সংগ্রামে-সংগঠনে

হও আগুয়ান, হাঁকিছে ভবিষ্যৎ

Facebook Twitter Google Digg Reddit LinkedIn StumbleUpon Email
ডা. মনোজ দাশ : প্রহসনের নির্বাচনের মধ্য দিয়ে সরকার ও আওয়ামী লীগের স্বৈরতান্ত্রিক-কর্তৃত্ববাদী-প্রকাশ্য রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাসবাদী স্বরূপ আরো স্পষ্ট রূপে উন্মোচিত হয়েছে। বিএনপির দেউলিয়াত্ব আরো প্রকট হয়েছে। রাজনৈতিক শূন্যতা সৃষ্টি হয়েছে। আমাদের পার্টি ও বামপন্থিদের নীতিনিষ্ঠ রাজনৈতিক অবস্থানের কারণে জনগণ বামপন্থিদের বিকল্প শক্তি হিসেবে বিবেচনা করতে শুরু করেছে। জনগণকে নেতৃত্ব দেওয়ার এক নতুন ঐতিহাসিক পরিস্থিতির উদ্ভব হয়েছে। বুর্জোয়াদের দেউলিয়াত্বের কারণে সৃষ্ট শূন্যতা দীর্ঘ সময় ধরে আমাদের জন্য অপেক্ষা করে থাকবে না। বাংলাদেশের বর্তমান এই পরিস্থিতি আগে কখনো হয়নি। এটি অভূতপূর্ব। এ ধরনের পরিস্থিতি একই সাথে বিপদ-সংকট ও সম্ভাবনার ইঙ্গিত বহন করে। বর্তমান এই পরিস্থিতি কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান নিয়ে উপস্থিত হয়েছে। প্রথমত প্রহসনের নির্বাচনের মধ্য দিয়ে আওয়ামী লীগ তার কর্তৃত্ববাদী স্বৈরতন্ত্রকে দীর্ঘস্থায়ী করার প্রচেষ্টা গ্রহণ করলেও আওয়ামী লীগের নৈতিক পরাজয় স্থায়ী রূপ নিয়েছে। জনগণ থেকে আওয়ামী লীগের চূড়ান্ত বিচ্ছিন্নতা সৃষ্টি হয়েছে। দ্বিতীয়ত নির্বাচনের বর্তমান ধারার প্রতি জনগণের মোহভঙ্গ হয়েছে। জনগণ এর থেকে মুক্তি চায়। তৃতীয়ত বিএনপির বহুমুখী ব্যর্থতার জন্য তার প্রতিও জনগণের আস্থা নেই। জনগণ বিএনপিকে আস্থায় নিতে পারছে না। লুটেরা বুর্জোয়াদের দুটি দলই দুটি ভিন্ন মাত্রার সংকটে আছে। চতুর্থত বুর্জোয়া রাজনীতির দেউলিয়াত্বের কারণে আমাদের পার্টি ও বামপন্থার বিকাশে এক ঐতিহাসিক সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। পঞ্চমত ইতিহাসের বর্তমান পরিস্থিতি বামপন্থিদের মধ্যে সবচেয়ে বড় শক্তি কমিউনিস্ট পার্টিকে বিদ্যমান সম্ভাবনাকে কাজে লাগাবার জরুরি কর্তব্যের মুখোমুখি দাঁড় করিয়েছে। যে কোনো ঐতিহাসিক পরিস্থিতির মতো বর্তমান পরিস্থিতির অবসান ঘটিয়ে আমাদের পার্টির শক্তি বৃদ্ধি ও বিকল্প সমাবেশ গড়ে তোলার প্রশ্নটি বিষয়গত ও বিষয়ীগত উভয় উপাদানের উপর নির্ভরশীল। বর্তমান ঐতিহাসিক পরিস্থিতির বিষয়গত দিকগুলির সব কিছু আমাদের ইচ্ছের উপর নির্ভর করে না। কিন্তু আমরা ততদূর পর্যন্ত এই বিষয়গত পরিস্থিতিকে ব্যবহার করতে সক্ষম হবো, ঠিক যতখানি এই পরিস্থিতিকে আমরা বুঝতে সক্ষম হবো। অন্যদিকে বিষয়ীগত উপাদানগুলি আমাদের ইচ্ছা-চিন্তা