নিঃসঙ্গ তিন তরুণী

মূল : আসিয়া জেবার অনুবাদ : মনির তালুকদার

Facebook Twitter Google Digg Reddit LinkedIn StumbleUpon Email

ছোট সুন্দর সাহেল গ্রামের ঠিক মাঝখানে খোলামেলা একটা বাড়িতে তিনটি মেয়ে নিঃসঙ্গ জীবনযাপন করছিল। বাড়িটার চতুর্দিক ঘিরে রয়েছে বিশাল একটি আঙুর বাগান। আমি যখন গ্রামে বেড়াতে আসতাম, তখন এদের সঙ্গেই এভাবে আবদ্ধ হয়ে জীবন কাটাতাম। আমার বয়স তখন আর কত হবে? দশ-এগারো কিংবা বারো। পুরো গ্রীষ্ম আমি ওই তিন বোনের সবার ছোটটির সাথে খেলে কাটাতাম, সে আমার চেয়ে দু’ই বছরের বড় ছিল। ঘণ্টার পর ঘণ্টা আমরা দু’জন একসাথে বাগানে একটা গাছের নিচে দোলনায় দোল খেতাম। আর মাঝে মাঝে দোলনা থেকে নেমে ঝোপের ফাঁক দিয়ে উঁকি দিয়ে পাশের গ্রামের মহিলাদের চিৎকার-চেঁচামেচি করা দেখতাম। সন্ধ্যা হতেই খামার বাড়ির ফটক খুলে দেওয়া হতো আর এক পাল ছাড়লা-ভেড়া হুড়মুড় করে ভেতরে ঢুকে পড়ত। আমি সবচেয়ে শান্ত ছাগিটার দুধ দোয়াতে শিখেছিলাম। তারপর চামড়ার মশক থেকে সেই দুধ খেতাম, তবে আলকাতরার মতো একটা গন্ধে আমার বমি বমি লাগত। গ্রামের ধূলিমাখা গলিতে ঘুরে বেড়াবার অনুমতি না থাকলেও আমার কোনো অসুবিধা ছিল না। বাড়িটা বেশ বড়। শীতল আর ছায়াময় কয়েকটি কামরার মেঝেতে উঁচু করে ম্যাট্রেস বিছানো রয়েছে আর দেয়ালে ঝুলছে এর আাগে যিনি গৃহকর্ত্রী ছিলেন তার হাতে অনেক আগে বোনা কয়েকটা সাহারা ট্যাপেস্ট্রি, তিনি আমার মায়ের দিকের আত্মীয়া। তিনি পাশের একটি শহরের বাসিন্দা। সব শেষের কামরাটায় আমি কখনো যাই না; সব সময় অন্ধকার ওই কামরাটায় পরিবারের বার্ধক্য পীড়িত একজন আত্মীয়া মাটিতে উবু হয়ে বসে থাকেন। মাঝে মাঝে আমি আর তাদের ছোট বোনটি দরজার কাছ থেকে উঁকি দিতাম আর ভয়ে কাঠ হয়ে দাঁড়িয়ে থেকে তাঁর ভাঙা গলার ফ্যাসফেসে কথাগুলো শোনতাম, এখন তিনি কঁকানির সুরে কারো বিরুদ্ধে অভিযোগ করছেন আর কাল্পনিক কোনো ষড়যন্ত্র ফাঁস করে দেওয়ার হুমকি দিয়ে ইনিয়ে বিনিয়ে কঁকিয়ে চলেছেন। কী এমন গোপন নাটকীয় বিষয় আমরা স্পর্শ করেছি– যা এই থুথুড়ে বুড়ির প্রলাপ বকা থেকে আবার কবর খুঁড়ে বের করা হয়েছে, আবার জীবন ফিরে পেয়েছে, আর ধর্মীয় কারণে অতীতে কোনো একসময় শাস্তি অথবা হয়রান করার কথা বলে