শপিং মল

Facebook Twitter Google Digg Reddit LinkedIn StumbleUpon Email

মেহেদী হাসান: এক নতুন গড়ে উঠা বিশালাকার এক শপিং মল; গ্রাউন্ড ফ্লোরে বেশ কয়েকটি দেশীয় ব্র্যান্ডের কাপড়ের দোকান- এগুলোকে অবশ্য দোকান বললে যেন ঠিক ম্যাচ করে না; আউটলেট বা শপ বললেই বোধ করি, ব্লাউজের সাথে কপালে পরা একই রঙের টিপের মত মিল হয়। মাসুদ এখানে এসেছে নিজের জন্য কিছু জামা-কাপড় কিনতে। বৈদ্যুতিক আলো দিয়ে “Entr” লেখা’র নিচের পথ দিয়ে অবলীলায় ঢুকে পড়ে সে। সাধারণত, অনেকক্ষণ ধরে খোঁজাখুঁজির পরই কেবল কোনো পোশাক হয়ত তার পছন্দ হয়, তবে আজকে সেটার ব্যতিক্রম ঘটল; হ্যাঙ্গারে ঝোলানো কাপড়-চোপড় থেকে নয়, প্রবেশ পথ দিয়ে ঢুকতেই চোখে পড়া সেলস বয়ের পরনের সার্ট মনে ধরে গেল তার। কোন পোশাক পছন্দ হয়ে যাওয়া, তার কাছে অনেকটা প্রেমে পড়ার মতই। এরপর অন্য যত সুন্দর কাপড়-চোপড়ই সে ঘুরে ফিরে দেখুক না কেন, প্রথমে ভালো লেগে যাওয়া পোশাকটি বাদে অন্য কিছুতে সে মন লাগাতে পারে না। প্রথমে একটা অন্যথা হল বলেই হয়ত ব্যত্যয়টিকে পুষিয়ে নিতে এই ব্যাপারে সে অন্য দিনের চেয়ে আজকে একটু বেশি একরোখা। আউটলেটটির ভেতরে বেশ কয়েকটি লাইনে হ্যাঙ্গারে ঝোলানো সারি সারি শার্টগুলোর মধ্যে সেলস বয়টির গায়ের শার্টের অনুরূপ শার্ট খুঁজতে লাগল সে। পরীক্ষায় ফেল করা কোনো ছাত্র যেমন আঁতিপাঁতি করে খুঁজেও তার রোল নাম্বার রেজাল্ট সিট কোথাও দেখতে পায় না, মাসুদও ঐ নির্দিষ্ট ধরনের শার্ট খুঁজে পেল না। যাহোক, কী আর করা, এখন ছেলেটির সাথেই কথা বলতে হবে। সে একজন কাস্টমারের পিছু পিছু ঘুরছিল। একপর্যায়ে লোকটি চলে যেতেই ছেলেটি ফ্রি হওয়ামাত্রই সে এক নিমিষে তার সামনে গিয়ে দাঁড়িয়ে, ‘এরকম দেখতে শার্ট কোন সারিতে আছে, বলুনতো। আমি তো হয়রান হয়ে গেলাম, কোথাও পেলাম না’। তারপর একটু থেমে, ‘এটার স্টক কি এরমধ্যেই ফুরিয়ে গেছে’, তাড়া দিয়ে জানতে চাইল সে। এই মুহূর্তে ছেলেটির মুখভাব দেখবার মত, যেন কাদা মাখা গ্রাম্য-পথ দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে হঠাৎ পা পিছলে পড়ে গেছে! ডানে, বামে একবার করে তাকিয়ে নিয়ে ছেলেটি শুরু করল, এখান থেকে দুই-তিনটা জামা-কাপড় কিনলেই সামান্য কয় টাকা বেতনের প্রায় সবটাই ফুরিয়ে যাবে। তারপর ঢাকা শহরে থাকা-খাওয়া চলবে কিভাবে। এইটুকু বলার পর ছেলেটা একটু থামল। এবার ছেলেটার ভ্রু খানিকটা উপরের দিকে উঠে গেল, কপালে ফুটে উঠল কয়েকটা সূক্ষ্ম রেখা। ডান হাতের আঙুল দিয়ে নাকের ডগা স্পর্শ করাতে তালুতে ঢেকে গেল