চিন্তার স্বাধীনতা

Facebook Twitter Google Digg Reddit LinkedIn StumbleUpon Email
মধুমিতা বিশ্বাস : চিন্তার স্বাধীনতা মানুষের একটি মৌলিক অধিকার। ‘সবার উপরে মানুষ সত্য’ এ উক্তিটি উপলব্ধি করে বলা যায়, মানুষের মৌলিক অধিকার থেকে চিন্তার স্বাধীনতাকে আলাদা করা যায় না। কেননা, মানুষ বুদ্ধিদীপ্ত প্রাণী। তার বিচার বিবেচনা করার ক্ষমতা আছে। কোনো মানুষ যখন এই বিচারক্ষমতা হারিয়ে ফেলে বা কোনো সংস্কারের নিকট মাথা নত করে তখন আত্মবিশ্বাসের যূপকাষ্ঠে বিবেককে সে বলি দিয়ে চেতনাকে বন্দী করে গতিহীন অন্ধ কারাগারে। সমাজ, রাষ্ট্রে মানুষের চিন্তা ও বিবেকের স্বাধীনতা যদি রক্ষিত না হয় তাহলে অশুভ শক্তির বিকাশ দৃশ্য-অদৃশ্য সব স্তরে ঘটে। ফলে সহনশীল সংস্কৃতির পরিবর্তে, অসহনশীল দানবীয় সংস্কৃতি জায়গা করে নেয় যা রাষ্ট্র ও সমাজকে আক্রান্ত করে এবং সৃষ্টিশীলতার পথ স্বাভাবিকভাবেই রুদ্ধ হয়ে আত্মবিকাশের প্রশ্ন হয়ে ওঠে সাংঘর্ষিক। এজন্য আধুনিক গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র বিনির্মাণের মূল শর্ত পক্ষ-বিপক্ষের চিন্তার অধিকার রক্ষা করা। গ্রিক দার্শনিক প্লেটো ও সক্রেটিস সম্ভবত প্রথম অধিকারের কথা বলতে শুরু করেন। তৃতীয় শতাব্দীতে সম্রাট অশোকের কিছু পদক্ষেপ চিন্তা ও বিবেকের স্বাধীনতার বিষয়টা নতুন করে আলোচনায় আনে। বস্তুত একটি রাষ্ট্রের শিল্পী, সাংবাদিক, কবি, বুদ্ধিজীবী, সাহিত্যিক, পণ্ডিত ও দার্শনিকগণ হচ্ছেন স্ব-স্ব রাষ্ট্রের বিবেক। তাঁদের চিন্তার স্বাধীনতা থেকে বঞ্চিত করা মানে জাতীর বিবেককে ধ্বংস করা। তাই জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে মুক্তবুদ্ধির চর্চা নিশ্চিত করতে হবে। মুক্তবুদ্ধি বা চিন্তার স্বাধীনতায় চিন্তাবিদগণের সুচিন্তার বক্তব্য পেশ করার স্বাধীনতাকেও বোঝায়। মানুষ অন্ধভাবে কোনো কিছু অনুসরণ না করে যখন তীক্ষ্ম পর্যবেক্ষণ, বিশ্লেষণের ভেতর দিয়ে সত্যের অনুরাগী হয়, তখনই তাকে ‘মুক্তবুদ্ধির ধারক’ বলা হয়। একটি দেশের ডাক্তার, উকিল, কবি, সাহিত্যিক, শিল্পী, সাংবাদিক, শিক্ষক, বিচারপতি প্রমুখ বুদ্ধিজীবীগণ হচ্ছেন সে দেশের মুক্তবুদ্ধির ধারক। এ সকল বুদ্ধিজীবী যখন ঐতিহ্যগতভাবে প্রাচীন সংস্কারের ধারার অচলায়তন ভেঙে যুক্তিনির্ভর বিশ্বাসযোগ্য জীবন সত্য প্রকাশের স্বাধীনতা পান তখন তাকে ‘মুক্তবুদ্ধির চর্চা’ বলা হয়। আমাদের চর্তুদিকে