এমন এক কণ্ঠস্বরে তিনি নিন্দা করছেন যা শুনে আমরা আতঙ্কে বিহ্বল হয়ে পড়ে। হঠাৎ এধরনের আবেগের প্রকাশ ঘটলে বড়রা যেভাবে জোরে জোরে কোরআনের কোনো ঐন্দ্রজালিক পদ্ধতি আমাদের একেবারেই জানা ছিল না। এরকম একজন বুড়ি, যার এক পা কবরে, বাড়িতে থাকার মানে এ বাড়ির মেয়েরা কেউই এক ওয়াক্তও নামাজ বাদ দিতে পারে না। রান্না ঘরের পাাশেই সবচেয়ে বড় ঘরটায় সবাই একত্রিত হয়। একজন হয়তো সেলাই কিংবা অ্যামব্রয়ডারি করছে; আরেকজন মেঝেতে আসন পেতে বসে ব্যস্ত হয়ে সামনে একটা সাদা কাপড়ের ওপর ছড়ানো মটর কিংবা ডাল বাছছে। হঠাৎ পাঁচ-ছয়টি হালকা-পাতলা মানবমূর্তি উঠে দাঁড়ায়, তারপর ঘোমটা টেনে মাথা আর কাঁধ ঢেকে, চোখ নিচে নামায়। নাজুক শরীর নিয়ে নামাজের নিয়মে সোজা হয়ে দাঁড়ায়, তারপর একসাথে সেজদা করে। অনেক সময় আমার আম্মাও ওই ধার্মিক মহিলাদের সাথে নামাজে সামিল হন। আমরা ছোটরা তখন বাইরে উঠানে আপেল গাছের নিচে আশ্রয় নেই। বুড়ির আপন মনে বিড়বিড় করা আর অন্যদের ঐকান্তিকভাবে ফিসফিসানি শোনা থেকে বেঁচে যাই। বাড়ির ছাদে কবুতরের খোপগুলোতে কয়টা কবুতর আছে গুণে দেখি কিংবা কে কত উঁচুতে দোলনায় চড়তে পারি তার প্রতিযোগিতা করি। ইস! ছন্দোময়ভাবে দোলনায় চড়তে কী যে মজা, একবার উঁচু আরেকবার নিচু, বাড়ি আর গ্রাম সবকিছু ছাড়িয়ে একেবারে ওপরে। আমার স্মৃতির মাঝে এক ফাঁকে হঠাৎ একটা অন্তহীন উষ্ণ গ্রীষ্মের কথা মনে পড়ে যায়। গত শীতে সম্ভবত প্রলাপি মারা গিয়েছিল। পরিবারে তখন মেয়ের সংখ্যাও কমে এসেছে; একই সময়ে তখন কাছের শহরে অনেক খতনা আর বিয়ে হচ্ছিল। অনেকে নববধূকে সান্ত¦না দিতে আর অভিনন্দন জানাতে মেয়েরাও কনের সাথে যায়। এবার দেখলাম গ্রামের মেয়েরা আসলেও বেশ একা হয়ে গেছে। কবুতর, দোলনা আর আরো অনেক কিছু থাকা সত্ত্বেও ছোট খামার বাড়িতে থাকতে থাকতে মনে হচ্ছিল, ইস এখন যদি স্কুলে থাকতাম; বোডিং স্কুলের অন্য মেয়েদের কথা খুব মনে পড়ছিল। গ্রামের এই তিন মেয়েকে আমি বাস্কেট বল খেলার বর্ণনা দিতাম। এখন আমার বয়স বারো কিংবা তেরো। তবে আমাকে আরো বড় দেখাত, সম্ভবত আমি লম্বা আর হালকা-পাতলা গড়নের ছিলাম হয়তো সেকারণে। তিন বোনের সবার বড়টি বার বার সেই ঘটনাটির কথা মনে করিয়ে দিত, যখন আমি শহরে প্রথম