মুখ; চোখ দুটি আপনা থেকেই পিটপিট করতে আরম্ভ করল। এই শার্টটা আমি বঙ্গবাজার থেকে কিনেছি, ওখানেও অনেক ভালো ভালো জামা-কাপড় পাওয়া যায়। দোকান ভাড়া কম বলেই সস্তায় বিক্রি করতে পারে। কাঁপা কাঁপা কণ্ঠে স্বাভাবিকের চেয়ে খানিকটা দ্রুত গতিতে বলে গেল ছেলেটি। ছেলেটা যেন এখন আর বিশাল শপিং মলের দামি ব্র্যান্ডের শপের সেলস বয় নেই, বঙ্গবাজারের কাপড়ের দোকানের বিক্রেতায় পরিণত হয়েছে। শেষের কথাগুলো বলার সময় ছেলেটি মুখে ফুটে উঠা অভিব্যক্তি দেখে রিয়াদের মনে হল, বঙ্গবাজার থেকে শার্ট কেনার ব্যাপারটি হয়ত মিথ্যা। শার্টটি সে সম্ভবত একশ টাকা দরে কোনো ফুটপাথ থেকে কিনে নিয়েছে। চলে আসার সময় সহানুভূতি-সূচক ছেলেটির পিঠে হাত স্পর্শ করাতে গিয়ে শার্টটি যে বেশ নিম্নমানের কাপড় দিয়ে তৈরি, তা টের পাওয়া গেল। দুই রিয়াদের কেনাকাটা করার ইচ্ছাটি নিস্পৃহ হয়ে গেছে; তবে এতদূর থেকে এসেছে, এখনই চলে যেতে মন সরল না। সে ভাবলো, এবার তাহলে নানান শপ ঘুরে বিভিন্ন তরুণী সেলস গার্লদের সৌন্দর্য উপভোগ করা যাক; সুযোগ পেলে খানিকটা মজা লুটতেই বা দোষ কোথায়! অন্য আরেকটা বিখ্যাত ব্র্যান্ডের আউটলেটে ঢুকে পড়তে বিলম্ব করল না সে। কপাল তার খারাপ না; অগোছালো মনযোগে একটা জিন্সের প্যান্ট নাড়াচাড়া করছে- এমন সময় একজন সেলস গার্ল তার পেছনে পড়ল। মেয়েটির সামনে তার অস্তিত্বকে খানিকটা বেপরোয়া করে তোলার প্রত্যাশায় সে বৃথা কাজে এদিক-সেদিক করতে শুরু করে। মজবুত শারীরিক কাঠামোর মেয়েটি ওদিকে পোষা বিড়ালের আদর্শ হয়ে তাকে অনুসরণ করে চলছে। চলতে চলতে মাসুদ এক পর্যায়ে প্যান্টের পকেট থেকে ক্যামেরা সংযুক্ত মোবাইল ফোনটি বের করে কাপড়-চোপড়ের ছবি তুলতে শুরু করে। পিছন থেকে নাচের ভঙ্গিতে একটা ঘূর্ণি দিয়ে সামনে এসে দাঁড়িয়ে স্বরটাকে মোলায়েম আবরণের ভেতরে যতটুকু পারা যায় কঠিন করে তরুণী সেলস গার্লটি বলে উঠল, ‘স্যার, শপের ভেতরের কোনো প্রডাক্টের পিক তোলা একদম নিষেধ’। তাহলে, আপনারই একটা ছবি তুলে ফেলি, কি বলেন? পেঁপে গাছের ডাঁটির আকারে সামান্য উপরের দিকে বেঁকে সামনে এগিয়ে আসা হাতে ধরে রাখা মোবাইল ফোনটি ইতিমধ্যেই কাপড়-চোপড়ের দিক থেকে ঘুরে এসে মেয়েটির মেকাপ করা মুখের দিকে তাক করা হয়ে গেছে। নদীর পানিতে ভেসে উঠা মাছ- তার দিকে শিকারির কোচ নিক্ষিপ্ত হচ্ছে বুঝতে পেরে যেমন ভাবে জলের গভীরে ডুবে যায়, ঠিক তেমনি দ্রুততায় মেয়েটি লেন্সের ফোকাস-সীমানার বাইরে চলে গেল।

Print প্রিন্ট উপোযোগী ভার্সন



Login to comment..
New user? Register..