আজীবন বিপ্লবী সুফিয়া ইসলাম

Facebook Twitter Google Digg Reddit LinkedIn StumbleUpon Email

শফিকুল ইসলাম অসীম : নারী শিক্ষার অগ্রদূত, বরিশালের নারীমুক্তি আন্দোলনের নেতা সুফিয়া ইসলাম ১৯৪০ সালের ১৩ জানুয়ারি বরিশালের শায়েস্তাবাদ ইউনিয়নের রাজাপুর গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। আইনজীবী বাবা আনোয়ার হোসেন খান তৎকালীন ভারতীয় কংগ্রেসের সদস্য হিসাবে ব্রিটিশবিরোধী অসহযোগ আন্দোলনের সাথে যুক্ত ছিলেন। সুফিয়া ইসলাম ছিলেন বাবা-মায়ের প্রথম সন্তান। মা আম্বিয়া খাতুনের কাছেই বাল্যশিক্ষা লাভ করেন। রাজাপুর গ্রামেই প্রাথমিক শিক্ষার পাঠ শেষ করে বরিশাল সদর গার্লস স্কুলে ভর্তি হন। কৃতিত্বের সাথে সুফিয়া ইসলাম তাঁর পড়াশুনা চালিয়ে যাচ্ছিলেন। কিন্তু তিনি দশম শ্রেণিতে ওঠার পরে বাবা আনোয়ার হোসেন হজব্রত পালন করতে যান এবং ফিরে এসে ঘোষণা দেন তাঁর আর পড়াশুনা করার প্রয়োজন নেই। বাবা স্কুলে যাওয়া বন্ধ করে দেন। বাবার এই আচরনকে তিনি মেনে নিতে পারেননি। স্কুলে যাওয়া বন্ধ করলেও সেই সময়ের বরিশাল সদর গার্লস স্কুলের প্রধান শিক্ষিকা শান্তি গুহ’র সহযোগিতায় তাঁর পড়াশুনা চালিয়ে যান। বাড়ির সবাই ঘুমিয়ে পড়লে গভীর রাতে তিনি লেখাপড়া শুরু করতেন। তাঁর এই লেখাপড়ায় উৎসাহ যুগিয়েছেন মা আম্বিয়া খাতুন ও দাদি খাদিজা বেগম। ক্রমশ ম্যাট্রিক পরীক্ষার সময় চলে আসে। পরীক্ষা শুরুর দুই দিন পূর্বে সুফিয়া ইসলাম পরীক্ষার প্রবেশ পত্র সংগ্রহ করতে স্কুলে গেলে তাঁর বাবা সকল বই খাতা লুকিয়ে ফেলে গ্রামের বাড়ি চলে যান। শত প্রতিকুলতার মাঝেও ১৯৫৬ সালে তিনি উচ্চতর দ্বিতীয় বিভাগে ম্যাট্রিক পাশ করেন। কিন্তু তাঁর কৃতিত্ব বাবাকে টলাতে পারেনি। বাবা আরও ক্ষিপ্ত হয়ে উঠেন এবং মেয়েকে বিয়ে দেয়ার চিন্তা করেন। তিনি পাত্র হিসেবে মাদ্রাসা থেকে পাশ করা একজন ছেলেকে বেছে নিলেন, যার পূর্বে আর একটি বিয়ে ছিল। বাধ সাধলেন মা ও দাদি। বাবা সবার মতামতকে আগ্রাহ্য করে ওই ছেলের সাথে বিয়ে রেজিস্ট্রি করেন। সুফিয়া ইসলাম বাড়ি থেকে পালিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। সহযোগিতা করেন মা। তিনি তাঁর স্কুলের প্রধান শিক্ষিকা শান্তি গুহ’র কাছে আশ্রয় চান এবং সহযোগিতা কামনা করেন। শান্তি গুহ বরিশালের কিংবদন্তি নেত্রী মনোরমা বসু মাসিমার সহযোগিতায় ম্যাজিস্ট্রেটের কাছে তাঁর বিবাহ সংক্রান্ত জবানবন্দি প্রদান করেন এবং ম্যাজিস্ট্রেটের সহযোগিতা কামনা করেন। তাঁর বাবা তাঁকে জোরপূর্বক শ্বশুরবাড়িতে পাঠানোর আয়োজন করলে ম্যাজিস্ট্রেট পুলিশ পাঠিয়ে সে আয়োজন বন্ধ করেন। এর পর তিনি আর বাড়িতে থাকেন নি। বরিশাল মহিলা কলেজের হোস্টেলে থেকে তাঁর পড়াশুনা চালিয়ে যান। এ সময়ে বরিশালের তৎকালীন ডিসি’র বিশেষ বৃত্তি এবং অন্যান্য প্রগতীশীল মহলের আর্থিক ও নৈতিক সহায়তা তাকে পড়াশুনা চালিয়ে যেতে সহায়তা করেছে। বরিশাল মহিলা কলেজের হোস্টেলে অবস্থানকালে একদিন মায়ের মিথ্যা অসুস্থতার খবর দিয়ে বাড়িতে এনে তাকে আটকে রাখার প্রচেষ্টা চালান বাবা। সুফিয়া ইসলামের আটক রাখার খবর পেয়ে বরিশালের কিংবদন্তি