চিরঞ্জীব কমরেড শাহ্ আব্দুল মোত্তালিব

Facebook Twitter Google Digg Reddit LinkedIn StumbleUpon Email

নলিনী কান্ত সরকার : আপনারে লয়ে বিব্রত রহিতে। আসেনি কেহ......। কবির এই উক্তিটি সকলের চেতনা সমৃদ্ধ হওয়া উচিৎ মনে হলেও তাদের সংখ্যা একে বারেই নগণ্য। এই সংখ্যালঘুদের একজন ছিলেন কমরেড শাহ আব্দুল মোত্তালিব (সুরুজ ভাই)। ১৯৩৪ সালের ১৭ ফেব্রুয়ারি নেত্রকোণা সদর উপজেলার বায়রাউড়া গ্রামে এক সম্ভ্রান্ত শাহ্ পরিবারে তিনি জন্ম গ্রহণ করেন। পিতা শাহ্ নওয়াব আলী, মাতা ফজরেন্নেছা। দুই ভাই দুই বোনের মধ্যে তিনি ছিলেন দ্বিতীয়। শিশুকাল থেকে বিভিন্ন প্রতিবার অধিকারী সুরুজ মিয়া দেওপুর উচ্চ বিদ্যালয়ে সপ্তম অষ্টম শ্রেণিতে অধ্যায়নকালে নাটক, খেলাধূলা, সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে পারদর্শি ছিলেন। অষ্টম শ্রেণি পাশ করার পর নেত্রকোণা আঞ্জুমান স্কুলে অধ্যায়নকালে ছাত্র লীগের যুগ্ম সম্পাদক হিসাবে বিভিন্ন স্কুলে ছাত্রদের সংগঠিত করে ৫২-এর ভাষা আন্দোলনে নেতৃত্ব দেন এবং গ্রেপ্তার হন। পরবর্তীতে ছাত্র ইইনয়ন গড়ে তোলেন। ১৯৫৩ সালে নেত্রকোণা আঞ্জুমান স্কুল থেকে ম্যাট্রিক পাশ করে নেত্রকোণা পাড়লা প্রাথমিক বিদ্রালয়ে শিক্ষকতায় যোগদান করেন। ১৯৫৪ সালে তিনি কমরেড মণি সিংহের সান্নিধ্য লাভ করেন এবং নিজে কমিউনিস্ট আন্দোলনে যুক্ত হন। ১৯৫৫ সালে গোপনে কমিউনিস্ট পার্টি এবং প্রকাশ্যে নেত্রকোণা মহকুমা আওয়ামী লীগের দপ্তর সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেন। তখন ময়মনসিংহের কমরেড জ্যোতিষ বোস, অজয় রায়, নেত্রকোণার সত্যকিরণ আদিত্য, খুশু রায়, হরিশংকর চৌধুরী, সুকুমার ভাওয়াল, হান্নান মৌলভী প্রমুখ বিপ্লবীদের নিয়ে বৃহত্তর ময়মনসিংহে প্রকাশ্যে আওয়ামী লীগ, গোপনে কমিউনিস্ট পার্টি গড়ে তোলেন। ১৯৫৬ সালে নিষিদ্ধ ঘোষিত কমিউনিস্ট পার্টির নেত্রকোণা মহকুমা সম্পাদক নির্বাচিত হন। প্রকাশ্যে শিক্ষক পরিচয়ে বাংলা প্রাথমিক বিদ্যালয়ে এবং পরে দক্ষিণ বিশিউড়া সিনচাপুর প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষক হিসাবে আদর্শ শিক্ষকের পরিচিতি লাভ করেন। এই সময় নেত্রকোণার কেন্দুয়া থানার বাহাগুন্দ গ্রামের আব্দুল সাহিদ, বারহাট্টা থানার জসমাদলের আজিজুল ইসলাম