একটা জনসমাবেশে অংশগ্রহণ করেছিলাম আর আমার মাথায় ঘোমটা ছিল। শহরের একজন মহিলা তখন আমার চারপাশে মৌমাছির মতো ঘরঘুর করছিল। æতার ছেলে নিশ্চয় তোমার চেহারা আর চোখ দেখে তোমার প্রেমে পড়েছে। সেক্ষেত্রে খুব শিগগিরই তোমার বিয়ের প্রস্তাব আসবে....।” ওর কথা শুনে ছোট বাচ্চাদের মতো রেগেমেগে তখন আমি মাটিতে পা ঠুকতে আরম্ভ করলাম। তারপর কয়েকদিন মুখ বার করে থাকলাম আর বড় বোনটির সাথে কোনো কথা বললাম না। সেই গ্রীষ্মে সবচেয়ে ছোট বোনটি আর আমি ওর ভাইয়ের বইয়ের আলমারিটা খুললাম, ওর ভাই তখন বাড়িতে ছিল না। এটা সবসময় তালা দেওয়া থাকত। সাহারাকে আমাদের কাছে আমেরিকার মতো অনেক দূর কোনো জায়গা মনে হতো। এক মাসেই আমরা বুককেসে রাখা সমস্ত উপন্যাস পড়ে ফেললাম; পল ব্রগেট, কোলেট আর আগাথা ক্রিস্টির লেখা সমস্ত উপন্যাস। যৌন আবেদনময়ী ছবির একটি অ্যালবাম আবিষ্কার করলাম, আর একটা খামের মধ্যে একগাদা গহনা পরা বুক খোলা উলেদ নাইল গোত্রের মেয়েদের পিকচার পোস্টা কার্ড পেলাম। ওই ভাইটি ছিল ভীষণ কড়া মেজাজের, আর এর আগে আমরা প্রতিদিন কখন তার মেজাজ চরে যায় সেই আতঙ্কে থাকতাম, আর এখন আমরা হঠাৎ একদিন দুপুরের বিশ্রামের সময় তার অস্বস্তিকর উপস্থিতি সম্পর্কে সচেতন হলাম। আসরের নামাজের জন্যে বাড়ির মহিলারা ঘুম থেকে উঠতেই আমরা সাবধানে বুককেসটা বন্ধ করলাম। অনুভব করলাম যে আমরা একটা নিষিদ্ধ জগতে ঢুকে পড়েছি, অনুভব করলাম আমরা বড় হয়ে গেছি। সেই গ্রীষ্মে তিন বোন ওদের গোপন কথা আমাকে শোনাল। এটা ছিল একটা অদ্ভুত, গুরুত্বপূর্ণ ও অপ্রত্যাশিত ব্যাপার। পরিবারের ছোট, বড় কখনো কাউকেই আমি একথাটা জানাইনি। আমি ওদেরকে কথা দিয়েছিলাম এবং বিবেকী জনোচিতভাবে আমার কথা আমি রেখেছিলাম। এই মেয়েরা বাড়ির চৌহদ্দির মাঝে আবদ্ধ থাকলেও লিখত। ওরা চিঠি লিখত ছেলেদের কাছে, পৃথিবীর চার কোণে থাকা আরব দেশের ছেলেদের কাছে চিঠি লিখত। সেই ছোট্ট গ্রামে এই তিন বোনই ছিল একমাত্র মুসলিম মেয়ে যারা প্রাইমারি স্কুলে পড়েছে। ওদের বাবা ছিলেন একজন মোটাসোটা ধর্মপ্রাণ গ্রাম্য লোক। এই অঞ্চলে তিনিই ছিলেন সবচেয়ে বড় ফল ব্যবসায়ী-তিনি ফরাসি ভাষা পড়তে কিংবা লিখতে জানতেন না। প্রতি বছর তাঁর হিসেবরক্ষকের কাছে ইনভয়েস পাঠাবার সময় সেগুলো ঠিক