পোলিং এজেন্টদের অভিজ্ঞতা

গুজবে কান দেবেন না

Facebook Twitter Google Digg Reddit LinkedIn StumbleUpon Email
লাবনী শবনম মুক্তি: আসলে গুজবে কান দেয়া উচিত নয়। তাই পোলিং এজেন্ট হয়ে ভোট কেন্দ্রের হালচাল দেখতে গেলাম। নিজের চোখে দেখে আসি আসলে কি ঘটে। ভোর ৭.১৫ মিনিটে ভোট কেন্দ্রে উপস্থিত হলাম। গেটে ঢোকার সাথে সাথে আমাকে পুলিশ, আর্মি আর আনসার বাহিনীর সদস্যগণের জিজ্ঞাসাবাদের মুখোমুখি হতে হলো বেশ ভালভাবে (আমি কোনো দলের এজেন্ট)। আমি ফর্মটি দেয়ার পর তারা আমাকে দোতলায় যেতে বলল। এরই মধ্যে ক্ষমতাসীন দলের লোকজনের চোখেও পড়লাম। আমার কেন্দ্রটি ছিল পিসি কালচার হাউজিং সোসাইটি স্কুল। আমাকে একটি কক্ষ পছন্দ করতে বলল। আমি একটি কক্ষ নিলাম। আমার নির্ধারিত কক্ষে ঢুকে সহকারী প্রিজাইডিং অফিসারের বেশ ভালো ব্যবহার পেলাম। এ কেন্দ্রে ইভিএম পদ্ধতিতে ভোটগ্রহণ শুরু হলো সকাল আটটায়। প্রথম ভোট পড়লো সকাল ৮.৩০ মিনিটে। ঠিক ৯টার দিকে প্রিজাইডিং অফিসার এসে বলল ভোট প্রাপ্তির ফর্মে স্বাক্ষর করতে। আমি বললাম এখনও তো ভোট দেয়া শেষ হয়নি এখনি কেন স্বাক্ষর করবো? তিনি বললেন দেখেন আওয়ামী লীগ আর ইসলামী আন্দোলনের এজেন্টরা দিয়ে দিয়েছে। আমি বললাম আমি ভোট প্রদান শেষ হলে স্বাক্ষর দিবো। আমার এ কথা শুনে চলে গেলেন। আমার কক্ষে মাত্র দু’জন পোলিং এজেন্ট ছিল। একজন আওয়ামী লীগের আর আমি কমিউনিস্ট পার্টির পক্ষে। ভোট দেওয়ার জন্য যারা আসছিল তাদের অনেকের জাতীয় পরিচয়পত্রের সাথে হাতের ছাপ মিলছিলো না। অধিকাংশের হাতের ছাপ মিলাতে সমস্যা হচ্ছিল। এক্ষেত্রে সহকারী প্রিজাইডিং অফিসার নিজের আঙুলের ছাপ দিতে পারেন, পোলিং এজেন্ট এর অনুমতি নিয়ে। সহকারী প্রিজাইডিং অফিসার আমাদেরকে জিজ্ঞাসা না করেই অনেকটা গোপনীয়ভাবে তার নিজের হাতের ছাপ দিয়ে অনুমোদন দিচ্ছিলেন। এ কেন্দ্রে মোট ৭টি কক্ষ/বুথ ছিল। আমি ২টার দিকে সবগুলো বুথ ঘুরে দেখলাম একেকটি কক্ষে ৭৫ থেকে সর্বোচ্চ ১০০টি ভোট পড়েছে। একেকটি কক্ষের মোট ভোটার সংখ্যা ছিল প্রায় ৪৩২ জন। আর শতকরা হিসেবে একেকটি বুথের প্রাপ্ত ভোট ছিল ২৫%। ক্ষমতাসীন দলের লোকজন ভোট কেন্দ্রের মধ্যে ঘুরাঘুরি করছিল অবাধে, প্রশাসন দেখেও কিছুই বলছিল না। তারা আওয়ামী