খান, পূর্বধলা থানার আঃ আজিজ তালুকদারকে নিয়ে নেত্রকোণায় শক্তিশালী ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি (ন্যাপ) গঠন করেন এবং ১৯৫৭ সালে মহকুমা ন্যাপ এর যুগ্ম সম্পাদক নির্বাচিত হন। ১৯৬২ সালে ত্রেকোণা কলেজ থেকে ইন্টারমেডিয়েট পাশ করেন। এবং আইয়ুব বিরোধী আন্দোলনে নেতৃত্ব দেন। ১৯৬৪ সালে জননিরাপত্তা আইনে গ্রেফতার হন এবং ৭ মাস ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে আটক থাকেন। জেল থেকে মুক্তি পাওয়ার পর পার্টির নির্দেশে ১৯৬৫ সালে ঢাকা চলে যান। সেখানে “দৈনিক সংবাদ” ২৬৩ বংশাল রোড অফিসে সার্কুলেশন বিভাগে যোগদান করেন এবং কমরেড মণি সিংহের সান্নিধ্যে পার্টির কাজে দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৬৭ সালে জগন্নাথ কলেজ থেকে স্নাতক ডিগ্রী পাশ করে সংবাদের চাকুরি ছেড়ে দিয়ে নেত্রকোণায় চলে আসেন। ঢাকা থেকে æসংবাদ” ছেড়ে আসার সময় সংবাদ কর্তৃপক্ষ তাঁকে নিজস্ব সংবাদ দাতা হিসেবে নিয়োগ প্রদান করে। তখন থেকে নেত্রকোণায় আত্মগোপনে থেকে পার্টির সার্বক্ষণিক হিসাবে নেত্রকোণা পার্টির মূল দায়িত্ব পালন করেন। তখন কমরেড বিভা বিশ্বাস এবং তাঁর স্বামী কমরেড মৃনাল বিশ্বাসের বাড়ী ছিল নেত্রকোণা পার্টির যোগাযোগের আস্থানা। অধ্যাপক যতীন সরকার ময়মনসিংহ ছেড়ে নেত্রকোণার বারহাট্টা স্কুলে শিক্ষকতায় নিযুক্ত হলে কমরেড শাহ্ আব্দুল মোত্তালিব বারহাট্টায় আজিজুল ইসলাম খানের সাথে পার্টির গোপন যোগাযোগ করতে গিয়ে ১৯৬৭ সালে যতীন সরকারকেও নেত্রকোণা পার্টির কাজের সাথে যোগসূত্র প্রদান। সময়টা ছিল আইয়ুব বিরোধী উত্তাল আন্দোলনের সময়। সুরুজ ভাই তখন ন্যাপ-কমিউনিস্ট-আওয়ামী লীগের মৌত নেতৃত্বের মূল ভূমিকায় থেকে নেত্রকোণার প্রত্যান্ত অঞ্চল পর্যন্ত তীব্র আন্দোলন গড়ে তোলেন। ৬৯ এর গণঅভ্যূত্থানের সময় নেত্রকোণায় নেতৃত্বদানকারী প্রথম সারির নেতৃবৃন্দের মধ্যে তিনি ছিলেন অন্যতমদের একজন। সুরুজ ভাইয়ের সাথে আমার প্রথম পরিচয় ৬৯ সালে মোহনগঞ্জের কমরেড বারী ভাইয়ের বাসায় রাত্রে। আমি তখন মোহনগঞ্জ পাইলট স্কুলের ৯ম শ্রেণির ছাত্র, বারী ভাইয়ের সান্নিধ্যে ছাত্র ইউনিযন কর্মী। ৭১ সালে নেত্রকোণা থেকে শাহ্ আব্দুল মোত্তালিব, ময়মনসিংহ থেকে জ্যোতিষ বোস, অজয় রায় কিশোরগঞ্জ থেকে