বিপ্লবী কমিউনিস্ট নেতা নলীনী দাসের নেতৃত্বে প্রগতীশীল কর্মীরা তাঁর বাবার বাড়ির সামনে অবস্থান নেন, যেন সুফিয়া ইসলামকে তাঁর বাবা অন্যত্র সড়িয়ে না নিতে পারে। পরবর্তীতে পুলিশ এসে সুফিয়া ইসলামকে বাবার বাড়ি থেকে বের করে নিয়ে আসে। সুফিয়া ইসলাম স্কুল জীবনেই মনোরমা বসু গঠিত মহিলা সমিতির সদস্য হন। মহিলা সমিতির সদস্য হিসেবেই বাড়িতে বাড়িতে গিয়ে চাঁদা ও মুষ্টির চাল সংগ্রহ করতেন। নৈশ বিদ্যালয়ে বয়স্ক শিক্ষার ক্লাশ পরিচালনা করতেন। বিভিন্ন সভা সমাবেশেও অংশগ্রহণ করেছেন। এ সময় কমিউনিস্ট নেতা হিরেণ ভট্টাচার্য, ফণি ভূষণ বাবুর নেতৃত্বে নিষিদ্ধ কমিউনিস্ট পার্টির কাজে সম্পৃক্ত হন। সুফিয়া ইসলাম ১৯৫৮ সালে কমিউনিস্ট নেতা এবং দক্ষিণাঞ্চলের অন্যতম কমিউনিস্ট তাত্ত্বিক অ্যাডভোকেট নুরুল ইসলামের সঙ্গে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন। ১৯৫৮ সালের ২৪ সেপ্টেম্বর বরিশাল মহিলা কলেজ হেস্টেলেই তার বিবাহ অনুষ্ঠান সম্পন্ন হয়। বিয়ের পরে হোস্টেল ছেড়ে কাউনিয়া ব্রাঞ্চ রোডে নূরুল ইসলামের বাসাতে উঠেন সুফিয়া ইসলাম। বিয়ের সাতদিনের মাথায় পুলিশ সুফিয়া ইসলামের বাড়ি তল্লাশি করে। স্বামী কমিউনিস্ট নেতা হওয়ায় কয়েকদিন পর পর পুলিশি হয়রানির শিকার হতেন। ফলে তাঁর পড়াশুনার ধারাবাহিকতা ব্যাহত হয়। ১৯৬২ সালের শিক্ষা আন্দোলনের সময় ২১ ফেব্রুয়ারি ১১ মাসের বাচ্চাসহ সুফিয়া ইসলাম গ্রেফতার হন। শিশু সন্তানসহ সারাদিন কোতোয়ালি থানায় আটক থাকার পরে রাতে মুক্তি পান। একইসময় থেকে স্বামী নূরুল ইসলামের উপরে হুলিয়া জারি হওয়াতে তিনি আত্মগোপনে যান এবং পরবর্তী ১০ মাস আত্মগোপনে থাকেন। এসময় থেকেই অর্থাৎ ১৯৬২ সন থেকে নূরুল ইসলাম আর ওকালতি পেশাতে ফিরে যাননি। স্বামীর আত্মগোপনের সময়কালে সুফিয়া ইসলামকে শিশু সন্তানসহ বিভিন্ন কমিউনিস্ট নেতাদের আশ্রয়ে থাকতে হয়েছে। ১৯৬৪ সালে উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষায় দ্বিতীয় বিভাগে উত্তীর্ণ হন সুফিয়া ইসলাম। ১৯৬৪ সালে কমিউনিস্ট পার্টির সদস্যপদ লাভ করেন। একইসময়ে কমরেড নূরুল ইসলাম কমিউনিস্ট পার্টির সার্বক্ষণিক কর্মী হিসেবে কাজ শুরু করেন। ১৯৬৪-৬৫ সালে ছাত্র ইউনিয়ন জেলা কমিটির সদস্য হন। ১৯৬৬ সালে তিনি বিএম কলেজ থেকে স্নাতক পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন এবং বরিশাল আলতাফ মেমোরিয়াল গার্লস হাইস্কুলের শিক্ষকতা পেশায় যুক্ত হন। তখন থেকেই শিক্ষক আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন ২০০০ সাল পর্যন্ত। তিনি বরিশাল শিক্ষক সমিতির সম্পাদকমণ্ডলীর সদস্য ছিলেন। ১৯৬৮-৬৯-এর গণআন্দোলনের সময় ঢাকা টিচার্স ট্রেনিং কলেজের পড়াশুনার জন্য ঢাকাতে অবস্থানকালে তিনি ছিলেন মিছিলের পুরোভাগে। গণআন্দোলনের সময় বরিশালে গ্রেফতার হন স্বামী নূরুল ইসলাম আর ঢাকাতে গ্রেফতার হন ভাই ছাত্র ইউনিয়ন কর্মী মোয়াজ্জেম হোসেন মানিক। এসময় রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের পাশাপাশি বি.