবস্থান হলো সাধারণভাবে সেই প্রতিপক্ষ শত্রু-শক্তির দিকে। সেই অর্থে তারা একই শিবিরের দল। একথা ঠিক যে আওয়ামী লীগ ও বিএনপি টাকার এপিঠ-ওপিঠ নয় এবং তাদেরকে সর্বাংশে ‘এক পাল্লায় মাপা’ সঠিক হবে না (যেমন কি না বিএনপি ও জামায়াতকেও একই পাল্লায় মাপাটা সঠিক নয়)। কিন্তু মোটা দাগে, আর্থ-সামাজিক নীতি-দর্শনের ক্ষেত্রে তাদেরকে ‘সমমনা’ বা একই শিবিরভূক্ত হিসেবে বিবেচনা করাটিও ভুল হবে না। বস্তুত, উভয় দলের কাছেই এখন নীতি-আদর্শ অনুসরণের চেয়ে ক্ষমতায় যেতে পারাটাই হলো প্রধান লক্ষ্য। গদি দখল করতে পারাটাই হয়ে উঠেছে তাদের মূল সাধনা। কারণ, ‘গদি’ হয়ে উঠেছে একটি ব্যবসা। বেপরোয়া লুটপাটের একটি সুযোগ। এমতাবস্থায় বিএনপি বা এই ধারার কোনো দল বা জোটকে ‘ভেজাল’ তথা ‘মেকি’ বিরোধী দল হিসেবে আখ্যায়িত করার যথেষ্ট যুক্তি রয়েছে। সাম্প্রদায়িক জঙ্গিবাদী শক্তির সাথে বিবাদের প্রশ্নে আওয়ামী লীগ ও বিএনপির অবস্থানের মধ্যে কিছু তারতম্য ছিল এবং কিছুটা রয়েছে। বিএনপি এই শত্রু শক্তিকে আগাগোড়াই মদদ ও আশ্রয় দিয়েছে এবং এখনো দিচ্ছে। আওয়ামী লীগও বর্তমানে ক্ষমতার সমীকরণ মিলানোর জন্য বিএনপির সাথে প্রতিযোগিতা করে সাম্প্রদায়িকতাকে মদদ দিয়ে ও তাকে নানাভাবে লালন করে চলছে। উভয় দলের ক্ষেত্রে এই শত্রু-শক্তি সম্পর্কে তাদের অবস্থান ও ভূমিকা, ক্ষমতার জন্য তাদের মধ্যকার প্রতিযোগিতার প্রশ্নে নিজ-নিজ কৌশলগত সুবিধার বিষয়ে পরিণত হয়েছে। বর্তমান দুঃশাসনের অবসান ঘটানো দেশবাসীর সামনে আজ অত্যাবশ্যক কর্তব্য হয়ে উঠেছে। সরকারের গণবিরোধী কর্মকাণ্ড, ফ্যাসিস্টসুলভ দমন-পীড়ন, চরম কর্তৃত্ববাদী শাসন ও যাবতীয় অপকর্মের বিরুদ্ধে সংগ্রাম আরো জোরদার করা জরুরি কর্তব্য হিসেবে জনগণের সামনে আজ উপস্থিত হয়েছে। এমতাবস্থায় প্রশ্ন হলো, এ কাজে জনগণকে উদ্বুদ্ধ করতে ও নেতৃত্ব দিতে উপযুক্ত ‘বিরোধী দলের’ ভূমিকা পালনের দায়িত্ব কে নিতে পারবে। জাতীয় পার্টি ও ১৪-দলের মতো ‘গৃহপালিত বিরোধী দল’ অথবা বিএনপি-জামায়াতের মতো ‘ভেজাল বিরোধী দল’ তা পালন করতে পারবে না। এই দুই ধরনের ‘বিরোধী দল’ ছাড়াও আর যে সরকার-বিরোধী শক্তি দেশে আছে তারা হলো দেশের প্রকৃত বাম প্রগতিশীল শক্তি। তারা সরকারের ‘নীতি’ ও ‘গদি’ উভয়ের প্রতিপক্ষ। ‘গৃহপালিত’ ও ‘ভেজাল’ বিরোধী দলের হাতে মূলধারার বিরোধী দলের দায়িত্ব থাকলে দুঃশাসনের হাত বদল হবে, কিন্তু দুঃশাসনের অভিশাপ থেকে দেশকে মুক্ত করা যাবে না। তা সম্ভব করতে হলে নীতি-আদর্শ দ্বারা পরিচালিত প্রকৃত বাম গণতান্ত্রিক শক্তিকে সরকার-বিরোধী শক্তির মধ্যে প্রধান ও নিয়ামক শক্তি হয়ে উঠতে হবে। যতোদিন ক্ষমতায় যাওয়ার জন্য বিকল্প আদর্শবাদী রাজনৈতিক শক্তির অভ্যুদয় না ঘটবে, ততোদিন দেশে ‘গদির বদল’ হলেও রাষ্ট্রের ‘নীতির’ বদল হবে না। ফলে, আম-জনতার ভাগ্যেরও কোনো মৌলিক পরিবর্তন হবে না। দুঃশাসনের অব্যাহত চক্রের অবসান ঘটিয়ে জনগণের ভাগ্যের মৌলিক পরিবর্তন সাধন করতে হলে ১ শতাংশ লুটেরা ধনীকের শাসনের অবসান ঘটিয়ে ৯৯ শতাংশের স্বার্থে দেশ পরিচালনার ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে। তা করতে হলে ৯৯ শতাংশের স্বার্থরক্ষাকারী শক্তিকে আজ মাথা তুলে দাঁড়াতে হবে। বামপন্থি শক্তির নেতৃত্বে সৃষ্টি করতে হবে গণসংগ্রামের নতুন জোয়ার। দেশের রাজনীতিতে লুটেরা বুর্জোয়া শক্তির চরম ব্যর্থতা ও দেওলিয়াপনা যে শূন্যতার জন্ম দিয়েছে সেমতাবস্থায় বামপন্থিদের বিকাশের জন্য অনুকূলে সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে। সময় থাকতে-থাকতে এই সুযোগকে কাজে লাগতে হবে। সে কাজটি না করতে পারলে অব্যাহত থাকবে সাম্রাজ্যবাদ, লুটপাটতন্ত্র ও সাম্প্রদায়িকতার আধিপত্ব। অব্যাহত থাকবে ১ শতাংশ লুটেরা ধনীকের শাসন-শোষণ। দেশের রাজনীতিতে চলতেই থাকবে লুটপাটের একচ্ছত্র সুযোগের জন্য ‘গদি দখলের’ প্রতিযোগিতার কুৎসিত ও বিপদজনক খেলা। রাজনীতির খাতা থেকে বর্তমান এই নিষ্ফল ও বন্ধ্যা অধ্যায়ের পরিসমাপ্তি ঘটানোর কর্তব্যটিকে আর অবহেলা করা যায় না।

Print প্রিন্ট উপোযোগী ভার্সন



Login to comment..
New user? Register..