কাজী বারীর নেতৃত্বে ন্যাপ-কমিউনিস্ট-ছাত্র ইউনিয়নের যুব সমাজ সংগঠিত হয়ে মেঘালয়ের বারেঙ্গাপাড়ায় মিলিত হন। সেখানে তাদের সাথে যোগদেন অধ্যাপক যতীন সরকার এবং অধ্যাপক নূরুল হক। তাঁরা বরেঙ্গাপাড়া থেকে বাঘমারা মালিকোনায় গিয়ে ন্যাপ-কমিউনিস্ট-ছাত্র ইউনিয়নের গেরিলা বাহিনীর ট্রেনিং করেন। ৭১ এ শাহ্ আব্দুল মোত্তালিব ছিলেন মুক্তিযুদ্ধের সংগঠক এবং সক্রিয় মুক্তিযোদ্ধা। ১৯৭৩ সালে আমি মোহনঞ্জের গ্রামের বাড়ী থেকে সরাসরি পার্টির কাজে যুক্ত হতে চাইলে, সুরুজ ভাই আমাকে ন্যাপ-এ থেকে কাজ করার নির্দেশ দেন এবং খালিয়াজুরীতে ১৫ দিনের প্রোগ্রামে সুরুজ ভাই, বারী ভাইসহ কমরেড মণি সিংহের সাথে জীবনের প্রথম আমাকে সরাসরি পার্টির কাজে অংশগ্রহণের সুযোগ করে দেন। সুরুজ ভাই তখন নেত্রকোণা পার্টির সম্পাদক। কমিউনিস্ট পার্টিতে তখন সভাপতির পদ ছিল না। ১৯৭৩ সালে খালিয়াজুরী থেকে ১৫ দিনের প্রোগ্রাম শেষ করে এসেই সুরুজ ভাই মস্কো ভ্রমণে চলে যান। দেশে ফিরে ১৯৭৪ থেকে নেত্রকোণা কৃষক সমিতির সভাপতির দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৮১ সালে পুনরায় তিনি প্রশক্ষণ নিতে রাশিয়া চলে যান। ১৯৮২ সালে মস্কোর সোশাল সায়েন্স ইন্সটিটিউট থেকে দেশে ফিরে নেত্রকোণা পার্টির সম্পাদকের দায়িত্ব গ্রহণ করেন। ১৯৮৩ সালে নেত্রকোণা জেলা ক্ষেতমজুর সমিতির সভাপতি নির্বাচিত হন। সংগ্রামী জীবনের ৫০ বৎসর বয়সে ১৯৮৩ সালের ৩০ ডিসেম্বর আতকাপাড়া গ্রামের আক্কাছ উদ্দিন মোক্তারের মেয়ে আমিনা আক্তারের সাথে বিবাহ বনধনে আবদ্ধ হন। তারপর এক ছেলে বিন্দু এবং এক মেয়ে বীথি দুই সন্তানের জনক হন। সংসার-রাজনীতি-সামাজিক কর্মকাণ্ডের সমন্বয় গঠিয়ে বিপ্লবী কমরেড শাহ আব্দুল মোত্তালিব এর জীবন কথা অল্প সময়ে অল্প কথায় লিখে উপস্থান করা সম্ভব নয়। সক্রিয়-রাজনৈতিক কর্মতৎপরতার মধ্যেও ১৯৬৮ সাল হতে বিভিনন্ সময়ে নেত্রকোণা প্রেসক্লাব, রেডক্রিসেন্ট সোসাইটি, উদীচী, খেলাঘর, সাংবাদিক সমিতির কার্যকরী কমিটির সভাপতির দায়িত্ব পালন করেছেন। তাছাড়া দূর্যোগ উত্তর বেসরকারি ত্রাণ পুনর্বাসন কমিটি সরকারি খাদ্য ও রিলিফ বণ্ঠন কমিটি, হিন্দু-মুসলিম শান্তি রক্ষা কমিটি, নেত্রকোণা সাংস্কৃতিক পরিষদ এবং নকল প্রতিরোধ কিমিটির সদস্য হিসাবে সমগ্র জেলায় তিনি