যে শাসনের দেয়াল, মিথ্যার দেয়াল, শোষণের সাথে সমাজের বুকে জগদ্দল পাথর চেপে বসেছে, তা সরিয়ে সমাজকে গতিময় করে তোলার জন্য সমাজকে প্রকৃত শিক্ষায় শিক্ষিত করে মুক্তবুদ্ধি চর্চার অধিকার নিশ্চিত করতে পারলেই বিশ্বসমাজকে একটি সহনশীল সমাজে পরিনত করা সম্ভব হবে। তাই সত্যকে মুক্তির আলোকে বিচার করার জন্য দরকার যুক্তিনিষ্ঠ মন। কেননা, মানুষের প্রতি মানুষের কর্তব্য আছে বলেই সমগ্র বিশ্ব সমাজের উন্নতি ও অগ্রগতি পরস্পরের উপর নির্ভরশীল। অথচ এ নির্ভরশীলতা ব্যবহার হয় হিংসা দ্বেষ অহমিকাবোধের জন্য। তাই মুক্তবুদ্ধির দ্বারা মানুষের চেতনাকে সুন্দর করলেই সে বেরিয়ে আসতে পারে সব রকম সংকীর্ণ গণ্ডি থেকে। প্রেম ও করুণার পথে কল্যাণকে সে আহ্বান করে, মনের দিগন্ত এতে প্রসারিত হয়। মানব সমাজের প্রগতি হয় নিশ্চিত, সুতরাং সংস্কার ও প্রগতিহীনতা থেকে মুক্ত হয়ে আত্মাকে সুন্দর ও প্রেমময় করে তুলতে হলে মুক্তিবুদ্ধির চর্চা আবশ্যক। অজ্ঞ ব্যক্তিরা সমাজের কুসংস্কারে আস্থাশীল হয়ে ধর্মীয় গোড়ামী ও অন্ধ অনুকরণে জ্ঞানহীন তথা মূর্খদের পক্ষ নেয়। কিন্তু শিক্ষিত মানুষ বিবেকের চোখ মেলে সত্যকে খুঁজে নেয়। সে কখনো অন্ধ আবেগে পথ চলবে না, বরং সামগ্রিক জগৎ মুক্তবুদ্ধি ও সজাগ আত্মচেতনা লাভ করেই সে হয়ে ওঠে গতিশীল জীবনের অধিকারী। পুরাতনকে আঁকড়ে ধরে বর্তমানের সত্যকে অস্বীকার করা হলো জীবনের অগ্রগতিকে অস্বীকারের নামান্তর। এজন্য সকল প্রকার কুসংস্কার ও ধর্মীয় গোঁড়ামি ত্যাগ করে মুক্তির আলোকে উদ্ভাসিত হওয়া উচিত। তাহলেই সমাজে প্রগতি আসবে। বর্তমান বিশ্বে গণতন্ত্র, সমাজতন্ত্র, কমিউনিজম ইত্যাদি মতবাদ চালু থাকলেও বাস্তবে দেখা যায়, শাসক শ্রেণির রাজতন্ত্র ও স্বৈরতান্ত্রিক আচরণ আর বিধি-নিষেধ মুক্তচিন্তার ক্ষেত্রে অন্তরায় সৃষ্টি করেছে। তাই পৃথিবীর অনেক দেশের চিন্তাবিদগণ তাঁদের মননশীলতা স্বাধীনভাবে গণমানুষের নিকট পৌঁছাতে পারছে না। ফলে তাঁদের মূল্যবান অভিমত মানুষের কল্যাণ করতে ব্যর্থ হচ্ছে। সাধারণত রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক কারণেই চিন্তা স্বাধীনতা ব্যাহত হচ্ছে। সক্রেটিস, দস্তয়ভস্কি, বোবিসপাস্তারনাক, আঁন্দ্রে শাখারভ, হাওয়ার্ড ফাস্ট, চার্লি চ্যাপলিন, নজরুল ইসলাম প্রমুখ ব্যক্তিত্বকে স্বাধীন চিন্তা প্রকাশের জন্য কঠোর শাস্তি ভোগ করতে হয়েছে। পৃথিবীর কোনো শাসকগোষ্ঠি