ও কাজের ঐক্য দ্বারা নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব। পার্টির নেতৃত্বদানকারী ক্ষমতা বিষয়গত ও বিষয়ীগত এই দুইয়ের মধ্যে অবিরাম ঐক্য ও সংগ্রামের দ্বান্দ্বিক পদ্ধতি দ্বারা পরিচালিত হয়। তাই আমাদের সর্বস্তরের নেতৃত্বকে বর্তমান ঐতিহাসিক পরিস্থিতির বিষয়গত গতি প্রকৃতি বুঝতে হবে। আবার বর্তমান ঐতিহাসিক পরিস্থিতির শুধুমাত্র বিশ্লেষণ করে ও আমাদের সংগঠনের কোনো সীমাবদ্ধতার কথা বলে স্থির হয়ে বসে থাকার সময় এটা নয়। বর্তমান পরিস্থিতির ইতিবাচক পরিবর্তনের জন্য সংগ্রাম ও সংগঠনের শক্তি বৃদ্ধির জন্য সর্বস্তরের নেতা কর্মীদের দ্বিগুণ মনোবল নিয়ে প্রবল গতিতে এগিয়ে আসার সময় এটা। সকল স্তরের নেতৃত্বের সাফল্য নির্ভর করছে পার্টির মতাদর্শ ও রাজনীতি অনুসরণ করে সংগঠনের লাল পতাকাতলে ও সংগ্রামের কর্মসূচিগুলি সফল করতে বেশি বেশি মানুষকে সংগঠিত করা যাচ্ছে কিনা তার উপর। প্রাগমেটিস্টরা বর্তমান কর্তৃত্ববাদী শাসনের তথাকথিত উন্নয়নে বিমোহিত হয়ে থাকতে প্ররোচিত করে। কারণ তারা উন্নয়ন দেখে, শোষণ-লুণ্ঠন-বৈষম্য-নিপীড়ন-কর্মহীনতা ও পরিবেশ ধ্বংস দেখে না। ভোটের বঞ্চনা তাদের পীড়া দেয় না। অন্যদিকে মার্কসবাদী নেতৃত্ব একটা বস্তু বা ঘটনাকে সব দিক দিয়ে দেখে। তথাকথিত উন্নয়নও দেখে, তার মধ্যে তীব্র বৈরি অসংগতিও দেখে। মার্কসবাদীরা শোষণ-নিপীড়ন-বৈষম্য-কর্মহীনতা ও ভোট বঞ্চনার স্বীকার বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগণকে আমূল পরিবর্তনের জন্য বিপ্লবী সংগ্রামে উদীপ্ত করে। তাই মার্কসবাদী হিসেবে বাংলাদেশের উদ্ভূত এই পরিস্থিতিতে জনগণের সাথে জীবন্ত সম্পর্ক স্থাপনের লক্ষ্যে আমাদের সর্ব স্তরের পার্টি কর্মী ও নেতৃত্বকে কঠিন পরিশ্রমের মধ্য দিয়ে জনগণের আপনজন হওয়ার বিপ্লবী কর্মকাণ্ডে জোর কদমে এগিয়ে আসতে হবে। মানুষের কাছে যাওয়ার কোনো বিকল্প নেই। মানুষের কাছে যেতে হবে মানুষের দৈনন্দিন সমস্যা, দাবি ও সেগুলি আদায়ের অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়ে আসার জন্য, তার থেকে আমাদের শিখতে হবে এবং সে শিক্ষা নিয়ে আবার মানুষের কাছে ফিরে যেতে হবে তাদের সংগঠিত করার জন্য। কেবলমাত্র মানুষের কাছে এভাবে নিরন্তনভাবে যাওয়া-আসার মধ্য দিয়েই আমাদের লক্ষ্যের দিকে অগ্রসর হওয়ার জন্য আমরা মানুষকে সংগঠিত করতে পারবো। মানুষকে সাথে নিয়ে রাজনৈতিক সংগ্রাম গড়ে তোলার জন্য মতাদর্শ ও রাজনীতির সাথে সাথে অবশ্যই প্রয়োজনীয় হলো পার্টি সংগঠন। সংগ্রামের মধ্যে দিয়েই সংগঠন গড়ে ওঠে। সংগ্রামবিমুখ হয়ে সংগঠন গড়ে