আছে কি-না তা নিশ্চিত হওয়ার জন্যে তাকে মেয়েদের কারও না কারও সাহায্য নিতে হতো। পোস্টম্যান ছিল গ্রামের একজন কাঠ মিস্ত্রীর ছেলে। সে নিশ্চয়ই তার পোস্ট অফিসে দূর-দূরান্ত থেকে এত এত চিঠি আসার বিষয়টা নিয়ে ভাবত বৈকি! এর আগে কেউ এ ধরনের ব্যাপার শোনেনি। যাই হোক, সে অবশ্য ঘুণাক্ষরেও কাউকে একথা জানায়নি, বাপরে! শেখের তিন মেয়ে বলে কথা। সে কোনো দিন ওই মেয়েদের দিকে চোখ তুলে তাকায়নি, তার কাছে ওরা ছিল রাজকুমারীর মতো......। খামের পেছনে প্রাচ্যের চিত্র নায়িকাদের নাম থেকে ধার করা অলীক বা কাল্পনিক নাম থাকত, যাতে বোঝা যায় যে চিঠিগুলো একজন মেয়ের কাছ থেকে এসেছে। তবে সে এতে ধোঁকা খায়নি। সে মেয়েগুলোর প্রিয়জন বা তার ধারণায় সম্ভবত ওদের পানি প্রার্থীদের কথা ভাবত। সে জানে ওই মেয়েরা কখনো ঘর থেকে বের হয় না, কেবল মাঝে মাঝে ওদের বাবা নিজে চার চাকার ঘোড়ার গাড়ি চালিয়ে ওদেরকে কাছের শহরের সবচেয়ে উন্নত টার্কিসবাথে নিয়ে যেতেন....... এভাবে অনবরত পৃথিবীর চার কোন থেকে আসা চিঠিগুলো নিশ্চয়ই তার মনের ওপর চেপে বসে তার মনে একটা গোপন হতাশা জাগিয়ে তুলেছিল। এই চিঠিগুলো সম্পর্কে কেবল একটা ব্যাপার আমার মনে পড়ে, সেটা ছিল এগুলোর সংখ্যাবৃদ্ধি আর যেসব জায়গা থেকে এগুলো আসে তার সংখ্যাটা সবচেয়ে ছোট বোনটি আর আমি সন্ধ্যায় যখন একত্রিত হতাম তখন সারা দুপুরে বসে যে উপন্যাস পড়ে সময় কাটিয়েছি, সে ব্যাপার বাদ দিয়ে ওই গোপন পত্র বিনিময়ের দুঃসাহসের কথাটা নিয়ে আলোচনা করতাম। আমরা কল্পনা করতাম ওরা হয়তো ভয়ঙ্কর কোনো বিপদের মধ্যে পড়তে যাচ্ছে। শহরে অসংখ্য ঘটনার কথা শুনেছি যে, এর চেয়েও আরো কম কারণে পরিবারের ভাই কিংবা বাবা নিজ হাতে আইন তুলে নিয়েছে; চুপিসারে একটা চিঠি হাত বদল হওয়ার কারণে বন্ধ জানালার ওপার থেকে ফিসফিস কথা বলা কিংবা কোনো মিথ্যা অপবাদে একজন অবিবাহিতা বোনের রক্ত ঝরেছে। বড় বোনটি বেশ দেমাগি ছিল, সে নিজেকে একজন কেউ কেটা মনে করত, বিয়ের জন্যে আনুষ্ঠানিকভাবে উপযুক্ত কোনো পাত্র খুঁজে না পেয়ে সে খেলাচ্ছলে ওই চিঠি লেখা শুরু করেছিল। একদিন পাশের ঘরে বড়রা যখন নামাজ শুরু করেছেন, তখন সে জোরে জোরে একটা ম্যাগাজিন থেকে নিচের বিজ্ঞাপনটা ওর বোনদেরকে পড়ে শুনিয়েছিল : æতিউনিশীয় পুরুষ, বয়স বাইশ, নীল চোখ, ফরিদ আল আত্রাশের ভক্ত, রোমান্টিক মনের আরব কলম বন্ধু খুঁজছি”......... æআচ্ছা ওই লোকটাকে চিঠি লিখলে কেমন হয়?” আমি কখনও জানতে পারিনি প্রথম, দ্বিতীয় এবং তৃতীয় পত্র বন্ধুর কাছে সে কি কি লিখেছিল; সে কি তার রোজকার একঘেয়ে জীবনের কথা, তার স্বপ্নের কথা নাকি যেসব বই পড়েছে সেসব নিয়ে লিখেছিল? হয়তো সে নিজের জন্যে একটা অ্যাডভেঞ্চার খুঁজে বের করেছিল, তবে আমি কখনো তা জিজ্ঞেস করিনি। আমি শুধু আতঙ্কিত হয়ে আবিষ্কার করলাম যে, সে খুব তাড়াতাড়ি এক ডজন পত্রবন্ধুর সাথে জড়িত হয়ে পড়েছে। ছোট বোনটিরও প্রায় একইরকম সংখ্যার পত্রবন্ধু ছিল। তবে মেজ বোনটি, যেছিল অনিন্দ সুন্দরী, ভদ্র এবং শান্ত সব সময় প্রতিবাদ করত যে, সে কখনো একজন অচেনা লোকের কাছে চিঠি লিখবে না। বেশ কয়েক বছর ধরে খুব যতেœর সাথে নীরবে সে তার বিয়ের পোশাক তৈরি করছিল। যদি সে তা-ই করে থাকে, এতে ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে যে, সে প্রেমে পড়ার জন্যে তৈরি। আর তাই সে অপেক্ষা করতে রাজি, সেলাই আর অ্যামব্রয়ডারি নিয়ে ব্যস্ত থাকছে আর অবশেষে তার জন্যে যে বর ঠিক করা হবে তাকে সে অবশ্যই ভালোবাসতে প্রস্তুত। আমার তখন তেরো বছর বয়স, সম্ভত সে-বার শীতের ছুটিতে ছোট বোনটির সাথে বিকেলে যখন কথা বলতাম তখন তার কাছে শুনতাম চিঠিতে কী কী বিষয় নিয়ে লেখা যায়, তা নিয়ে ওদের তিন বোনের মধ্যে তর্ক হতো। বড় বোনটি তার অনেক পত্রবন্ধুর কাছে মিসবীয় এবং লেবানিজ গানের কথাগুলো লিখে জানাত আর আরব অভিনেত্রী আর সিনেমার নায়িকাদের ছবি পাঠাত। তবে সবার ছোট বোনটি তার চিঠির বিষয়বস্তু সম্পর্কে রহস্যময়ভাবে নীরব ছিল..........। গেলবার যখন এখানে এসেছিলাম, তখনকার স্মৃতিগুলো আমার মনে তালগোল পাকিয়ে গেছে; ওদের ভাইয়ের নিষিদ্ধ বইয়ের আলমারির উপন্যাস আর গাদা গাদা রহস্যময় চিঠি আসার ব্যাপারটাসহ সবকিছু আমরা নিজেদের মধ্যে আলোচনা করে বেশ মজা পেতাম যে, ওই পোস্টম্যানটা না জানি কী ভাবছে তা কৌতুহল আর হতভম্ব হওয়ার কথাটা ভেবে আমরা নিজেরা ঠাট্ট তামাশা করতাম। ভাবতাম সে নিশ্চয়ই খুব কষ্ট পাচ্ছে কথাটা ভেবে যে, সে নিজে গ্রামের এই রাজকন্যাদের কাউকেই বিয়ে করার আশা কোনোদিন