এড পাস করেন এবং ১৯৭০ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইতিহাসে স্নাতকোত্তর পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন। জন্মলগ্ন থেকেই মহিলা পরিষদ বরিশালের সঙ্গে কাজে যুক্ত ছিলেন সুফিয়া ইসলাম। ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের সময় ২৫ মার্চ বরিশালে ছিলেন। মুক্তিযুদ্ধের প্রস্তুতিকালীন প্রশিক্ষণ ক্যাম্পে সহযোগিতা করেন। ১৯৭১-এর ৪ এপ্রিল বরিশাাল ত্যাগ করে মনোরমা বসু ও নলিনী দাসসহ স্বরূপকাঠিতে আশ্রয় নেন। এসময় মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য বিভিন্ন খবর সংগ্রহ ও সরবরাহ করেন। শহরত্যাগী মানুষদের নানাভাবে সহযোগিতা করেন। ২০ ডিসেম্বর বরিশালে ফিরে দেখেন নিজেদের বাড়ী রাজকারবাহিনী দখল করে আছে এবং সমস্ত মালপত্র লুট হয়ে গেছে। ১৯৭১-এর মুক্তিযুদ্ধ পরবর্তী সময়ে ভারত থেকে ফেরা শরণার্থীদের পুনর্বাসনে এবং পাকবাহিনীদের দ্বারা নির্যাতিত নারীদের চিকিৎসা ও সহায়তা করেন। ১৯৭৪-৯২ সাল পর্যন্ত বরিশাল মহিলা পরিষদের সাধারণ সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। এসময় বিভিন্ন নারী নির্যাতনের ঘটনাসহ রাজনৈতিক আন্দোলনে বলিষ্ঠ ভূমিকা পালন করেন। বাংলাদেশ পরবর্তী সময়েও প্রতিক্রিয়াশীল সরকারসমূহের সময়ে হতে হয়েছে বিভিন্ন হয়রানির শিকার। ১৯৭৫-এর ১৫ আগস্ট পটপরিবর্তনের পর স্বামী নূরুল ইসলামকে আবারো আত্মগোপনে যেতে হয়। নূরুল ইসলামকে গ্রেফতারের জন্য ১৯৭৬-এর মার্চেও হানা দেয়া হয় বাসাতে। ৮০-এর দশকে তিনি সিপিবি বরিশাল শহর কমিটির সদস্য পদেও দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৮৮-তে এরশাদবিরোধী আন্দোলনের সময়েও গ্রেফতার হন স্বামী নূরুল ইসলাম এবং জেলখানাতে সাধারণ কর্মীদের ডিভিশন প্রাপ্তির জন্য অনশনকালে স্ট্রোকের শিকার হন। সুফিয়া ইসলামকেও হতে হয়েছে পুলিশি নজরদারির শিকার। ১৯৯৭ সালের ১০ মার্চ স্বামী নূরুল ইসলামের মৃত্যুর পরও তিনি শিক্ষকতা ও নারী আন্দোলনের কাজ চালিয়ে যান। ২০০০ সালে সুদীর্ঘ ৩৪ বছরের শিক্ষকতা জীবনে অবসান ঘটিয়ে আলতাফ মেমোরিয়াল গার্লস স্কুল থেকে সহকারী প্রধান শিক্ষিকা হিসেবে অবসর গ্রহণ করেন। ২০০১ সালে গ্লুকোমা আক্রান্ত হয়ে দৃষ্টিশক্তি হারানোর কারণে আর রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে সক্রিয় থাকতে পারেননি। ২০০৪ থেকে তিনি ঢাকাতে অবস্থান করছিলেন সন্তানদের কাছে। ২৯ ডিসেম্বর ২০১৮তে অসুস্থ অবস্থায় হাসপাতালে ভর্তি হন এবং ৪ জানুয়ারি ২০১৯ রাত ১১:৩০ মিনিটে তিনি মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েন। তিনি আমৃত্যু বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি (সিপিবি)’র সদস্য ছিলেন। কমরেড নুরুল ইসলাম এবং সুফিয়া ইসলামের দুই সন্তান, শফিকুল ইসলাম অসীম বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডে এবং সাইফুল ইসলাম সমীর বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে প্রকৌশলী হিসেবে কর্মরত আছেন। সাইফুল ইসলাম সমীর বর্তমানে সিপিবি সূত্রাপুর থানা কমিটির সহ-সাধারণ সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।

Print প্রিন্ট উপোযোগী ভার্সন



Login to comment..
New user? Register..