তোলা যায় না। আবার সংগঠন ছাড়া কোনো সংগ্রামও গড়ে তোলা যায় না। তাই লক্ষ্য অর্জনের জন্য গ্রাম-ওয়ার্ড পর্যন্ত একটি মজবুত সংগঠন তোলার দিকে আমাদের গুরুত্ব দিতে হবে। শুধুমাত্র তত্ত্বজ্ঞানে চলবে না, তত্ত্বকে প্রয়োগ ও পরীক্ষা করতে হবে সংগ্রামের পথে। এই প্রক্রিয়ায় তত্ত্ব ও তার প্রয়োগের ব্যবহারিক কাজ- এ দুটোকেই সমৃদ্ধ করে তুলতে হবে। বর্তমান ঐতিহাসিক সুযোগকে কাজে লাগাবার জন্য আমাদের পার্টির সর্ব স্তরের নেতৃত্ব ও সদস্যদের এটা বুঝতে হবে যে, সংগঠন ও সংগ্রাম গড়ে তোলার যে আর্থ-সামাজিক-রাজনৈতিক পরিস্থিতি বিরাজ করছে তা অতীতে ছিল না। এই পরিস্থিতিকে পুরো মাত্রায় কাজে লাগাবার জন্য সব কমরেডকে ‘পা চালিয়ে’ চলতে হবে, মার্চ ফরওয়ার্ড করতে হবে। প্রহসনের নির্বাচনের দগদগে ক্ষতের মধ্যে উপজেলা নির্বাচন আমরা বর্জন করলেও মানুষের ভোটের অধিকার আদায় ও স্থানীয় সরকারকে শক্তিশালীকরণের সংগ্রামে আমাদের নেতৃত্ব দিতে হবে। বর্তমান পরিস্থিতির সামনে দাঁড়িয়ে গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের লড়াইকে জনগণের জীবনজীবিকার সংগ্রামের সঙ্গে সম্পৃক্ত করে ছোট বড় মাঝারি সব ধরনের সমাবেশে জনগণকে হাজির করার সর্বাত্মক প্রচেষ্টা চালাতে হবে। এ ধরনের পরিস্থিতিতে রাজপথই আমাদের নতুন নতুন পথের সন্ধান দেবে। পার্টির মতাদর্শ, রাজনীতি, সংগ্রাম ও সংগঠন এই চারটি হাতিয়ারকেই অবিরাম শানিত করার চতুর্মুখী কাজ যুগোপৎ চালিয়ে যাওয়াই এখনকার সময়ে পার্টির সামনে মুখ্য চ্যালেঞ্জ। আমাদের পার্টিকে শক্তিশালী করা ও বাম-গণতান্ত্রিক বিকল্পের জন্য সংগ্রামকে একটি উন্নততর পর্যায়ে তরান্বিত করার কাজে সর্বশক্তি নিয়োগ করার এখনই সময়। কংগ্রেসে গৃহীত রাজনৈতিক লাইনে দৃঢ় থেকে শ্রম-মেধা ও সময় দিয়ে গণতন্ত্র পুনরুদ্ধার ও জনগণের আশু আদায়যোগ্য দাবিকে সামনে রেখে আন্দোলন সংগ্রামের ময়দানে সব সময় প্রতিবাদী কণ্ঠ জারি রাখা ও সংগঠন শক্তিশালী করাই এই মুহূর্তের জরুরি কর্তব্য। রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাসসহ সব ধরনের হামলা, জেল-জুলুম মোকাবিলা করে বর্তমানের নানা জটিল ও বিপজ্জনক পরিস্থিতিতে ধারাবাহিকভাবে মানুষের সুখে-দুঃখে তার পাশে থেকে ভোট ও ভাতের জন্য লড়াকু গণসংগ্রাম ও একই সঙ্গে জনগণের মধ্যে নানা ইতিবাচক গঠনমূলক কাজ এগিয়ে নিতে সামর্থ্যরে পরিচয় দিতে পারলেই একটি বিকল্প শক্তি সমাবেশ ও শক্তিশালী পার্টি গড়ে ওঠার বস্তুগত সম্ভাবনা অবশ্যম্ভাবী হয়ে উঠবে।

Print প্রিন্ট উপোযোগী ভার্সন



Login to comment..
New user? Register..