দায়িত্ব পালন করেছেন। সোভিয়েত ইউনিয়নের পতন এবং বাংলাদেরে কমিউনিস্ট পার্টির দূর্যোগ মুহূর্তে কমরেড শাহ্ আব্দুল মোত্তালিব (সুরুজ ভাই) পার্টি এবং পার্টির আদর্শ ছেড়ে এক মুহূর্তের জন্যও গড়ে দাঁড়াননি। ৯০ দশকে বিলোপবাদীরা কমিউনিস্ট পার্টি ভেঙে দিয়ে গণফোরাম এবং অন্যান্য দলে চলে গেলে অভিজ্ঞ নেতৃস্থানীয় কমরেডদের মধ্যে শাহ্ আব্দুল মোত্তালিব, কমরেড অ্যাডভোকেট রবীন্দ্র চক্রবর্তী এবং কমরেড মোস্তফা কামাল তিন জন মাত্র প্রবীণ কমরেড আমরা তিন/চার জনকে নিয়ে নেত্রকোণা পার্টির হাল ধরেন। তাছাড়া পার্টির এই দুর্দিনে বিলোপবাদীদের চক্রান্ত থেকে নেত্রকোণার পার্টিকে টিকিয়ে রাখার লড়াইয়ে আমাদের পাশে দাঁড়ান কমরেড ডা. দিবালোক সিংহ। ১৯৯৮ সালে নেত্রকোণা জেলা পার্টির বিশেষ জেলা সম্মেলনে নবীন-প্রবীনের সমন্বয় করে কমরেড শাহ্ আব্দুল মোত্তালিব (সুরুজ ভাই) সভাপতি নির্বাচিত হয়। ২০১২ সালে পার্টির দশম কংগ্রেসে কমরেড শাহ্ আব্দুল মোত্তালিব পার্টির কন্ট্রোল কমিশনের সদস্য নির্বাচিত হন। সম্পূর্ণ অসাম্প্রদায়িক চরিত্রের মানবতাবাদী মার্কসীয় আদর্শে সমাজ বিবর্তনের বিপ্লবী কমরেড শাহ্ আব্দুল মোত্তালিব জীবনের সকল কর্ম প্রয়াসের ঊর্ধ্বে কমিউনিস্ট আন্দোলনকে ব্রত হিসাবে গ্রহণ করে ছিলেন। ১৯১৪ সাল থেকে বার্ধক্য জনিত ব্যাধিত শম্যশামী হয়েও পার্টির কাজে তিনি দিক নির্দেশনা দিতেন। তিনি ছিলেন আমাদের নেত্রকোণায় পার্টি সংগঠনের সবচেয়ে অভিজ্ঞ অভিভাবক। তিনি তো কমরেড মণি সিংহ থেকে শিখে ছিলেন তাই আমাদেরকেও শিখাতেন। আমাদের মাঝে আজ সুরুজ ভাই নেই। মেনে নিতে পারছি না। যেতে নাহি দিব হায়, তবু যেতে দিতে হয়.............। পরিবর্তনের এই নিয়মকে মেনে তো নিতেই হবে। কিন্তু আমাদের এমন অভিভাবক কোথায়? তাঁর অসমাপ্ত কাজ তাহলে আমাদেরকেই করতে হবে। তাঁর মত দৃঢ়তা নিয়েই করতে হবে। স্পষ্টভাষি, দৃঢ় চিন্তের অধিকারী আপোষহীন সংগ্রামী কমরেড শাহ আব্দুল মোত্তালিব গত ২৬ ডিসেম্বর রাত ৮.১৫ মিনিটে আমাদের ছেড়ে চির বিদায় নিযে লোকান্তরে চলে গেলেন। চিরঞ্জীব কমরেড শাহ্ আব্দুল মোত্তালিব– তোমাকে ভুলব না। তোমাকে লাল সালাম। লেখক : সাধারণ সম্পাদক, সিপিবি নেত্রকোণা জেলা কমিটি

Print প্রিন্ট উপোযোগী ভার্সন



Login to comment..
New user? Register..