কিংবা রাজশক্তি চিন্তার স্বাধীনতাকে কেড়ে নিয়ে সত্যকে বেশিদিন দাবিয়ে রাখতে পারেনি। এ ব্যাপারে যারা যত বেশি কঠোর হয়েছে তারা তত বেশি জনরোষে পতিত হয়েছে। এমনকি দেখা গেছে অনেক প্রজ্ঞাবান-বিচক্ষণ শাসক দেশের জ্ঞানী-গুণী, শিল্পী, সাহিত্যিক, উকিল, ডাক্তার দার্শনিক ও চিন্তাবিদদের বিশেষ সমাদর করে তাঁদের একান্ত সান্নিধ্যে এসে চিন্তার ফসলকে কাজে লাগিয়ে জনগণের নিকট অমর হয়ে আছেন। সকল দেশের সভ্য মানুষের চিন্তার স্বাধীনতা থাকার কারণেই বুদ্ধিজীবীরা সমাজ ও রাষ্ট্রের দোষ, ত্রুটির সমালোচনা করে সঠিক পথের সন্ধান দেন, সত্যের বাণীকে নির্ভীক কণ্ঠে প্রচার করেন। তাঁদের আন্দোলনই সুষ্ঠুসমাজ প্রতিষ্ঠা করে। মোট কথা মানুষের ভেদ-বুদ্ধি দূর করে মানবিক আচরণকে মর্যাদা দিতে হলে মুক্তবুদ্ধির চর্চাই একমাত্র পথ। কোনো অবস্থাতেই চিন্তার স্বাধীনতায় বাঁধা সৃষ্টি করা উচিত নয়। যুগ-যুগ ধরেই সকল সমাজেই চিন্তার স্বাধীনতা সমাদৃত হয়ে আসছে। বর্তমান যুগেও বিশ্বের বিচক্ষণ প্রশাসকরা চিন্তার স্বাধীনতার দূরদৃষ্টি নিয়ে এগিয়ে গেলেই ইতিহাসে সোনালি অধ্যায় সৃষ্টি করে অক্ষয় কীর্তি রেখে যেতে পারেন। প্রকৃতপক্ষে, মুক্তবুদ্ধি চর্চার অধিকারীরাই মানব সভ্যতার রূপকার। আর গভীর মননশীলতা ও উদার দৃষ্টিভঙ্গির জন্যই মানবসভ্যতা আজকের এ উন্নত স্তরে পৌঁছাতে সক্ষম। চিন্তাবিদগণের সুচিন্তায় বিশ্বসভ্যতা ও সংস্কৃতির প্রসার লাভে মুক্তবুদ্ধির চর্চা জাতীয় উন্নয়নকে ত্বরান্বিত করে। সমাজের সুষ্ঠু গণতান্ত্রিক সংস্কৃতি বিকাশের ধারাকে বেগবান করতে আদৌ এর বিকল্প নেই। যদিও বর্তমানে ব্যক্তিগত মতপ্রকাশের স্বাধীনতা, রাষ্ট্রের অনুমোদিত মত লালন ও বিকাশ করার কোনো সুযোগ নেই বললেই চলে। এমতাবস্থায় মুক্তবুদ্ধি চর্চার আন্দোলন খুঁজতে যাওয়া বিলাসিতার নামান্তর। তারপরও দীর্ঘ রাত্রির পর যেমন পূর্বাকাশে নবারুণ সকল নিকষ আঁধার দূর করে আলোকোজ্জ্বল দিনের অপার সম্ভাবনা সৃষ্টি করে, তেমনি করে ঠিক এমন অন্ধকার সময়ে দেশে মুক্তবুদ্ধি চর্চা আন্দোলন পুণরায় নতুন করে শুরু করা অত্যাবশ্যক। নতুন প্রজন্মের জন্য অপেক্ষা করছে এ গুরু দায়িত্ব। আমরা আশা করি নতুন প্রজন্মের মধ্য থেকেই মুক্তবুদ্ধি চর্চা আন্দোলনে প্রমিথিউসরা বের হয়ে সমাজ, দেশ ও জাতিকে নিয়ে যাবে আগামীর পথে।

Print প্রিন্ট উপোযোগী ভার্সন



Login to comment..
New user? Register..