করতে পারে না। ছোট বোনটি আর আমি নিজেদের মধ্যে খুব আত্মবিশ্বাস নিয়ে ফিসফিস করতাম। ঘুমে যখন চোখ জড়িয়ে আসত, তখন কল্পনা করতাম চিঠির কথাগুলো চারপাশে অলক্ষে ঘরপাক খাচ্ছে, আর পুরোনো পারিবারিক পালঙ্কে পাশাপাশি শুয়ে থাকা আমাদের সদ্য-যুবতী দেহকে চারদিক থেকে অদৃশ্য প্রলোভনের ফাঁদে পেঁচিয়ে ধরবে। এটা ছিল সেই পালঙ্ক যার ওপর শুয়ে সেই মানসিক বিকারগ্রস্ত বুড়িটি প্রলাপ বকতেন আর অনেক আগে ভুলে যাওয়া কোনো অনৈতিক বা অন্যায়ের প্রতিবাদে ধর্মকে আক্রমণ করে প্যান প্যান করতেন। স্বীকার করব আমি ভয় পেয়েছিলাম। আমি নিশ্চিত ছিলাম ছাদ থেকে একটা অগ্নিশিখার আলো নেমে এসে আমাদের পাপ প্রকাশ করে দেবে কেননা, আমিও এই ভয়ঙ্কর অপরাধী গোপন ব্যাপারের সাথে জড়িত হয়েছিলাম। ছোট বোনটি তখনো থেকথেকে প্রচণ্ড আবেগের সাথে ফিসফিস করে চলেছে। সে তখনো আর দৃঢ় ইচ্ছাশক্তির কব্জায় আটকে রয়েছে, আর এদিকে রাত গভীর হয়ে চলেছে আর জীবিত সকল প্রাণী অনেক আগেই ঘুমিয়ে পড়েছে। æআমি কখনো ওদেরকে একজন অপরিচিত লোকের সাথে আমার বিয়ে দিতে দেবো না, যে কি-না একরাতে আমাকে স্পর্শ করার অধিকার অর্জন করবে! সেজন্যেই আমি ওই চিঠিগুলো লিখছি! একদিন কেউ এসে এই জীবন্মৃত গর্ত থেকে আমাকে উদ্ধার করে নিয়ে যাবে; আমার বাবা আর ভাই হয়তো তাকে চিনবে না, কিন্তু সে আমার কাছে একজন অপরিচিত মানুষ হবে না।” আমি একটা আগাম সতর্ক বার্তা পাচ্ছিলাম যে, এই ঘুমন্ত, সংশয়শূন্য গ্রামে একটি অভূতপূর্ব নারীর সংগ্রাম দানা বেধে উঠছে। লেখক পরিচিতি : আসিয়া জেবার একজন আলজেরীয় (৩০ জুন, ১৯৩০ - জুলাই ২০১৫) ঔপন্যাসিক এবং চলচ্চিত্র নির্মাতা। উত্তর আফ্রিকার অন্যতম বিখ্যাত ও প্রভাবশালী এই লেখিকা নারীর বন্ধনমুক্তি এবং উত্তর আফ্রিকার নারীদের ওপর যে অত্যাচার চলেছে সে-বিষয় নিয়ে ফরাসি ভাষায় সাহিত্য রচনা করেছেন। তাঁর সমগ্র কাজের জন্যে তাঁকে নিউস্টাডট ইন্টারন্যাশনাল প্রাইজ ফর লিটারেচার প্রদান করা হয়। এছাড়া বেশ কয়েক বছর ধরে সাহিত্যে নোবেল পুরস্কারের জন্যে তাঁর নাম সম্ভাব্য তালিকায় এসেছিল। এই গল্পটি ডরোথি ব্লেয়ার কর্তৃক মূল ফরাসি থেকে ইংরেজি অনুবাদের বঙ্গানুবাদ।

Print প্রিন্ট উপোযোগী ভার্সন



Login to comment..
New user? Register..