লীগ লেখা মাফলার গলায় পড়ে দম্ভের সাথে সব কক্ষে ঘুরে বেড়াচ্ছিল। অনেক প্রমাণ আনতে পারতাম কিন্তু ক্ষমতাশীল দলের তথ্য-প্রযুক্তির যুগে মুঠোফোন এবং নেট ব্যবহার করতে না পারাই তথ্য সংগ্রহে ব্যর্থ হলাম। তবে সত্য ঘটনা দেখে এলাম। গুজবে কান না দিয়ে। পোলিং এজেন্ট হয়ে আমার অভিজ্ঞতা অরণী সেমন্তি খান : চৌদ্দগোষ্ঠী বাম আমার, তো পারিবারিক বন্ধু, লাবলু কাকার এজেন্ট হইলাম। দেখতে কেমন লাগে। সকাল ৭ টায় ভোটকেন্দ্রে গেলাম, পরিচয় দিলাম, খুব সুন্দর- আর্মি আর প্রশাসনের লোকে বসতে দিলো। দিন গড়াইলো, খুব ডেডিকেশন আমার বুথের অফিসারদের। কিন্তু এই ফাঁকে কত যে এজেন্ট ব্যতিত একটি বিশেষ দলীয় লোক যাওয়া আসা করলো, হিসাব নাই। আর আমি আমার বুথ থেকে বেরোলে পুলিশ আপার কড়াকড়ি। এই গেল এক নাম্বার- অর্থাৎ পুলিশ আর্মি প্রিজাইডিং অফিসারের ঊর্ধ্বে তারা। প্রিজাইডিং অফিসারের অনুমতি নিয়া বাইরে গেলাম, ঢুকার সময় প্রবীণ আওয়ামী নেতার কড়াকড়ি, আমার সঙ্গে যাচ্ছেতাই আচরণ, চোখ রাঙানি। আমি বলছি তার সাথে আমি কথা বলবনা, অফিসার বা আর্মি ডাকেন। পুলিশরাও তার কমান্ডে চলতেছে। এই গেলো দুই নাম্বার। ভিতরে গিয়ে তাও আমার কিউট প্রিজাইডিং অফিসার কইলেন- আপনার সমস্যা হইলে আমাকে বলিবেন। আমি বলছি ভাই দ্বিতীয়বার এমন ঘটলে মিডিয়ারে কমপ্লেন দিমু। সে কয়- না না আমরা আছি তো! কিন্তু সেই নেতা এবং তার পেট মোটা দুইটা মিনি-নেতা, আমার সামনেই, দুই পুলিশেরে কইলো- অরে ঢুকতেই দিছোস ক্যান! ৩ নাম্বার। এবং আধা ঘণ্টা পর সে আমাক কয়, একদম কানের কাছে এসে, চোখ রাঙায়ে- তুমি আমার নামে কমপ্লেন করছো? তুমি তো নতুন বুঝনা কিছু। তোমারে শিক্ষা দিবো দাঁড়াও। ৪ নাম্বার- লাঞ্চ করতেছে সব। একজন বয়স্ক মহিলা আসলেন। আওয়ামী এজেন্ট ভাত খাইতে খাইতে কয়, æখালা নৌকায় ভুট দিয়েন”। চুপ থাকলাম। পরে প্রিজাইডিং অফিসার আইলো, তার লগে কইলাম ব্যাপারটা। কয় সাক্ষী আনেন। ওকে ফাইন। এরপর আমি ঘরে ঢুকে দেখি আওয়ামী এজেন্ট একজন, যার হাতে আগেই দাগ দেয়া, সে কালো পর্দা দিয়ে বের হইতেছে। স্ক্রিনে লিখা- ভোট গ্রহণ সম্পন্ন! কইলাম যে আপা আপনি না সকালে দিছেন? আপনার হাতে না দাগ আছিলো? উত্তর না দিয়া, অন্যদিকে ঘুরলো। হাসতেছিল। -ইভিএমেও