লাল ব্রিগেডে পরিবর্তনের ডাক

Facebook Twitter Google Digg Reddit LinkedIn StumbleUpon Email

একতা বিদেশ ডেস্ক : পরিবর্তনের আহ্বান জানালো ভারতের পশ্চিমবঙ্গের ব্রিগেডে বামপন্থিদের সমাবেশ। আগামী লোকসভা নির্বাচনে বামপন্থিদের শক্তি বাড়ানোর আহ্বান জানালেন বামফ্রন্ট চেয়ারম্যন বিমান বসু। ব্রিগেড সমাবেশে বিমান বসু বললেন, দুটো মুখ্য স্লোগানকে সামনে রেখে আমাদের লড়াই। ‘বিজেপি হঠাও, দেশ বাঁচাও’ এবং ‘তৃণমূল হঠাও রাজ্য বাঁচাও’। গত ৩ ফেব্রুয়ারি ঘড়ির কাঁটায় দুপুর ১টা ১৭মিনিটে শুরু হল ঐতিহাসিক ব্রিগেড সমাবেশ। দুপুর পৌনে দুটোতেই ব্রিগেড ময়দান ভাসিয়ে উপচে পড়লো জন¯্রােত। সমাবেশের নানা অংশে উঠেছিল লাল পতাকার জোয়ার। তখনও মহানগরের নানা অংশে ব্রিগেডমুখী মানুষের জন¯্রােত ভেসে আসছিল। থিকথিকে মানুষের মধ্যে ব্রিগেড ময়দানে চলাফেরাও করা কার্যত যাচ্ছিল না। রাজ্যের প্রতিটি জেলা থেকে মানুষ এসেছেন এদিনের ব্রিগেড সমাবেশে। এ সমাবেশকে ‘লাল সমুদ’ আখ্যা দিয়ে নিয়ে ভারতের গণশক্তির ‘স্পর্ধার প্লাবনে প্রতিবাদের বার্তা’ শিরোনামের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে: সাধারণ ধর্মঘটে যে স্পর্ধার পুনর্র্নিমাণ, তাই বিদায়ী-শীতের ব্রিগেডে জনপ্লাবনের অসামান্য প্রতিবাদের বার্তা হয়ে উঠল। সুবর্ণরেখা দুঃসাহসের যাবতীয় ধারা, উপধারায় ৩ ফেব্রুয়ারি জোয়ার এসেছিল। জন্মভূমির এই প্রবল কৃষ্ণপক্ষেও ময়দানে এদিন কোজাগরী এসেছিল। সব পথের চেনা মানচিত্র ভেঙেচুরে, সব বাঁধ দুপায়ে মাড়িয়ে, এদিন কলকাতায় জনসমুদ্রে নেমেছিল। স্বদেশ এদিন কান পেতে তন্ময় হয়েছিল- জনতার ব্রিগেডে। নাহলে এত স্বতঃস্ফূর্ত জনপ্লাবন থাকে কী করে? এদিন সেই উত্তাল ব্রিগেডের দিকে তাকিয়ে সিপিআই(এম)’র রাজ্য সম্পাদক সূর্য মিশ্র বললেন, ‘পশ্চিমবঙ্গ ধ্বংসের পথে চলেছে। একে আটকানো শুধু নেতাদের কাজ নয়।’ সমবেত করতালিতে ধ্বনিত সমর্থন ভেসে গেল পশ্চিমি বাতাসে। তারপর? কার তবে কাজ এই ধ্বংসকে আটকানো? সূর্য মিশ্রই বললেন, ‘নিম্নচাপ হচ্ছে। মানে ঝড় আসছে। তাকে লালঝড়ে পরিণত করতে হবে।’ দায়িত্ব বুঝে নিল গণপ্লাবন। তুমুল স্লোগানে ডুবে যেতে যেতে শহীদ মাতঙ্গিনী ব্লকের বামুনঅড়া গ্রামের দুই কলেজ সহপাঠী অনির্বাণ পাঞ্জা আর শেখ নাজিম বললেন, ‘প্রথমবার এলাম। খুব, খুব ভালো লাগছে। এত মানুষ আছে লালঝাণ্ডার সঙ্গে না আসলে কোনদিনই বুঝতাম না।’ পাশে কিঞ্চিৎ লাজুক কমলেশ পাঞ্জার মুখে শব্দ নেই। শুধু স্মিত হাসি, যৌবনের চিঠি, সজীবতার বার্তা। রাতভর শিশিরের ছোঁয়ায় ময়দানের বেশিরভাগ ঘাস এদিনও ধূসর বলিরেখার মতো ছিল। তবু ঋতুরাজ অপেক্ষা করেনি। স্পর্ধার উজানে এদিন ময়দানের বিস্তীর্ণ শীতলপাটিতে বিছিয়ে গেছিল অকাল-বসন্ত। গ্রাম কিংবা শহর- কয়েক লক্ষ যুবক, যুবতী, ছাত্রছাত্রীর উপস্থিতিই জানিয়ে গেছে– আগামী তৈরি। বসন্ত জেগেছে। স্পর্ধা ফিরেছে। এসেছে ডাক। সামনে বড় লড়াই। ব্রিগেড তুলে দিয়েছে শস্ত্র সীতারাম ইয়েচুরির ভাষ্যে। সিপিআই(এম)’র সাধারণ সম্পাদক বলেছেন, ‘এই বিরাট সমাবেশ দেখিয়ে দিয়েছে বামপন্থার শক্তি। এবার প্রতিবাদ ভাঙতে এলে প্রতিরোধ হবে।’ কেতাব আলি মণ্ডল কী ঠিক তাই বুঝিয়ে গেলেন না? কিংবা সেলিম সেখ। যেখানে পাড় ভাঙে নির্নিমেষ, যেখানে গঙ্গা কাড়ে মাটি, সেই জলঙ্গীর সাহেবনগরের দুই বাসিন্দা বললেন, ‘আমাদের এমএলএ চলে গেছে তৃণমূলে। ক’দিন আগে। ওই বেইমানের বাড়ির পাড়া থেকেই এদিন অনেকে এসেছেন আজকে। ৮টি বাস এসেছে আমাদের ব্লক থেকে। এত সহজে মাথা নোয়ানো যাবে না আমাদের।’ ব্রিগেড মাথা নোয়ানোর নয়। ব্রিগেড জানে জনপ্লাবনের রূপকথা কিভাবে পুনর্র্নিমাণের বৃত্তান্ত এঁকে দেয় কুমারগ্রাম থেকে কাকদ্বীপে। দুপুর তিনটেতেও ঠায় মানুষের মাথা-মঞ্চের সামনে থেকে ছড়িয়ে। উত্তরে তার প্রায় ছুঁয়েছিল পিচের রাস্তা পর্যন্ত। পশ্চিমের রেডরোড প্রায় সারাক্ষণ ছিল মানুষের দখলে। পূর্বেও বিস্তীর্ণ মাঠে মানুষ বসে থেকেছেন। ড্রোনের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে উড়েছে লাল ঘুড়ি। মন দিয়ে বক্তৃতা শুনেছেন। হাততালি দিয়েছেন কখনও। জনতা কখনও মগ্ন থেকেছেন বক্তব্যের গভীরতায়। দলবেঁধে বেশিরভাগ গেছেন। কিন্তু এই ব্রিগেডে এমন অনেকে ছিলেন, যাঁরা সপরিবারে নিজেদের উদ্যোগে এসেছেন। এদিনের ব্রিগেড বুঝিয়েছে Í লাল ঝান্ডা সংগঠিত উদ্যোগের বাইরেও ছড়িয়ে আছে অনেকটা। আর মেজাজ? যেন বেঁধে দিয়েছিলেন বামফ্রন্ট চেয়ারম্যানই। তিনি বলে দেন, ‘কেউ যাবেন না। পুলিশকে বলে দেব। বাস ছাড়বে না। এখানে এমন বলার কেউ নেই। এখানে আপনারাই ভলান্টিয়ার, আপনারাই কর্মী, আপনারাই নেতা।’’ শিরদাঁড়াই পতাকার ধারক তখনই ঘোষিত হয়ে গেছে। ব্রিগেড কাদের– তখনই স্পষ্ট হয়ে গেছে। দেবলীনা হেমব্রমের চ্যালেঞ্জই হয়ে দাঁড়িয়েছে এদিন ‘মানুষের ব্রিগেডের’ হৃদয়ের কথা- ‘আমরা ওদের ছাড়ব না। শেষ পর্যন্ত লড়াই হবে।’ জয়? সুনিশ্চিত। কার? ব্রিগেডের। কত মানুষ এসেছিলেন এদিন? মানুষই পাশের মানুষকে প্রশ্ন করেছেন এদিন। অথচ দুজনেই একই জায়গায় দাঁড়িয়ে। ইদানীংকালের মধ্যে এত বড় জমায়েত হয়নি কলকাতায়। রাতের কলকাতায় অনেকেই কলকাতা পুলিশের সিপি রাজীব কুমারের বাড়িতে সিবিআই যাওয়া, মুখ্যমন্ত্রীর সাংবাদিক সম্মেলনকে একপ্রস্থ নাটক বলেছেন। কারণ- বামফ্রন্টের ব্রিগেড সাফল্য খবরের দুনিয়া থেকে সরানোর জন্যই এই ঘটনা ঘটিয়েছে দুই সরকার মিলে- অনেকেরই তেমনই বক্তব্য। তবু কত লোক হয়েছিল? জবাব কিছুটা মিলেছে সূর্য মিশ্রের ভাষণে- ‘এখানে কয়েকদিন আগে একটি সভা হয়ে গেছে। সেখানে ২৩জন বক্তা ছিলেন। আজ ৯জন বক্তা। অর্ধেকের কম। ভিড় দ্বিগুণের বেশি।’ মুম্বাই থেকে ফোনটাও এল একই কারণে। দুপুর তখন সাড়ে বারোটা। মূল মঞ্চের সামনে ছিল সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের নির্ধারিত ডায়াস। সেখানে তখন গান হচ্ছিল। তখনই নাদিমুল শেখের সস্তা মোবাইলে রিং টোন বেজে উঠল। এক গাল হেসে, পানের দাগে চটা দাঁতের সারি প্রকাশিত করে বছর পঞ্চাশের ছোট দোকানদার বললেন, ‘‘ছেলের ফোন। মুম্বাই থেকে। খুব উচাটন ছেলেটার মন।’’ কথোপকথন চলল মিনিট তিনেক। মোদ্দা কথা Í পরিযায়ী শ্রমিক, বছর চব্বিশের রহমান তাঁর বাবার কাছে জানতে চাইছে ভিড় কেমন হয়েছে? লোক কত হলো? গ্রাম থেকে কতজন গেছে? ছেলেকে স্বস্তি দিয়ে ফোন পাঞ্জাবির বুক পকেটে চালান করে দিলেন চাপড়ার বাসিন্দা। তিনি নজর উড়িয়ে তাকালেন ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়ালের দিকে। সেদিকেই মঞ্চ। আজ ধুম লেগেছে হৃদকমলে– স্পর্ধার হাতে বৈঠা। ঠেকায় কে? কার আছে সাধ্য? শক্তি চট্টোপাধ্যায় এদিন নিশ্চয়ই খুশি হতেন। যাদবপুরের ২৬বছরের যে যুবক রবিবার দুপুর ১টার আগে ব্রিগেডের পূর্বপাড় থেকে সরাসরি মঞ্চের কাছাকাছি এসে হাজির হয়েছিলেন, আসন পিঁড়ি হয়ে বসে পড়েছিলেন সরাসরি ভিক্টোরিয়ার পরির মুখোমুখি, তাঁর হাত ধরে নিশ্চয়ই বেপরোয়া কবি নিজেরই কবিতার অবিস্মরণীয় লাইন এদিন নিজেই বদলে দিতেন। ‘তুমি গেছো, স্পর্ধা গেছে, বিনয় এসেছে’ - পরিবর্তিত হত। হতই। চ্যালেঞ্জ ব্রিগেডের। মানুষের ব্রিগেডের।

Print প্রিন্ট উপোযোগী ভার্সন



Login to comment..
New user? Register..