চোরামি দেখলাম। ৫ নাম্বার- ম্যাজিস্ট্রেট আইলেন। নিয়ম মেনে তারে এই দুইটা অভিযোগ দিলাম। সে আপ্পিকে ওয়ার্নিং দিলো, এইটা তো আইনত দণ্ডনীয়। এই এতোটুকুই। আর ভুয়া ভোটের ব্যাপারে কইলেন সাক্ষী দেখান। আমি কইলাম এই অফিসাররা না বললে আর কারে সাক্ষী দেখামু কন? আর আমারে তো ফোনও নিতে দেন নাই। এই যে আমি অহন পুরা কোণঠাসা। ৬ নাম্বার- প্রবীণ নেতাটি আসলেন। আবার আমার কানের কাছে মুখ নিয়ে কথা বললেন। তুমি আমারে অপমান করছো, আমি তোমারেও অপমান করবো। এইটা বাংলাদেশ। এমেরিকা, কানাডা না। তুমি যা শুরু করছো এইভাবে জীবনে চলতে পারবা না। আর তোমরা তো ভোট পাইতা একশো দুইশ, সেইটাও আমি দেখতেছি। ৭ নাম্বার- খবর আইলো আমার প্রার্থী বয়কট করছে। আমারে শেষ ৬টা পর্যন্ত ধরে রাখলো তারা। এর মাঝে যা হইল- - এক ঝাঁক নারী-পুরুষ আসলো। সাড়ে ৩ টার দিকে। ইভিএমে সারাদিন দেখছি যে যার হাতের ছাপ মিলেনা তারটা সহকারী প্রিজাইডিংয়ের আঙুলের ছাপ দিয়ে চালায়ে দিয়া যায়, এজেন্টদের অনুমতি নিয়ে। অর্থাৎ, ইভিএম-ও একটা ভাওতা- যে কারো ছাপেই হয়। জাল ভোট দেয়া যায়-ই! তো সেই এক ঝাঁক নারী-পুরুষকে বিভিন্ন ঘরে ঢোকাই দেয়া হলো, ৪টার পর, আমার ঘরটা বাদে, আবার বাইরে দাঁড়ায়ে তারা জোরে জোরে আলাপ করতেছিলো, না এইটাতে নেয়া যাবে না, ঝামেলা আছে। ৮ নাম্বার- প্রিজাইডিং অফিসার যে শেষ পর্যন্ত আমাকে ধরে রাখলো, তার কথা ছিলো আমি যে সাইন করবো না তার গণনার কাগজে, তার জন্য একটা প্রমাণ হিসেবে সই দিতে হবে। সেসব কাজ শেষ করে বলল, আপনারটা প্রিন্ট করতে ভুলে গেছি, যান গা আপনে। আমি ছোট, কালা বলেই হয়ত এমন করছে! কিন্তু অফিসিয়াল প্রসিডিংসের মধ্যেই চলছিলো নৌকা মার্কার উল্লাস আর ফোন আসা আর টিটকারি মারা। এর বাইরে এতো সুষ্ঠু ভোট হইছে ম্যান! জাস্ট একটু পুলিশ, আর্মি, প্রশাসন, দলীয় লোক মিলে ভোট চুরি আর হয়রানি। নাথিং মাচ! আর আমার এলাকাটা ছিলো লালমাটিয়া। এমন এলাকায় কিছু হয় নাকি আবার! দ্রষ্টব্য ঃ নিয়মতান্ত্রিক উপায়ে, আমার সাধ্যের ভেতর সব করার চেষ্টা করেছি। এরপরেও সমালোচনা আলোচনা বা আরও শয়তানি বুদ্ধি থাকলে অবশ্যই শুনতে চাই!

Print প্রিন্ট উপোযোগী ভার্সন



Login to comment..
New user? Register..